


নিজস্ব প্রতিনিধি, ঝাড়গ্ৰাম: ঝাড়গ্রামের কেঁউদি গ্ৰামে সাধক হাড়িরামের কন্যারূপে অধিষ্ঠান করেন দেবী যোগমায়া। জাগ্রত এই দেবীকে ঘিরে ছড়িয়ে রয়েছে নানা কিংবদন্তি। স্থানীয়রা যোগমায়া দেবীর মন্দিরকে উত্তরেশ্বর কালীমন্দির নামেও চেনেন। শাক্ত ও বৈষ্ণব, দুই মতেই দেবীর আরাধনা করা হয়। পুজোর সময় মধ্যরাত থেকে ভোর পর্যন্ত আরাধনা চলে। ভক্তরা এসে হাড়িরামের সাধনস্থলে ফুল দেন।
ঝাড়গ্রামের রাধানগর গ্রাম পঞ্চায়েতে ছোট্ট গ্ৰাম কেঁউদি। শহর থেকে মাইল খানেকের পথ। বাঁশঝোপের মধ্যে দেবীর মন্দির। মৃন্ময়ী চতুর্ভুজার নিত্যপুজো হয়। গত শতকের চল্লিশের দশকে হরিনাম সংকীর্তন গায়ক হাড়িরাম দাসের ঘর আলো করে এক কন্যাসন্তানের জন্ম হয়। কিন্তু দেড় বছর বয়সেই তার মৃত্যু হয়। একমাত্র কন্যাকে হারিয়ে শোকে ভেঙে পড়েন হাড়িরাম। গ্রামের অদূরে শ্মশানে সমাধিস্থ করা হয় শিশুকন্যাকে। মেয়েকে হারানোর শোকে রাত নামলেই শ্মশানে ছুটে যেতেন হাড়িরাম। মাটি সরিয়ে কন্যার দেহ বুকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়তেন। ভোর হওয়ার আগে দেহ মাটি চাপা দিয়ে বাড়ি ফিরে আসতেন। চারদিন এরকম চলার পর পঞ্চম দিনে শ্মশানে দেবী যোগমায়ার দর্শন পান হাড়িরাম। দেবী যোগমায়া তাঁকে আশ্বস্ত করে বলেন, কন্যা হারানোর শোক তাকেআর বহন করতে হবে না। তিনিই কন্যারূপে তাঁর কাছে আজীবন থাকবেন। দেবীর নির্দেশে হাড়িরাম বাড়ির উঠোনে বেলগাছের তলায় পঞ্চমুন্ডির আসন প্রতিষ্ঠা করে তন্ত্র সাধনায় বসেন। সেই সময় তাঁর সঙ্গী হয় দূর থেকে আসা তিন তান্ত্রিক। অমাবস্যার এক রাতে হাড়িরামের সিদ্ধিলাভ হয়। কীর্তন গায়ক থেকে হাড়িরাম হয়ে ওঠেন সাধক। কেঁউদির সাধনস্থল হয়ে ওঠে পুণ্যভূমি। তন্ত্র সাধনায় দীক্ষিত হাড়িরাম শাক্ত ও বৈষ্ণব ভাবধারার সমন্বয় করেন। তাঁর পুজোর মন্ত্র ছিল, ‘হরে কৃষ্ণ হরে রাম, কালী কৃষ্ণ রাম রাম’। বর্তমানে হাড়িরামের ছেলে শিশির দাস মন্দিরের সেবাইতের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। তিনি বলেন, কন্যাকে হারানোর পর বাবার জীবনে বড় পরিবর্তন এসেছিল। দিশেহারা হয়ে পড়েছিলেন। তখনই দেবীর দর্শন পেয়েছিলেন। দেবীর নির্দেশে পুজো শুরু করেন। প্রথমে এখানে খড়ের ছাউনির মাটির মন্দির ছিল। পরবর্তী সময়ে ভক্তরা পাকা মন্দির তৈরি করে দেয়। পুজোর রীতি ও প্রথায় কোনো পরিবর্তন হয়নি। এবার পুজোর প্রস্তুতি শুরু হয়ে গিয়েছে। ভক্তরা দূরদূরান্ত থেকে এবারও পুজো দিতে আসবেন। ঝাড়গ্রাম শহরের বাসিন্দা প্রণব মণ্ডল বলেন, সাধক হাড়িরামের সাধনা ও সিদ্ধিলাভ নিয়ে জঙ্গলমহলে নানা কিংবদন্তি ছড়িয়ে আছে। তাঁর সাধনস্থল দেখতে ভক্তরা আসেন। কালীপুজোর সময় পরিবারের সদস্যদের নিয়ে প্রতিবার যোগমায়ার মন্দিরে পুজো দিতে যাই। হাড়িরামের সাধনস্থলে ফুল দিই। দেবীর কাছে প্রার্থনা করলে মনস্কামনা পূরণ হয়।-নিজস্ব চিত্র