


সায়ন্তন মজুমদার: ‘চালাকির দ্বারা কোনো মহৎ কর্ম হয় না।’ উক্তিটি স্বামী বিবেকানন্দের। কিন্তু মহৎ হয়েও অনেকেই একটি দিনে চালাকি ত্যাগ করতে পারেননি। মিছিমিছি কৌতুকের উদ্দেশ্যে এপ্রিলস্য প্রথমা দিবসে পালিত বোকা দিবসের জোয়ারে গা ভাসিয়েছিলেন রবি ঠাকুরও। এমনকি অনেককে ‘এপ্রিল ফুল’ বানিয়েও ছিলেন তিনি। শান্তিনিকেতন আশ্রমে এপ্রিল ফুল বা বোকা দিবস প্রচলনে অগ্রণী ছিলেন গুরুদেব।
একদিন ছাতিমতলায় দাঁড়িয়ে রয়েছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন আশ্রমের ছাত্র মুকুল দে। তখনও তিনি মুকুল থেকে খ্যাতনামা চিত্রশিল্পী, কলকাতার গভর্নমেন্ট স্কুল অব আর্টের প্রথম ভারতীয় অধ্যক্ষ হননি। সেদিন ‘উত্তর-পশ্চিম’ কোণ হতে কালবৈশাখীর বাণী বয়ে আনছিল রাঙা আকাশ। রবীন্দ্রনাথ মুকুলকে একটা কাজ করতে বললেন। প্রথমে তাঁর কাছে কয়েকজন আশ্রমিকের খোঁজ নিয়ে নিলেন। সেই সময়ে ১৯০৪ সালে আশ্রমে রবিনির্মিত দেহলি বাড়িতে রবীন্দ্রসংগীতের ভাণ্ডারী দিনু অর্থাৎ দীনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে চায়ের পেয়ালায় তুফান তুলছেন আশ্রম বিদ্যালয়ের শিক্ষক নেপালচন্দ্র রায়, প্রাবন্ধিক জগদানন্দ রায়।
যাই হোক, গুরুদেবের কথামতো শিষ্য সেই চা চক্রের আড্ডায় হাজির। সটান বলে দিলেন— ‘ছাতিমতলায় গুরুদেব পড়ে গিয়েছেন’। বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো সে খবর সকলে শুনেই ব্যস্ত হয়ে দৌড়ে চলে আসেন সপ্তপর্ণীতলে। এসে সকলে হতবাক। তাঁরা দেখেন, রবীন্দ্রনাথ দিব্যি দাঁড়িয়ে রয়েছেন। পরম সত্যের সাধনাস্থলে দাঁড়ানো মুকুলকে মিথ্যা ভাষণের জন্য সকলে তখন উত্তম-মধ্যম দিতে উদ্যত হন। গুরুদেব তখন তাঁদের নিরস্ত করেন। হেসে বলেন, মুকুল তাঁর কথাতেই এই কাজ করেছেন! কারণ সেই দিনটা ছিল এপ্রিল ফুল করার দিন।
সেই শুরু। তারপর থেকে প্রতি বছর পয়লা এপ্রিলের ফুল আশ্রমজুড়ে ফুটতে থাকে। শান্তিনিকেতনের দ্বিতীয় নোবেলজয়ী অমর্ত্য সেনের মাতামহ বা দাদু ছিলেন আশ্রমের অধ্যাপক, প্রাবন্ধিক ক্ষিতিমোহন সেন। তাঁর স্ত্রী কিরণবালা আশ্রমে পরিচিত ছিলেন ‘ঠানদি’ নামে। একবার ঠানদিকে এপ্রিল ফুল বানাতে গিয়ে স্বয়ং বিশ্বকবির পুত্র-কন্যাদের বুমেরাং হয়ে গিয়েছিল। এ যেন শায়েস্তা করতে এসে শায়েস্তা খানের নিজেরই শায়েস্তা হয়ে যাওয়া। ক্ষিতিমোহন তখন মধ্যমা কন্যা মমতা বা লাবুকে নিয়ে কলকাতায় গিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁকে ডাকতেন পুষ্পলাবী নামে। হঠাৎ ঠানদির কাছে টেলিগ্রাম আসে—‘Labu’s marriage arranged. Come immediately.’ ঠানদি তখন শ্রীনিকেতনের প্রাণপুরুষ কালীমোহন ঘোষের পত্নী মনোরমা দেবী, রবিকন্যা মীরা দেবী, রবীন্দ্রনাথের পুত্রবধূ প্রতিমা দেবীর সঙ্গে গল্পে মুখর। আড্ডা ছেড়ে আশ্রম শিক্ষক অর্থাৎ ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’ প্রণেতা হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্ত্রী সুরঙ্গিণী দেবীর কাছে কনিষ্ঠা কন্যা অমিতাকে রেখে দেন তিনি। অমিতাই হলেন অমর্ত্য সেনের মা। বাড়ি এসে ক্যালেন্ডারের