


কলকাতা ও হাওড়াসহ সাতটি পুরসভায় ভোটগ্রহণ এই নভেম্বরেও হচ্ছে না! এটি নিঃসন্দেহে প্রশাসনিক ব্যর্থতা। প্রশাসনের পাপ গণতন্ত্রের ঘাড়ে চাপানো সমীচীন নয়। খসড়া ভোটার লিস্ট তৈরির কাজ অসম্পূর্ণ, ওয়ার্ড ও বুথ পুনর্বিন্যাসের জটিলতা ও কর্মীর অভাব—ভোট পিছিয়ে দেওয়ার এবংবিধ যুক্তি খাড়া করেছে প্রশাসন। ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ভোটগ্রহণের সম্ভাবনার কথা বলা হলেও, এই পরিস্থিতিতে তা তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত গড়াতে পারে বলেই আশঙ্কা সংশ্লিষ্ট মহলের। কিন্তু প্রশ্ন হল, ভোটের প্রস্তুতি নিয়ে এত অনিশ্চয়তা তৈরি হল কেন? সম্ভাব্য নির্বাচনের দিনক্ষণ নিয়ে আলোচনা চলাকালে প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলি কি ঘুমিয়ে ছিল? কলকাতায় ওয়ার্ড সংখ্যা ১৪৪ থেকে বেড়ে ২০৯ হয়েছে। স্বভাবতই বদলে গিয়েছে বহু ভোটারের ওয়ার্ড এবং বুথের বিন্যাস। এই পরিবর্তনের জন্য বাড়তি সময় ও কর্মী এবং সুষ্ঠু পরিকল্পনা যে জরুরি ছিল—এ তো জানা কথা। তাহলে আগাম প্রস্তুতিতে খামতি থাকল কেন? বিএলও-দের উপর জনগণনার কাজের চাপ, কর্মিবলের ঘাটতি মেনে নিলেও প্রশাসনের ব্যর্থতার দায় নাগরিকের ঘাড়ে চাপানোর যুক্তি খুঁজে পাওয়া যায় না। নির্বাচন অনুষ্ঠান কোনো দপ্তরের ফাইল চালাচালির মতো মামুলি বিষয় নয়, সংবিধানস্বীকৃত গণতান্ত্রিক দায়িত্ব। সময়মতো সেই দায়িত্ব পালনের ব্যবস্থা করতে না পারলে জবাবদিহি করতে হবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে। প্রশাসনিক অদক্ষতার মাশুল হিসাবে নাগরিকের ভোটাধিকার বঞ্চনা গণতন্ত্রসম্মত নয়।
হাওড়ায় ২০১৩ সালের পর পুরভোট হয়নি। বালিসহ একাধিক পুরসভায় দীর্ঘদিন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের অনুপস্থিতিতে প্রশাসকনির্ভর ব্যবস্থায় কাজ চলেছে। বছরের পর বছর এই পরিস্থিতি চলতে দেওয়া স্থানীয় গণতন্ত্রের পক্ষে বিপজ্জনক। পুরকর গুনবেন নাগরিক, অথচ পরিস্রুত জল, নিকাশি, রাস্তা, বর্জ্য অপসারণের মতো মৌলিক পরিষেবা নিয়ে জনপ্রতিনিধিদের জবাবদিহিতার ব্যবস্থা অন্তর্হিত—এ বন্দোবস্ত চলতে পারে না। প্রশাসক নিয়োগ সাময়িক প্রয়োজনেই গ্রহণযোগ্য। কিন্তু সেটিকে অনির্দিষ্টকালের ‘বিকল্প’ ব্যবস্থা বানানো চলে না। তাতে কষ্টার্জিত গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থাটি দুর্বল হয়ে পড়ে। এখন প্রয়োজন নির্ভুল, স্বচ্ছ ও সর্বশেষ ভোটার লিস্ট। ইসিআই থেকে ১ অক্টোবর পর্যন্ত ভোটার-তথ্য চাওয়া হয়ে থাকলে তার ভিত্তিতে তালিকা প্রস্তুতির কাজ দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। আরও বেশি যোগ্য নাগরিকের ভোটদানের সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। তালিকা