


হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত: হ্যাভলক থেকে বিশাল ক্রুজে চেপে সকালবেলা যখন নীল দ্বীপের উদ্দেশে যাত্রা করলাম তখনই ক্রুজের জানলাতে জলের ছিটে এসে লাগতে শুরু করল। না সমুদ্রর জল নয়, বৃষ্টির জল। বর্ষা প্রবেশ করেছে আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে। সমুদ্রও উত্তাল হয়ে উঠেছে বর্ষণ আর ঝোড়ো বাতাসে। আর তার দাপটে বিশালাকৃতির যাত্রীবাহী ক্রুজটাও মাঝে মাঝে দুলে উঠছে। এই জলযানগুলির ঘাঁটি হল পোর্ট ব্লেয়ার, সেখান থেকে তারা হ্যাভলক দ্বীপ ছুঁয়ে, নীল দ্বীপে যাত্রীদের নিয়ে যায়, আবার একই পথে ফিরে যায় পোর্ট ব্লেয়ারে। হ্যাভলক থেকে নীল অর্থাৎ বর্তমানের ‘স্বরাজ দ্বীপ’ থেকে আমাদের গন্তব্য ‘শহিদ দ্বীপের’ দূরত্ব আঠারো নটিক্যাল মাইলের মতো। যেতে সময় লাগে পঁয়তাল্লিশ মিনিটের মতো। এই স্বল্প যাত্রাপথেই বর্ষণসিক্ত সমুদ্রের দুলুনিতে অনেকেরই বমনের উদ্রেক ঘটছে। তবে, আমার ব্যক্তিগত মত, প্রচণ্ড প্রাকৃতিক দুর্যোগ সৃষ্টি না হলে নতুন জায়গা দেখার উত্তম সময় হল তথাকথিত ‘অফ সিজন’। তাছাড়া, প্রত্যেক জায়গাতেই আলাদা আলাদা ঋতুতে আলাদা আলাদা সৌন্দর্য থাকে। তা খুঁজে নিতে হয়।
আকারে ছোট এই আইল্যান্ড। আমার ভ্রমণ এজেন্সির লোক গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করছিল। তারাই আমাকে হোটেলে নিয়ে গেল কিছু সময় বিশ্রাম নিয়ে বেরিয়ে পড়ার জন্য। আমার ঘরটা ঠিকঠাক করার জন্য রিসেপশনে বসা ছেলেটি আমার কাছ থেকে মিনিট পাঁচেক সময় চেয়ে নিল। বেশ কয়েকটা সোফা রয়েছে রিসেপশনে। সেখানেই বসলাম ঘরে যাওয়ার আগে। হঠাৎ দেখি একটা প্রাণী বেরিয়ে এল আমার সোফার নীচ থেকে। নানা রঙে চিত্রবিচিত্র বিরাট আকারের একটা কাঁকড়া। এমন সুন্দর কাঁকড়া আমি আগে কখনও দেখিনি। আমি মোবাইল ফোনে ছবি তুলে নিলাম তার। রিসেপশনের ছেলেটির থেকে খবর নিয়ে জানলাম ওই রংচঙে কাঁকড়ার নাম নাকি ‘কোকোনাট ক্র্যাব’ বা ‘নারকেলি কাঁকড়া’। বর্ষা ঋতুতে নীল আইল্যান্ডে প্রচুর দেখতে পাওয়া যায়। এই কাঁকড়া নাকি নারকেল গাছের মাথায় উঠে তাদের শক্ত দাঁড়ার সাহায্যে নারকেলের খোল ভেঙে তার শাঁস খায়। তাই এদের নাম ‘কোকোনাট ক্র্যাব’। বর্ষায় না এলে এ কাঁকড়া দেখার সৌভাগ্য আমার হতো না।
হোটেলের রুমে চেক-ইন করেই কিছুক্ষণের মধ্যেই বেরিয়ে পড়লাম। আমার গন্তব্য নীল আইল্যান্ডে প্রধান তিনটি সমুদ্র সৈকত—ভরতপুর, সীতাপুর ও লক্ষ্মণপুর সমুদ্র সৈকত। আমার যাত্রা শুরুর সময়ও টিপটিপ করে বৃষ্টি হয়েই চলেছে। গন্তব্যস্থলগুলোতে যাওয়ার আগে পেটে কিছু দিতে হবে। এ কথা জেনে ড্রাইভার একটা হোটেলের সামনে গাড়ি থামাল। মাছ ধরার ছেঁড়া জাল, নৌকার বৈঠা, লাইফ সেভিং জ্যাকেট-টিউব ইত্যাদি পড়ে রয়েছে সেখানে। ভিতরে ঢুকে বুঝতে পারলাম সেটা একটা পানশালা। মাঝি-মাল্লা-জেলেরা সস্তায় পানাহার করতে আসে সেখানে। যাই হোক খাবার মতো কিছু জিনিস মিলে গেল সেখানে। তা খেয়ে রওনা হলাম আমার প্রথম গন্তব্য ভরতপুর সৈকতের উদ্দেশে।
