


শিবের অশ্রু থেকে রুদ্রাক্ষের জন্ম। রুদ্রাক্ষ কোনও অলৌকিক বস্তু নয়, আবার নিছক অলংকারও নয়। এটি ভারতীয় আধ্যাত্মিক পরম্পরায় শিব-তত্ত্বের গভীর প্রতীক। পরীক্ষা করে দেখা গিয়েছে রুদ্রাক্ষ ধারণের ২০ মিনিটের মধ্যেই মস্তিষ্কে আলফা তরঙ্গের বৃদ্ধি হয়। যার ফলে মন শান্ত হয়ে যায়। দূর হয় নানান মানসিক ও শারীরিক সমস্যা। রুদ্রাক্ষের উপর সম্প্রতি বেশ কয়েকটি গবেষণা হয়েছে। এর মধ্যে ভাবা অ্যাটমিক রিসার্চের পরীক্ষার ফলাফলেও রয়েছে চমকপ্রদ তথ্য! শারীরিক ও মানসিক সমস্যা অনুযায়ী কী ধরনের রুদ্রাক্ষ ধারণ করতে হয়?
লিখেছেন স্বামী হরিময়ানন্দ।
পুরাণ, ইতিহাস ও বিজ্ঞান
ম
ানব সভ্যতার দীর্ঘ যাত্রাপথে এমন কিছু কিছু বস্তু রয়েছে, যা কেবল উপকরণ নয়, একটি ইতিহাস, এক একটি তত্ত্ব, এক একটি অনন্ত অন্বেষা। রুদ্রাক্ষ সেই ধরনের এক বিস্ময়— যার জন্ম যেন শিবের নীল নিঃশ্বাসে, বৃদ্ধি যেন তপস্যার প্রাচীন আগুনে, আর অন্তরের শক্তি যেন যুগ-যুগান্তরের সাধনার স্বরলিপি। একটি বীজের মধ্যে যেন লুকিয়ে রয়েছে সমগ্র ভারতীয় আধ্যাত্মিকতার গোপন স্পন্দন।
ভারত পবিত্রভূমি, দেবভূমি। এদেশের যেকোনও প্রান্তে গেলেই শিব মন্দির চোখে পড়বে। সে বড় ছোট যাইহোক না কেন। আর ভোলানাথ শিবের নাম মনে উঠলেই যে রূপ চোখের সামনে ভাসে তা হল জটাধারী, বাঘের ছাল, কোমরে সাপ জড়ানো। গলায় ও বাহুতে জড়ানো রুদ্রাক্ষের মালা। সঙ্গে মা পার্বতী নানা অলংকারে ভূষিতা। শ্রদ্ধাবান ভক্তদের মনে তাই প্রশ্ন ওঠে দেবাদিদেব মহাদেব সব কিছু বাদ দিয়ে কেন রুদ্রাক্ষকে এত পছন্দ করেন? শুধু মহাদেবের ভক্ত নয়, যারা শক্তির উপাসক, যারা গণপতির উপাসক তাদেরও রুদ্রাক্ষের প্রতি এত আকর্ষণের কারণ কী? কী এমন মহিমা রুদ্রাক্ষের? একটু ইতিহাস জানতে ইচ্ছা করে বইকি!
মানুষের আত্মার সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্ক যত প্রাচীন, ততই প্রাচীন রুদ্রাক্ষের ইতিহাস। এই বীজটি যেন বৃক্ষের মধ্যে শিবের নিঃশব্দ তপস্যার এক অনন্ত প্রতিধ্বনি— একটি অশ্রুবিন্দু, যা পরিণত হয়েছে বিশ্বাস, সাধনা ও শক্তির প্রতীকে। ‘রুদ্রাক্ষ’ শব্দটি নিজেই মিশ্রিত দুই অনন্ত তত্ত্বের সংযোগ—‘রুদ্র’ অর্থাৎ শিব, এবং ‘অক্ষ’ অর্থাৎ অশ্রু। এটি শুধু ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক প্রতীক নয়, এক রহস্যময় প্রতীক যা বিজ্ঞান, ধর্ম, আধ্যাত্মিকতা, পুরাণ, সাহিত্যকে মিলেমিশে একাকার করে দিয়েছে। ভারতীয় দর্শনে এটি এক চেতনার প্রতীক। যুগে যুগে এটি বিবর্তিত হয়েছে কখনও এর আধ্যাত্মিক গুণের জন্য, কখনও বা নান্দনিক প্রয়োগে।
পুরাণ বলে, যখন রুদ্র দীর্ঘ তপস্যার পর জগতের কল্যাণের জন্য অশ্রু বিসর্জন করেন, সেই অশ্রুবিন্দু ভূমিতে পড়ে অঙ্কুরিত হয় রুদ্রাক্ষ বৃক্ষ-রূপে। ‘দেবী ভাগবতে’ বলা হয়েছে মহাদেব একবার ত্রিপুরাসুরকে বধ করার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলেন। কারণ, তার উৎপাতে দেবতা, মানুষ সকলেই অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন। তাই তাকে বধ করা ছাড়া কোনও উপায় নেই। কিন্তু কে বধ করবে এই ভয়ানক অসুরকে। বহু হাজার বছর কেটে গেল, মহাদেব ধ্যান মগ্ন থাকলেন। যখন ধ্যান ভাঙল তিনি চোখ মেলে তাকালেন। চোখের জল পড়ল মাটিতে। সেই অশ্রুবিন্দু থেকে জন্ম নিল একটি গাছ। যার ফল গোলাকার, শক্ত ও খাঁজযুক্ত। দেবতারা জানতে চাইলেন কী বিশেষত্ব রয়েছে এই গাছের? রুদ্রাক্ষ কেবল একটি বীজ নয়; এটি তপস্যার ফল, সহানুভূতির প্রতীক এবং মহাজাগতিক চেতনার জীবন্ত দ্যোতক। ভারতীয় সংস্কৃতিতে রুদ্রাক্ষ ধারণ করা মানে কেবল অলংকার পরিধান নয়— এটি এক আধ্যাত্মিক দায়বদ্ধতা, এক আত্ম-স্মরণ। হিমালয়ের নির্জন গুহা থেকে শুরু করে শহরের সাধনা-গৃহ পর্যন্ত, রুদ্রাক্ষ যেন এক সেতুবন্ধন— মানুষকে তার অন্তরাত্মার দিকে ফিরিয়ে নেওয়ার এক নীরব আহ্বান।
বর্তমান প্রবন্ধে আমরা চেষ্টা করব রুদ্রাক্ষ নিয়ে এর বিভিন্ন দিকগুলি একে একে তুলে ধরতে। এর প্রধান উদ্দেশ্য তিনটি— ১) রুদ্রাক্ষ সম্পর্কে প্রাচীন শাস্ত্রীয় ভিত্তি স্পষ্ট করা, ২) আধুনিক বিজ্ঞান ও গবেষণার আলোকে এর কার্যকারিতা বিশ্লেষণ করা এবং ৩) আধ্যাত্মিক অনুশীলনে এর ব্যবহারকে সুসংহতভাবে উপস্থাপন করা।
বৈদিক যুগে রুদ্রাক্ষ
বৈদিক যুগে রুদ্র ছিলেন এক ভয়ঙ্কর অথচ কল্যাণময় দেবতা— বজ্র, ঝড়, অগ্নি ও চিকিৎসার দেবতা। অথর্ববেদে রুদ্রকে বলা হয়েছে ‘ভৈষজ্যপতি’— অর্থাৎ চিকিৎসার অধিপতি। সে সময় ঋষিরা তপস্যার জন্য নানা প্রাকৃতিক দ্রব্য ব্যবহার করতেন। ঋষিরা এই ফলকে পবিত্র গণনা বা ধ্যানমালা হিসাবে ব্যবহার করতেন। পরবর্তী সময়ে এর থেকে জপমালা বা জপ-বীজ এর ধারণার সৃষ্টি হয়। যজুর্বেদের তৈত্তিরীয় সংহিতাতে বলা হয়েছে— তপস্বীরা রুদ্রের আশীর্বাদ লাভের জন্য তাঁর নাম জপ করতেন। আর সেই জপে প্রাকৃতিক ফল বা বীজ ব্যবহার করতেন। সেটিই রুদ্রাক্ষ। অথর্ব বেদে বীজ ও ফলের মাধ্যমে রোগ নিবারণের নির্দেশ রয়েছে। রুদ্রাক্ষের বীজ সেই ঐতিহ্যের অংশ বলে মনে করা হয়। এই সময় থেকে পরের উপনিষদ যেমন রুদ্রাক্ষ জাবাল উপনিষদে যে সব কথা বলা হয়েছে তার শিকড় বৈদিক বিশ্বাসে নিহিত। যেমন বলা হয়েছে— ‘রুদ্রাক্ষং তু বহুধা ধৃত্বা রুদ্রভক্তো ভবেৎ সদা।’ — যিনি রুদ্রাক্ষ ধারণ করেন, তিনি সর্বদা রুদ্রের ভক্ত হিসাবে পরিচিত হন।
