


ওয়াশিংটন: ‘ট্রাম্প ট্যারিফ’ বেআইনি। অসাংবিধানিকভাবে তা আরোপ করা হয়েছিল। ফেব্রুয়ারি মাসে এই রায় দিয়েছিল আমেরিকার সুপ্রিম কোর্ট। যদিও আদালতে ধাক্কা খাওয়ার পরই বেপরোয়া ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়ে দিয়েছিলেন, ফের বর্ধিত হারে কর চাপাবে। সেজন্য বিকল্প রাস্তা খুঁজে বের করবে তাঁর প্রশাসন। মার্কিন প্রেসিডেন্টের সেই মন্তব্য যে শুধু কথার কথা নয়, তার ইঙ্গিত প্রকাশ্যে এসে গেল। ‘অন্যায্য বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডে’র অছিলায় এবার মোট ১৬টি সহযোগী দেশের বিরুদ্ধে তদন্তে নামছে ওয়াশিংটন। এই তালিকায় রয়েছে ভারত, চীন, বাংলাদেশও। তদন্তে ‘দোষী’ প্রমাণিত হলে এই দেশগুলির ঘাড়ে চাপবে বাড়তি করের বোঝা। অর্থাৎ মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট ‘ট্রাম্প ট্যারিফ’ বাতিল করলেও ঘুরপথে ফের চড়া শুল্ক আরোপের ফিকির খুঁজে নিয়েছে আমেরিকা। ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের ৩০১ ধারায় এই তদন্ত শুরু করছে ট্রাম্প প্রশাসন। এর ‘শক্তিতে’ মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধিরা অনৈতিক ও নিয়ম বহির্ভূত বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের জন্য সহযোগী দেশগুলির উপর চড়া শুল্ক আরোপ সহ বিভিন্ন পদক্ষেপ করতে পারেন।
অর্থাৎ, সমীকরণ পরিষ্কার। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যতই ‘মাই ফ্রেন্ড ডোনাল্ড’ বলে বন্ধুত্বের বাঁধনে মার্কিন বরফ গলানোর চেষ্টা করুন না কেন, ট্রাম্প নিজের স্বার্থ ছাড়া কিছুই দেখবেন না। ক’দিন আগে নয়াদিল্লিতে আয়োজিত ‘রাইসিনা ডায়লগে’ আমেরিকার সহকারী বিদেশ সচিবের বক্তব্যই তার ইঙ্গিতবাহী। ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি প্রসঙ্গে তাঁর দাবি ছিল, আমাদের কাছে সর্বাগ্রে আমেরিকার স্বার্থ। আমরা সমাজসেবা করতে আসেনি। দু’দশক আগে চীনকে মাত্রাতিরিক্ত আর্থিক সুবিধা দিয়ে যে ‘ভুল’ আমেরিকা করেছিল, ভারতের ক্ষেত্রে তার পুনরাবৃত্তি করবে না ওয়াশিংটন। কংগ্রেস সহ বিরোধী শিবির ইতিমধ্যেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিরুদ্ধে আমেরিকার কাছে ‘আত্মসমর্পণে’র অভিযোগে সরব। তারই মধ্যে এবার ফের ভারতের উপর ঘুরপথে চড়া শুল্ক আরোপের আশঙ্কা তৈরি হল। তদন্তের এই তালিকায় ভারত, চীন, বাংলাদেশ ছাড়াও রয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, মেক্সিকো, তাইওয়ান, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, কম্বোডিয়া, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া, সুইৎজারল্যান্ড ও নরওয়ে। মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রির জানিয়েছেন, তদন্তের ভিত্তিতে চলতি গ্রীষ্মের মধ্যেই এই দেশগুলির উপর নতুন শুল্ক চাপাতে পারে। কিন্তু সহযোগী দেশগুলির বিরুদ্ধে ‘অন্যায্য বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডে’র অভিযোগ কেন তুলছে ওয়াশিংটন? গ্রিরের সাফাই, এই ১৬টি দেশ নিজেদের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ক্ষমতা এমনভাবে বৃদ্ধি করেছে, ঘরোয়া ও আন্তর্জাতিক চাহিদার সঙ্গে যা সংগতিপূর্ণ নয়। কয়েকটি দেশ তো তাদের রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলিকে ব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ পণ্য অল্প দামে আন্তর্জাতিক বাজারে ছড়িয়ে দিচ্ছে। এখানেই শেষ নয়—আমেরিকার দাবি, পণ্য উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে শ্রমিকদের উপর অন্যায্যভাবে জোরজবরদস্তির অভিযোগ উঠেছে আরও ৬০টি দেশের বিরুদ্ধে। সেই দেশগুলির বিরুদ্ধে একইভাবে তদন্ত শুরু হচ্ছে।
সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে চড়া হারে পালটা শুল্ক বা ‘ট্রাম্প ট্যারিফ’ বাতিল হওয়ার পর ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের ১২২ ধারায় প্রাথমিকভাবে ১০ শতাংশ হারে সাময়িক কর ঘোষণা করেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। সংশ্লিষ্ট আইনের এই ধারার মেয়াদ ১৫০ দিন। ট্রাম্প জানিয়ে রেখেছিলেন, তার আগেই ফের চড়া শুল্ক আরোপের বিকল্প রাস্তা তৈরি হয়ে যাবে। এবার গ্রিরের কথাতেও স্পষ্ট, সেই রাস্তা তারা পেয়ে গিয়েছে—৩০১ ধারায় তদন্ত। ১০ শতাংশ হারে ওই সাময়িক করের মেয়াদ জুলাই মাসে শেষের আগেই তদন্তের প্রক্রিয়া শেষে বর্ধিত কর আরোপের ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়ে যাবে। এবং সেই শর্তও মানতে হবে ‘বন্ধু’ মোদিকে।