ভরতপুর সৈকতে গিয়ে যখন উপস্থিত হলাম তখন বৃষ্টি যেন ধীরে ধীরে আরও বাড়তে শুরু করেছে। এই সৈকত ওয়াটার স্পোর্টস, স্নরকেলিং অর্থাৎ সমুদ্র পাড়ের অগভীর তলদেশ দিয়ে হেঁটে সমুদ্রের জীবজগৎকে প্রত্যক্ষ করার জন্য বিখ্যাত। তবে বৃষ্টির জন্য এদিন পর্যটকদের তেমন ভিড় নেই। সাদা উন্মুক্ত বালুতটকে চুম্বন করছে নীল সমুদ্রের ঢেউ, মাথার ওপর নীল আকাশ। সমুদ্র আর আকাশের রং যেন এখানে মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছে। সমুদ্র পাড়ের নারকেল গাছের মাথারা ওপর থেকে নেমে এসে যেন ছুঁতে চাইছে সমুদ্রের জলরাশিকে। বৃষ্টি আর বাতাস বইছে বলে আজ গাছগুলো যেন বেশি চঞ্চল হয়ে উঠেছে। বর্ষণসিক্ত সমুদ্র তটের এ এক অন্যরকম রূপ। কিছুক্ষণের মধ্যেই ঝেপে বৃষ্টি নামল। কাজেই বাধ্য হয়ে আশ্রয় নিতে হল কাছেই এক সুভেনির শপে। বেশ কিছু সুভেনিরের দোকান আছে এখানে। পাওয়া যায় নারকেল মালা দিয়ে, খেজুর পাতা দিয়ে তৈরি সামগ্রী, জারোয়াদের মূর্তি এসব। নীল আইল্যান্ডের বাসিন্দাদের নব্বই শতাংশই কিন্তু বাঙালি। দেশ বিভাগের সময় যে বাঙালিরা উদ্বাস্তু হয়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান থেকে ভারতে এসেছিলেন, তাঁদের এ দেশের বিভিন্ন স্থানে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করে ভারত সরকার। তাঁদেরই একটা বড় দল এসে বসতি স্থাপন করে এই নীল আইল্যান্ডে। তাঁরাই এখন বংশানুক্রমে নীল দ্বীপের স্থায়ী বাসিন্দা। সামান্য কিছু নিকোবরি ও দক্ষিণ ভারতের লোকও এখানে আছে, তবে সংখ্যায় তাঁরা অতি নগণ্য।
বৃষ্টি একসময় থামল। রোদ আবার ঝলমলিয়ে হাসতে শুরু করল। আমিও রওনা হয়ে গেলাম নীল দ্বীপের বিখ্যাত সমুদ্র সৈকত লক্ষ্মণপুর বিচ দেখার জন্য। এই সৈকতের একটা অংশ টিলার মতো প্রবাল প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। হাজার হাজার বছর ধরে প্রকৃতি সৃষ্টি করেছে এই প্রবাল প্রাচীর। সিঁড়ি দিয়ে অতিক্রম করে তারপর নীচে নেমে পৌঁছতে হয় সমুদ্র সৈকতে। সেখানে সামুদ্রিক প্রাণী, কোরাল ইত্যাদি দেখাবার জন্য গাইডরা অপেক্ষা করে থাকে যাত্রাপথে। তবে গাইড চার্জ এক হাজার টাকা। তা সে একজনকেই ঘুরিয়ে দেখাক বা কোনও বড় দলকে। যাত্রাপথে আমার গাড়ির চালক একটা পরামর্শ দিয়েছিল, তা হল সমুদ্র তটে যেখানে দেখবেন, গাইড দাঁড়িয়ে অন্যদের