বৈদিক যুগে যজ্ঞের সময় রুদ্রাক্ষের মালা ব্যবহার করা হতো। বৌদ্ধ জৈন পরম্পরাতেও রুদ্রাক্ষের ব্যবহার করা হয়। শিব-তত্ত্বের মূল কথা হল সংযম, ধ্যান ও নীরবতা।
প্রাচীন শাস্ত্রে রুদ্রাক্ষ
রুদ্রাক্ষের মাহাত্ম্য ভারতীয় আধ্যাত্মিক সাহিত্যধারায় অত্যন্ত প্রাচীন ও গভীরভাবে প্রতিষ্ঠিত। বেদের পরবর্তী সময়ে উপনিষদ, তন্ত্র, পুরাণ, স্মৃতিশাস্ত্র প্রভৃতিতে রুদ্রাক্ষের উল্লেখ পাওয়া যায়। এগুলি কেবল অলৌকিক গল্প নয়, বরং সাধনার পরম বাস্তব অভিজ্ঞতা ও সাধকের স্বীকৃতি। জাবাল উপনিষদে রুদ্রাক্ষকে তপস্যার প্রতীক বলা হয়েছে। এখানে উল্লেখ রয়েছে অধ্যাত্মপথে অগ্রসরের জন্য রুদ্রাক্ষ একটি সহায়ক শক্তি। রুদ্রাক্ষ জাবাল নামে আর একটি উপনিষদ পাওয়া যায়। সেখানে বিস্তারিত ভাবে বলা হয়েছে এর উৎপত্তি, মুখী-ভেদ, ধারণ করার নিয়ম, ফলাফল ইত্যাদি। এছাড়া শিবোপনিষদ নামে আর একটি উপনিষদে রুদ্রাক্ষকে ‘শিবের অঙ্গরূপ’ বলা হয়েছে। তন্ত্রশাস্ত্রগুলিতে রুদ্রাক্ষের শক্তি দেহের নাড়ি-প্রবাহ, চক্র ও প্রাণশক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত। তান্ত্রিক জপ, ন্যাস, যজ্ঞ ও কুণ্ডলিনী সাধনায় রুদ্রাক্ষের জপমালা হিসাবে বা সহায় সরঞ্জাম হিসাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আয়ুর্বেদের প্রাচীন গ্রন্থ চরক সংহিতা ও সুশ্রুত সংহিতাতে রুদ্রাক্ষের বিভিন্ন অংশের ঔষধগুণের উল্লেখ রয়েছে। সেখানে হৃদরোগ, উচ্চ-রক্তচাপ, মানসিক অস্থিরতা ও দেহের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে ফলের সঙ্গে এর পাতার ব্যবহারের কথা প্রচলিত ছিল।
আগেই বলা হয়েছে, এক সময় মহাদেব গভীর ধ্যানে মগ্ন ছিলেন। মহাদেবের স্বভাবই হল জগতের দুঃখে কাতর হওয়া। বিশ্বজগতের দুঃখ, দারিদ্র্য অজ্ঞান ও কলুষতা দেখে শিবের হৃদয়ে জেগে ওঠে অমিত করুণা। সেই করুণার অশ্রুধারা যখন পৃথিবীতে পড়ে, তখনই তা পরিণত হয় রুদ্রাক্ষ বৃক্ষে। শিবপুরাণ, পদ্মপুরাণ, স্কন্দপুরাণ ও দেবী ভাগবতে এর উল্লেখ পাওয়া যায়।
শিবপুরাণে একেবারে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে— ‘রুদ্রাক্ষং পরমং পুণ্যং পাপঘ্নং পাপনাশনম্। সর্বদারিদ্র্যনাশায় রুদ্রাক্ষং পরিধারয়েৎ।’— অর্থাৎ রুদ্রাক্ষ ধারণ করলে পাপ নাশ হয়, দারিদ্র্য দূর হয় ও মন পবিত্র হয়। যিনি রুদ্রাক্ষ ধারণ করেন তিনি ‘রুদ্রস্বভাবং গচ্ছতি’— মহাদেবের স্বভাব প্রাপ্ত হন।
ইতিহাসে রুদ্রাক্ষ
ভারতের প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদানে সরাসরি রুদ্রাক্ষ শব্দ খোদাই করা শিলালিপিতে খুব বেশি পাওয়া যায় না। তবে গুপ্তযুগ থেকে (খ্রিস্টীয় চতুর্থ থেকে ষষ্ঠ শতক) যে সব শিব মূর্তি, যোগী মূর্তি প্রভৃতি পাওয়া গিয়েছে সেখানে গোলাকার বীজের মালা হিসাবে দেখা গেছে। তারও আগে মহেঞ্জোদারো ও হরপ্পা থেকে যে সব মানুষের মূর্তি বা সিলমোহরে গলায় মালা বা বীজের মতো অলংকার দেখা গেছে, প্রত্নতত্ত্ববিদরা ওই সব মালাকে ascetic beads হিসাবে চিহ্নিত করেছেন। অনেকের মতে এটি রুদ্রাক্ষ মালার প্রাচীন রূপ। বিশেষ করে ধ্যানমগ্ন শিবের গলায় একাধিক স্তরের মালা, কখনও বাহু ও কব্জিতে বীজের অলংকার— এ সবই শৈব সাধনায় রুদ্রাক্ষের ব্যবহারের ঐতিহাসিক নিদর্শন। বৌদ্ধ তন্ত্রযানে নেপাল ও তিব্বতে রুদ্রাক্ষ জপ, মালার প্রচলন ছিল। বজ্রযান সাধকরা একে ‘বোধি-চিত্তের প্রতীক’ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। শৈব ও নাথ সম্প্রদায়ের গোরক্ষনাথ, মৎস্যেন্দ্রনাথ প্রমুখ যোগীরা রুদ্রাক্ষ ধারণ করতেন। প্রাচীন কাল থেকে নেপাল, উত্তরাখণ্ড, গঙ্গা উপত্যকা, জাভা দ্বীপ প্রভৃতি স্থানে রুদ্রাক্ষের ব্যবহার ছিল। এর থেকে বোঝা যায়, শুধু এটি ধর্মীয় জিনিস নয়, একটি সভ্যতা সংযুক্ত বস্তু।
কেন এর এত গুরুত্ব? রুদ্রাক্ষের এই প্রাকৃতিক খাঁজ ও তন্তু বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে এক অনন্য জীববৈচিত্র্য প্রকাশ করে। এর ভেতরে থাকে বিদ্যুৎ-চৌম্বকীয় শক্তি। এর জল ধারণ ক্ষমতা মানুষের দেহে বৈদ্যুতিক ভারসাম্য রক্ষা করতে সাহায্য করে। রুদ্রাক্ষ জপমালা হিসাবে ব্যবহৃত হয়। সেক্ষেত্রে মনোযোগ বাড়াতে ও ধ্যানের গভীরে স্থির থাকতে সাহায্য করে। রুদ্রাক্ষের স্পর্শে মানসিক ভার কমে ও ধৈর্য বৃদ্ধি পায়। শিব-তত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করার আগে আসুন জেনে নিই রুদ্রাক্ষের গাছ নিয়ে আরও কিছু কথা।
রুদ্রাক্ষ গাছ কেমন?
