


শুভজিৎ অধিকারী, কার্গিল: শেখ রাজাক। বাহাত্তরের বৃদ্ধ। কার্গিল যুদ্ধের সময় বয়স ছিল ৪৬। ওই সময় সেনাদের ক্যাম্পে রেশন ও জল পৌঁছে দিতেন। এখন বেমাথাং বাজারে হরেক সামগ্রীর দোকান চালান। সাকিনা ও মাহিরা-দুজনেই গৃহবধূ। ওই লড়াইয়ের সময় একজনের বয়স ছিল চার, অন্যজনের ছয়। আর যুদ্ধ শেষের বছরে জন্ম শায়েরির। এখন হায়দরাবাদে একটি মেডিক্যাল কলেজের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী। অপারেশন সিন্দুরের প্রথম ক’দিন আশঙ্কার সিঁদুরে মেঘ দেখেছিল রণক্ষেত্র কার্গিলের তিন প্রজন্মই। এই বুঝি পাহাড়ের ওপার থেকে একের পর এক গোলা আছড়ে পড়বে উঠোনে। ঘরবাড়ি ছেড়ে খুঁজতে হবে নিরাপদ কোনও আশ্রয়। মাথার উপর যুদ্ধ বিমানের চক্কর, বেমাথাঙের রাস্তায় ট্যাঙ্কবাহী গাড়ির দাপাদাপি। সে এক ভয়ঙ্কর অবস্থা। সেই অভিশপ্ত দিন আর দেখতে চায় না কার্গিল। তাঁরা একবাক্যে বলছেন, ‘আমাদের সেনাদের কাছে পাকিস্তান কোনওদিনই এঁটে উঠতে পারবে না। আবারও যুদ্ধ হলে জিতব আমরাই। কিন্তু যুদ্ধ মানে তো সেই অস্থিরতা, ভয়াবহতা, সেনা ও সাধারণ মানুষের মৃত্যু। এসব আমরা আর চাই না।’
দোকানের সামনে ১৯৯৯ সালের যুদ্ধের স্মৃতিচারণের মধ্যেই বাইরে এসে আঙুল তুলে দেখিয়ে রাজাক সাহেব বললেন, ‘ওই যে দেখছেন পাহাড়। ওর পিছনে আরও কয়েকটা পাহাড় টপকে গেলে পাকিস্তান। ওই সব পাহাড়ের পিছন থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে গোলা উড়ে এসে পড়ত কার্গিলের গ্রামগুলিতে। আমাদের সেনারাও মোক্ষম জবাব দিত। যুদ্ধের সময় এখানে যে কী হয়েছিল, তা এখনকার শান্ত ও ব্যস্ত বেমাথাংকে দেখে বুঝতে পারবেন না। কী ভয়ঙ্কর থমথমে হয়ে উঠেছিল গোটা এলাকা। এখানকার বাসিন্দাদের নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল সেনা।’
যুদ্ধের সময় ছোট্ট থাকলেও অনেক কিছুই মনে রয়েছে সাকিনার। কার্গিল টুরিজম ডেভেলাপমেন্টে বোর্ডের সুসজ্জিত টিএফসি পার্কে বসে তিনি বললেন, কার্গিলবাসী জানে, দেশের সেনারা সুরক্ষিত মানে আমরা সুরক্ষিত। আবার যুদ্ধ বাঁধলে সেনার পাশেই থাকবে সবাই। কিন্তু এখন যুদ্ধ নয়, উন্নতির সময়।
ডাক্তারি পড়ুয়া শায়েরি বললেন, যুদ্ধের অস্থিরতা সব দিক দিয়েই ক্ষতি করে। কার্গিল যুদ্ধ দেখিনি। মায়ের মুখে শুনেছি। এখন বুঝি যুদ্ধের পরিস্থিতি আমার পড়াশোনায় সময় থাকলে ডাক্তারি পড়া হতো না। সোরূ নদী পাহাড় থেকে নেমে আছাড় খাচ্ছে কার্গিলের বেমাথাং বাজারে। বাম দিকে ধাক্কা খেয়ে চলে যাচ্ছে ডানদিকে। সাড়ে আট কিলোমিটার গিয়ে পড়েছে পাকিস্তানে। এই নদীর উপর ইকবাল ব্রিজ। তার লাগোয়া সেনাবাহিনীর ক্যাম্প। সদ্য অপারেশন সিন্দুরের সময় অস্থিরতার আঁচ পেয়েছিল বেমাথাং...ঘর পোড়া গরু যে....!