


ব্যাংকক ও নেপি দ: না, যুদ্ধ-বিধ্বস্ত গাজা বা খারকিভের কোনও রাস্তা নয়। কিন্তু ভিডিও দেখে মনে হবে বুঝি মিসাইল আছড়ে পড়েছে! হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ছে আস্ত বহুতল। চারদিকে ধুলোর মেঘ... আর্তনাদ... ছুটোছুটি। আর মৃত্যুমিছিল। শুক্রবার ভরদুপুরে ভয়াবহ ভূমিকম্পে তছনছ মায়ানমার ও প্রতিবেশী দেশ থাইল্যান্ডের বিস্তীর্ণ অঞ্চল। এখনও পর্যন্ত দুই দেশ মিলিয়ে ১৬৭ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গিয়েছে। যদিও মার্কিন দাবি, ইতিমধ্যেই মৃতের সংখ্যা কয়েক হাজার ছাড়িয়ে গিয়েছে। ধ্বংসস্তূপের তলায় চাপা পড়ে রয়েছে অসংখ্য মানুষ।
স্থানীয় সময় তখন দুপুর ১২টা ৫০ মিনিট। আর পাঁচটা দিনের মতোই কাজকর্মের ব্যস্ততা ছিল তুঙ্গে। তারই মধ্যে হঠাৎ ভয়াবহ কম্পন। আমেরিকার জিওলজিক্যাল সার্ভে ও জার্মানির জিএফজেড সেন্টার ফর জিওসায়েন্সেস জানিয়েছে, রিখটার স্কেলে কম্পনের তীব্রতা ছিল ৭.৭ মাত্রার। উৎসস্থল মায়ানমারের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মান্দালয়ের কাছে। ভূপৃষ্ঠ থেকে ১০ কিলোমিটার গভীরে। সেই কম্পনের ধাক্কা সামলে ওঠার আগেই গোদের উপর বিষফোঁড়ার মতো ৬.৪ তীব্রতার আফটার শক। এরপর আরও চারটি কম্পন। বাড়ি-ঘর, রাস্তা, সেতু, হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয়, মসজিদ, প্যাগোডা কোনও কিছুই ধারাবাহিক কম্পনের অভিঘাত থেকে রক্ষা পায়নি। ভেঙে পড়ছে ইরাবতী নদীর উপর ব্রিটিশ আমলে তৈরি ৯১ বছরের পুরনো আভা সেতু। মান্দালয়ে নামাজ চলাকালীন ধসে পড়ে মসজিদ। রেহাই পায়নি সেখানের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ও। দু’জায়গাতে বহু মানুষের প্রাণহানির আশঙ্কা করা হচ্ছে। থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে একটি নির্মীয়মাণ আকাশচুম্বী বহুতল হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ার দৃশ্যও এদিন দুপুর থেকে ছড়িয়ে পড়ে সোশ্যাল মিডিয়ায়। সেখানে ধ্বংসস্তূপের নীচে ৮০ জনেরও বেশি মানুষ আটকে রয়েছেন বলে আশঙ্কা। কম্পন এতটাই শক্তিশালী ছিল যে সুদূর চীন, ভিয়েতনাম, বাংলাদেশের ঢাকা, চট্টগ্রাম এমনকী ভারতে মণিপুর ও কলকাতাতে তা অনুভূত হয় বলে খবর। বসিরহাট সহ সুন্দরবন এলাকাও বাদ যায়নি। ভূমিকম্প বিধ্বস্ত মায়ানমার ও থাইল্যান্ডকে সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।
এমনিতেই গৃহযুদ্ধে রক্তাক্ত মায়ানমার। তার মধ্যে ভয়াবহ কম্পনের ধাক্কা। সেই কারণে শেষপর্যন্ত নজিরবিহীনভাবে আন্তর্জাতিক সাহায্যের আর্জি জানিয়েছে সেদেশের সেনাবাহিনী পরিচালিত জুন্টা সরকার। মান্দালয় সহ ছ’টি অঞ্চল ও প্রদেশে জরুরি অবস্থা জারি করেছে তারা। যদিও সর্বত্র বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় বিধ্বস্ত বহু অঞ্চলে ত্রাণ আদৌ পৌঁছে দেওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে সংশয় চরমে। রেড ক্রসের দাবি, মান্দালয়, সাগাইং ও দক্ষিণের শান প্রদেশে ক্ষতিগ্রস্তদের কাছে প্রয়োজনীয় সাহায্য নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চলছে। মায়ানমারের রাজধানী নেপি দতে একটি বড় হাসপাতালও এখন ধ্বংসস্তূপ। অগত্যা হাসপাতালের বাইরেই সার দিয়ে বেড রেখে কোনওক্রমে চিকিৎসার কাজ শুরু করা হয়। বহু জখমের স্থান হয় মাটিতে। দেশজুড়ে রক্তের আকাল দেখা গিয়েছে। জুন্টা প্রধান মিন আউং লাইংও হাসপাতাল পরিদর্শন করেন। এক চিকিৎসকের কথায়, ‘আগে কোনওদিন এমন ভয়াবহ দৃশ্য দেখিনি। আমরা পরিস্থিতি সামলানোর আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছি। রীতিমতো বিধ্বস্ত লাগছে।’ মান্দালয় এবং নেপি দ’তে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে শহরের বিমানবন্দরও।
ভয়াবহ কম্পনের জেরে ব্যাংককের বিভিন্ন বহুতল থেকে আতঙ্কে রাস্তায় নেমে আসতে শুরু করেন সাধারণ মানুষ। পরপর আফটার শক চলায় প্রশাসনের তরফে তাঁদের বাড়ির বাইরেই থাকার আর্জি জানানো হয়। বন্ধ করে দেওয়া হয় র্যাপিড ট্রানজিট সিস্টেম ও সাবওয়ে। স্যুইমিং পুলগুলির জলে রীতিমতো ঢেউ খেলতে শুরু করে। রাস্তাগুলিতে চওড়া ফাটল তৈরি হয়। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত সেখানে ১০ জনের মৃত্যুর খবর মিলেছে।