


রূপক বর্ধন রায়: একটা বইয়ের গল্প বলি। নিস শহরের ১২৫ বছর বয়সি পুরনো বইয়ের যে বিরাট দোকানটায় (ছোট বাজারও বলা চলে) আমার রোজ যাতায়াত, তার নাম ‘আ লা সোরবোন—ব্রুইলোঁ দু কুলচুর’। বাংলা আক্ষরিক অনুবাদ, ‘সোরবোনে অবস্থিত সংস্কৃতির খসড়া’। ফিলিপ আমার বন্ধু। পুরনো বইয়ের দোকানের কিউরেটর। ফরাসি ভাষায় যখন আমার দাঁত বসানোর পালা সবে শুরু হয়েছে, তখন ইচ্ছে থাকলেও বেশিরভাগ দোকানের মধ্যযুগীয় বইপত্র ছুঁতে পারতাম না। ফিলিপ তখন আমায় বেসমেন্টের এক কোণে ইংরেজি বইয়ের সেকশনে বসতে দিয়েছিল। সেখানেই ১৯০২ সালে লন্ডনের স্যান্ডস অ্যান্ড কোম্পানি থেকে প্রকাশিত হ্যারিয়েট বিচার স্টোয়ের বিখ্যাত উপন্যাস ‘আংকল টম’স কেবিন’ বইটির প্রাপ্তিযোগ ঘটে।
সোরবোনের ওই কোণে সেদিন ঘণ্টাতিনেক যেন এক টাইম মেশিনে চড়ে বসেছিলাম আমি। চামড়া ও রেক্সিন মেশানো বাঁধাইয়ের উপর সোনার জলে খোদাই করা প্রচ্ছদ। সেটা উল্টোতেই বিস্ময়! অপূর্ব ক্যালিগ্রাফির মতো হাতে লেখা দুটো লাইন...
‘Walerton P. School
Second Prize awarded to
Catherine H. Smith
July 1906’
বছর পঁচিশ আগেও পরীক্ষায় দারুণ ফল করলে স্কুলের আন্টিরা ভালোবেসে বই উপহার দিতেন। মধ্যবয়স্ক বাঙালির কাছে এ লেখা তাই এক সময়াবর্তন। কত যত্নেই না ব্রিটেনের (খুব সম্ভবত ওয়েকফিল্ড) কোনও এক ছোট্ট ক্যাথেরিনের জন্য কথাগুলো লিখে দিয়েছিলেন হয়তো স্কুলের দিদিমণিই। বইয়ের ওই একটা পাতা ঘণ্টাখানেকের জন্য বিশ্বযুদ্ধ-পূর্ব পৃথিবীতে নিয়ে গিয়েছিল আমায়। কারণ, লেখাটির ঠিক পাঁচ বছর পর প্রথমবার (ইতালি-তুর্কি যুদ্ধ) আকাশপথে বোমা ফেলে একইসঙ্গে অনেক মানুষ মারতে শিখেছিল এ দুনিয়া। আমি বইয়ের পাতা উল্টে চলি। সে সময়ের মুদ্রণ-শিল্প, আঠার ব্যবহার বোঝা যায়, ছবি-অলংকরণের জন্য ব্যবহৃত আলাদা প্লেট খুলে আসে—একটা শিল্পের সাময়িক বিবর্তন যেন সামনে ভেসে ওঠে। বিজ্ঞান ও সাহিত্য যেখানে হাতে হাত ধরে চলে। চোখে পড়ে, কোনও কোনও পাতার উপর বা নীচের কোণায় খানিকটা করে পাতার অংশ একে অপরের গায়ে সেঁটে রয়েছে। বুঝি, দু’-দুটো বিশ্বযুদ্ধ সামলে বেঁচে থাকা বইটা ভারী কিছুর নীচে অনেকদিন পড়ে ছিল কোথাও। একেবারে শেষ পৃষ্ঠায় পাই ‘সিক্সটি মিনিট ক্লিনার লিমিটেড’ নামক এক ধোপা-কারখানার ছাপানো একটা পেজমার্ক। তাতে ‘সোনিক’ পদ্ধতিতে জামাকাপড় ধোয়ানোর কথা বলা। এও এক টাইম-স্ট্যাম্প। আজকের ব্রিটেনে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই ধরনের নানা আধুনিক ধোপা-কারখানা ফুলে-ফেঁপে ওঠে। যুদ্ধ বিজয়ের পর নতুন পৃথিবীতে