রুদ্রাক্ষ হল একটি গাছের ফল। গাছটির বিজ্ঞানসম্মত নাম হল এলাইও করপাস জেনিট্রাস (Elaeocarpus ganitrus)। প্রধানত হিমালয়ের দক্ষিণ ঢালে, নেপাল, ভুটান, মায়ানমার, থাইল্যান্ড প্রভৃতি অঞ্চলে বেশি দেখা যায়। উষ্ণ ও আর্দ্র পরিবেশে ৬০ থেকে ৮০ ফুট পর্যন্ত লম্বা হয়।
ফলগুলি বিভিন্ন আকারের হয়। বেশিরভাগ হয় গোলাকার আর বাদামি রংয়ের। বেশ শক্ত বীজ। গায়ে খাঁজ কাটা দাগ বা রেখা থাকে। ওইগুলোকে বলে ‘মুখী’। মুখীর সংখ্যা দ্বারাই রুদ্রাক্ষের গুণমান নির্ধারিত হয়। যেমন একমুখী রুদ্রাক্ষ শিবের প্রতীক।
লম্বা আকারের কাণ্ড সোজা, ছাল ধূসর-বাদামি। ছাল ছিঁড়ে গেলে হালকা সাদা রস বের হয়। পাতাগুলি সব সময় সবুজ থাকে। ছোট সাদা বা হালকা হলুদ রঙের ফুল হয়। সাধারণত এপ্রিল থেকে মে মাসে এর ফুল হয়। ফল পাকে জুলাই থেকে অক্টোবর মাসে। ফল প্রথমে সবুজ পরে পেকে গেলে নীল-বেগুনি বা কালো ধরনের হয়। ফলের বাইরের আবরণ নরম কিন্তু বীজটি অত্যন্ত শক্ত হয়। ফল পাকলে গাছ থেকে নীচে পড়ে যায়। সেখান থেকে সংগ্রহ করা হয়। বাইরের নরম আবরণ কয়েক দিন জলে ভিজিয়ে রাখলে উঠে যায়। এবার বীজগুলো পরিষ্কার করে শুকনো করা হয়। সরাসরি রোদে না রেখে ছায়াতে শুকনো করা হয়, যাতে প্রাকৃতিক শক্তি বজায় থাকে। দেখা গেছে একটি রুদ্রাক্ষ গাছ বছরে প্রায় পাঁচশো থেকে দু’হাজার ফল দেয়। আর একটি গাছ প্রায় ৫০ বছর বাঁচে।
শিব-তত্ত্ব ও রুদ্রাক্ষ
শিব-তত্ত্বের মূল কথা হল সংযম, ধ্যান ও নীরবতা। শিব একদিকে যেমন শুভ আবার অন্যদিকে বিধ্বংসী শক্তি। ত্রিপুরারি মহাদেবের চোখে রয়েছে করুণা, আবার তৃতীয় নয়নে রয়েছে জ্ঞানের আগুন। এই দুই বিপরীত শক্তির সমন্বয় শিবকে পূর্ণ করে এবং রুদ্রাক্ষ হল সেই সমন্বয়ের প্রতীক।
রুদ্রাক্ষের ‘মুখী’ সাধারণত একে অপরের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে। মহাবিশ্বে যেমন সব শক্তি একে অপরের সঙ্গে সংযুক্ত। এক মুখী থেকে একুশ মুখী পর্যন্ত সাধারণত রুদ্রাক্ষ পাওয়া যায়। প্রতিটি মুখী শিবের এক বিশেষ রূপের সঙ্গে সম্পর্কিত।
শাস্ত্রে বার বার বলা হয়েছে, রুদ্রাক্ষ ধারণ করার আগে ভাবনা শুদ্ধ হওয়া দরকার। পবিত্রভাবে ব্যবহার না করলে এটি কেবল অলংকার হয়। জীবনযাত্রায় শুদ্ধতা, সতত অহিংসা আত্মনিয়ন্ত্রণের ভাব রাখতে পারলে এর আধ্যাত্মিক গুণগুলি বোঝা যায়।
রুদ্রাক্ষ নিয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণা
হাজার হাজার বছর ধরে রুদ্রাক্ষ ব্যবহৃত হয়ে আসছে। বিশ্বাস তত্ত্ব ও সাধনার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু আজকের যুগে প্রশ্ন উঠতে পারে এটি কি শুধুই ধর্মীয় অলংকার নাকি এর কোনও প্রাকৃতিক বা বৈজ্ঞানিক ভিত্তি রয়েছে? আগেই বলেছি রুদ্রাক্ষ বিভিন্ন ধরনের বা মুখী হয়। ২১ মুখী পর্যন্ত রুদ্রাক্ষ পাওয়া যায়। প্রতিটি বীজের গঠন ও বিদ্যুৎ পরিবাহিতা ভিন্ন। আধুনিক গবেষণায় দেখা গেছে এর প্রধান উপাদান হল— কার্বন, হাইড্রোজেন, নাইট্রোজেন ও অক্সিজেন। প্রাকৃতিকভাবে এর চৌম্বকীয় উপাদান রয়েছে। যেমন— আয়রন, কপার, কোবাল্ট, নিকেল ইত্যাদি। এগুলি ক্ষুদ্র চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি করে। যা দেহের রক্তপ্রবাহ ও স্নায়ুতন্ত্রের সঞ্চালনকে প্রভাবিত করে। বিজ্ঞানীরা বিশ্লেষণ করে দেখেছেন যে, এর ভেতরে ছোট ছোট ক্যাপিলারি চ্যানেল রয়েছে যা আর্দ্রতা শোষণ করে ও ক্ষুদ্র চার্জ জমা রাখে। ওই চার্জ মানুষের শরীরে থাকা বৈদ্যুতিক ক্ষেত্রকে রেজোন্যান্স সৃষ্টি করে। এর ফলে নেতিবাচক চিন্তা যেমন stress anxiety কম হয়। কিছু গবেষণাতে দেখানো হয়েছে রুদ্রাক্ষের ব্যবহারের ফলে উচ্চ রক্তচাপও কমে।
মানুষের মস্তিষ্কে রয়েছে লক্ষ লক্ষ নিউরন। এগুলি বৈদ্যুতিক সংকেত পাঠাতে থাকে। মন অস্থির বা উত্তেজিত হলে এই সংকেত পাঠানো খুব দ্রুত হয়। রুদ্রাক্ষের চৌম্বক ক্ষেত্র উত্তেজনাকে কমিয়ে মস্তিষ্কে আলফা ওয়েভ তৈরি করে। এর ফলে ধ্যানের প্রশান্তির মতো অবস্থা সৃষ্টি হয়। এমনকী EEG (Electroencephalogram) পরীক্ষা করে দেখা গেছে রুদ্রাক্ষ ধারণের ২০ মিনিটের মধ্যেই মস্তিষ্কে আলফা তরঙ্গের বৃদ্ধি হয়। যার ফলে মন শান্ত হয়ে যায়। পেটের বিশেষ করে অন্ত্রের নানা সমস্যা, পেটের কিছু তার মধ্যে সেরোটোনিন নার্ভকে শান্ত রাখে। সার্বিকভাবে গাট-হেল্থকে শক্তিশালী করে এই ফল। শরীরের যেকোনও প্রদাহকে শান্ত করে। রুদ্রাক্ষের উপর সম্প্রতি বেশ কয়েকটি গবেষণা হয়েছে। এর মধ্যে ২০১৮ সালে ভাবা অ্যাটমিক রিসার্চের পরীক্ষার ফলাফলও রয়েছে। তবে রুদ্রাক্ষ সব সময় প্রাকৃতিক হওয়া উচিত। রাসায়নিক দিয়ে পালিশ করলে এর গুণ নষ্ট হয়। ধারণের সময় মনে রাখতে হবে এটি যেন ত্বকের সংস্পর্শে থাকে।
রুদ্রাক্ষকে বলা যায় বিজ্ঞান ও আধ্যাত্মিকতার মিলনবিন্দু। এখানে প্রাচীন ঋষি-মুনিদের তপস্যা-জাত জ্ঞান ও বিজ্ঞানের পরীক্ষা নিরীক্ষার দ্বারা মানব কল্যাণের পথকে সুগম করেছে।
আধুনিক যুগে এর প্রাসঙ্গিকতা
আজকের যুগ গতির যুগ। প্রযুক্তির যুগ। সকলেই ছুটে চলেছি। সমাজ ও মানুষ যতই উন্নত হোক, হারিয়ে ফেলছি অন্তরের শান্তি। আর ঠিক এই সময়েই আবার নতুন করে অর্থবহ হয়ে উঠছে রুদ্রাক্ষ। এটি আমাদের শেখায়— অভ্যন্তরীণ স্থিতি ছাড়া বাহ্যিক সাফল্য শূন্য। রুদ্রাক্ষ ব্যবহার মানে কেবল ধর্মীয় বিশ্বাস নয়, বরং প্রতিদিনের জীবনে নীরবতা, ধ্যান ও আত্ম-জিজ্ঞাসার চর্চা।