কিছু দেখাচ্ছে, গাইড দেখানো শেষ করে অন্যদিকে গেলে সে স্থানে গেলেই আপনার চোখে কিছু একটা পড়তে পারে। তাছাড়া, বর্ষাকালে গাইড নেওয়ার প্রয়োজন হয় না। জোয়ারের জল সমুদ্র থেকে অনেকটাই ওপরে উঠে আসে। জল ফিরে যাওয়ার পর কোরাল পাথরের গর্তে এমনিতেই নানা সামুদ্রিক প্রাণী আটকে পড়ে খেলে বেড়ায়, এমনিতেই তাদের দেখা যায়। তাই গাইড আর নিলাম না। সিঁড়ি দিয়ে উঠে তারপর ঢাল বেয়ে নীচে নেমে উপস্থিত হলাম সমুদ্র সৈকতে।
বালি নয়, সমুদ্র সৈকতে কেউ যেন কালচে খয়েরি কোরাল পাথরের চাদর বিছিয়ে রেখেছে। প্রথম দর্শনে সমুদ্র তটটিকে দেখে কাদা বা পাঁকের আস্তরণ মনে হলেও আসলে সেগুলো মৃত জমাট বেঁধে পাথর হয়ে যাওয়া কোরাল বা প্রবালই। সবাই যেভাবে এগচ্ছে আমিও এগলাম সেভাবেই। তবে সাবধানে এগতে হয় পাথরের ওপর পা রেখে। কারণ গভীর না হলেও নানা ছোট-বড় গর্ত আছে। অসাবধানে তাতে পা পড়ে গেলে ভূপতিত হওয়ার আশঙ্কা। কখনও আবার গোড়ালি সমান জলে পা ডুবিয়েও এগতে হয়। হাঁটতে হাঁটতে তেমনই এক অগভীর জমা জলে দেখলাম খেলে বেড়াচ্ছে ছোট একটা নীল মাছের দল। তারা অপেক্ষা করছে সমুদ্রর জল আবার কখন ওপরে উঠে আসবে সে জন্য। তখন আবার তারা ফিরে যাবে সমুদ্রে। এই সমুদ্র তটে এভাবে মাছ, সামুদ্রিক প্রাণী দেখা যায় বলে অনেকে এই সমুদ্র তটকে ‘ওপেন এয়ার মেরিন অ্যাকরিয়াম’ নামেও ডেকে থাকেন। কিছুটা দূর এগবার পরই দেখতে পেলাম কোরাল পাহাড়ের মাথার ওপর থেকে ঝুলন্ত নীল আইল্যান্ড তথা আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের বিখ্যাত ঝুলন্ত সেতুকে। আসলে সেটা উঁচু কোরাল প্রাচীরের গা থেকে বেরিয়ে আসা ঝুলন্ত একটা অংশ। হাজার হাজার বছর ধরে সমুদ্রর বাতাসের ঘর্ষণে তার মধ্যে বেশ বড় ফোকরের সৃষ্টি হয়েছে। তাই তাকে ঝুলন্ত সেতুর মতো দেখতে লাগে। তার গায়ে জড়ানো লতাগুল্ম বর্ষার জল পেয়ে আরও সবুজ হয়ে উঠেছে। প্রকৃতির এক আশ্চর্য সৃষ্টি এই ঝুলন্ত সেতু। নীল আইল্যান্ডের আইকনিক সিম্বল এই ঝুলন্ত পাথরের সেতু। বহু মানুষ তার নীচে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছে। এই ঝুলন্ত সেতুর একটা মজার নামও আছে। স্থানীয়রা একে বলেন ‘হাওড়া ব্রিজ’।
সমুদ্রর তটরেখা ধরে ঘুরতে শুরু করলাম। কোরাল চাদর ঢাকা তটরেখার মধ্যে মাঝে মাঝে অগভীর গর্ত রয়েছে। যাদের গভীরতা তিন-চার ফুট মতো, আর দৈর্ঘ্যে-প্রস্থেও বড় গর্তগুলো পাঁচ-ছয় হাতের চেয়ে বেশি নয়। ঘুরতে ঘুরতে তাঁদের মধ্যে চোখে পড়তে লাগল নানা ধরনের মাছ। স্বচ্ছ জ্বলে সূর্য কিরণে তাদের শরীরে বিচিত্র রূপ খেলা করছে। এরপর কোথাও কোথাও চোখে পড়তে লাগল অক্টোপাস। পাথরের খাঁজে তারা মাথা ঢুকিয়ে শুঁড়গুলো