


বিদ্যুৎ পাতর: একে বাজারে আগুন, তার উপরে ভোটের উত্তাপ। মাথা ঠান্ডা রাখা এখন প্রায় তপস্যা, বাপু! কান্তবাবুর মতো নিপাট ভদ্রলোকের যত্নে আঁচড়ানো চুলও এই গরমে এমন বিদ্রোহে নেমেছে, যেন মাথার ভেতরেই নীরব গণঅভ্যুত্থান চলছে। চিরুনি সেখানে এখন কার্যত বিলুপ্তপ্রায় এক প্রতিষ্ঠান। নুটুবাবুর মতো পেটুকও দুপুরবেলা ডাবের শরবত নিয়ে বসে। ভাত-তরকারির দিকে এমন চোখে তাকান, যেন বহুদিনের শত্রুপক্ষ। দামোদর শেঠের মতো যাঁরা অল্পে খুশি হন না, তাঁরাও এই দাবদাহে বাধ্য হয়ে সন্তুষ্টির সংজ্ঞা নতুন করে লিখছেন। আর ফ্যাশনিস্তার মেকআপ? সে তো গরমের সঙ্গে নিঃশব্দ আঁতাত করে ধীরে ধীরে গলে পড়ছে। ‘এবারের মতো গরম আগে কখনও পড়েনি’—এই চিরচেনা বাক্যটি বলতে বলতে, শুনতে শুনতে, গরম যেন আরও কয়েক ডিগ্রি চড়ে বসে শরীর ও মনের উপর। অথচ একটু ইতিহাসের দিকে তাকালেই এই আহাজারির সুরে খানিক বিরাম টানা যায়। কারণ, আমরা যেন প্রতি বছরই ভুলে যাই এই উপমহাদেশের গ্রীষ্ম কোনো আকস্মিক দুর্ভোগ নয়। এর ইতিহাস বেশ প্রাচীন এবং উপস্থিতি প্রায় চরিত্রসম। দিল্লি, আগ্রা থেকে বঙ্গভূমি—এই বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডে গ্রীষ্ম বরাবরই এক কঠোর পরীক্ষক। সে কেবল তাপমাত্রা বাড়ায় না, ধৈর্যের সীমা মাপে, শরীরের সহনশীলতা যাচাই করে। আর সুযোগ পেলেই নিজের নির্মমতার পরিচয় দেয়। তাই আমরা যতই ভাবি, ‘এবারটাই বুঝি সব ছাপিয়ে গেল’, ইতিহাস নিঃশব্দে মুচকি হেসে যেন বলে—‘ওসব তোমাদের নতুন মনে হচ্ছে, আমার ভাণ্ডারে এর চেয়েও পুরানো, আরও দগ্ধ করা গল্প মজুত আছে।’
পার্থক্য শুধু এতটাই যে, আজ আমরা যন্ত্রের উপর ভরসা করে নিজেদের রক্ষা করি। আর সেযুগে মুঘলরা শিখেছিল প্রকৃতির সঙ্গেই সমঝোতা করে বাঁচতে। এই সমঝোতার ইতিহাস আসলে বুদ্ধির ইতিহাস— যেখানে স্থাপত্য, দৈনন্দিন জীবনযাপন, খাদ্যাভ্যাস, এমনকি শাসন ব্যবস্থাও গ্রীষ্মের সঙ্গে এক নিঃশব্দ বোঝাপড়ায় আবদ্ধ। গরমকে জয় করার দম্ভ নয়। তাকে বুঝে নিয়ে তার ভিতরেই স্বস্তির পথ খুঁজে নেওয়ার এক সূক্ষ্ম প্রজ্ঞা সেখানে কাজ করে। এই বোঝাপড়ার প্রথম প্রকাশ দেখা যায় মুঘলদের চলাফেরায়। তাদের প্রাথমিক কৌশল ছিল আপাত সহজ— স্থান পরিবর্তন। উত্তর ভারতের সমতলে গরম তীব্র হয়ে উঠলেই সম্রাট ও অভিজাতরা সরে যেতেন কাশ্মীরের শীতল উপত্যকায়। জাহাঙ্গীরের