পোশাকে-আশাকে ধোপদুরস্ত সাহেবদের পড়াশোনার প্রতি ভালোবাসাকে যে এই লন্ড্রি-সার্ভিসগুলো বেশ সমীহের চোখে দেখতো এবং খদ্দের ধরে রাখার জন্যই যে এই পেজমার্ক, সে কথাও স্পষ্ট হয়। আমি আরেকটু খোঁজ করি। হ্যা ঠিক! ১৯৫১ সালের মার্চ মাসের স্কটল্যান্ডের ডানফেরমলাইন কমিউনের ‘সিক্সটি মিনিট ক্লিনার লিমিটেড’ লেটারহেডের একটা বিল হাতে আসে। ধারণা পোক্ত হয়। যাই হোক, ১৯৫১ সালেও বইটার শেষ পাতায় মানব-স্পর্শের সুস্পষ্ট প্রমাণ মিলেছে। এরপর? এরপর একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে, নিস শহরে, ফ্রান্সের দক্ষিণে সে বই এখন এই মধ্যবয়সি বাঙালির বইয়ের আলমারি আলো করে আছে। বিগত বেশ কয়েক শতাব্দী জুড়ে ইংরেজ ও স্কটিশরা গ্রীষ্ম ও রোদের লোভে প্রায়ই দক্ষিণ ফ্রান্সে চলে আসেন। কাজেই ক্যাথেরিনেরই কোনও সাংস্কৃতিক উত্তরসূরির হাতে বইটির এদিকে চলে আসা মোটেই অস্বাভাবিক নয়।
এই একখানা বই নিয়ে আপনাদের কেন বিরক্ত করলাম, এবার সে কথায় আসি। আসলে নিজের গবেষণার বাইরে দুটো সময় জুড়ে আমার দুটো সাংস্কৃতিক জীবন। প্রথমটির উৎস ২০১১-১২ পূর্ববর্তী কলকাতার পুরনো বইপত্রের দোকানপাট। মূলত কলেজ স্ট্রিট এবং গোলপার্কের ফুটপাত। আর দ্বিতীয়টি বিগত ১২ বছর যাবৎ তুরস্ক, ব্রিটেন, জার্মানি, ফ্রান্স এবং সেভাবে বললে ইউরোপের বিস্তীর্ণ রাস্তায়। যেখানে দেখেছি ছাই, উড়িয়ে দেখেছি তাই... আর মিলেছে অমূল্য রতন! সে কলকাতার রাস্তায় খুঁজে পাওয়া সমকামিতার ইতিহাসের সব থেকে পুরনো বইটা বা ক্যাথেরিনের ‘আংকেল টম’স কেবিন’। যা আমাকে বুঝিয়েছে উপর উপর যাই হয়ে চলুক, শয়ে শয়ে মানুষ সংস্কৃতির ইতিহাস দিয়ে যুদ্ধ ও হিংসার সাময়িক ঘা’গুলোকে ভরে তোলার নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
যেমন ধরুন ইস্তানবুল। পিএইচডি জীবনের ছ’টা বছরে হয়ে ওঠা আমার আরেক বাড়ি। কাদিকয়, অর্থাৎ এশিয়ার দিকের যে মধ্যাঞ্চল, তার একদিকে গাঢ় নীল মারমারা সাগর আর অন্যদিকে শশব্যস্ত পুরনো ইস্তানবুল। কাঁচাবাজার, ব্যাংক, কাফে, ফেরিঘাট, বাসস্ট্যান্ড, ট্রামলাইন। কাদিকয় মোড় থেকে তিন-চারটে গলি পেরিয়ে একটু ভিতরে ঢুকে গেলেই একটা অন্য জগত— ‘আকমার পাসাজি’। ১৯ শতকের শেষাশেষি তৈরি হওয়া পুরনো বইপত্রের বাজার। এ এমন জগৎ যেখানে একরাশ ওটোম্যান বইপত্র, নথি, ‘সহাফলার শেখ’ নামের সঙ্গে জড়িত বই নিলামের কিংবদন্তি, ১৯ শতকে প্রথম ওটোমান মুদ্রণ প্রেস চালু করা ইব্রাহিম মুতেফেরিকারার স্মৃতিতে তৈরি শুধুমাত্র মুদ্রণ শিল্প সম্বন্ধীয় গ্রন্থ, বিজ্ঞান বিপণী ছাড়িয়েও বড় হয়ে