


কলহার মুখোপাধ্যায়: কাশফুলের ঢেউ, শিউলির গন্ধ, ভোরের শিশির, নরম রোদের চাদর—বাংলায় হেমন্ত এভাবেই এসে দাঁড়াত। এখনও ঋতুচক্রের নিয়মে হেমন্ত আসে। কিন্তু প্রকৃতির শরীর তার ছোঁয়া পায় না। শরতের বিদায় আর শীতের আগমনের মাঝখানে যে স্নিগ্ধ, মায়াময় ঋতুটুকু বাঙালির মন ছুঁয়ে থাকত, তার অস্তিত্ব গিয়েছে হারিয়ে। এ কি নিছক আবহাওয়ার খামখেয়াল? নাকি প্রকৃতির উপর মানুষের নির্মম অত্যাচারের উপযুক্ত প্রতিফল?
বাংলার ছয় ঋতুর মুকুটে হেমন্ত এক নীরব, বিষণ্ণ সৌন্দর্য। শরতের কাশফুলের উচ্ছ্বাস আর শীতের কনকনে ঠান্ডার মাঝখানে তার আগমন নিঃশব্দে, মৃদু পায়ে। রবীন্দ্রনাথ লেখেন, ‘ক্ষীণ নদীরেখা নাহি করে গান আজি, নাহি লেখে লেখা বালুকার তটে...’
বাংলায় কার্তিকের শেষ আর অগ্রহায়ণের শুরু মানে বাতাসে শিরশিরানি। দুপুরের রোদে গ্রীষ্মের দহন উধাও, সন্ধ্যা নামলে হাওয়ায় মিঠে শীত। ভোরবেলা বারান্দার শিকে, ঘাসের ডগায় ঝলকে ওঠা শিশির। মাঠে ধান পাকার সুগন্ধ, চরাচরজুড়ে কুয়াশার পাতলা চাদর, রোদ্দুর নরম আর দীর্ঘ বিকেল—সবমিলিয়ে হেমন্ত যেন বাংলার প্রকৃতির নিজস্ব কবিতা, তার তাল হালকা, লয় মৃদু, ছন্দ ধীর। তবে এখন সে কবিতা ছন্দে বাজে না। তার তাল কেটেছে।
এখন নভেম্বরের দুপুরেও ঘাম ঝরে, পাখা চালাতে হয়, সন্ধ্যার বাতাসও ঘন গরম। কোথাও হঠাৎ তাপমাত্রার পতন, কোথাও দীর্ঘ সময় ধরে গরমেরই দাপট। হেমন্ত ঋতু যেন তার চেনা সময়সূচি ভুলে পথ হারিয়ে চলে যাচ্ছে অন্য কোথাও। কলকাতা ও সংলগ্ন অঞ্চলের মানুষের অভিজ্ঞতায় এ পরিবর্তন স্পষ্ট হচ্ছে ক্রমশ। আর মানুষ আরও স্পষ্ট করে জানছে... পৃথিবী উত্তপ্ত হচ্ছে।
এর প্রমাণ বিজ্ঞানীদের গবেষণাপত্রে শুধু সীমাবদ্ধ নয়। তা মানুষের দৈনন্দিন জীবন, কৃষি, স্বাস্থ্য, জীববৈচিত্র এবং সর্বোপরি অর্থনীতিতে প্রত্যক্ষ প্রভাব ফেলছে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার (ডব্লুএমও) ২০২৫ সালের জলবায়ু সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন জানিয়েছে, ২০১৫ থেকে ২০২৫, এই ১১ বছর নথিভুক্ত ইতিহাসের উষ্ণতম ১১ বছর হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে। ২০২৫ সালে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা প্রাক-শিল্পায়ন যুগের তুলনায় ছিল প্রায় ১.৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি। ভারতের আবহাওয়া দপ্তর (আইএমডি ) ২০২৫ সালের জলবায়ু বিবৃতিতে জানিয়েছে, দেশের স্থলভাগের বায়ুর বার্ষিক গড় তাপমাত্রা ১৯৯১–২০২০ সালের তুলনায় ছিল ০.২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি। ২০২৪ সালে এই ব্যবধান ছিল ০.