আত্মকথা পড়লে বোঝা যায়, কাশ্মীর তাঁর কাছে নিছক প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আবাস নয়, প্রায় স্বর্গীয় আশ্রয়। কিন্তু এই যাত্রা কেবল রূপের মোহে নয়। এর মধ্যে লুকিয়ে ছিল দহন থেকে মুক্তির এক বাস্তব কৌশল। প্রকৃতিকে বদলানোর চেষ্টা নয়, বরং নিজেকে তার অনুকূলে সরিয়ে নেওয়ার এই বোধটিই এখানে বিশেষভাবে লক্ষণীয়। তবে এই সহজ পথ সবার জন্য খোলা ছিল না। সম্রাটের অনুগামী হয়ে সবাই তো আর কাশ্মীর যেতে পারেন না। তাই যাঁরা রয়ে যেতেন, তাঁদের জন্যই মুঘলরা গড়ে তোলে এক অভিনব স্থাপত্য-সংস্কৃতি। গরমকে প্রতিরোধ নয়, প্রশমিত করার কৌশলই সেখানে মুখ্য ছিল। জল, বাতাস, ছায়া ও সবুজ— এই চার উপাদানকে কেন্দ্র করে নির্মিত হতে থাকে প্রাসাদ, উদ্যান ও অন্দরমহল। যেন প্রকৃতির শক্তিকেই নিজের পক্ষে টেনে নেওয়া হচ্ছে। ফলে স্থাপত্য এখানে নিছক ইট-পাথরের বিন্যাস নয়, গরমকে সহনীয় করে তোলার সুসংহত শিল্পরূপ।
এই প্রকৃতিনির্ভর স্থাপত্য ভাবনার কেন্দ্রে ছিল জল। মুঘল নির্মাণে যার ভূমিকা নিছক অলংকারের অনেক ঊর্ধ্বে। প্রাসাদ কিংবা উদ্যানের বুক চিরে বয়ে যাওয়া সরু জলধারা, যাকে বলা হতো ‘রিল’ তার সঙ্গে ফোয়ারার ছন্দময় ওঠানামা, কিংবা প্রশস্ত পুকুর—সব মিলিয়ে এক চলমান জলের জগৎ। এগুলি কেবল চোখ জুড়োনোর জন্য নয়, পরিবেশকে শীতল রাখার এক কার্যকর উপায়। বাষ্পীভবনের সময় জল আশপাশের তাপ শোষণ করে নেয়, ফলে চারপাশে তৈরি হয় এক নরম, সহনীয় আবহ। উপরন্তু, জলের উপর সূর্যালোকের প্রতিফলন দেয়ালের উপর সরাসরি তাপের অভিঘাত কমিয়ে দেয়। এই সূক্ষ্ম আয়োজন দেখে মনে হয়, স্থাপত্য যেন নিজেই এক নীরব বিজ্ঞানের আশ্রয় নিয়েছে। সেখানে সৌন্দর্য ও কার্যকারিতা নিঃশব্দে মিশে গিয়েছে। এই জলের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত ছিল বাগান। আর সেই কারণে মুঘল বাগানকে কখনই শুধু অলংকার হিসাবে ধরা উচিত নয়। ‘চারবাগ’-এর সুশৃঙ্খল বিন্যাসে গড়ে ওঠা এই উদ্যানগুলি ছিল প্রকৃত অর্থেই তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের কৌশল। গাছের নিবিড় ছায়া, সিক্ত মাটির আর্দ্রতা এবং জলের উপস্থিতি মিলিয়ে তৈরি হতো এক স্বতন্ত্র শীতল পরিবেশ, যা আশপাশের দহনকে খানিকটা হলেও প্রশমিত করত। এর সঙ্গে যুক্ত হতো স্থাপত্যের আরও