ওঠে ইতিহাসচেতনা ও সংরক্ষণশীলতার মানবিক মুখ। এখানেই আমায় ডেকে দোকানে বসে চা-সিমিত খাইয়ে জনৈক ওনুর বে হাতে তুলে দিয়েছিলেন ১৯০৬ সালে নিউইয়র্ক থেকে পুনঃপ্রকাশিত ‘লাস্ট অফ দা মোহিকান’। হাসতে-হাসতে বলেছিলেন, ‘আমাদের দুই দেশের সংস্কৃতিতে ও খাবারে তেল-মশলার কেমিস্ট্রি হাজার হাজার বছর ধরে প্রায় এক, অথচ এরা মাত্র এক হাজার বছরের ধর্মীয় ইতিহাসের দিকে তাকিয়ে রয়েছে!’ ওনুর বে আমার সুহৃদ। ইস্তানবুলের পর এক বছরের ঠাঁই হল পূর্ব জার্মানির ড্রেসডেন। নিয়মিত যেতে না পারলেও নয়েশস্টাডের মার্কটহালে, এলবেফ্লোহমার্কট (এলবে নদীর তীরে), হাউস ডার প্রেসে ফ্লোহমার্কট, বা বুখটেডিতে দিব্যি গোলপার্কের আমিকে খুঁজে পেতাম পুরনো বইপত্রের ভিড়ে। এরপর ফ্রান্সের নিস শহর, যার হাইকোর্ট চত্বরে প্রত্যেক দু’হপ্তা অন্তর বসা ফ্লি-মার্কেট আমার বিচরণভূমি। সেখানে জাভিয়ে আমার বন্ধু। বিগত ৪০ বছর ধরে ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে পুরনো বইপত্র বিক্রি করছেন। এটাই ওঁর পেশা। ওঁর কাছেই প্রথম প্যারিসের ‘বুকেনিস্ট’দের গল্প শুনেছিলাম; পরে নিজে গিয়ে আড্ডাও দিয়েছি। কিন্তু কারা এই ‘বুকেনিস্ট’? ১৭ শতকে ভ্রাম্যমাণ কিছু বইবিক্রেতা মাঝেমধ্যে পুরনো বইপত্র সবুজ বাক্সে ভরে বিক্রি করতে আসতেন প্যারিসের সেঁই (Seine) নদীর ধারে। ১৮৫৯ সালে প্যারিস শহর তাদের স্থায়ীভাবে বিক্রির অনুমতি দেয়। প্রায় ২৩০ জন ‘বুকেনিস্ট’ এবং প্রায় ৯০০ বাক্স নিয়ে সেঁই নদীর তীর আজ বিশ্বের বৃহত্তম মুক্ত আকাশের বইবাজার। শোনা যায়, ‘বুকেনিস্ট’দের বাক্সে ভিক্টর হুগোর নিজের হাতে লেখা পাণ্ডুলিপি পাওয়া যেত, এবং তিনি নিজেও ওদের আইনি স্বীকৃতির জন্য প্রচার করেছিলেন। এও বলা হয় যে, ‘লা মিজারেবল’-এর প্রাথমিক সংস্করণ নাকি জনসমক্ষে আসে ‘বুকেনিস্ট’দের মাধ্যমে। তাছাড়া ক্ষমতার বিরদ্ধে মানবতার লড়াইয়ের ইতিহাসেও তাদের নিত্য আনাগোনা। ফরাসি বিপ্লব এবং পরবর্তীকালে অর্থাৎ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় প্রতিরোধ আন্দোলনের অংশ হয়ে গোপন বার্তা ও নিষিদ্ধ লেখালেখি বিতরণের ক্ষেত্রে ‘বুকেনিস্ট’দের সাহায্যের অন্ত ছিল না। ২০২১ সালে ইউনেস্কো তাদের ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ স্বীকৃতি দেয়। আমার বন্ধু জাভিয়ে ৪০ বছর আগে প্যারিসের এক ‘বুকেনিস্টে’র শাগরেদ ছিলেন। তারপর নিজের বাক্স, মার্সেই, এবং শেষে বিগত পনেরো বছর ধরে নিসের পাক্ষিক বাজারে ও অনলাইনে পুরনো কাগজপত্র, বই বিক্রি করেন। ১৯ শতকের খবরের কাগজ, প্রথম