


পরামর্শে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ অমিতাভ মুখোপাধ্যায়।
অফিস থেকে বাড়ি ফেরার পথে রাস্তার ধারে একটা হাওয়াই মিঠাইয়ের দোকান দেখে অটো থেকে নেমে পড়ল অরিজিতা। দিন কয়েক আগে নিজের গ্রামের মেলার গল্প করতে গিয়ে এই হাওয়াই মিঠাই খাওয়ার জন্য ছোটবেলায় কত বায়না করতেন, সেকথা বলছিলেন সুরমা। চোখটা চিকচিক করছিল যেন! অরিজিতা অটো থেকে নেমে চারটে বড় দেখে প্যাকেটবন্দি হাওয়াই মিঠাই কিনল। বাড়ির সকলের জন্য একটা করে। সদর দরজায় বউমার হাতে হাওয়াই মিঠাই দেখে সুরমা তো অবাক! শাশুড়ির কোন সে ছোটবেলার গল্প শুনে বউমা সাধ করে হাওয়াই মিঠাই কিনে এনেছে। মেয়ে নেই বলে একসময় আক্ষেপ ছিল সুরমার। আজ যেন সেই ক্ষতে কিছুটা প্রলেপ দিল কেউ।
ভারতীয় নিয়মে একটি বিয়ে মানে শুধু দু’টি মন নয়, বরং দুই পরিবারের মিলমিশ। পরের ঘর থেকে আসা বউমাকে ‘নিজের মেয়ে’ করে নেওয়ার দায়িত্ব যেমন শাশুড়ির, তেমনই অন্য একজনকে ‘নিজের মা’-এর চোখে দেখার কর্তব্যটিও বউমার। এই দুই দেখার চোখ যখনই খানিকটা মিলে যায়, তখনই সংসারের মঞ্চে জলতরঙ্গ বেজে ওঠে। সম্পর্ক, ভালবাসা, দায়-দায়িত্বের হাত ধরেই আসে মেনে নেওয়া, মানিয়ে চলার গভীর পাঠ। একটি মেয়ে যখন অন্য বাড়িতে যায়, তখন তাঁর সব আচার-আচরণ, স্বভাব সবকিছু নিয়েই সে কিছুটা চিন্তায় থাকে। শাশুড়ি ও বউমার সমীকরণ কেমন হবে, তা নিয়েও অনেকেই ভয়ে থাকে। এই দুই সম্পর্ক কিছু পরিবারে এতটাই বিষিয়ে যায় যে তৃতীয় কোনও ব্যক্তিই তাকে সুস্থ করে তুলতে পারেন না। অথচ এই দুই ব্যক্তির মধ্যে বোঝাপড়া সুন্দর হলে সংসারও সুখের হয়।
সমস্যা কোথায়?
ভারতীয় পরিবার নিয়ে হওয়া নানা সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, যত পরিবার ছোট হয়ে নিউক্লিয়ার হয়েছে, ততই সমস্যা বেড়েছে। একটা সময় ভাবা হতো, সংসারে লোকসংখ্যা কম হলে হয়তো ঠোকাঠুকি কম লাগবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গিয়েছে, ঠিক তার বিপরীত ঘটনা ঘটছে। নিউক্লিয়ার পরিবারেই সমস্যা ও অশান্তির মাত্রা বাড়ছে। মনের কথা ভাগ করার মতো মানুষের অভাব ও নানা সমস্যা মিটিয়ে দেওয়ার ‘মাধ্যম’ হয়ে ওঠা মানুষজনের সংখ্যা কমে যাওয়া এর অন্যতম কারণ বলে মত সমাজতত্ত্ববিদদের।
সাধারণত বাঙালি ঘরে সংসারের মূল কারিগর বা কর্ত্রী হলেন শাশুড়ি। তাই শাশুড়ির সঙ্গে বোঝাপড়া নিয়ে টেনশনে থাকেন কমবেশি সব মেয়েই। শাশুড়ির সঙ্গে বনিবনা না হলে অনেকেই ‘এস্কেপ রুট’ খুঁজতে যান। সেখান থেকেই আসে আলাদা হয়ে যাওয়ার মানসিকতা। ‘নিজের মায়ের জায়গা আমি কাউকেই দিতে পারব না’— এমন অনমনীয় মানসিকতার ভিতরেও থাকে নানা জটিল সমীকরণের বীজ। আবার ‘বউমা কখনওই নিজের মেয়ে হয় না’— শাশুড়িকুলের এই ভাবনাও ভিত্তিহীন ও অকারণ জটিলতা তৈরি করে। ছেলের বউ কেমন হবে তা নিয়ে আগে থেকেই যে ছবি তাঁর মনে আঁকা হয়ে থাকে, তার সঙ্গে বাস্তব না মিললে মনখারাপ হয় বয়স্ক মানুষটিরও। সেখান থেকেই বিরক্তি আসে। এর সঙ্গে থাকে দু’পক্ষেরই মানিয়ে নেওয়ার সদিচ্ছার অভাব।
সমাধান কোন পথে?