এক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান—বায়ুপ্রবাহের সচেতন পরিকল্পনা। ‘ঝারোখা’ অর্থাৎ ঝুলন্ত বারান্দাগুলি এমনভাবে নির্মিত হতো যাতে সরাসরি রোদের প্রবেশ রোধ হয়, অথচ বাতাসের চলাচল অবাধ থাকে। প্রশস্ত উঠোন বা অঙ্গন এই বায়ু চলাচলকে আরও সক্রিয় করত। গরম বাতাস স্বভাবতই উপরে উঠে বেরিয়ে যেত, আর তার জায়গায় বাইরের তুলনামূলক শীতল বাতাস ভিতরে প্রবেশ করত। ফলে স্থাপত্য এখানে নিছক আশ্রয় নয়। শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়ার পরিসর, যেখানে গ্রীষ্মের তীব্রতাও ধীরে ধীরে শীতল হয়ে আসে।
স্থাপত্যের সূক্ষ্ম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে গড়ে উঠেছিল দৈনন্দিন জীবনের নানা ছোটো ছোটো কৌশল। যেগুলি হয়তো চোখে পড়ে না, কিন্তু গরম সামলানোর ক্ষেত্রে ছিল অত্যন্ত কার্যকর। ‘খুস তট্টি’ অর্থাৎ ভেটিভার ঘাস বা খাস-ঘাসের শিকড় দিয়ে তৈরি পর্দা ছিল তার এক অনন্য উদাহরণ। আজকের ভাষায় যেন একেবারে পরিবেশবান্ধব শীতলীকরণ ব্যবস্থা। এই পর্দায় জল ছিটিয়ে রাখলেই তার ভিতর দিয়ে আসা বাতাস হয়ে উঠত স্বস্তিদায়ক ঠান্ডা। দিনের স্বাভাবিক ছন্দও বদলে যেত পরিবেশের কারণে। দুপুরের প্রখরতায় কাজকর্ম প্রায় থেমে যেত। মানুষ আশ্রয় নিত ‘তেহখানা’ বা ভূগর্ভস্থ শীতল কক্ষে। আর সন্ধ্যা নামলেই জীবন সরে আসত ছাদের উপর। খোলা আকাশের নীচে রাত কাটানোর সেই সহজ, প্রাচীন অভ্যাসে। কয়েক বছর আগেও গ্রাম, মফঃস্বলে ছাদঘুম ছিল স্বাভাবিক অভ্যাস। আজকের প্রজন্মের কাছে তা প্রায় কল্পকাহিনি। গ্রীষ্মের রাতে খোলা আকাশের নীচে শুয়ে হাওয়া মাখতে মাখতে চাঁদের চলন দেখা, একটা একটা করে তারা চেনা, আর নিঃশব্দে রাতের গভীর হয়ে ওঠা অনুভব করা— এই সরল আনন্দগুলির স্বাদ তারা আর পায় না। যেন একটুকরো আকাশ হারিয়ে গিয়েছে আমাদের জীবন থেকে।
মুঘলদের খাদ্য ও পানীয়তেও ছিল এই তাপ প্রশমনের সূক্ষ্ম বোধ। বড়ো ঘরে ‘আবদার’ নামে বিশেষ কর্মচারী থাকতেন। তাঁদের কাজ ছিল ঠান্ডা জল সরবরাহ করা। ঠান্ডা জল তখন শুধু প্রয়োজন নয়, এক ধরনের আরাম, আভিজাত্য ও যত্নের প্রতীক ছিল। পোশাকেও ছিল ঋতুর প্রভাব। মসলিনের মতো হালকা কাপড় শরীরকে শীতল রাখত। ঘন ঘন স্নান, হাতপাখা, দিনের বেলায় বিশ্রাম, রাতে কাজ— এসব ছিল গরমের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার অংশ। লস্যি, শরবত, ফলের রস শরীরকে