অতলান্ত বিমানযাত্রার খবরের কাটিং, নেহরুর ছবি সহ আমাদের দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের খবরের পৃষ্ঠা, ১৯৩২ সালের বিখ্যাত অলংকরণ শিল্পীর সই সমেত তাঁর বই, আধুনিক সিনেমা মক্কার পত্রিকা ‘কাহিয়ে দু সিনেমা’ র প্রথম দু’বছরের ৫১টা কপি—এ সমস্ত কিছু জাভিয়ে আমায় এনে দিয়েছেন। আজকাল বয়স হয়েছে তাই প্রতি মাসে আসতে পারেন না। কিন্তু তাতে বিক্রি কমেনি। কারণ, অনলাইনে পুরনো বই কেনার খদ্দের বাড়ছে।
এত কথার মধ্যে মনোজিতের কথা ভুলি কীভাবে? ফেসবুকে আলাপ। মনোজিত আমারই মত মফস্সলের ছেলে। মাস্টারমশাই পুরনো বইপত্রের নেশা মাথায় ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন, তারপর থেকে বছর বারো হল কলেজ স্ট্রিট ঘুরে ঘুরে পুরনো বই কেনার নেশা মেটাবে বলে কিছু কিছু করে বিক্রি করে। জাভিয়ের মতো কলকাতার মনোজিত বা নামকরা ভিন্টেজ বুকসের কর্ণধার আদিত্যবাবুরও একই বক্তব্য। সময়ের অভাবে হাতে নেড়ে-ঘেঁটে বই কেনার লোক কমে গেলেও অনলাইনে খদ্দের দিনকে দিন বাড়ছে। মনোজিতের কথায়, পোস্ট করার সুবিধা থাকায় আজকাল আবার পুরনো দিনের মতো কলকাতা থেকে বিদেশেও বই পাঠানোয় হ্যাপা অনেক কম। আদিত্যবাবু কর্মঠ মানুষ। ১৯৮৭ সালে বইমেলায় ‘পুথিপুস্তক’ দোকানে প্রথম পুরনো বইপত্র নিয়ে কাজ শুরু করেন। ধীরে ধীরে সে নেশায় বুঁদ হয়ে নব্বইয়ের শুরুতে জুট মিলের চাকরি ছেড়ে নিজের মতো করে ব্যবসা শুরু। কলকাতা তথা রাজ্যের বিভিন্ন পুরনো বাড়ির বইয়ের তাকে অবনীন্দ্রনাথ ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নিজের হাতে সই করা বই আবিষ্কারের গল্প বলার সময় গলা কাঁপে। দেশের মধ্যে নানান জায়গায় পুরনো বই পৌঁছে দেওয়া থেকে শুরু হওয়া কারবার আস্তে আস্তে জাপান, আমেরিকা সহ বিশ্বের তাবড় দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। মনোজিত, আদিত্যদের মতো সকলেরই মনন জুড়ে বাঙালি সংস্কৃতি ও নান্দনিকতার এক রাজপুত্র আছেন। তাঁর নাম ইন্দ্রনাথ মজুমদারের। ‘কে ইন্দ্রনাথ?’ যদি কারও মনে এ প্রশ্ন আসে, তাঁদের বলি—
‘...মধ্যরাতে যে সমস্ত যুবকের কলকাতা শাসন করার কথা শক্তির কবিতায় দেখতে পাই, তারা তিনজন নাকি শক্তি, সুনীল এবং ইন্দ্রনাথ।’ এবং যার ‘...ইতিহাস জ্ঞানে মুগ্ধ হয়ে বেলাল চৌধুরী তার নাম রেখেছিলেন ‘প্রফ’, অর্থাৎ প্রফেসার।’
