


কলহার মুখোপাধ্যায়, কলকাতা: ভক্তের ঘরে যে ধন আছে, কালীর ঘরেও সে ধন আছে। হোন না পাষাণ, অনড়, অচলা। সেই পাষাণ মূর্তিরও আছে ভূসম্পত্তি। রয়েছে প্যান কার্ড। উত্তর কলকাতার কাশীপুরের কৃপাময়ী দক্ষিণাকালীর নামে রয়েছে কার্ড।
বামনদাস মুখোপাধ্যায়কে বলা হতো ‘কালো হীরার রাজা’। কয়লাখনির মালিক ছিলেন। কাশীপুরে তাঁর বাড়িটি দেখার মতো। বাড়ি ঠিক নয়, অট্টালিকা। কলকাতার মধ্যে অত বড়ো ইমারত বাস্তবিকই চোখ কপালে তুলে দেয়। সাদা-সোনালি-হলুদ রং। বিশাল সিংহদরজা। পুষ্করিণী। ঠাকুরদালান। সবটাই ছড়িয়ে ৩৫ বিঘা জায়গায়। ১৮৯৪ খ্রিস্টাব্দে জন হার্ট নামে এক ব্রিটিশ অ্যাটর্নির থেকে জায়গাটি কিনেছিলেন বামনদাস। তারপর বাড়ি-মন্দির তৈরি করতে ইংল্যোন্ডের বার্মিংহাম থেকে লোহা আনালেন। ইতালি থেকে আনালেন মার্বেল। মায়ানমার থেকে কাঠ।
কাশীপুর রোডের উপর মন্দিরের সবুজ রঙের ভারী কাঠের দরজা ভেজানো থাকে। খিলানে পঙ্খের কাজ। সদর দিয়ে ঢুকলে চকমিলানো উঠোন। নবরত্ন কালীমন্দির। তার চূড়া আকাশে ঠেকে। বার্মিংহাম থেকে আনা লোহার স্তম্ভ গুচ্ছবেঁধে ভার ধরে রেখেছে। মন্দিরের মার্বেল ইতালির। সম্পত্তি গ্রেড ওয়ান হেরিটেজ। কলকাতার বহু হেরিটেজের রক্ষণাবেক্ষণ সেভাবে হয় না। তবে এটি সেরকম নয়। সযত্নে রক্ষিত সবকিছু। কৃপাময়ীর অধিষ্ঠান মন্দিরের ঠিক মাঝ মধ্যিখানে। ডানদিকে দুর্গেশ্বর, বাঁদিকে ক্ষেত্রেশ্বর শিব। তাঁদের নামেও আছে প্যান কার্ড। বস্তুত এই তিন দেবতা বামনদাসের সম্পত্তির মালিক। তাঁদের নামেই ট্রাস্ট—‘কৃপাময়ী, দুর্গেশ্বর, ক্ষেত্রেশ্বর ট্রাস্টি’। বাড়ির দেওয়ালে পাথরের ফলক। লেখা, ‘রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কলকাতা, বর্দ্ধমান, হুগলী ও যশোহর জেলার কয়েকটি সম্পত্তি দেবতার নামে অর্পণ করেন ও ১৯০৯ খৃঃ ট্রাস্ট গঠন করেন...।’ বামনদাসের প্রপৌত্র অসীমকুমার মুখোপাধ্যায়ের প্রয়াণ ঘটে ২০১৮ সালে। তিনি ছিলেন ব্যবস্থাপনা ট্রাস্টি। ‘বর্তমান’-এর প্রতিবেদককে তিনি একসময় বলেছিলেন, ‘ঠাকুরের নামে প্যান কার্ডও আছে।’
বিভিন্ন সূত্র মারফত জানা যায়, বামনদাস স্বপ্নাদেশ পেয়ে বেলুড় রাসবাড়িতে গিয়ে একটি কষ্টিপাথরের চাঁই খুঁজে বের করেন। পাথর ভেঙে তৈরি করান স্বপ্নে দেখা চতুর্ভুজা দক্ষিণা কালী। এবং বাবা ও মা, অর্থাৎ দুর্গাদাস ও ক্ষেত্রময়ীর নামানুসারে দুর্গেশ্বর ও ক্ষেত্রেশ্বর নামে দু’টি শিবলিঙ্গ গড়ান। বর্তমান পুরোহিত শুভাশিস চক্রবর্তী জানান, হালখাতা থেকে শুরু করে দুর্গা—সব পুজো হয় মন্দিরে। বিশেষ পুজো কালীপুজোর অমাবস্যায়। ভাত, খিচুড়ি, ডাল, শুক্তো-ভাজা বেগুনি, চচ্চড়ি, ফুলকপির তরকারি, দই, মিষ্টি ভোগ দেওয়ার রীতি। ঠাকুরকে বড়ি ভাজা দিতে হয়। বড়ি বানান বাড়িরই প্রবীণ মহিলা। এ বাড়িতে এসেছিলেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু। এখানে ছবি বিশ্বাস সিনেমার শ্যুটিং করে গিয়েছেন।
কাশীপুর রোড গঙ্গার সমান্তরাল। নদীর হাওয়া বামনদাসের বাড়ির গম্বুজের ফাঁক দিয়ে যাওয়া আসা করে। কালীপুজোর সময় সে হাওয়ায় শীত শীত ভাব। এখন বাড়িতে নহবত বসে না। গঙ্গার হাওয়ায় অতটা শীতও নেই। তবে কৃপাময়ীর প্রতি শতাধিক বছরের ভক্তি এখনও একই রয়ে গিয়েছে মানুষের। ওই ফুটপাত দিয়ে হাঁটলে বন্ধ দরজায় মাথা ঠেকিয়ে যায় পাড়ার লোক। একবার বিনা মেঘে বৃষ্টি নেমেছিল। ফুটের রোয়াকে বসা লোকজন দৌড়ে উঠে গিয়েছিলেন। তারপর হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ে বাড়ির কার্নিশ। ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি। কিন্তু কেউ মারা যায়নি। পাড়ার লোকে জানে, ভক্তদের বাঁচাতে কৃপাময়ীর আদেশেই নেমেছিল বৃষ্টি। -নিজস্ব চিত্র