মনোবিজ্ঞান ও রুদ্রাক্ষ
বহু শতাব্দী ধরে দর্শন, বিজ্ঞান ও যোগশাস্ত্র একটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজে আসছেন, তা হল মানুষের মন কতদূর শরীরের সঙ্গে যুক্ত। আধুনিক মনোবিজ্ঞানে এখন স্পষ্টভাবে বলা হয়, মানুষের মনের একটি বড় অংশ শরীরের অনুভূতির মধ্যেই বাস করে। আমরা যাকে মন বা (Mind) বলি তা কেবল মস্তিষ্কে সীমাবদ্ধ নয়। বরং শরীরের সূক্ষ্ম অনুভূতি, স্নায়ুতন্ত্রের প্রতিক্রিয়া ত্বকের সংবেদন, স্পর্শ ও চাপ— সবকিছু মিলিয়ে মন নামক এক বিস্ময়কর জগৎ গড়ে ওঠে। রুদ্রাক্ষ পরলে যে সূক্ষ্ম ত্বক-সংবেদন তৈরি হয়, সেই ছোট্ট অনুভূতিই মানুষের অন্তর্জগতে এক গভীর শান্তির প্রবাহ ছড়িয়ে দেয়। ত্বকের স্পর্শ তখন মস্তিষ্কে একটি বার্তা পাঠায়। মস্তিষ্ক বুঝতে পারে এখানে একটি প্রাকৃতিক, স্থির ও শান্ত স্পর্শ রয়েছে। এর ফলে শ্বাসের গতি কম হয়। স্নায়ু শিথিল হয়। মন ধীরে ধীরে শান্ত হয়। এলোমেলো চিন্তা কমে। শরীর যেন বলে ওঠে— নিশ্চিন্ত হও, তুমি নিরাপদ।
এই স্পর্শের কথা যখন উঠল বলে রাখি। যারা রুদ্রাক্ষের মালা জপের জন্য ব্যবহার করেন তারা নিশ্চয় জানেন এর প্রাকৃতিকভাবে অসমান পৃষ্ঠ, উঁচু-নিচু মুখ, সূক্ষ্ম শিরার মতো গঠন ত্বকে খুব কোমল চাপ স্নায়ু-কেন্দ্রকে উদ্দীপ্ত করে। এর ফলে হরমোন যা মনকে শান্ত ও গভীর প্রশান্ত করে— সেরোটোনিন ও কোর্টিজল-এর মাত্রা বাড়ে। আশ্চর্যের হলেও সত্য যে, স্পর্শ মানুষের স্বভাবকে নম্র করতে পারে। তীব্র ক্রোধের সময় শরীর উত্তেজিত হয় ও শক্ত হয়। তখন রুদ্রাক্ষের কোমল স্পর্শ ভেতরের কঠোরতাকে নরম করে। এর ফলে মন গভীরতর স্তরে প্রবেশ করতে পারে। জপ সহজ হয়। মনোযোগ দীর্ঘ সময় ধরে রাখা যায়। চিন্তা স্বচ্ছ হয়। অনুভব গভীর হয়।
মনোবিদ্যার দৃষ্টিতে এটি একটি ‘মাইন্ডফুলনেস টুল’- যা মানুষকে মুহূর্তে বর্তমানে ফিরিয়ে নিয়ে আসে। আজ তাই শুধু সাধু সন্ন্যাসী নয়, সাধারণ মানুষও রুদ্রাক্ষ পরছেন। এটি সর্বদা মানুষকে মনে করিয়ে দেয়, জীবনের সব শব্দের মধ্যে কোথাও এক নীরব সুর রয়েছে, যেখানে শান্তি, শিব বিরাজ করেন।
যোগের দৃষ্টিতে
যোগের দৃষ্টিতে প্রাণ হল জীবনের সূক্ষ্ম-শক্তি। ইড়া, পিঙ্গলা ও সুষুম্না নাড়ির মাধ্যমে যা প্রবাহিত হয়। সাধনার পথে প্রধান বাধা হল নাড়ির অশুদ্ধতা ও তার ফলে প্রাণের অসাম্য। রুদ্রাক্ষ ধারণকে যোগীরা নাড়ি-শুদ্ধির সহায়ক মনে করেন। বিশেষ করে হৃদয় সংলগ্ন স্থানে রুদ্রাক্ষ ধারণ করলে প্রাণের স্থিতি ও সমতা বৃদ্ধি পায়। শ্বাস-প্রশ্বাসে স্বাভাবিক ছন্দ আসে। প্রাণায়াম ঠিক ভাবে হয়। মন স্থির হয়।
যোগে মানুষের পূর্ণ সত্তাকে পাঁচটি কোষে ভাগ করা হয়েছে। ১) অন্নময় কোষ (দেহ) ২) প্রাণময় কোষ (প্রাণ) ৩) মনোময় কোষ (মন) ৪) জ্ঞানময় কোষ (বুদ্ধি) ৫) আনন্দময় কোষ (চেতনার পরম স্তর)।
পতঞ্জলির যম-নিয়ম ছাড়া যোগ অসম্পূর্ণ। রুদ্রাক্ষ ধারণের সঙ্গে নৈতিকতা যুক্ত না হলে তা তেমন ফল দেয় না— বহু যোগী এমন মনে করেন। যোগের দৃষ্টিতে রুদ্রাক্ষ মনে করিয়ে দেয়— অহিংসা ও সংযম, সত্য ও শৌচ, ঈশ্বর-প্রণিধান।
কোন কোন উপকারে রুদ্রাক্ষ ধারণ করবেন—
একমুখী রুদ্রাক্ষ:
বলা হয় এটি স্বয়ং মহাদেবের অদ্বৈত তত্ত্বের প্রতীক। একমুখী রুদ্রাক্ষ বিরল ও মহাশক্তিধর। পুরাণ ও তন্ত্রে একে শিবের স্বরূপ বলা হয়েছে। সাধারণত নেপাল ও ইন্দোনেশিয়ার মধ্যে নেপালের একমুখী রুদ্রাক্ষ অধিক মূল্যবান ও শক্তিশালী বলে ধরা হয়। দেবতা হলেন শিব আর শক্তি হলেন পরমাত্মজ্ঞান, বৈরাগ্য, সমাধি। সাধারণত গলায় বা মস্তকে ধারণ করতে হয়। এর উপকারিতা হল, মনকে একাগ্র করে। অহংকার দূর করে। গভীর ধ্যানের শক্তি বৃদ্ধি করে। রাজযোগে, জ্ঞানযোগে ঈশ্বরচিন্তা বাড়ায়। আয়ুর্বেদ মতে একমুখী রুদ্রাক্ষ হৃৎস্পন্দন ও স্নায়ু-শক্তিতে স্থিরতা আনে। একে রুদ্রাক্ষদের রাজা বলা হয়।
দ্বিমুখী রুদ্রাক্ষ:
অধিপতি অর্ধনারীশ্বর। দ্বিমুখী রুদ্রাক্ষ ঐক্য, সু-মিলন ও সম্পর্কের প্রতীক। এর দেবতা হলেন অর্ধনারীশ্বর (শিব-শক্তি)। উপকারিতা হল দাম্পত্য জীবনে শান্তি। সম্পর্কের টানাপোড়েন কমায়। সন্তান লাভের সহায়ক। সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বাড়ায়। মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে। আয়ুর্বেদ মতে, এটি মানসিক উদ্বেগ, দ্বিধা অতিরিক্ত চিন্তা কমাতে সাহায্য করে। এর কম্পাঙ্ক হৃদযন্ত্র ও ফুসফুসের স্নিগ্ধতা আনে। সিদ্ধান্তহীনতা দূর করে সদর্থক মনোভাব গড়ে তোলে।
ত্রিমুখী রুদ্রাক্ষ:
এর দেবতা হলেন অগ্নিদেব। যারা সম্পর্কের সংঘাতের জন্য অশান্তিতে রয়েছে, তাদের জন্য উপকারী। পিতা-পুত্র, স্বামী-স্ত্রী বা বন্ধুদের মধ্যে সুন্দর সম্পর্ক তৈরি করে। যারা অলস প্রকৃতির ও কাজে মন স্থির করতে পারে না, উপকারী তাদের জন্যও। অলসতা দূর করে কর্ম শক্তি বাড়ায়। শিশুদের ভয় কমায়। অতীতের অপরাধ-বোধ দূর করে মানসিক শান্তি আনে।
চারমুখী রুদ্রাক্ষ:
