


ওয়াশিংটন: স্রষ্টাকে ক্রমে ছাপিয়ে যাচ্ছে সৃষ্টি। আর একসময় সে ছারখার করে দিচ্ছে গোটা দুনিয়া। দক্ষিণী সুপারস্টার রজনীকান্তের ‘রোবট’ সিনেমার মতো বাস্তবেও যেন সেই পথে এগচ্ছে এআই তথা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। শুরুতে তা ছিল নিছক বিনোদনের রসদ। বর্তমানে খুদের হোমওয়ার্ক, মজার ছবি-ভিডিয়ো তৈরি থেকে শুরু করে অফিসের জটিল রিপোর্ট তৈরি বা গবেষণা সহ নানা কঠিন কাজে মুশকিল আসান হয়ে উঠেছে এআই। এমনকি সাইবার অপরাধ কিংবা নাশকতার ছক বানাতেও প্রয়োজন হচ্ছে একটু ঠিকঠাক কোডিং আর কমান্ড। ব্যস, এক ক্লিকে খেল খতম। কিন্তু এরপর কী? এনিয়ে ইতিমধ্যে অশনি সংকেত দিয়েছেন গুগল সহ একাধিক আন্তর্জাতিক সংস্থার কর্মকর্তারা। এবার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বাড়বাড়ন্ত নিয়ে রক্ত হিম করা হুঁশিয়ারি দিলেন আমেরিকা তথা বিশ্বের শীর্ষ এআই সংস্থা অ্যানথ্রোপিক থেকে সদ্য ইস্তফা দেওয়া গবেষক জ্যাকব কক্সন। সোশ্যাল মিডিয়ায় তিনি স্পষ্ট লিখেছেন, ‘এক দশকেই এই পৃথিবীকে মানবশূন্য করে দেবে এআই। আমাদের জীবন নিয়ে জুয়া খেলছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে যুক্ত সংস্থাগুলি।’ তাঁর এই মন্তব্যে সিলমোহর দিয়েছেন খোদ অ্যানথ্রোপিকের শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তিবিদ (অ্যালাইনমেন্ট সায়েন্সেস লিড) ইভান হুবিংগার। তিনি লিখেছেন, ‘জ্যাকব সঠিক কথা বলেছেন। আগামী দশকে মানুষকে শেষ করে দেবে এআই। ১০ শতাংশের বেশি ক্ষেত্রে এমন সম্ভাবনা রয়েছে।’
জ্যাকব এর আগে ওপেন এআই-তে কাজ করেছেন। এবার অ্যানথ্রোপিক থেকে ইস্তফার সঙ্গে সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে গবেষণা করা বিশ্বের দুই বড়ো সংস্থাকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন তিনি। তাঁর সংযোজন, এআই সংস্থার কর্তারাও এই ভয়ঙ্কর ভবিষ্যতের কথা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন। কিন্তু কাজে তাঁরা চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচয় দিচ্ছেন। সংস্থাগুলির সুপার ইন্টেলিজেন্স তৈরির খেলায় ক্রমে মৃত্যু-খাদের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে মানবজাতি। গত মাসেই সাইবার সিকিউরিটি টেস্টিংয়ের সময় অ্যানথ্রোপিকের তৈরি ‘ক্লড’ মডেলটি নিজে থেকে একটি থার্ড-পার্টি মাধ্যমের সাহায্যে ইন্টারনেটে ঢুকে কিছু ওয়েবসাইটের সিস্টেম হ্যাক করার চেষ্টা করে। তার জেরে মডেলটির পরীক্ষানিরীক্ষা সাময়িকভাবে বন্ধ করতে বাধ্য হয় সংস্থাটি। তার কয়েক সপ্তাহের মধ্যে জ্যাকব-ইভানের হুঁশিয়ারিতে স্পষ্ট যে, এআই-কে বাগে আনা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে গড়ে ওঠা সুপার হিউম্যান সিস্টেম শীঘ্রই সবকিছু হ্যাক করতে পারবে। রাতারাতি যে কোনো ক্ষেত্রকে বদলে দেবে। যাবতীয় ক্ষমতা ও সম্পদ নিমেষে দখল করবে।
কিন্তু কীভাবে এতটা বিপজ্জনক হয়ে উঠবে এআই? বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, এর মূলে রয়েছে এজিআই বা আর্টিফিশিয়াল জেনারেল ইন্টেলিজেন্স, যা মানুষের মতো বিচার-বুদ্ধি, চিন্তাভাবনাকে কাজে লাগিয়ে আরও জটিল সমস্যার সমাধান করতে পারবে। তবে সেই এআই মডেলগুলি সঠিক দিশা না পেলেই সর্বনাশ। সাইবার নিরাপত্তা, অপরাধ থেকে শুরু করে পারমাণবিক ক্ষেত্রে বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে এটি। কারণ, ধীরে ধীরে মানুষের ইনপুট ছাড়াই কোডিংগুলিকে ব্যবহার করছে এআই। নিজেকে আরও আপডেট করে তুলছে। সেল্ফ ডেভেলপমেন্টের এই প্রক্রিয়া অত্যন্ত বিপজ্জনক। এটি কোথায় গিয়ে থামবে কারও জানা নেই। ডিপফেক, বিকৃত তথ্য এখন ছোটো অপরাধ। সাইবার হামলা, জৈব মারণাস্ত্র নিয়েই আতঙ্কিত প্রযুক্তিবিদরা। ভুল হাতে এআই পড়লেই মহামারীতে গোটা বিশ্ব শেষ হয়ে যাবে। এই আশঙ্কার মাঝেই আশার বাণী শুনিয়েছেন মার্কিন কংগ্রেস সদস্য টেড লিউ। তাঁর কথায়, আর নীতি প্রণয়নে সময় নষ্ট করে লাভ নেই। অবিলম্বে আইন আনতে হবে —‘এআই কিল-সুইচ অ্যাক্ট’!