শীতল রাখার প্রয়োজনেই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। মুঘলদের হাত ধরে ষোড়শ শতকে শরবতের এক নতুন পরিশীলিত রূপ ভারতে আসে। মুঘল বাদশাহরা, বিশেষ করে সম্রাট বাবর ছিলেন এই পানীয়ের নিবেদিত অনুরাগী। ঠান্ডা জলের সঙ্গে ফল, ফুল ও সুগন্ধি রসের মিশেলে তৈরি এই পানীয় যেন দমবন্ধ করা গ্রীষ্মে এক চুমুক প্রশান্তি। তবে শরবতের শিকড় ছিল আরও গভীরে। প্রাচীন পারস্যের মাটিতে প্রোথিত। একাদশ শতকে ইবন নানা রকম সুগন্ধি ও ঔষধি গুণসম্পন্ন সিরাপের উল্লেখ করেছিলেন। এই প্রেক্ষিতে ইসবগুলের কথাও স্মরণযোগ্য। শরবতের সঙ্গে মিশে তা দেহে শীতলতা আনে এবং জলশূন্যতা কমাতে সহায়তা করে। গোলাপ জল, খাস, চন্দনের মতো উপাদান স্বাদের সঙ্গে সঙ্গে শরীরেও রেখে যায় প্রশান্তির ছোঁয়া। আর কুলফি ছিল গরমের এক প্রিয় উপশম। তখনকার বিলাসের চূড়ান্ত রূপ। বরফ ছিল বিরল ও ব্যয়বহুল। দূর হিন্দুকুশ পর্বত থেকে তা সংগ্রহ করে আনতে হতো। কিন্তু এই অভাবও মুঘলদের উদ্ভাবনী শক্তিকে থামাতে পারেনি। ‘শোরা’ বা সল্টপিটার ব্যবহার করে জল ঠান্ডা করার এক অভিনব পদ্ধতির প্রচলন করেন আকবর স্বয়ং। আবুল ফজলের ‘আইন-ই-আকবরি’-তে এর বর্ণনা পাওয়া যায়। ১৫৮৬ সালের পর পাঞ্জাবে অবস্থানকালে আকবরের উদ্যোগে উত্তর পর্বতমালার অঞ্চল থেকে বরফ আনার এক সুবিন্যস্ত ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। লাহোর থেকে বহু দূরের পাহাড়ি অঞ্চল থেকে নৌকা, গাড়ি ও বাহকদের মাধ্যমে এক জটিল ও ব্যয়বহুল পরিবহন ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে ধাপে ধাপে রাজধানীতে পৌঁছাত সেই বরফ। কী দাম পড়ত? একটা উদাহরণ দিতে বিষয়টি বোঝা যাবে। যেখানে দশ রুপিতে এক তোলা সোনা কেনা যেত, সেখানে এক রুপিতে মাত্র দুই বা তিন সের বরফ মিলত। ফলে বরফ নিছকই গরম থেকে উপশমের উপকরণ ছিল না, তা আদতে ছিল বিলাসের প্রতীক। তবে এই বিলাস শুধু অভিজাতদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। গ্রীষ্মকালে দরবারের নানা স্তরের মানুষই এর স্বাদ পেত। ব্যবসায়ীরাও এই চাহিদাকে কেন্দ্র করে এক লাভজনক ব্যবসা গড়ে তোলেন। পাহাড়ি মানুষের কাঁধে, নৌকার দোলায় বা গাড়িতে চাপিয়ে বরফ আনা হত রাজধানীতে। আবুল ফজল আরও লিখছেন, ভারতকে একসময় ‘ঠান্ডা জলের অভাব’ নিয়ে সমালোচনা করা হতো। আকবর সেই অভাব পূরণ করতে