ছ’ ও সাতের দশকের বাঙালি বুদ্ধিজীবীতার তথাকথিত শেষ তরঙ্গে দিনগুলোয়, কলেজ স্ট্রিটের ‘কথাশিল্পের’ আড্ডায়, ‘এক্ষণ’ পত্রিকা গোষ্ঠীর সত্যজিৎ-সৌমিত্র-নির্মাল্যবাবুদের বৃত্তে যাঁর বৌদ্ধিক ও আক্ষরিক উপস্থিতি যেমন কিংবদন্তিতুল্য তেমনই বোহেমিয়ান! কমলকুমার মজুমদারের চিরসুহৃদ ইন্দ্রনাথের ‘সুবর্ণরেখা’ আক্ষরিক অর্থেই আধুনিক বাঙালি সংরক্ষণশীলতার আঁতুরঘর। আজ যে উত্তরাধুনিক ইতিহাসচেতনার কথা ঠুকে ঠুকে মধ্যবিত্ত বাঙালি মেধায় ঢোকানো দরকার, বিক্রি হতে চলা অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নিজস্ব লাইব্রেরির বইগুলো কিনে প্রায় জলের দামে সঠিক হাতে পৌছে দিয়ে সাতের দশকে ইন্দ্রনাথ তারই একটা চেষ্টা শুরু করেছিলেন বলা চলে। এরপর বাকিটা ইতিহাস। ইন্দ্রনাথবাবুর নিজের কথায়, সাতের দশকে পুরনো বাংলা বইয়ের গোল্ডমাইন কলকাতা তথা পশ্চিমবঙ্গ থেকে সারা বিশ্বে পাঠানো হতো- এবং তার অনেকটাই করতেন তিনি নিজে। কলকাতা ও পরে শান্তিনিকেতনেও গড়ে ওঠা ‘সুবর্ণরেখা’-র গল্পগুলো একাধিক অর্থেই ইতিহাসাবৃত এবং রোমহর্ষক। সে বিষয়ে ২০০৭ সালের ‘ধ্রুবপদ’ পত্রিকায় মনোজিতের মাষ্টারমশাই দেবাঙ্গন বসুর দীর্ঘ লেখাটা পড়ে ফেলতে পারেন। তাছাড়া ‘কথাশিল্পে’র আড্ডার প্রসঙ্গে আশীষদা (লাহিড়ী) ইন্দ্রবাবুর কাছ থেকেই পাওয়া ‘চেম্বার্স বায়োগ্রাফি অফ সায়েন্সেস’ বইটার উল্লেখ করে একই কথা বললেন, যার যে বইটা দরকার উনি তাকেই সে বইটা দিতেন। ইন্দ্রনাথবাবু চলে গিয়েছেন, ‘সুবর্ণরেখা’ কোনওক্রমে ছেলেদের হাতে টিকে আছে। তবে ইস্তানবুলের ওনুর বে, নিসের ফিলিপ ও জাভিয়ে এবং কলকাতা তথা শান্তিনিকেতনের ইন্দ্রনাথ যে এক এবং অভিন্ন... সেকথা এ পৃথিবীর সংস্কৃতি চেতনায় স্বগর্বে টিকে আছে, থাকবেও।
যে বইয়ের গল্প দিয়ে শুরু করেছিলাম, আবার সে কথায় ফিরি। একশো কুড়ি বছরেরও বেশি বয়সি বইটা সাহিত্যোর্ধ্ব হয়েছে বহুদিন। এখন সে একটুকরো ইতিহাস। আজকের পৃথিবীতে সংরক্ষণ প্রবণতার গুরুত্ব কতটা, তার দলিলও বটে। নাৎসি-দৌরাত্ম্যের বছরগুলোয় ইউরোপের সর্বত্র প্রায় রোজ যেখানে বই-পুঁথি-নথি পোড়ানো চলছিল, সেই সময়কালেই ব্রিটেনের কোনও কোনায় যত্নে বা অযত্নে বেঁচে ছিল ক্যাথেরিনের ছোটোবেলার ‘আংকেল টম’স কেবিন’। তার সাত দশক পর থেকে বইটির সঙ্গে আমার সহযাত্রা। ক্যাথেরিনের মতো আমি চলে গেলে হিয়া-রূষার কাছে থাকবে অথবা আবারও অন্যত্র যাবে সে। কলকাতার আড্ডাগুলোয় আজকাল একটা কথা ওঠে। আমরা নাকি বই পড়ি না, আমরা বই কিনিনা, বইয়ের ব্যবসা উঠে যাবে, ইত্যাদি। ব্যাপারটা গপ্পো! বিগত ৫ বছরে দেশ বিদেশের অন্তত ২০ থেকে ৩০ জন পুরনো বই বিক্রেতার সঙ্গে আমি নিজে কথা বলেছি। সকলেই একই কথা বলেছেন, পুরনো বই কেনার চল বাড়ছে।
• গ্রাফিক্স : সোমনাথ পাল
• সহযোগিতায় : বিশ্বজিৎ চক্রবর্তী