এর অধিপতি হলেন ব্রহ্মা। বিশেষ ক্ষমতা হল জ্ঞান, বিদ্যা ও রচনা শক্তি। উপকার পাওয়া যায়— স্মৃতিশক্তি বাড়ায়। বুদ্ধির বিকাশ ঘটায়। লেখালেখি, গবেষণা, সঙ্গীত ও বিদ্যাচর্চায় উন্নতি করে। এর কম্পাঙ্ক বিশুদ্ধ-চক্রকে সক্রিয় করে। শিশুদের বুদ্ধি বাড়াতে সাহায্য করে।
পাঁচমুখী রুদ্রাক্ষ:
অধিপতি কালাগ্নি রুদ্র। বিশ্বব্যাপী এর সর্বাধিক ব্যবহার। সাধারণ মানুষ এটি ব্যবহার করে থাকে। এটি শিবের রূপ ও অগ্নি শক্তির সমন্বয়কে নির্দেশ করে। প্রতিটি মুখ উপরের দিকে সূচক-রেখা দ্বারা চিহ্নিত। এটি মনের পাঁচ দিককে নির্দেশ করে— মন, বুদ্ধি, ধৈর্য, ক্ষমা ও শান্তি। এটি ধারণ করলে ধ্যান, জপ ও আধ্যাত্মিক সাধনায় সহায়তা হয়। চিত্তকে সংযমী ও স্থির রাখে। মনের অশান্তি ও মানসিক চাপ কমায়। জপ ও প্রার্থনায় একাগ্রতা বাড়ে। মানসিক ও শারীরিক উপকারিতাও আছে। রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখে। হৃদযন্ত্র ও স্নায়ুতন্ত্রকে স্থিতিশীল রাখে। অতিরিক্ত রাগ, উদ্বেগ ভয় হতাশা কমাতে সাহায্য করে। পিত্ত, কফ ও বায়ুর মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। এটি ধারণ করলে কিছু দিনের মধ্যে জীবন ধারায় এর প্রভাব বুঝতে পারা যায়। ব্যক্তির আচরণে সহমর্মিতা, ধৈর্য ও মানবিক গুণ বাড়তে থাকে। কর্মজীবনেও মনোযোগ বাড়ে ফলে সাফল্য নিশ্চিত করে। সোমবার বা শুভ তিথিতে শুদ্ধ করে পরিধান করতে হয়।
ছয়মুখী রুদ্রাক্ষ:
দেবতা কার্তিকেয়। ছয়মুখী রুদ্রাক্ষ হল কার্তিকেয় বা স্কন্দের প্রতীক। এটি বুদ্ধি, জ্ঞান, স্বাধ্যায় শক্তি ও শৃঙ্খলার প্রতীক। শিবপুরাণ ও দেবী-ভাগবতে উল্লেখ রয়েছে যে, এটি জীবনের অশান্তি ও মানসিক অস্থিরতা দূর করে। ছয়টি মুখের প্রতীক মানসিক ও আধ্যাত্মিক ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ দিককে নির্দেশ করে। যেমন মৌলিক জ্ঞান, স্বাধ্যায় শক্তি, ধৈর্য, একাগ্রতা, নৈতিকতা ও ভয়হীনতা। মনের অস্থিরতা কম করার পাশাপাশি অধ্যয়ন, গবেষণা ও জ্ঞান চর্চাতে সহায়তা দেয়। কুণ্ডলিনী জাগরণে সহায়তা করে ও মনকে গভীর ভাবে পরিশুদ্ধ করে। শরীরের উপকারও হয়। হজম শক্তি বাড়ে ও পাকস্থলীর কার্যকারিতা বাড়ে। ফুসফুস কণ্ঠ ও শ্বাসতন্ত্রকে সুস্থ রাখে।
সাতমুখী রুদ্রাক্ষ:
অধিদেবতা মহালক্ষ্মী। সাতমুখী রুদ্রাক্ষ হল রুদ্রাক্ষের মধ্যে একটি বিশেষ শক্তিশালী প্রকার। এটি শিবের সপ্তম রূপের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং আধ্যাত্মিক, মানসিক ও শারীরিক দিক থেকে অসাধারণ। সপ্তম মুখ মূলত মনের সাতটি দিককে প্রতিফলিত করে— ভয়হীনতা, আত্মসংযম, ধৈর্য, স্থিরতা, শক্তি, সাহস ও সৃজনশীলতা।
সাতমুখী ধারণকারীকে শত্রু ও প্রতিকূল পরিস্থিতি থেকে সুরক্ষা দেয়। এটি মনকে স্থির করে ধ্যান ও জপে একাগ্রতা বৃদ্ধি করে। আধ্যাত্মিক সাধনায় এটি কুণ্ডলিনী জাগরণ ও চিত্তশুদ্ধিতে সহায়তা করে। যারা নিয়মিত তপস্যা, ব্রহ্মচর্য ও জ্ঞানচর্চা করেন, তাদের জন্য সাতমুখী রুদ্রাক্ষ অত্যন্ত ফলপ্রসূ। এছাড়া এটি আতঙ্ক, ভয় ও নেতিবাচক চিন্তাভাবনা কমিয়ে আত্মবিশ্বাস ও সাহস বৃদ্ধি করে। মানসিক চাপ, উদ্বেগ ও হতাশা কমায়। প্রতিদিন ধারণ করলে কঠিন পরিস্থিতিতেও মনোবল অটুট থাকে।
এটি স্নায়ুতন্ত্র ও মেরুদণ্ডকে শক্তিশালী করে। দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতা ক্লান্তি ও অনিদ্রা কমায়। ত্রিদোষ দূর করে। ঝুঁকিপূর্ণ জীবনে স্থিরতা ও সাহস যোগ করে। কর্মজীবনে কঠোর পরিশ্রম ও সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে সাহায্য করে। পারিবারিক শান্তি বজায় থাকে।
আটমুখী রুদ্রাক্ষ:
অধিদেবতা গণেশ। আটমুখী রুদ্রাক্ষ হল বিশেষভাবে শক্তিশালী। এটি গণেশের প্রতীক হিসেবে পরিচিত। বাধা দূর করতে, নেতৃত্বের ক্ষমতা বাড়াতে ও জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সাফল্য আনার জন্য কাজ করে। এর আটটি মুখ মনের আটটি দিককে নির্দেশ করে— সংযম, একাগ্রতা, সাহস, মনোবল, নৈতিকতা, সৃজনশীলতা, স্থিতিশীলতা ও নেতৃত্বগুণ।
এটি পরলে নেতিবাচক শক্তি ও অশুভ প্রভাব ও বিপর্যয় থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। সাধন ভজন ভালো হয়। মনকে উচ্চ দিকে তুলে রাখে তাই চিত্তশুদ্ধিতে সাহায্য করে। শারীরিক উপকারিতা তো আছেই। সেই সঙ্গে কর্মজীবনে নেতৃত্ব দানে সহায়ক। ধনলাভ, সামাজিক সম্মান ও সাফল্য বৃদ্ধি করে।
নয়মুখী রুদ্রাক্ষ:
নয়মুখী রুদ্রাক্ষের অধিদেবতা দেবী দুর্গা বা মহামায়া। এটি মায়ের নয় প্রকার রূপের বা শক্তির সমন্বয়— শৈলপুত্রী, ব্রহ্মচারিণী, চণ্ডঘণ্টা, কুষ্মাণ্ডা, স্কন্দমাতা, কাত্যায়নী, কালরাত্রি, মহাগৌরী ও সিদ্ধিদাত্রী। যিনি ধারণ করেন তিনি অন্তরের দুর্বলতা, ভয়, শত্রুভয়, মানসিক অস্থিরতা ও নেতিবাচক শক্তি থেকে রক্ষা করে এবং কর্মজীবনে বিজয় ও শক্তি প্রদান করে।
নয়মুখী রুদ্রাক্ষের শক্তি মূলত শক্তি-তত্ত্ব নির্ভর। যার ফলে অশুভ শক্তি ও মনের ভয় দূর করে। তন্ত্র উপাসনা ও দেবী সাধনাতে শক্তির প্রবাহ উন্নত করে। অন্তরের দুর্বলতা দূর করে ব্যক্তিকে আত্মিক জাগরণে সাহায্য করে। বিশেষ করে, যারা দুশ্চিন্তা ভয়, ঈর্ষা, নিরাপত্তাহীনতা বোধ করে বা শত্রুর ভয়ে সব সময় ভীত থাকেন তাদের জন্য খুবই কার্যকর। যারা নতুন করে কোনও কাজ শুরু করতে ভয় পান, জীবনে দিকভ্রান্ত বা মন ভেঙে পড়েছে তাদের জন্য উপকারী। এটি ধারণ করলে এর প্রভাব জীবনের উপর পড়ে। বড় কোনও সিদ্ধান্ত নিতে পারে, নতুন কাজ সানন্দে শুরু করতে পারে। দেখা যায় যে সব মানুষ জীবনে বড় দায়িত্ব পালন করেন— সন্ন্যাসী, শিক্ষক, নেতা, সমাজকর্মী তাদের জন্য এই রুদ্রাক্ষ বিশেষ উপযোগী।