একটা নতুন সংসার কালে কালে মেয়েটির যাপনের আধার হয়ে ওঠে। সংসার বড় হয়। মেয়েটিও। বয়স হয় শাশুড়ির। ধীরে ধীরে এই বাড়ির কর্ত্রী হয়ে ওঠেন বিয়ে হয়ে আসা বউটিই। ভারতীয় সংসারের প্রকৃতি ও স্বভাব এমনই। তাই সেখানে শাশুড়ি ও বউমার সম্পর্ক ভালো হওয়া জরুরি। শুধু গৃহশান্তি বজায়ের কারণেই নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুস্থভাবে বেঁচে থাকা ও বড় হয়ে ওঠার চরিত্রগঠনেও বাড়ির পরিবেশ একটি বড় ভূমিকা নেয়। তাই শাশুড়ি-বউমা সম্পর্কের শুরুতেই খেয়াল রাখুন কিছু খুঁটিনাটি বিষয়ে।
• প্রতিযোগিতা আদতে বোকামি: বউমা ও শাশুড়ি উভয়কেই মনে রাখতে হবে, এই দুই মানুষই আপনাদের প্রিয় মানুষটির জীবনে গুরুতর। তিনি তাঁর মায়ের ত্যাগ ও প্রতিপালনেই বড় হয়েছেন। তাই সম্মান শাশুড়িকে করতেই হবে। আবার বউও তাঁর আজীবনের সঙ্গী। তাই সম্মান তাঁরও প্রাপ্য। তিনি তখনই মনের দিক থেকে ভালো থাকবেন, যখন মা ও বউয়ের মধ্যে ভালো বোঝাপড়া ও স্বাস্থ্যকর সম্পর্ক দেখবেন। নতুন একটি বাড়িতে গেলে মেয়েটির অনেক কিছুই নিজের মনের মতো হবে না। শাশুড়িও নিজের মনের মতো সব একজনের মধ্যে খুঁজে পাবেন না। এই সত্যই সহজ ও বাস্তব। একে দ্রুত মেনে নিন। এবার দেখুন, কোন দিকগুলি আপনাকে নিতান্তই বিচলিত করছে, ধীরে ধীরে দু’পক্ষের মধ্যে কথাবার্তা বাড়লে ও আলাপপরিচয় ঘন হলে সেসব পছন্দ-অপছন্দের কথা জানিয়ে রাখুন। তবে এটি জানালেই যে পরিস্থিতি হাতের মুঠোয় এসে যাবে, এমন নয়। উল্টোদিকের মানুষটির মনে নিজের সম্পর্কে ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার জায়গা তৈরি করতে পারলে দেখবেন আপনার মতটিও একদিন গুরুত্ব পাচ্ছে। তাই ধৈর্য ধরতে শিখতে হবে। প্রতিযোগিতামূলক দ্বন্দ্বে না গিয়ে বরং উভয়ই উভয়ের দিকে বন্ধুত্বের হাত বাড়ান। এতে সংসার সুন্দর হয়।
• আপস নয়, তবে মানিয়ে নেওয়ার বিকল্প নেই: ভালো করে ভাবলে দেখবেন, নিজের বাড়িতেও নানাবিধ বিষয়ে একটু আধটু মানিয়ে চলতে হয় সকলকেই। তাই শ্বশুরবাড়িতে গেলেই একমাত্র সব মানিয়ে নিতে হচ্ছে বা বাড়িতে নতুন একজন এল বলেই আপনি মানিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছেন, বিষয়টা এমন নয়। বউমাকে সবসময় মাথায় রাখতে হবে, আপনার ভাইয়ের বউ থাকলে, তিনি আপনার মায়ের সঙ্গে কেমন ব্যবহার করলে আপনি আনন্দ পেতেন? আবার শাশুড়িকে মনে রাখতে হবে, নিজের মেয়ে অন্য বাড়িতে বিয়ের পর কী ধরনের ব্যবহার ও স্বীকৃতি পেলে সুখী হতেন? ঠিক তেমন ব্যবহারই করুন একে অন্যের সঙ্গে।
• মত চাপাবেন না: দু’জনে দুই প্রজন্মের মানুষ। প্রতিটি যুগ স্বতন্ত্র। একে অন্যের সব কাজ বুঝবেন বা সবরকমের আদর্শ এক হবে, এমন না হওয়াই স্বাভাবিক। এমন হলে ঝগড়া বিবাদে না গিয়ে বরং কয়েকদিন গল্পের ছলে আপনার জীবন সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি, আপনার কাজের ক্ষেত্র তাঁকে বলুন। পরস্পরের সঙ্গে ভাগ করুন নিজেদের জীবনের নানা বিশ্বাস ও ধারণার কথা। চারপাশের খবর, পৃথিবীতে কোথায় কী ঘটছে সেসব গল্পের ছলে ভাগ করুন শাশুড়ির সঙ্গে। কেউ একজন সেসব শুনতে খুব একটা আগ্রহী না হলেও ধৈর্য ধরুন। ধীরে ধীরে আগ্রহ বাড়বে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে নিজের মত স্পষ্ট জানান। তবে কখনওই জোর করে নিজের মত অন্যের উপর চাপিয়ে দেবেন না। অন্যের মতকেও সম্মান করুন। কোনও মতভেদ ঘটলে তর্কে যাবেন না। আসলে তর্কে হেরে কেউ কারও বিশ্বাস বদলান না। বরং পাল্টা জেদ তৈরি হয়। মাথায় রাখবেন, বয়স হলে মানুষ অভিমানী হয়। তাই কোনও কাজ একসঙ্গে করে সফল হলে সিংহভাগ কৃতিত্ব তাঁকে দিন।
• ননদের গুরুত্ব বেশি: কোনও কোনও বাড়িতে শাশুড়ি তাঁর নিজের মেয়ের সামনেই ছেলের বউকে ছোট করেন। এসব ক্ষেত্রে মেয়েরা মনে করেন, এমন শাশুড়িকে ভালো রাখার দায় তাঁর নয়। এইসব না মাথায় এনে বরং কৌশল অবলম্বন করুন। প্রথম প্রথম আপনিও ননদকে বেশি গুরুত্ব দিন। এতে শাশুড়ির সঙ্গে প্রাথমিক সংঘাত এড়ানো যাবে। পরে তাঁকে বুঝিয়ে বলুন কোথায় আপনার খারাপ লাগে। তিনি মানুষ ভালো হলে এতেই বুঝবেন। নচেত শান্তভাবে প্রতিবাদ করুন প্রয়োজনে। মানিয়ে নেওয়া মানেই কিন্তু আপস নয়, এই আপ্তবাক্যও মাথায় রাখবেন।
• মানসিক আঘাতে চুপ নয়: শ্বশুরবাড়িতে সকলের খুচখাচ কথা গায়ে না মাখলেও সচেতন হোন। একে অন্যকে সন্দেহের চোখে দেখবেন না। একে অন্যের নামে নালিশ করবেন না বাড়ির অন্য সদস্যের কাছে। বরং নিজেদের সমস্যা নিজেরা মেটান। এতে দুই সম্পর্কে আত্মবিশ্বাসও বাড়ে। তবে একে অন্যের কোনও কথায় বা কাজে বড়সড় আঘাত পেলে চুপ করে হজম না করে সরাসরি কথা বলুন। প্রয়োজনে বাড়ির অন্য সদস্যদের তা জানিয়ে রাখুন। ঝগড়া বা অশান্তি নয়, শান্ত হয়ে প্রতিবাদের দাম বেশি।
• সম্পর্কের রং ভিন্ন হোক: শাশুড়ির সঙ্গে তাঁর ছেলেমেয়ে ও নাতি-নাতনিদের সমীকরণ কেমন হবে, তা নিয়ে বেশি মাথা ঘামাবেন না। কিছু কিছু সম্পর্ক নিয়ে শাশুড়িরা পজেসিভ হন, যতক্ষণ না সেসব আপনার প্রত্যক্ষ কোনও সমস্যার কারণ হচ্ছে, ততক্ষণ এগুলির মধ্যে ঢুকবেন না।
• আবেগে শান দিন: শ্বশুরবাড়িতে ছেলের বউকে অনেক গঞ্জনা সইতে হয়। এই ভাবনা অনেক শাশুড়ির মাথায় থাকে। একে একেবারে প্রশ্রয় দেবেন না। যুগের সঙ্গে নিজের মানসিকতা বদলান। নিজে কখনও শ্বশুরবাড়িতে মানসিক নির্যাতন সয়েছেন বলে সেই অত্যাচার ছেলের বউয়ের উপরেও করতে হবে এই ‘স্যাডিস্ট প্লেজার’ কোনও কাজের কথা নয়। বরং নিজের সেই নির্যাতনের রেশ ছেলের বউয়ের গায়ে যেন না লাগে, সেদিকে খেয়াল রাখুন। একে অন্যের পছন্দে সায় দিন। একসঙ্গে গল্প করুন, সময় কাটান, কেনাকাটা করতে যান। প্রিয় পদ কখনও সখনও রান্না করা, অসুস্থতায় সেবা করা, একে অন্যের জন্মদিন একটু অন্যরকম ভাবে পালন করা— এগুলো সাংসারিক জীবনে অন্যরকম সুর বয়ে আনে। এদের যত্ন করে রাখুন। একে অন্যের আবেগ ও সংবেদনশীল জায়গাটি বুঝতে চেষ্টা করুন। এতকিছুর পরেও নানা ছুতোনাতায় কেউ অশান্তি করলে অপরপক্ষ চুপ করে যান। বিশেষ পাত্তা না পেলে এগুলো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কমে যায়। একান্তই না কমলে মনোবিদের দ্বারস্থ হোন। তবে দু’পক্ষের কেউই কখনও দিনের পর দিন প্রচণ্ড অপমান সয়ে বা শারীরিক নিগ্রহ হজম করে একসঙ্গে থাকবেন না।
লিখেছেন মনীষা মুখোপাধ্যায়