


নিজস্ব প্রতিনিধি, কোচবিহার ও নয়াদিল্লি: ফের বাংলা বলার ‘অপরাধে’ ভিন রাজ্যে হেনস্তার মুখে বাঙালি! এবার ঘটনাস্থল গুরুগ্রাম। কোচবিহার-১ ব্লকের জিরানপুরের বড়বালাসি গ্রামের বাসিন্দা সিরোজ আলম মিয়াঁ। বছর ৩৮’এর সিরোজ পেটের টানে গিয়েছিলেন গুরুগ্রাম। হোটেলে রান্নার কাজের পাশাপাশি একটি জিমেও কাজ করেন তিনি। রবিবার বিকেলে কাজ সেরে ঘরে ফেরার পথে গুরুগ্রামের সেক্টর-৫৫ এলাকা থেকে হরিয়ানা পুলিস তাঁকে বাংলাদেশি সন্দেহে নিয়ে যায়। পরিবারের অভিযোগ, শুধুমাত্র বাংলায় কথা বলাতেই হেনস্তার শিকার হয়েছেন সিরোজ। তাঁর পরিচয়পত্র যাচাই করে, মুচলেকা লিখিয়ে বাড়ি ফেরার অনুমতি দেয় পুলিস।
সিরোজের বাবা জাহেরউদ্দিন মিয়াঁ স্থানীয় জিরানপুর এলাকায় পঞ্চায়েতের ট্যাক্স কালেক্টর ছিলেন। বয়স ৭২ বছর। রবিবার বিকেলে এই খবর পাওয়ার পর কোচবিহার কোতোয়ালি থানার দ্বারস্থ হয়েছিল সিরোজের পরিবার। এরপর সোমবার কোচবিহারের প্রাক্তন সাংসদ তথা উত্তরবঙ্গ রাষ্ট্রীয় পরিবহণ নিগমের চেয়ারম্যান পার্থপ্রতিম রায় পার্থপ্রতিম রায়ের সঙ্গে তাঁরা জেলাশাসকের সঙ্গে দেখা করতে যান। অতিরিক্ত জেলা শাসকের কাছে প্রয়োজনীয় নথিপত্র জমা দেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পুরো বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখা হচ্ছে। পার্থবাবু বলেন, ‘সিরোজ আলম দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে গুরুগ্রামে হোটেলে কাজ করেন। তিনি কর্মসূত্রে সৌদি আরবেও পাঁচ বছর ছিলেন। বংশপরম্পরায় এখানে থাকেন।’ তারপরই খবর আসে, সিরোজকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ, কোচবিহারের এই বাসিন্দা এবং তাঁর স্ত্রী, দু’জনেরই মোবাইল নিয়ে নিয়েছিল হরিয়ানা পুলিস। মুচলেকা দেওয়ার পর সেই দু’টি তাঁরা ফেরত পান। তবে সেক্টর ৫৫/৫৬ পুলিস সাফ জানিয়েছে, বাংলা বলার জন্য বা বাংলাদেশি সন্দেহে কোনও আটক বা গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটেনি। পার্থপ্রতিম রায় রাতে জানান, ‘আমি জিরানপুরে ওঁদের বাড়ি গিয়েছিলাম। সেই সময় সিরোজ আলম মিঁয়ার সঙ্গে কথা হয়েছে। তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।’
একের পর এক রাজ্যে বাঙালি হেনস্তার ঘটনা ঘটছে। ছত্তিশগড়ে ন’জন বাঙালি শ্রমিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁরা বস্তার জেলায় একটি স্কুলের নির্মাণকাজের জন্য গিয়েছিলেন। এই সব ঘটনার প্রতিবাদে ইতিমধ্যেই কড়া অবস্থান নিয়েছে তৃণমূল। সোমবার রাজ্য মন্ত্রিসভার বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে ফের সরব হন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বলেন, ‘এখানে ভিন রাজ্যের দেড় কোটি মানুষ বসবাস করেন। এখানে তাঁদের কেউ বিরক্ত করে না। তাঁরা বাংলায় শান্তিতে রয়েছেন। অথচ বাংলার মাত্র সাড়ে ২২ লক্ষ মানুষ ভিন রাজ্যে বসবাস করেন। বঙ্গভাষী হওয়ার জন্য তাঁদের উপর অত্যাচার হবে! এর প্রতিবাদে ১৬ জুলাই সবাই পথে নামব।’ এদিন ভোপালে অল ইন্ডিয়া অ্যাসেম্বলি স্পিকার কনফারেন্সে এই ইস্যুতে সরব হন বিধানসভার অধ্যক্ষ বিমান বন্দ্যোপাধ্যায়ও। তাঁর কথায়, ‘বাঙালিদের হেনস্তা করা হচ্ছে। বাংলাদেশি বলে দাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে।’ অধ্যক্ষের প্রশ্ন, অন্য রাজ্যের মানুষ এখানে নিশ্চিন্তে রয়েছেন, ‘তাহলে বাঙালিরা ভিন রাজ্যে কেন আক্রান্ত হবেন?’
পাশাপাশি, দক্ষিণ দিল্লির বসন্তকুঞ্জে উচ্ছেদের মুখে পড়া বাঙালিদের পাশে থাকার বার্তা দিতে সোমবার সারারাত জয় হিন্দ কলোনির অসহায় মানুষগুলোর সঙ্গেই কাটালেন তৃণমূল সাংসদরা। দিনভর চলল ধর্না। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছবি পিছনে রেখে দিল্লির বিজেপি সরকার বিরোধী স্লোগান তুললেন সুখেন্দুশেখর রায়, ডেরেক ও’ব্রায়েন, সাগরিকা ঘোষ, সাকেত গোখলে এবং দোলা সেন। গলা মেলালেন ফতিমা, মনসুর আলি, খবরু শেখ, শাহনুর মিয়াঁর মতো মানুষ। তাঁদের বেশিরভাগই কোচবিহারের বাসিন্দা। পেটের টানে দিল্লি চলে এসেছেন সেই বাম জমানায়। তাই দিল্লিতে পরিচারিকা, রিকশচালক, শৌচালয়ের সাফাইকর্মী বা কেয়ারটেকারের কাজ করে দিন গুজরান করেন তাঁরা। তবে এখন এলাকার কয়েকজন প্রোমোটার ‘নোটিস’ ধরিয়েছেন, জায়গা খালি করতে হবে। দিল্লি পুলিসও তকমা দিচ্ছে বাংলাদেশি। গত মঙ্গলবার থেকে জল, বিদ্যুৎহীন গোটা বস্তি। যদিও তৃণমূলের চাপে সোমবার থেকে দিল্লি জল বোর্ডের ট্যাঙ্কার এসে দিচ্ছে পানীয় জল। বিকেলে জলের গাড়ি আসতেই খালি জ্যারিকেন নিয়ে হুড়োহুড়ি পড়ে যায়। বিদ্যুৎ সংযোগ ছিল কর্মাশিয়াল। সেটাই কেটে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ। তারই মধ্যে বর্ষার জলে কর্দমাক্ত কলোনির নারকীয় পরিবেশেই দাঁতে দাঁত চেপে পড়ে রয়েছেন বাসিন্দারা। যদিও কয়েকজন টেম্পো ডেকে ডাঁই করা আসবাব, কাপড়চোপড় নিয়ে ছাড়ছেন এলাকা। ‘বাংলায় কথা বললেই বাংলাদেশি? এটাই কি আমাদের অপরাধ?’ বলছেন তাঁরা।