৬৫। এর পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত রাষ্ট্রপুঞ্জের বিশেষজ্ঞ প্যানেল আইপিসিসি জানিয়েছে, গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন সহ মানুষের কাজকর্ম বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রধান কারণ। জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার, বনভূমি ধ্বংস এবং জমি ব্যবহারের পরিবর্তন এই সংকটকে তীব্র করেছে।
এই সংখ্যাগুলি কেবল গবেষণাগারের হিসাব নয়। এর অর্থ, পৃথিবীর জলবায়ু ব্যবস্থায় বিপুল তাপ জমা হচ্ছে। সমুদ্র সেই অতিরিক্ত তাপের অধিকাংশ শোষণ করে নিচ্ছে। গরমে গলছে হিমবাহ। ফলে বাড়ছে জলস্তর। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে। এবং তৈরি হচ্ছে ঝুঁকিপূর্ণ চরমভাবাপন্ন আবহাওয়া। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে পৃথিবীর জলবায়ু ব্যবস্থার শক্তির ভারসাম্যহীনতা পৌঁছেছিল সর্বোচ্চ স্তরে।
বাংলার ছয় ঋতুর ক্যালেন্ডারে হেমন্তের স্থান কার্তিক ও অগ্রহায়ণের পরিসরে। কিন্তু ঋতু তো কেবল পঞ্জিকার পাতায় বাঁধা নয়। তার অস্তিত্ব নির্ভর করে তাপমাত্রা, বাতাসের আর্দ্রতা, বৃষ্টিপাত, রাতের ঠান্ডা, মাটির আর্দ্রতা এবং উদ্ভিদজগতের পরিবর্তনের উপর। কলকাতা ও তার আশপাশে কংক্রিটের বাড়ি, পিচঢালা রাস্তা, গাছপালা কমে যাওয়া এবং যানবাহন ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের বর্জ্যতাপ শহরের নিজস্ব তাপমাত্রা বাড়াচ্ছে। একে বলা হয় আরবান হিট আইল্যান্ড। দিনের বেলা জমা তাপ রাতে সহজে বেরিয়ে যেতে পারছে না। ফলে শহরে রাতও থাকছে উষ্ণ।
প্রকৃতির উপর ধারাবাহিক অত্যাচার চালানোর প্রতিফলই ফিরে পাচ্ছে মানবজাতি। মানুষ প্রকৃতিকে বছরের পর বছর ধরে ভোগের সামগ্রী বলে মনে করেছে। হিসাব না কষে গাছ কেটে বাড়ি বানিয়েছে। জলাভূমি বুজিয়ে নগর তৈরি করেছে। নদীর স্বাভাবিক গতিপথে বাধা দিয়েছে, নির্বিচারে জীবাশ্ম জ্বালানি পুড়িয়েছে। উন্নয়নের নামে কংক্রিটের জঙ্গল তৈরি করতে গিয়ে ভুলে গিয়েছে, গাছের ছায়া, জলাভূমির আর্দ্রতা আর উন্মুক্ত মাটি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার অপরিহার্য অংশ। কলকাতা মহানগর অঞ্চল নিয়ে ২০২৫ সালে প্রকাশ হয়েছিল একটি গবেষণাপত্র। তাতে উঠে এসেছে, ১৯৯৩ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে নির্মাণ কাজ উল্লেখযোগ্য হারে বিস্তার লাভ করেছে। তার ফলে যথেচ্ছহারে কাটা হয়েছে গাছ। ১৯৯৩ সালে প্রায় ৮২৫ বর্গকিলোমিটার গাছ ছায়া দান করত। ২০২৩ সালে তা নেমে এসেছে ৬০৪ বর্গকিলোমিটারে। বৃক্ষের এই আচ্ছাদন কমার অর্থ, ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বৃদ্ধি। গবেষকদের