চেয়েছিলেন। এখানে শাসকের এক অন্যরকম দৃষ্টিভঙ্গি দেখা যায়— প্রকৃতির সঙ্গে লড়াইয়ের মধ্যেও ছিল এক সামাজিক দায়িত্ববোধ। এই প্রসঙ্গে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম উঠে আসে— ফতুল্লা শিরাজি। আকবরের দরবারের এই পণ্ডিত প্রযুক্তিবিদ শুধু সামরিক যন্ত্র বা গোলাবারুদের প্রযুক্তিতে নয়, দৈনন্দিন জীবনের ব্যবহারিক সমস্যার সমাধানেও অবদান রেখেছিলেন। বিভিন্ন যান্ত্রিক ব্যবস্থায় তাঁর দক্ষতা, বিশেষত ‘গিয়ার’ ব্যবহারের মতো প্রযুক্তিতে মুঘল দরবারে এক নতুন দিগন্ত খুলে দেয়। যদিও সল্টপিটার দিয়ে জল ঠান্ডা করার কৃতিত্ব আবুল ফজল আকবরের নামেই আরোপ করেছেন, তবু এই ধরনের প্রযুক্তির পিছনে যে এক বিস্তৃত বৌদ্ধিক পরিবেশ কাজ করছিল, যেখানে ফতুল্লা শিরাজির মতো ব্যক্তিরা সক্রিয় ছিলেন, তা অস্বীকার করা যায় না।
আকবর ও তাঁর উত্তরসূরিদের জীবনে সুগন্ধি ছিল বিলাসের অভ্যাস। এক সূক্ষ্ম নান্দনিক সাধনা— যেখানে গন্ধ, রুচি ও পরিবেশ একসূত্রে বাঁধা পড়ত। সম্রাটের দরবার থেকে অন্দরমহল, সর্বত্রই যেন বিরাজ করত এক মৃদু অথচ স্থায়ী সুগন্ধের আবরণ। অ্যাম্বর, আগর ও নানা ধূপের ধোঁয়া রাজপ্রাসাদের বাতাসে ভেসে বেড়াত। যেন অদৃশ্য কোনো অলংকারে সজ্জিত করে তুলছে চারপাশকে। এই সুগন্ধির কিছু ছিল প্রাচীন হিন্দু আচার-অনুষ্ঠানের উত্তরাধিকার, আবার কিছু আকবরের নিজস্ব সৃজন। তাঁর রুচি ও কল্পনার অভিনব প্রকাশ। সোনা-রুপোর কারুকার্যমণ্ডিত ধূপদানে প্রতিদিন জ্বলত ধূপ। চারদিক ভরে উঠত সুগন্ধি ফুলের প্রাচুর্যে। সেই ফুল থেকেই তৈরি হত আরক, আতর ও সুগন্ধি তেল। গ্রীষ্মের প্রখরতায় এই সুগন্ধি-সংস্কৃতি আরও এক বিশেষ তাৎপর্য লাভ করত। চন্দনের শীতল পরশ ও কর্পূরের স্বচ্ছ স্নিগ্ধতা দেহ-মনকে এনে দিত প্রশান্তি। খাসের মাটির গন্ধমাখা সবুজ সুবাস যেন তপ্ত ভূমির বুক থেকেই উঠে আসা এক নির্মল শীতলতার বার্তা বহন করত। আর গোলাপ ও জুঁই-জল তাদের কোমল, স্নিগ্ধ সুবাসে উত্তপ্ত দিনকে করে তুলত সহনীয়, মনোরম। ফলে সুগন্ধি এখানে কেবল আভিজাত্যের পরিচায়ক নয়, বরং ঋতুর সঙ্গে তাল মিলিয়ে গড়ে ওঠা এক সংবেদনশীল জীবনবোধের প্রকাশ। এই প্রসঙ্গেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে একটি বৃহত্তর সত্য। মুঘলদের গরমের মোকাবিলা কোনো একক উপায়ের উপর নির্ভরশীল ছিল না। তা ছিল এক সমন্বিত বোধের