


নিজস্ব প্রতিনিধি, আমেদাবাদ: ডাঁই করে রাখা নোংরা। ঢেউ খেলানো পাহাড়ের মতোই। কচিকাঁচাদের কাছে এটাই ‘কাচড়া পট্টি’। নোংরার এই স্তূপকে সঙ্গে নিয়েই দিন গুজরান একশোরও বেশি মুসলিম পরিবারের। আশপাশের কলকারখানার চিমনির বিষাক্ত বাতাস, জঞ্জালে লাগিয়ে দেওয়া আগুনে তৈরি হওয়া ধোঁয়াও সঙ্গী দিনযাপনের। বিষাক্ত কেমিক্যালের ধারা কখনও নেমে আসে ঝুপড়িতে। দুর্গন্ধে নিঃশ্বাস আটকে আসে। ‘সিটিজেন নগর’-এ এটাই অবশ্য স্বাভাবিক।
সবরমতী নদীতে তৈরি হওয়া অটল ব্রিজ থেকে দূরত্ব মেরেকেটে মিনিট কুড়ি। সুসজ্জিত নদীর পার থেকে নারকীয় পরিবেশ, অনেকটা মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠের মতোই। ২০০২ সালের গুজরাত দাঙ্গায় নারোদা পাটিয়া অঞ্চলে প্রাণ হারিয়েছিলেন ৯৭জন মুসলিম। সেখানের বেঁচে যাওয়া পরিবারগুলোই এখন থাকেন সিটিজেন নগরে। দাঙ্গার হাত থেকে বাঁচলেও এমন জঘন্য জীবনকে এড়ানো যায়নি। এই জঞ্জালের স্তূপের ৫৫ মিটার ব্যাসের মধ্যে যে কোনও বাড়িকে ‘অবৈধ’ ঘোষণা করেছে আমেদাবাদ মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন। কিন্তু হতভাগারা যাবেন কোথায়? প্রতিনিয়ত মাথার উপর ঝুলন্ত উচ্ছেদের খাঁড়া নিয়েই বিষাক্ত পরিবেশে থাকা। দিনের পর দিন এখানে থাকার অবশ্যম্ভাবী পরিণতি হল অসুস্থতা। শিশু-বৃদ্ধদের মধ্যে তা ফুটে উঠছেও।
জীবন এখানে মূল্যহীন। পানীয় জলে মিশে থাকে কেমিক্যাল। সেটাই গিলতে হয়। জল কেনার সঙ্গতি নেই। হতদরিদ্র বর্তমান ডুবে রয়েছে হতাশা আর জঞ্জালের পাহাড়ে। নেই ভবিষ্যতের আশার আলো। অভাবের তাড়নায় বাচ্চাদের পাঠানো হয় না স্কুলে। আগে তো খেতে পরতে হবে। অতীত মানেই আবার দাঙ্গার বিভীষিকা। কোনও মতে প্রাণ হাতে নিয়ে পালিয়ে আসারা বেঁচে রয়েছেন জীবন্মৃত হয়েই। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে ধুঁকতে ধুঁকতে।
এই পিরানা ডাম্পসাইট পরিষ্কার করার ডেটলাইন পেরিয়ে গিয়েছে অনেকদিন। কিন্তু অসহায় নাগরিকদের দুর্দশা ঘোচেনি। কাজ শুরু হয়েছে ঠিকই, তবে জঞ্জাল যে হারে জমছে, তাতে কবে যে তা পরিষ্কার হবে কেউ জানে না। এই খাতে পুরসভার কোটি কোটি টাকার বরাদ্দ নিয়েও চলছে রঙ্গ। জঞ্জাল ঘাঁটাঘাঁটি ও বড় বড় ট্রাকের আনাগোনার ধুলোয় আকাশ যদিও ঢেকে থাকে সর্বক্ষণ। ধোঁয়াটে দেখায় সবকিছু। আগামী দিনগুলোর মতোই!
সব হারানোর যন্ত্রণা তাঁদের খোঁচায় সর্বক্ষণ। নারোদা পাটিয়ায় নিজের বাড়ি ছিল। কিন্তু এখানে আসা সর্বস্রান্ত হয়ে। কোভিডের পর বেড়েছে আবর্জনা। বর্ষায় নামে ধ্বস, পিচের রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়। অনেক সময়েই ভেঙে পড়ে বাড়ি। আশ্রয়হীন হন তাঁরা। লাগোয়া বাড়ির অনেকগুলোই তাই তালাবন্ধ। কেউ থাকেন না। তবে এঁদের অন্যত্র যাওয়ার ক্ষমতা নেই। নোংরা জল জমে সাঁতসেঁতে হয়ে পড়া বাড়িতে সেজন্যই থাকা। অসুস্থ হয়ে পড়লেও এখানে অ্যাম্বুলেন্স মেলে না। আসতে চায় না গাড়ি। বৃষ্টিতে ঘরের ভিতর দিয়ে বয়ে চলে বর্জ্য কেমিক্যাল। ঘিরে ধরে কালো নোংরা জল। জঞ্জালের স্তূপের নীচে চাপা পড়ে শিশুদের মৃত্যুর ঘটনাও হরদম শোনা যায়। স্থানীয় একজনের কথায়, ‘এটাকে বাঁচা বলে না। অবশ্য আমরা বাঁচি বা মরি, তাতে কারও এসে যায় না।’
জীবন এখানে মৃত্যুরই সমান। বেঁচে থাকা নিষ্ঠুর রসিকতা ছাড়া আর কী!