বিশ্লেষণে নগরায়ণের সঙ্গে ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বৃদ্ধির সম্পর্ক উঠে এসেছে। সেই তথ্য জানাচ্ছে, যে গাছ একসময় পৃথিবীকে ছায়া দিত, সেই গাছের জায়গায় তৈরি হয়েছে পার্কিং লট, বহুতল ও রাস্তা। যে পুকুর বৃষ্টির জল ধরে রাখত এবং চারপাশের পরিবেশ শীতল রাখতে সাহায্য করত, তার জায়গায় মাথা তুলেছে কংক্রিট। তবে প্রকৃতি প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য অপেক্ষা করে না। তার নিজস্ব নিয়ম আছে। সেই ভারসাম্য নষ্ট হলে ফল ভোগ করতে হয় সমস্ত জীবজগতকে। মানুষের কর্মকাণ্ডে সে ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে বলেই উষ্ণায়ন, তাপপ্রবাহ, অনিয়মিত বৃষ্টি এবং জীববৈচিত্রের সংকট হয়ে উঠেছে উদ্বেগজনক। যত উষ্ণ হচ্ছে গ্রহ, ততই বাড়ছে গরম। হারিয়ে যাচ্ছে গাছপালা, নদীনালা, বিলুপ্ত হচ্ছে প্রাণীজগৎ। অপসৃয়মান নরম, মেদুর হেমন্তও।
হেমন্ত কেবল একটি ঋতুর নাম নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে বাংলার কৃষি, খাদ্য সংস্কৃতি, সাহিত্য এবং স্মৃতিও। ধান পাকার সঙ্গে এ ঋতুর নিবিড় সম্পর্ক। মাঠের সোনালি ফসল, নতুন ধান ঘরে তোলার আনন্দ, নবান্নের উৎসব আরও কত কী যে জড়িয়ে! এসবের সঙ্গে প্রকৃতির তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের সম্পর্ক গভীর। তাপমাত্রা এবং বৃষ্টির ধরন বদলে গেলে কৃষিকাজের সময়সূচি, ফসলের বৃদ্ধি, রোগ, পোকার প্রকোপ এবং সেচের চাহিদা প্রভাবিত হতে পারে। এছাড়া শিশির, কুয়াশা, পাখির বিচরণ, ফুল ফোটা ইত্যাদি বিষয়ও আবহাওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত। দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু পরিবর্তন উদ্ভিদ ও প্রাণীর স্বাভাবিক জীবনচক্রে প্রভাব ফেলে। অনেক প্রজাতিই তা সহ্য করতে পারে না। বিলুপ্ত হয়ে যায়। এ প্রবণতা শুরু হয়ে গিয়েছে। আর এ হল শেষের শুরু। তা না আটকালে সভ্যতা ধ্বংস হবে।
বিশ্ব উষ্ণায়ন রোধে উদ্যোগ নেওয়া আশু কর্তব্য। প্রথমত, নতুন গাছ বসাতে হবে। পুরানো বড়ো গাছ কেটে তার বদলে কয়েকটি চারাগাছ বসিয়ে দায় সারলে চলবে না। পরিণত গাছের ছায়া ফিরিয়ে আনতে বহু বছর লাগে। তাই প্রাচীন গাছ সংরক্ষণ, বৃক্ষরোপণ এবং চারার নিয়মিত পরিচর্যা জরুরি। দ্বিতীয়ত, জলাভূমি সংরক্ষণ ও পুকুর রক্ষা করতে হবে। জলাভূমিকে উন্নয়নের বাধা হিসাবে দেখলে চলবে না। জলা বুজিয়ে নগর সম্প্রসারণের পরিণতি নিয়ে প্রশাসনকে গভীরভাবে ভাবতে হবে। তৃতীয়ত, কমাতে হবে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার। চতুর্থত, পাড়ার গাছ কাটা, পুকুর ভরাট কিংবা অবৈধ নির্মাণ দেখে নীরব থাকা চলবে না। নাগরিক সংগঠনের সক্রিয়তা পরিবেশরক্ষার গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার।