ফসল। স্থাপত্যের সূক্ষ্ম পরিকল্পনা, খাদ্য ও পানীয়ের সচেতন নির্বাচন, দৈনন্দিন জীবনের অভ্যাস— সব মিলিয়ে গড়ে উঠেছিল এক পূর্ণাঙ্গ জীবনযাপন পদ্ধতি। সেযুগে গ্রীষ্মকে প্রতিপক্ষ নয়, সহাবস্থানের এক বাস্তবতা হিসাবে গ্রহণ করা হয়েছিল। আজ আমরা সম্পূর্ণ ভিন্ন এক জগতে বাস করি। কংক্রিটের শহর, কাচে মোড়া দেওয়াল, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের নিশ্চয়তা— এসব আমাদের আরাম দেয়। সুরক্ষার এক আবরণ গড়ে তোলে। কিন্তু সেই আবরণের আড়ালেই আমরা নিঃশব্দে দূরে সরে যাই প্রকৃতি থেকে। ‘এয়ার কন্ডিশনার’ আমার, আমাদের ঘর ঠান্ডা রাখে ঠিকই, কিন্তু সেই স্বস্তির বিনিময়ে বাতাসে জমা হয় দূষণ, জরা, অসহ্য উত্তাপ— যার হিসাব আমরা সহজে রাখি না। যে কথায় শুরু হয়েছিল— উত্তাপ বাড়ছে, দ্রব্যমূল্য বাড়ছে! তার সঙ্গে আজ যুক্ত হয়েছে আরও এক বাস্তবতা— নগরায়ন। আর সেই নগরায়নের চাপে অরণ্য সরে যাচ্ছে, জল ক্রমশ অপ্রতুল হয়ে উঠছে। ভূমি ও জল-স্থল যেন এক অস্থির টানাপোড়েনে আবদ্ধ। এই মুহূর্তে, যখন নতুন সরকার গঠনের প্রাক্কালে আমরা দাঁড়িয়ে, তখন প্রত্যাশা একটাই— ক্ষমতার সঙ্গে যেন যুক্ত হয় এক সুস্পষ্ট, দায়বদ্ধ পরিবেশ-চিন্তা। কারণ এই সংকট কেবল আবহাওয়ার নয়, আমাদের জীবনযাত্রারও।
এই প্রেক্ষিতেই অতীতের অভিজ্ঞতা ফিরে এসে আমাদের নীরবে ভাবায়। সেযুগের শাসকেরা শেখায়— গরমকে জোর করে পরাস্ত করা যায় না। তাকে বুঝতে হয়, তার সঙ্গে সুর মিলিয়ে নিতে হয়। হয়তো আজ আমরা তেহখানার শীতল অন্ধকারে আশ্রয় নেব না, বা খুস তট্টির ভেজা পর্দা ঝুলিয়ে রাখব না! কিন্তু জীবনযাত্রার ছন্দে কিছু সহজ পরিবর্তন— ঘরে বাতাসের চলাচল নিশ্চিত করা, সবুজকে ফিরিয়ে আনা, জলের উপস্থিতিকে গুরুত্ব দেওয়া, এই প্রাথমিক বোধগুলি আজও সমান প্রাসঙ্গিক, আশু জরুরি। ইতিহাস তাই এখানে কেবল অতীতের স্মৃতি নয়। সে আমাদের বর্তমানকে প্রশ্ন করে, আমাদের অভ্যাসকে নতুন করে বিচার করতে শেখায়। আমরা বর্তমানেই বাস করি, কিন্তু এই বর্তমান আসলে ক্ষণিক! আমাদের বাক্য শেষ হওয়ার আগেই যার অবসান ঘটে। সেই অস্থিরতার ভিতরেই প্রশ্নটি ফিরে আসে— আমরা কি সত্যিই উন্নত, যদি প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানের সহজ জ্ঞানটুকুই হারিয়ে ফেলি!
লেখক বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক