


অপরাধ, গ্রেপ্তার, গুলি, মৃত্যু। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সব শেষ। আদালতে তারিখ পে তারিখ নেই। সাক্ষীর জন্য অপেক্ষা করার দরকার নেই। বিচার ‘অন দ্য স্পট’। সেই কবে মুখ্যমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘সকালে জমা, বিকালে খরচ!’ তারপরই বারুইপুরে নাবালিকা খুন-ধর্ষণকাণ্ডে ধৃত অভিযুক্তের এনকাউন্টার হয়েছিল। সেটা অবশ্য সাড়ে তিন মাস আগের কথা। মাঝে আর এমন ঘটনা ঘটেনি। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রীর বাণী তো বিফলে যাওয়ার নয়। তাই তো চোরবাগানের ঘটনায় গোটা রাজ্যে যখন শোকের আবহ চলছে, ঠিক সেই সময়ই আবারও রাজ্যে ফিরল ‘এনকাউন্টার-রাজ’। মঙ্গলবার ভোররাতে গাইঘাটায় একাদশ শ্রেণির ছাত্রীকে ধর্ষণ ও মুখ থেঁতলে খুনের ঘটনায় মূল অভিযুক্ত প্রল্হাদ দাসের মৃত্যু হয়েছে পুলিশের গুলিতে। আবার সেদিনই দিনেদুপুরে মুর্শিদাবাদের ধুলিয়ানে বিজেপি কর্মী খুনের মামলায় অভিযুক্ত সামাউন শেখও তদন্তকারীদের বুলেটে নিহত। দু’টি পৃথক ঘটনা, অথচ পুলিশের বয়ান প্রায় এক। অপরাধের পুনর্নির্মাণের জন্য অভিযুক্তকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল ঘটনাস্থলে। সেখানেই পুলিশের পিস্তল ছিনিয়ে পালানোর চেষ্টা করে সে। এলোপাতাড়ি তিনটি গুলিও চালায়। তারপরই পুলিশের পালটা গুলি। ব্যস, খতম অভিযুক্ত। রাজ্যের মন্ত্রী, শাসকদলের বিধায়করা এব্যাপারে পুলিশের পাশে। রীতিমতো ঘোষণা করছেন, এটাই আইনের শাসন! অথচ প্রশ্নটা ঠিক উলটো। আইনের শাসনে অপরাধীর শাস্তি নির্ধারণ করবে কে? আদালত, নাকি পুলিশের পিস্তল? অভিযুক্ত যতই ঘৃণ্য অপরাধে অভিযুক্ত হোন, তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণের দায় রাষ্ট্রের। তাঁকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়াও রাষ্ট্রেরই কর্তব্য। সেই পথ এড়িয়ে গুলি চালিয়ে দেওয়াকে যদি ন্যায়বিচার বলা হয়, তা হলে আইন এবং প্রতিহিংসার মধ্যে তফাত কোথায়?
সমস্যা হল, এই প্রশ্ন তোলার অবকাশ ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে। কেউ প্রশ্ন তুললেই পালটা উড়ে আসছে, নিজের মেয়ের সঙ্গে এমন হলে কী করতেন? যেন বিচার চাইলে অপরাধীকে বিনা বিচারে মেরে ফেলতেই হবে! জনতার একাংশ এই ‘ইনস্ট্যান্ট’ বা তাৎক্ষণিক বিচার রীতিমতো উৎসব হিসাবে উদযাপন করছে। নারী নির্যাতন বা নৃশংস খুনের মতো অপরাধে মানুষের ক্ষোভ স্বাভাবিক। সেই ক্ষোভকে অস্বীকার করার প্রশ্ন নেই। বছরের পর বছর মামলা ঝুলে থাকা, সাক্ষ্যপ্রমাণ নষ্ট হওয়া, অপরাধীর শাস্তি না পাওয়া—এই ব্যর্থতাই মানুষকে বন্দুকের নলে ন্যায়বিচার খুঁজতে শিখিয়েছে। এনকাউন্টারকে সমাধান ধরে এনকাউন্টার নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুললেই পালটা উড়ে আসছে, নিজের মেয়ের সঙ্গে এমন হলে কী করতেন? যেন বিচার চাইলে অপরাধীকে বিনা বিচারে মেরে ফেলতেই হবে! এই যুক্তি আবেগের। আর তাকেই অস্ত্র করে আইনের মৌলিক প্রশ্নটিকেই চাপা দিচ্ছে প্রতিশোধের আকাঙ্ক্ষা। ন্যায়বিচার সেখানে অর্থহীন।
এনকাউন্টারের এই সংস্কৃতি অবশ্য আজকের নয়। এরাজ্যে নকশাল আন্দোলনের উত্তাল সময় পুলিশের পিস্তল বারবার গর্জে উঠেছে এভাবে। গত শতাব্দীর আট-নয়ের দশকে মুম্বইয়ের আন্ডারওয়ার্ল্ডের রমরমা রুখতেও একই পন্থা নিয়েছিল পুলিশ আর সাম্প্রতিক উত্তরপ্রদেশের উদাহরণ তো রয়েছেই। বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন রাজ্যে পুলিশের বন্দুক হয়ে উঠেছে আইনের বিকল্প। প্রতিবারই প্রায় একই গল্প: অভিযুক্ত পালানোর চেষ্টা করেছে, পুলিশকে আক্রমণ করেছে, আত্মরক্ষার্থে গুলি চালাতে বাধ্য হয়েছেন অফিসাররা। অভিযুক্তের মৃত্যু হওয়ায় সেই বয়ানের সত্যতা যাচাই করার অবকাশ থাকে না। পুলিশের দাবিই হয়ে ওঠে ধ্রুব সত্য। এভাবে যদি এনকাউন্টার হয় তার বিচার করবে কে? ২০২৫ সালে এনকাউন্টারকে মহিমান্বিত করার বিপজ্জনক প্রবণতা নিয়ে হুঁশিয়ারি দিয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট। কিন্তু সতর্কবার্তাও কারও কানে পৌঁছায়নি। জনমতের চাপে রাজনীতিকরাও এর বিরোধিতা করতে ভয় পান। অথচ এই প্রবণতার সবচেয়ে ভয়ংকর দিক কিন্তু অপরাধীর মৃত্যু নয়, রাষ্ট্রের হাতে থাকা বিচারবহির্ভূত ক্ষমতার বিষয়টি আম জনতার কাছে সয়ে যাওয়া। আজ জনতার রাগের সঙ্গে পুলিশের গুলি মিলে গিয়েছে বলে উল্লাস হচ্ছে। কাল কোনো নিরপরাধ মানুষকে মিথ্যা অভিযোগে অভিযুক্ত করা হলে, কিংবা সরকার-শাসকদলের বিরোধিতা করার অপরাধে কেউ পুলিশের নিশানায় এলে, সেই একই জনতা কী করবে? তখনও কি বলবে, বেশ হয়েছে, ন্যায়বিচার হয়েছে? বিচারহীন হত্যার উল্লাসে আজ যাঁরা হাততালি দিচ্ছেন, কাল সেই বন্দুকের নল তাঁদের দিকেও ঘুরতে পারে। তখন আর আদালতের দরজা খোলা থাকবে তো?