বাইরে জলের মধ্যে নাড়াচ্ছে। বিচিত্র রঙের বিভিন্ন আকারের কাঁকড়াও ছোটাছুটি করছে। এক জায়গায় দেখলাম নীল রঙের চিংড়ি গোত্রের স্রিম্প, চোখে পড়ল স্টার ফিস সহ আরও নানান সামুদ্রিক প্রাণী। আমি জীববিজ্ঞানের ছাত্র নই, তাই সব প্রাণীর নাম জানি না। নাম জানতে পারলে ভালো হয়, কিন্তু সব সময় সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য নাম জানার প্রয়োজন হয় না। যেমন এই জায়গা। কেউ কেউ গাইড নিয়ে ঘুরছেন আবার কেউ বা গাইড ছাড়াই ঘুরে বেড়াচ্ছেন আমারই মতো। এক জায়গায় দেখলাম দু’জন অল্পবয়সি যুবক জলের দিকে ক্যামেরা তাক করে কীসের যেন ছবি তুলছে। কিছুক্ষণ আগে একজন গাইডও কয়েকজন লোককে সে জায়গায় কী যেন দেখাচ্ছিল। আমি গিয়ে দাঁড়ালাম ছেলে দুটোর কাছে। জলকুণ্ডের মধ্যে মাকুর আকৃতির একটা প্রাণী নড়ছে। তারই ছবি তুলছে তারা। ছেলে দুটোর কাছ থেকেই জানলাম প্রাণীটির নাম নাকি ‘সমুদ্র শসা’। ইংরেজি নাম ‘সি কুকুম্বার’। ঠিক এরপরই এক মজার ঘটনা ঘটল। যে গাইড কিছুক্ষণ আগে এই প্রাণীটাকে দেখাচ্ছিল, সে ছুটতে ছুটতে হাজির হল সেখানে। তারপর সমুদ্র শসাটাকে তুলে পাশের একটা ছোট জলপূর্ণ গর্তের মধ্যে রেখে তাকে পাথরের খাঁজে লুকিয়ে ফেলল। বুঝতে পারলাম ট্যুরিস্টরা যদি এমনিতেই সব দেখে ফেলে, তবে তার ব্যবসার ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা। তাই প্রাণীটাকে লুকিয়ে রেখে গেল সে। ছেলে দু’টি স্থানীয় বাঙালি। ফোটোগ্রাফির শখ। ছবি তুলতে এসেছ তারা। এ জায়গার সঙ্গে পরিচিত। তারা আমাকে বলল, ‘জীবন্ত কোরাল দেখতে চাইলে আমাদের সঙ্গে আসুন।’ তাদের সঙ্গে গিয়ে উপস্থিত হলাম ঝুলন্ত সেতুর কাছে একটা জলকুণ্ডের সামনে। একঝাঁক ফুলের তোড়া যেন জেগে আছে জলের ভিতর। সাদা আর গোলাপি তাদের রং। নড়ছে তারা। জীবন্ত কোরাল মুগ্ধ হয়ে আমি তাদের দেখতে লাগলাম, আর ছেলেগুলো ছবি তুলতে লাগল। একসময় খেয়াল হল সূর্য ঢলতে শুরু করেছে, আমাকে সীতাপুর সৈকতে যেতে হবে সূর্যাস্ত দেখার জন্য। তবে এ দ্বীপ ছোট হওয়ার কারণে সমুদ্র সৈকতগুলোর মধ্যে দূরত্ব বেশি নয়।
সীতাপুর সমুদ্র সৈকত ‘সূর্যোদয়ের সৈকত’ নামেও পরিচিত। দুটি’ সমুদ্র খাঁড়ির মিলিত স্বচ্ছ জলরাশি ছুঁয়ে যাচ্ছে নির্জন সমুদ্র সৈকতের সোনালি বালুতটকে। সাধারণত সূর্যোদয় বা সূর্যাস্ত দেখার জন্য মানুষ এখানে আসে। সার সার তালগাছ আর তার নীচে বসার জায়গা রয়েছে এখানে। সমুদ্র তটে ঘুরে বেড়ায় লাল কাঁকড়ার দল। যখন সেখানে পৌঁছলাম তখন সূর্য ডুবতে শুরু করেছে। বেলা শেষের আলো রং ছড়াতে শুরু করেছে সমুদ্রের জল আর বালুতটে। এও এক অপূর্ব শান্ত সৌন্দর্য। খানিক পরই সন্ধ্যা নামবে নীল আইল্যান্ডের বুকে।