দশমুখী রুদ্রাক্ষ:
সাধারণত দশমুখী রুদ্রাক্ষকে নারায়ণ বা শ্রীবিষ্ণুর অধিদেবতা হিসাবে মনে করা হয়। এটি ধর্ম, রক্ষা, ন্যায়, স্থিতি ও জীবনের সব ক্ষেত্রে সুষমার প্রতীক। দশটি মুখ মানব জীবনের দশ দিককে নির্দেশ করে— ইন্দ্রিয় সংযম, বুদ্ধি, স্মৃতি, সাহস, দয়া, নীতি, স্থিতি, রক্ষা, কল্যাণ ও সিদ্ধান্তগ্রহণ ক্ষমতা। এটি জীবনে জটিলতা, শত্রু, আইনি সমস্যা, অপবাদ ও অকারণ বাধা থেকে রক্ষা করে।
দশমুখীকে রক্ষাকারী রুদ্রাক্ষ বলে। কারণ অশুভ প্রভাব ও অভিশাপ দূর করে। মন ও হৃদয়ের শুদ্ধতা ও স্থিরতা বৃদ্ধি পায়। নিত্য সাধনা সহজ হয়। জীবনে ধর্ম-অধর্ম বোঝার ক্ষমতা বাড়ে।
এগারোমুখী রুদ্রাক্ষ:
অধিদেবতা রুদ্র। এগারোমুখী রুদ্রাক্ষকে একাদশ রুদ্র-শক্তিযুক্ত বলে বর্ণনা করা হয়। অবশ্য কোনও কোনও গ্রন্থে মহাবীর হনুমানের শক্তির প্রতীক বলা হয়েছে। প্রাচীন গ্রন্থগুলিতে বলা হয়েছে এটি জপ ধ্যান তপস্যার সহায়ক। মনকে স্থির করে। স্মরণশক্তি ও একাগ্রতা উন্নত করে। পথেঘাটে বিপদ, দুর্ঘটনা বা হঠাৎ বিপর্যয় থেকে মানসিক সুরক্ষা পাওয়া যায় বলে বলা হয়েছে। যাদের জীবনে অনেক দায়িত্ব পালন করতে হয়, বড় বড় সিদ্ধান্ত নিতে হয় তাদের জন্য খুব উপকারী। স্থিরতা ও নৈতিক শক্তি বাড়ায়। যারা শরীর ও মন উভয়কে সাত্ত্বিক পথে নিয়ে যেতে চায়, তাদের জন্য খুবই উপকারী। যারা ক্লান্তি, উৎসাহের অভাবে ভোগে তাদের চেতনায় শক্তি সঞ্চার করে। হনুমান-তত্ত্ব মানেই কর্মবীর। তাই সেবামূলক কর্মে এটি বিশেষ সহায়ক।
বারোমুখী রুদ্রাক্ষ:
রুদ্রাক্ষের মধ্যে বারোমুখী বিশেষ শক্তিধর। অধিদেবতা দ্বাদশ আদিত্য। আদিত্য-তেজের অবতার এটি তাই সূর্যদেবের প্রভাব-বাহী। পরিধান করলে তার জীবনে সূর্যের মতো দীপ্তি, শক্তি, সাহস, স্থিতি উদ্যম ও সাফল্য উপস্থিত হয়। সূর্যদেবের মধ্যে যেমন কর্মনিষ্ঠা, দৃঢ় সংকল্প ও সময়ানুবর্তিতা দেখা যায়, ধারণকারীর মধ্যে বিশেষ গুণের প্রকাশ দেখা যায়। যেমন অর্ধেক কাজ ফেলে রাখে না। সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভুল হয় না। লক্ষ্য পূরণে অবিচল থাকে। মানুষের সম্মান, গ্রহণযোগ্যতা ও প্রভাব দিনে দিনে বাড়তে থাকে। আত্মবিশ্বাস বাড়ে। মানুষের মধ্যে স্বাভাবিক শ্রদ্ধা বাড়তে থাকে। দৈহিক শক্তিও বাড়তে থাকে। মনের অন্ধকার দূর হলে শরীরও কার্যক্ষম হয়।
তেরোমুখী রুদ্রাক্ষ:
এই রুদ্রাক্ষের অধিদেবতা কামদেব। শাস্ত্রে এটিকে বলা হয়েছে কামদেব ও রতির তত্ত্ববাহী। বহু গ্রন্থে এর সঙ্গে মহাশক্তি ও ইচ্ছাপূরণের শক্তি যুক্ত বলা হয়েছে। ফলে যিনি এটি ধারণ করেন তার জীবনে সৃজনশীল প্রতিভা, আকর্ষণশক্তি, সিদ্ধান্ত-ক্ষমতা, সাফল্য ও জীবন-সমৃদ্ধি বৃদ্ধি পায়। যারা লেখালেখি করেন, সঙ্গীত, শিল্প প্রভৃতি চর্চা করেন তাঁদের জন্য বিশেষ উপকারী। সাধকের জীবনে ধ্যানে আনন্দ বাড়ে, জপে মনোযোগ বৃদ্ধি পায়।
চোদ্দোমুখী রুদ্রাক্ষ:
চোদ্দোমুখী রুদ্রাক্ষকে এক বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। কারণ এর গুণ প্রভাব ও সাধনা-গত গুরুত্বের জন্য। এটিকে গভীর বিবেক, ভয়হীনতা ও আত্মিক দৃঢ়তার প্রতীক হিসাবে গণ্য করা হয়। সমাজসেবা, নেতৃত্ব কিংবা কোনও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে এই মানসিক শক্তি খুবই প্রয়োজন। যোগশাস্ত্রে এটিকে আজ্ঞা ও সহস্রার চক্রের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে ধরা হয়। এর অধিদেবতা পবনপুত্র হনুমান।
পনেরোমুখী রুদ্রাক্ষ:
অধিদেবতা চন্দ্র। শৈব ও তান্ত্রিক ব্যাখ্যায় পনেরোমুখী রুদ্রাক্ষ চন্দ্র-তত্ত্বের সঙ্গে যুক্ত শিব ভাবের প্রতীক। চন্দ্র মানে মন, রস, শীতলতা ও সংযম। মানুষের মন যেমন আকর্ষণ ও আসক্তির দিকে দ্রুত ছুটে যায়, তেমনই চন্দ্রের শীতল প্রভাব সেই উত্তাপকে প্রশমিত করে। এর ফলে অতিরিক্ত বিষয় চিন্তা ধীরে ধীরে কমতে থাকে। মন রাজসিক প্রভাব থেকে মুক্ত হয়। আবেগ ও প্রবৃত্তির উপর বোধ বা বিচারের প্রাধান্য বৃদ্ধি পায়। সাধকের মন মন্ত্রে স্থির হয়। জপ দীর্ঘস্থায়ী ও গভীর হয়।
ষোলোমুখী রুদ্রাক্ষ:
অধিদেবতা মহা-মৃত্যুঞ্জয়। চিত্তবৃত্তির নিরোধকে বলে যোগ। কিন্তু মন যদি ভয়, সংশয় ও নিরাপত্তা-হীনতায় চিন্তিত হয়, তা হয় যোগের পথে বাধা। ভয় মনকে সংকুচিত করে, শ্বাসকে অগভীর করে তোলে। ফলে চেতনার বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে। যোগদর্শনে তাই ভয়মুক্তি ও সাহসকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মানসিক যোগ্যতা হিসেবে দেখা হয়। ষোলোমুখী রুদ্রাক্ষ এমন এক সহায়ক উপকরণ যা সাধককে অন্তর্গত ভয় থেকে মুক্ত করে আত্মবিশ্বাসে প্রতিষ্ঠিত করে। মহামৃত্যুঞ্জয়তত্ত্ব ভয়নাশক ও অভয় প্রদানের প্রতীক। এখানে বুঝতে হবে মৃত্যু মানে কেবল দেহত্যাগ নয়, বরং সমস্ত অনিশ্চয়তা, বিপদ ও মানসিক আতঙ্ককেও বোঝানো হয়। এটি ধারণকারীর মনে অকারণ আতঙ্ক ও দুশ্চিন্তা হ্রাস পায়। সংকটের সময় বুদ্ধি স্বচ্ছ থাকে। মন না ভয় পেয়ে পরিস্থিতিকে পর্যবেক্ষণ করতে পারে।
সতেরোমুখী রুদ্রাক্ষ:
অধিদেবতা বিশ্বকর্মা। সতেরোমুখী রুদ্রাক্ষের অধিষ্ঠাত্রী শক্তি বিশ্বকর্মা। বিশ্বকর্মা হলেন সৃষ্টি, বিন্যাস ও রূপদানের প্রতীক। তাই এটি হল কর্মে শুদ্ধতা ও সুসংহত আনার প্রতীক। শরীরের শক্তিকেন্দ্রগুলির মধ্যে সামঞ্জস্য বজায় রাখে। প্রচলিত বিশ্বাস, জীবনে স্থায়িত্ব ও বিচক্ষণতা বৃদ্ধি করে।
আঠারোমুখী রুদ্রাক্ষ:
এর দেবতা ভৈরব। আঠারোমুখী রুদ্রাক্ষ খুবই দুর্লভ। ফলে নকল প্রচুর। তাই বিশ্বস্ত জায়গা ছাড়া পাওয়া অসম্ভব। এর সাধনা-গত গুণাগুণ— অন্তরের দুর্বলতা, ভয়, সংশয় দূর করতে সাহায্য করে। যোগের দৃষ্টিতে এটি প্রাণশক্তির সুরক্ষাতে সাহায্য করে। শক্তির অপচয় কমায়। ভয় ও উত্তেজনা জনিত চঞ্চলতা কমিয়ে মনকে ধ্যানের দিকে নিয়ে যায়।
উনিশমুখী রুদ্রাক্ষ:
দেবতা নারায়ণ। সাধক সমাজে প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী উনিশমুখী রুদ্রাক্ষ মানসিক বিচ্ছিন্নতা, অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া প্রশমিত করে। কিছু তান্ত্রিক গ্রন্থে এটি দেবতাদের সমষ্টিগত শক্তির আধার বলা হয়েছে। চিত্তের বিচ্ছিন্নতা দূর করে সমগ্রতা বোধ জাগায়। গুরু-কৃপা ও ঈশ্বর অনুগ্রহ লাভের ক্ষমতা বাড়ায়। বহুমুখী দায়িত্ব সামলানোর মানসিক ক্ষমতা লাভ হয়।
বিশমুখী রুদ্রাক্ষ:
দেবতা ব্রহ্মা-শক্তি। ১৫ থেকে ২১ মুখী পর্যন্ত শাস্ত্রীয়ভাবে স্পষ্টভাবে নির্ধারিত নয়। স্বাভাবিকভাবে বিশটি পৃথক রেখা থাকে তাই এই নাম। প্রকৃত নেপালি বিশমুখী অত্যন্ত দুর্লভ। বেশিরভাগ বাজারে জোড়া-দানা, কৃত্রিমভাবে খাঁজ কাটা দেখা যায়। তাই সতর্ক হওয়া দরকার। দাম বেশি মানেই উচ্চমানের তা কিন্তু নয়। বিশমুখী রুদ্রাক্ষ চিত্তের বিস্তার ও ভারসাম্য রক্ষার সহায়ক। জটিল পরিস্থিতিতে স্থির রাখতে সাহায্য করে।
একুশমুখী রুদ্রাক্ষ:
দেবতা স্বয়ং পরম ব্রহ্ম। কিছু সাধকের মতে এটি সমস্ত দৈবশক্তির সমন্বিত প্রতীক। বহু কর্ম, জ্ঞান ও অনুভবের একত্রিত করার ধারণার সঙ্গে যুক্ত। বাইরের জগতের সেবা ও ভেতরের উপলব্ধির মধ্যে সাম্য রক্ষাকারী প্রতীক হিসাবে কাজ করে। এটি সাধারণত দীর্ঘদিনের সাধক ও সন্ন্যাসীদের জন্য। সাধারণ গৃহস্থদের অপরিহার্য নয়।
মহান সাধকদের পরম্পরা
ভারতের আধ্যাত্মিক ইতিহাসে আদি শংকরাচার্যের স্থান অনন্য। তাঁর তীক্ষ্ণ মেধা, সাধনা ও উপনিষদের ভাষ্য মানব সভ্যতার এক পরম বিস্ময়। তিনি তাঁর যোগ পরম্পরাতে যে বাহ্য-চিহ্নগুলি গ্রহণযোগ্য বলে উল্লেখ করেছেন, রুদ্রাক্ষ তার মধ্যে অন্যতম। যদিও ‘রুদ্রাক্ষ জাবাল উপনিষদ’ এর শংকরভাষ্য পুরোপুরি সংরক্ষিত নয়, তবুও তাঁর শিষ্যদের রচনা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে রুদ্রাক্ষকে তিনি সাধনার অনুষঙ্গ হিসাবে অনুমোদন করেছেন।
জ্ঞানপথ তথা বেদান্তে বাহ্য উপকরণ ততটা প্রয়োজন নয়। তবুও রুদ্রাক্ষ নিষিদ্ধ নয়। এখানে গুরুত্ব হল চিত্তশুদ্ধি। একাগ্রতার দিকে মনকে নিয়মিত এক বিন্দুতে স্থাপন করা কঠিন। সেক্ষেত্রে রুদ্রাক্ষ এক নীরব সংহতিকারক। মানসিক প্রশান্তির মাধ্যম হিসাবে কাজ করে। যোগী গোরক্ষনাথ তথা নাথ সম্প্রদায়ের যোগীরা মাথা, বাহু, গলা ও বুকে রুদ্রাক্ষ ধারণ করেন। হিমালয়ে তপস্যারত যোগীরা ঘোর বরফ-ঝড়ের মধ্যে নীরব গুহায় দীর্ঘ উপবাস-ধ্যানে রুদ্রাক্ষকে একান্ত সঙ্গী রাখেন। সাধারণ মানুষের ধারণার বাইরে, গুহাগুলোতে সাধকদের জীবন কীভাবে চলে। প্রতিকূল পরিবেশে সাধকরা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে রুদ্রাক্ষ ব্যবহার করে আসছেন। রুদ্রাক্ষ তাঁদের কাছে তপস্যার বর্মস্বরূপ। নাগা সন্ন্যাসীরাও রুদ্রাক্ষ ব্যবহার করেন। বিভিন্ন সাধক রুদ্রাক্ষ ব্যবহার করেছেন আজও তা ব্যবহৃত হয়। কিন্তু কোনও সাধক এ কথা বলেননি যে রুদ্রাক্ষ পরলেই মুক্তি, বরং একথা বলেছেন এটি সর্বদা সাধকের মনে সংকল্পের প্রতি দৃঢ় রাখে— জ্ঞানের পথ থেকে যেন বিচ্যুত না হয়। এটি ঈশ্বরকে ভুলতে দেয় না। যেমন প্রদীপ জ্বলে তেল দিয়ে, কিন্তু তেল নিজে আলো নয়। তবু তেল ছাড়া আলো জ্বলে না। তেমনই রুদ্রাক্ষ মুক্তি নয়, কিন্তু মুক্তির পথের সহায়ক।
শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব গলায় রুদ্রাক্ষের মালা পরতেন। শ্রীম, মাস্টারমশায় লিখেছেন— ‘গলায় রুদ্রাক্ষের মালা, পরনে গেরুয়া কাপড়।’
শ্রীশ্রীমাও রুদ্রাক্ষ মালা ধারণ করতেন। শ্রীমায়ের জীবন ছিল সাদা শঙ্খের মতো নির্মল ও অহংকার শূন্য। রুদ্রাক্ষ যেমন মহাদেবের অশ্রু, তেমনই শ্রীমায়ের করুণা ছিল মানবতার অশেষ অমৃত। রুদ্রাক্ষ তাই মায়ের কাছে অন্তরের শুদ্ধতার প্রতীক।
রুদ্রাক্ষ ধারণ প্রসঙ্গে স্বামীজির মনোভাব — ‘Rudraksha has been worn by thousands of saints. If it helps one to remember God, there is no harm in wearing it.’— অর্থাৎ যদি রুদ্রাক্ষ ভক্তির স্মরণ করিয়ে দেয়, তবে তা উপকারী, তাতে কোনও দোষ নেই।
কারা ব্যবহার করতে পারেন