পরিবেশ বাঁচাতে না পারলে, হেমন্তকে বাঁচাতে না পারলে ভবিষ্যৎ বাঁচানো যাবে না। ম্যাড ম্যাক্স বা কল্কি সিনেমার মতো তৈরি হবে এক ধুলোমাখা পৃথিবী। সে ভবিয্যতের পৃথিবীর সন্তানরা প্রশ্ন তুললে কী জবাব দেবে এখনকার মানুষ।
কী বলবে? আমরা জানতাম পৃথিবী উষ্ণ হচ্ছে। জানতাম, গাছ কাটা, জলাভূমি ধ্বংস, দূষণ এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণ আমাদের পরিবেশ বিপন্ন করছে। তবু আমরা উন্নয়নের নামে প্রকৃতির সম্পদ নিঃশেষ করেছি। আগামী প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য পৃথিবী রেখে যাওয়ার চেষ্টা আমরা করে যাইনি। নিজেদের সন্তানদের এ জবাব দেওয়ার মতো অপরাধ যেন বর্তমান পৃথিবীকে করতে না হয়। সকলের কাছে এটাই অনুরোধ।
হেমন্তকে বাঁচানো শুধু একটি ঋতুকে বাঁচানো নয়। তা আসলে মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির হারিয়ে যেতে বসা সম্পর্কটিকেও বাঁচিয়ে রাখা। যে পৃথিবীকে আমাদের পূর্বপুরুষরা উত্তরাধিকার হিসাবে রেখে গিয়েছেন, সে পৃথিবী কেবল আমাদের সম্পত্তি নয়, এর উপর অধিকার সেই শিশুটিরও যে এখনও জন্মায়নি। তারও অধিকার আছে শিশিরভেজা ভোরে হাঁটার, শীতল, পরিচ্ছন্ন বাতাসে শ্বাস নেওয়ার, সোনালি ধানের চালে পেট ভরানোর। আমরা সে অধিকার কেড়ে নিলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে দেওয়ার মতো আর কোনো অজুহাত বেঁচে থাকবে না।
হেমন্ত আজও আসে। কিন্তু তার আগমনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা শীতলতা, স্নিগ্ধতা আর নিশ্চিন্ত প্রকৃতির অনুভূতি ক্রমশ অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। প্রকৃতি আমাদের ছাড়া বাঁচতে পারবে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক হতে পারে। কিন্তু প্রকৃতিকে ধ্বংস করে মানুষ নিজে কত দিন বাঁচতে পারবে, সেই প্রশ্নের উত্তর আমরা বিলক্ষণ উপলব্ধি করছি। সময় এখনও আছে প্রকৃতির ভাষা বুঝতে শেখার, হেমন্তের দীর্ঘশ্বাসকে অবহেলা না করে তাকে সতর্কবার্তা হিসাবে গ্রহণ করার।
যে পৃথিবীতে ঋতুর সৌন্দর্য মুছে যেতে থাকে, সেখানে মানুষের জীবন হয়ে পড়ে বর্ণহীন। প্রকৃতিকে হারালে শুধু একটি ঋতু হারায় না, হারিয়ে যায় আমাদের সংস্কৃতি আর মাটির সঙ্গে নাড়ির টান। তাই হেমন্তকে ফিরে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা মানে শুধু শিশিরভেজা সকাল ফিরে পাওয়া নয়, প্রকৃতির প্রতি আমাদের হারিয়ে যাওয়া ভালোবাসাটুকুকেও ফিরিয়ে আনা।