দিকে তাকাতেই ঠানদির কেমন যেন সন্দেহ হয়। সেই দিনেই এপ্রিল মাস পড়েছিল। টেলিগ্রাম খুলে বহু খুঁজেও ডাকঘরের সিলমোহর দেখতে পাননি তিনি। ধন্দ কাটাতে সোজা চলে যান উপাসনা মন্দিরের পশ্চিমে, বড়ো দু’টি বকুলগাছের পাশে থাকা পোস্ট অফিসে। পোস্টমাস্টার সাহেব তখন সব ফাঁস করতে বাধ্য হন। সকালবেলায় কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর, স্থপতি সুরেন্দ্রনাথ কর, আশ্রমের গৌর প্রাঙ্গণ যাঁর নামাঙ্কিত সেই আশ্রমিক-শিক্ষার্থী ও পরবর্তীতে শিক্ষক গৌরগোপাল ঘোষ এবং দিনু ঠাকুরের স্ত্রী কমলা দেবী ডাকঘরে হাজির হয়েছিলেন। টেলিগ্রামের একটি ফর্ম নিয়ে নিজেরাই তাতে কিছু কথা লিখে দেন। তারপর শশী হরকরাকে দিকে পাঠিয়ে দেন ঠানদির কাছে। কিন্তু নিজ কর্তব্যজ্ঞানে ডাকঘরের পোস্টমাস্টারমশাই ফর্মটিতে সিল দিতে দেননি।
সব শুনে-জেনে এবার পালটি দিতে চান ঠানদিও। ডাকঘরে তাঁর আসার কথা কাউকে জানাতে নিষেধ করেন। আশ্রমের গুরুপল্লিতে ফিরে মীরা দেবীকে চিঠিতে কলকাতা যাওয়ার জন্য পঞ্চাশ টাকা ধার চেয়ে পাঠান। টাকা পেয়েও যান। এবার তিনি নিজের বাড়ি বন্ধ করে জাপানি ব্যাগ হাতে নিয়ে বেরিয়ে পড়েন স্টেশনের রাস্তায়। আড়াল থেকে রথীবাবু, মীরা দেবীরা যে তাঁর উপর লক্ষ্য রাখছেন, সে কথা ভালোই বুঝতে পেরেছিলেন। কিন্তু তাঁরা একটু তফাতে যেতেই ঠানদি গোপনে বাড়িতে ফিরে আসেন। পূর্ব পরিকল্পনামতো বাড়ির পিছন দিকের ভেজিয়ে রাখা খিড়কি দুয়ার ঠেলে ঘরের ভিতরে এসে চুপটি করে বসে থাকেন।
এদিকে, ট্রেনে উঠে ঠানদির হেনস্তা আটকাতে রথীন্দ্রনাথ মোটরগাড়ি নিয়ে স্টেশনে তড়িঘড়ি হাজির হন। প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রেনের প্রতিটি কামরায় ঠানদির নাম করে খুঁজতে শুরু করেন। ট্রেন ছাড়ার সময় হয়ে গেলে রথীদার নির্দেশে সুরেনবাবু এবং গৌরবাবুও ট্রেনে উঠে পড়েন—বর্ধমান স্টেশন থেকে ঠানদিকে ধরে এনে আশ্রমে ফেরাবেন বলে। কিন্তু কোথায় তিনি? সেখানে গিয়েও নাকাল হন তাঁরা। শেষে সকলেই বুঝতে পারেন যে, ঠানদির এপ্রিল ফুলের ঘায়ে তাঁরা একেবারে আহাম্মক বনে গিয়েছেন।
অগত্যা আশ্রমে প্রত্যাবর্তন। উত্তরায়ণে তখন গুরুদেবকে নিয়ে মজলিস বসেছে। ঠানদি গোটা ঘটনাটি সবিস্তারে ব্যাখ্যা করছেন। গুরুদেব সব শুনে কিরণের হাতে নাটা ঝামটা হওয়া পুত্র-কন্যা, আশ্রমিকদের কথা শুনে হেসে ওঠেন। ঠানদির বুদ্ধির প্রশংসা করে বলতে বাধ্য হন—‘দরখাস্ত করলে গোয়েন্দা বিভাগে তুমি সরকারি বড়ো পদ পেয়ে যাবে, একথা হলফ করে বলতে পারি।’
এবার কিস্তিমাতের পালা। নিজেকে বিজয়িনী ঘোষণা করে মীরা দেবীর দেওয়া সেই পঞ্চাশ টাকা কবির হাতে তুলে দিয়ে ভোজসভা আয়োজনের প্রস্তাব উত্থাপন করেন ঠানদি স্বয়ং। সকলেই এক কথায় রাজি হয়ে যান। সেই আয়োজনের সম্পূর্ণ দায়িত্ব নেন বউঠান প্রতিমা দেবী। শোনা যায়, সেই দিন এপ্রিল ফুলের নানা কৌতুকপ্রদ কাহিনি শুনিয়ে নাকি সভা মাতিয়ে দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। সে সব কথা ঝরা ফুলের মতো মাটিতে পড়ে আজ কোথায় উড়ে গিয়েছে, কে জানে। তবু হিপ হিপ হুররে এপ্রিল ফুলস ডে!