সংশোধনের নামে একজনও বৈধ ভোটারকে বঞ্চিত করা চলবে না। খসড়া তালিকা প্রকাশের পর অভিযোগ জানানোর যথেষ্ট সময় দিতে হবে, প্রতিটি আপত্তির নিষ্পত্তি হওয়া চাই যথানিয়মে। কিন্তু তালিকা তৈরির কাজ অসম্পূর্ণ রেখে ভোটের দিন পিছিয়ে দেওয়া আর তারপর সেই বিলম্বকেই নতুন বিলম্বের যুক্তি হিসাবে খাড়া করা বন্ধ করতে হবে। তাড়াহুড়ো করে ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠান যেমন অর্থহীন, তেমনই প্রশাসনিক প্রস্তুতির ঘাটতিকে ঢাল করে ভোটগ্রহণ পিছিয়ে দেওয়াও গ্রহণযোগ্য নয়। ভোটাধিকার এবং ভোটের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দায়িত্ব কমিশনের।
অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া জরুরি। বন্ধ হোক চেনা টালবাহানা। নির্বাচন ঘিরে বাধা, প্রশাসকের দীর্ঘ শাসন এবং স্থানীয় স্তরে নির্বাচিত প্রতিনিধিত্বের অভাব নিয়ে যে প্রশ্ন ও অভিযোগ উঠেছে, তার পুনরাবৃত্তি ঠেকানোই এখন কর্তব্য। সরকার পরিবর্তন হোক বা না হোক, নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার কোনো সরকারের দয়া-দাক্ষিণ্যের বিষয় নয়। শুধু ভোটের আশ্বাস দিয়ে দায়িত্ব শেষ করা যায় না। নির্দিষ্ট নির্ঘণ্ট প্রকাশ, অবাধ প্রচারের পরিবেশ, নিরাপদে ভোটদান এবং নিরপেক্ষ গণনা নিশ্চিত করতে হয়। রাজ্য নির্বাচন কমিশনকে তার দায়িত্ব স্বাধীনভাবে পালন করতে দিতে হবে। ভোটার তালিকা প্রস্তুতির জন্য পর্যাপ্ত কর্মী, প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং রাজনৈতিক দলগুলির সঙ্গে নিয়মিত সমন্বয়ের ব্যবস্থা থাকা জরুরি। ডিসেম্বরের কোন সপ্তাহে ভোট নেওয়া হবে, তা নিয়ে ফালতু জল্পনা জিইয়ে না রেখে বাস্তবসম্মত সময়সূচি প্রকাশ করতে হবে কমিশনকে। প্রস্তুতির প্রতিটি ধাপ সম্পর্কে প্রকাশ করতে হবে স্পষ্ট তথ্যাদি। যেসব পুরসভায় দীর্ঘদিন নির্বাচিত বোর্ড নেই, সেখানেও নির্বাচনের রূপরেখা জানাতে হবে। স্মর্তব্য, স্থানীয় সরকার শাসক দলের সম্পত্তি নয়, নাগরিকের যাপনের সঙ্গে যুক্ত গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান। পুরভোট হল সেই ব্যবস্থা—পাড়ার রাস্তা থেকে নিকাশি, পানীয় জলসরবরাহ থেকে বর্জ্যঅপসারণ প্রভৃতি প্রশ্নে জনপ্রতিনিধির জবাবদিহিতা সুনিশ্চিত করার পথ। তাই আসন্ন পুরভোট নিয়ে আর কোনো অজুহাত, গড়িমসি বা দায়িত্ব এড়ানোর সুযোগ নেই। সার্বিক স্বচ্ছতার সঙ্গে তৈরি হোক ভোটার লিস্ট, প্রকাশ করা হোক গ্রহণযোগ্য নির্ঘণ্ট, সর্বোপরি ভোটগ্রহণ থেকে গণনা হোক আক্ষরিক অর্থেই অবাধ। প্রশাসনের ব্যর্থতার আড়ালে গণতন্ত্র যেন বন্দি না-হয়ে পড়ে। পুরভোটের অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার দায় রাজ্য নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের—নাগরিকের নয়।