এখন প্রশ্ন, কারা রুদ্রাক্ষ ব্যবহার করতে পারেন? হাজার বছরের ঐতিহ্যে রুদ্রাক্ষ ব্যবহার মূলত সাধু সন্ন্যাসী যোগী তান্ত্রিক যোগী, গৃহস্থ ভক্ত— সকলকে কেন্দ্র করেই বিস্তৃত হয়েছে। আজকের দিনে মানুষের মনে প্রশ্ন ওঠে— কে বা সসকারা ব্যবহার করতে পারেন? সকলে ব্যবহার করতে পারেন কি? নারী, গৃহস্থ শিশুরা কি পরতে পারে? শাস্ত্রে কোনও বিধি নিষেধ আছে কি? শিব পুরাণ মতে যে-ই রুদ্রাক্ষ ধারণ করবে সেই পবিত্র হবে, সফল হবে, দুঃখ থেকে মুক্তি পাবে। সন্ন্যাসী, গৃহস্থ, নারী, ব্রাহ্মণ, রাজা, পুরুষ— সকল ভক্তের জন্য রুদ্রাক্ষ ব্যবহারের অনুমোদন রয়েছে। এর থেকে এ কথা স্পষ্ট, রুদ্রাক্ষ কোনও বিশেষ শ্রেণি বা সম্প্রদায়ের জন্য সংরক্ষিত নয়, এটি সর্বজনীন। ভারতের পুরনো ঐতিহ্যতে গুরুশিষ্য পরম্পরা বিবেচনা করলে দেখা যায় রুদ্রাক্ষ সন্ন্যাসীদের অন্যতম পরিচয় ছিল। ভক্তদের সুরক্ষা ও তপস্যা শক্তির প্রতীক ছিল। কপাল, গলা ও বাহুতে পরা হতো। প্রাচীন কালে বহু গৃহী ভক্ত রুদ্রাক্ষ পরতেন— বিশেষ করে পাঁচমুখী রুদ্রাক্ষ। শাস্ত্রে নারীদের এ বিষয়ে কোনও নিষেধ নেই। তন্ত্রে নারীদের শক্তিরূপা বলা হয়েছে— রুদ্রাক্ষ ধারণ করলে শক্তি আরও বাড়ে ও মনের স্থিতি বজায় থাকে বলা হয়েছে। এমনকী শিশুদেরও রুদ্রাক্ষ ব্যবহারে অনুমতি ছিল। চোখের দৃষ্টি ভালো রাখতে, কান্না ও ভয় থেকে রক্ষা করতে পাঁচমুখী রুদ্রাক্ষ গলায় পরানো হতো। দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ শতকের বহু শিলালিপিতে পাওয়া যায় যোদ্ধারা যুদ্ধক্ষেত্রে রুদ্রাক্ষ ধারণ করতেন। যারা জপ-ধ্যান, তপস্যা ব্রহ্মচর্য পালন করে তাদের জন্য রুদ্রাক্ষ বিশেষ উপকারী।
এককথায় যদি প্রশ্ন করেন, কে এই রুদ্রাক্ষ পরতে পারে? সহজ উত্তর হল যে কেউ পরতে পারে। যেকোনও বয়সের, স্ত্রী-পুরুষ, শারীরিক স্থিতি যেমনই হোক, যেকোনও ধর্মে বিশ্বাসী ধারণ করতে পারেন। বিশেষ করে কম বয়সি ছেলেমেয়ে ছাত্রছাত্রী ও বয়স্ক মানুষদের খুব উপকারে আসে। অনেকের ধারণা নিরামিষ খেতে হয় রুদ্রাক্ষ পরলে। কিন্তু এটি ঠিক নয়।
এখন কথা হল, যে সব কার্য ও গুণের কথা বলা হল, এগুলো কি সত্যি? প্রচলিত তন্ত্রে পৌরাণিক সাহিত্যে যেমন বর্ণনা রয়েছে, আমরা চেষ্টা করলাম পাঠকের কাছে তা তুলে ধরতে। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ সাধক-পরম্পরা ও লোকবিশ্বাস, যা বহুকাল ধরে চলে আসছে।
রুদ্রাক্ষের উপকারিতা
১) রুদ্রাক্ষ ধারণ করলে মন শান্ত হয়। ২) মানসিক উত্তেজনা, উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তা কমাতে সাহায্য করে। ৩) শরীরের রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে। ৪) জপমালা হিসাবে রুদ্রাক্ষ অত্যন্ত জনপ্রিয়। ৫) মনোযোগ, চিত্ত-একাগ্রতা ও ধ্যানের গভীরতা রাড়ে। ৬) নেতিবাচক শক্তি থেকে রক্ষা করে। ৭) যোগীরা বলেন দেহের শক্তি-ক্ষেত্রকে সমান করে ও ক্লান্তি কমায়। ৮) অধ্যাত্ম সাধকদের বিশ্বাস রুদ্রাক্ষ হৃৎস্পন্দনের ছন্দ স্থিতিশীল রাখে। ৯) রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। ১০) রুদ্রাক্ষ ধারণ করলে ক্রোধ কমে, এমন বিশ্বাস বহু যুগের।
আসল চেনার উপায়
আধুনিক বিশ্বায়ন ও বাণিজ্যের ফলে রুদ্রাক্ষ এখন সারা পৃথিবীতে পৌঁছেছে। এর ফলে যেমন পরিচিতি বেড়েছে, তেমনই নকল, অতিরঞ্জিত দাবি এসবের ঝুঁকিও বেড়েছে।
দেখতে আসলের মতো হলেও নকল রুদ্রাক্ষ আধ্যাত্মিক শক্তিহীন। তাই আসল রুদ্রাক্ষ চেনা দরকার। রুদ্রাক্ষের উপর খাঁজগুলি উপর থেকে নীচের দিকে সমান্তরাল ভাবে চলে যায়। আসল হলে প্রতিটি মুখ স্পষ্টভাবে এক প্রান্ত থেকে আর এক প্রান্ত পর্যন্ত কাটা থাকবে। মাঝখানে কোনও বিরতি থাকবে না। নকল হলে রেখাগুলি কৃত্রিমভাবে কেটে রং করে দেওয়া হয়। খাঁটি রুদ্রাক্ষ হলে জলে ডুবে যাবে। নকল হলে ভেসে থাকে। আধুনিক এক্সরে যন্ত্র ব্যবহার করে অনেকে মুখী নির্ধারণ করেন— এটি আধুনিক নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি। বিশ্বস্ত জায়গা থেকে সংগ্রহ করলে খাঁটি জিনিস পাওয়া যেতে পারে।
রুদ্রাক্ষ নিয়ে এই দীর্ঘ আলোচনার শেষে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে— রুদ্রাক্ষ কোনও অলৌকিক বস্তু নয়, আবার নিছক অলংকারও নয়। এটি ভারতীয় আধ্যাত্মিক পরম্পরায় শিব-তত্ত্বের এক গভীর প্রতীক। আমাদের মনে করিয়ে দেয় সংযম, শুদ্ধতা ও ঈশ্বর-স্মরণের কথা। শাস্ত্র অনুযায়ী এক থেকে চোদ্দো মুখী রুদ্রাক্ষের আলোচনা স্পষ্টভাবে পাওয়া যায়। তার পরের গুলি সম্পর্কে খুব স্পষ্ট কিছু পাওয়া যায় না। তাই এদের ঘিরে প্রচলিত বহু ধারণা আসলে লোকবিশ্বাস ও সাধকের অভিজ্ঞার উপর নির্ভরশীল। এই পার্থক্যটি যেন আমরা মনে রাখি— এটি বলার কারণ যাতে আমরা অন্ধবিশ্বাসে না পড়ি।
আজকের দিনে রুদ্রাক্ষকে নিয়ে অনেক ভ্রান্তি ও অতিরঞ্জন দেখা যায় অনেক ক্ষেত্রে। দাম, বিরলতা বা অলৌকিক প্রতিশ্রুতি দিয়ে রুদ্রাক্ষের প্রকৃত অর্থ বোঝা যায় না। প্রকৃত অর্থ বোঝা যায় জীবন যাপনের পরিবর্তনের দ্বারা।
সব শেষে বলা যায়, রুদ্রাক্ষ আমাদের ভেতরে নতুন কিছু যোগ করে না, বরং আমাদের ভেতরে যা রয়েছে, তাকে জাগিয়ে তোলে। এটি মনে করিয়ে দেয় যে প্রকৃত সাধনা বাহ্য বস্তুতে নয়, অন্তরের শুদ্ধতায়। বৈরাগ্যশতকম্ গ্রন্থে ভর্তৃহরি বলছেন— ‘বাহ্যৈর্বিভূষণৈঃ কিম্ অন্তঃশুদ্ধির্ভূষণম্’। বাহ্য অলংকারে কী আসে যায়? অন্তরের শুদ্ধতাই প্রকৃত অলংকার। তাই বলা যায় রুদ্রাক্ষ হল এক শুদ্ধ জীবনের স্মারক।