


‘সংসারে নানা গোল। এদিকে যাবি, কোঁস্তা ফেলে নারব; ওদিকে যাবি, ঝাঁটা ফেলে মারব; এদিকে যাবি জুতো ফেলে মারব।’ অর্থাৎ মানুষের পালাবার যেন পথ নেই। যে পথে যাচ্ছে সে পথেই বিঘ্ন; প্রতিকূলতা। এটি একটি অত্যন্ত অসহায় অবস্থার কথা ঠাকুর বলছেন, কিন্তু তা বলে তিনি কাকেও নিরাশ করেননি। বলেছেন, সকলেরই এ অবস্থা থেকে ঊর্ধ্বে উঠবার পখ আছে। সংসারের ভিতর যারা আছে ঠাকুর তাদের বলতেন, মাঝে মাঝে নির্জনে ঈশ্বরের চিন্তা করতে হয়। নাহলে নিজের মনকে কখনও বশে আনা যায় না। এমনিই মন চঞ্চল, তার উপর যদি চারিদিকে চাঞ্চল্যের কারণ থাকে তাহলে সে মনকে বশ করা অসম্ভব। এইজন্য মাঝে মাঝে নিজনে ঈশ্বরচিন্তা করা দরকার। সর্বদা তো সম্ভব নয়, সেইজন্য বলছেন, মাঝে মাঝে। কতদিন ঈশ্বর চিন্তা নির্জনে করতে হবে? নিজেই তা বলে দিচ্ছেন, যতদিন পার। দীর্ঘকাল পারলে খুব ভাল, তা যদি না পারা যায় একমাস বা তিনদিন, একদিনও যদি হয় তাও ভাল। কারণ এইসময় মানুষের মনের পরিচয় ঠিক ঠিক মেলে। যতক্ষণ না নির্জনে গিয়ে মানুষ মনের সঙ্গে সংগ্রাম করতে চেষ্টা করে ততক্ষণ পর্যন্ত মনের স্বরূপ, মন যে কিভাবে তাকে বিপথগামী করছে সে বুঝতেই পারে না। অনেকে মনে করে আমি ভগবানের নাম বেশ করতে পারি। করতে পারি বলে মনে করে কিন্তু তার মনের খবর যদি রাখে তাহলে সে বুঝতে পারে যে, এরকম মনে করায় কোন কাজ হবে না। মন যখন বিপথগামী হচ্ছে তাকে টেনে রাখবার সময় বোঝা যায় মনের শক্তি কত।
মন যে কতখানি প্রতিকূল তা সংগ্রাম না করলে মানুষ বুঝতেই পারে না। ঠাকুর দৃষ্টান্ত দিচ্ছেন, ‘যখন কেল্লায় যাচ্ছি, একটুও বুঝ্তে পারি নাই যে গড়ানে রাস্তা দিয়ে যাচ্ছি। কেল্লার ভিতরে গাড়ী পৌঁছলে দেখতে পেলুম কত নীচে এসেছি।’ এইরকম সংসারের পরিবেশের ভিতর থেকে মন আমাদের অজ্ঞাতসারে কত নীচে নেমে যায় সে কথা বুঝতে পারা যায় যদি আমরা উপরের দিকে চেয়ে দেখি। সেই উপরের দিকে চেয়ে দেখবার অবকাশ হয় না যদি না আমরা নির্জনে গিয়ে ভিন্ন পরিবেশে মনকে দেখতে চেষ্টা করি। এজন্য নির্জনে সাধনের কথা ঠাকুর বার বার বলছেন। বলছেন, ‘আর নির্জন না হলে ভগবান্ চিন্তা হয় না। সোনা গলিয়ে গয়না গোড়বো, তা যদি গলাবার সময় পাঁচবার ডাকে, তাহ’লে সোনা গলান কেমন ক’রে হয়?’ খুব একাগ্র না হলে মনকে একদিকে নিবিষ্ট করবার কোন আশা নেই, করতে পারবও না। ‘চাল কাঁড়ছো একলা বসে কাঁড়তে হয়। এক একবার চাল হাতে করে তুলে দেখতে হয়, কেমন সাফ হলো। কাঁড়তে কাঁড়তে যদি পাঁচবার ডাকবে, ভাল কাঁড়া কেমন করে হয়?’ সাধন করতে করতে মাঝে মাঝে মনকে পরীক্ষা করে দেখতে হয় যে কতখানি মনটা ভগবানের দিকে গেল।
স্বামী ভূতেশানন্দের ‘শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত-প্রসঙ্গ’ থেকে