


নিজস্ব প্রতিনিধি, নয়াদিল্লি: ভারতে খাদ্য সংকটের ছায়া তীব্র হচ্ছে! এই আশঙ্কা খোদ মোদি সরকারের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শংকরের। সেটাও তিনি বলেছেন মার্কিন মুলুকে দাঁড়িয়ে, নিউ ইয়র্কে এশিয়া সোসাইটির অনুষ্ঠানে। এই সংকটের অন্যতম কারণ? পশ্চিম এশিয়ার অস্থিরতা। হরমুজ প্রণালী বন্ধ। আর তারই জেরে জ্বালানি এবং সারের জোগানেও টান। যা আগামী দিনে খাদ্য উৎপাদনের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে চলেছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, বিদেশমন্ত্রীর আশঙ্কা-বার্তা এসেছে এমন সময়, যখন আমেরিকা এবং ইরানের মধ্যে শান্তি আলোচনা ফের ভেস্তে যাওয়ার মুখে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি ইরানের শর্ত মানবেন না। আর যতদিন না তিনি সমঝোতায় যাচ্ছেন, অচলাবস্থা থাকবে। ঠিক এই সম্ভাবনার কথা মাথায় রেখেই বিদেশমন্ত্রীর উদ্বেগ প্রকাশ, ‘পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ পরিস্থিতির জন্য অস্থিরতা চলছে, আর তার আশু সমাধানের লক্ষণ পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না। সেই কারণেই তীব্র সঙ্কট দেখা দিচ্ছে গ্লোবাল সাউথে।’ সংকটের কারণ কী? মূল ভরকেন্দ্র হিসাবে তিনি চিহ্নিত করেছেন চারটি ‘এফ’। ফুয়েল (জ্বালানি), ফার্টিলাইজার (সার), ফিনান্স (অর্থনীতি) এবং ফুড (খাদ্য)।
নয়াদিল্লি যখনই আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে গ্লোবাল সাউথের প্রসঙ্গ তোলে, তা সব সময় হয় ভারতকেন্দ্রিক। কারণ, গ্লোবাল সাউথের মধ্যে সবচেয়ে বেশি জনসংখ্যার দেশ ভারত। অতএব এই চার সংকটের সম্মিলিত প্রভাবে সবথেকে বড়ো অভিঘাত আসতে চলেছে ভারতেই। জয়শংকর বলেছেন, ‘রাশিয়া, পশ্চিম এশিয়া, উপসাগরীয় দেশগুলিতে সারের উৎপাদন এবং রপ্তানি প্রবল ধাক্কা খেয়েছে। ফলে যেসব দেশে সার যায়, সেখানকার খাদ্য উৎপাদন সবার আগে ধাক্কা খাবে। ভাণ্ডারে টান পড়লে খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি হবেই।’ প্রসঙ্গত, গত ৭৯ বছরে একাধিকবার খাদ্য সংকটের মুখোমুখি হয়েছে ভারত। ছয়ের দশকে আমেরিকা ও ব্রিটেন থেকে খাদ্যশস্য আমদানি করতে হয়েছে। সেই সময়ই সবুজ বিপ্লব করে সংকটের স্থায়ী মোকাবিলা করা গিয়েছিল। কিন্তু এই মুহূর্তে খাদ্যশস্যের উৎপাদন ও মজুত কমলে বাজার ও গণবণ্টন দুই ক্ষেত্রেই সংকট। কারণ, সরকারিভাবে ৮০ কোটি জনতাকে বিনামূল্যে চাল, গম দেওয়া হয় রেশনে। খাদ্য সংকট প্রভাব ফেলবে তাতে।
রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ সভায় জয়শংকর এই সুরেই উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন খাদ্য, জ্বালানি, সার ও অর্থনীতির মহাবিপদ নিয়ে। সেই প্রসঙ্গ টেনে এদিন আবার তিনি মনে করিয়ে দেন, ‘বিশ্বের নীতি নির্ধারক ও শক্তিশালী অর্থনীতির দেশগুলিকে এখন দায়িত্বশীল হতে হবে। শুধু তাদের স্বার্থের কথা না ভেবে দুনিয়া জোড়া আসন্ন সংকট নিয়ে ভাবতে হবে। সারের সাপ্লাই ও জ্বালানির জোগান স্বাভাবিক করার লক্ষ্যে এখনই কোনো সিদ্ধান্ত না নিলে কোনোভাবেই আর বিশ্বজোড়া মহামন্দা ঠেকানো যাবে না।’ জয়শংকরের আশঙ্কার মধ্যে রয়েছে বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তন এবং সুপার এল নিনোর প্রভাবও। তার জেরে কৃষিতে বিপুল বিরূপ প্রভাব পড়ছে এখনই। কংগ্রেস অবশ্য কটাক্ষ করেছে, মোদি সরকারের মন্ত্রী এখন খাদ্যপণ্যের সংকটের কথা বলছেন! নরেন্দ্র মোদি যদি সময় থাকতে কাজ করতেন, তাহলে দেশকে এই সংকটের মুখে পড়তে হত না।
ধান, গম, ভুট্টার মতো খাদ্যশস্যের চাষে প্রত্যেকটির জন্য গড়ে ১৫ থেকে ১৮ শতাংশ সার প্রয়োজন। পাশাপাশি আখ, কলা, আলু, সবজি এবং তুলোচাষেও সার ব্যবহার হয়। ভারতে বছরে লাগে সাড়ে ৬ কোটি টন। সবথেকে বেশি আমদানি হয় পটাশ (পটাশিয়াম যুক্ত সার)। তা আসে রাশিয়া, বেলারুশ, কানাডা থেকে। ফসফেটের ক্ষেত্রে কাঁচামাল আমদানির উপর নির্ভর করতে হয়। ইউরিয়ার জন্য প্রয়োজন প্রাকৃতিক গ্যাস। যা দেশে উৎপাদিত হলেও সার্বিক চাহিদা মেটাতে আমদানি করতেই হবে। অতএব যুদ্ধের ছায়া আমাদের স্পর্শ করেনি বলে দেশের অন্দরে প্রচার করলেও মোদি সরকারের বিদেশমন্ত্রী আন্তর্জাতিক মঞ্চে কিন্তু আশঙ্কার বার্তাই দিলেন। পশ্চিম এশিয়ার অনিশ্চয়তা, হরমুজ প্রণালী এবং কৃষ্ণসাগরের করিডরকে স্তব্ধ করে দেওয়া—সংকটে কিন্তু ভারতই।