


এক কিশোর ক্রিকেটার এক টাকার কয়েন জমাচ্ছেন! কৌতূহলী হয়ে মা জানতে চাওয়ায় বললেন, ‘এগুলো টাকা নয় মা। যতগুলো এক টাকা, ততবার আমি আউট হইনি!’ সেই ক্রিকেটারের নাম শচীন তেন্ডুলকর। আগামী শুক্রবার তাঁর জন্মদিন। শচীনের লড়াইয়ের গল্প বললেন সৌগত গঙ্গোপাধ্যায়।
মুম্বইয়ের শিবাজি পার্কে পড়ন্ত বিকেল। কোচ রমাকান্ত আচরেকর মাঠে ঢুকেই উইকেটের উপর এক টাকার কয়েন রাখলেন। ছাত্ররা সবাই অবাক। গম্ভীর গলায় গুরুর আদেশ, ‘এই কয়েনটা স্টাম্পের উপর রাখলাম!’ তারপর একটি ছোট্ট ছেলের দিকে তাকিয়ে আবার বলতে শুরু করলেন, ‘শচীন ব্যাট করবে। বোলাররা তাকে আউট করার চেষ্টা করবে। যদি শচীন পুরো সেশনে আউট না হয়, এই কয়েনটা তার পুরস্কার। আর যদি আউট হয়, কয়েনটা পাবে সেই বোলার।’ ছেলেরা মুখ চাওয়াচাওয়ি করল পরম আনন্দে। এক টাকা তখন বাচ্চাদের কাছে কম কথা নয়! কিন্তু, আসল কারণটা ছিল লক্ষ্য স্থির করা। হারলে লজ্জা, জিতলে পুরস্কার— এই দুটো মিলিয়ে যে চাপ তৈরি হয়, তারজন্যই ছেলেদের তৈরি করে রাখা। বিশেষ করে শচীন তেন্ডুলকরকে।
পুরস্কার ছিনিয়ে নিতে বোলাররা ঝাঁপিয়ে পড়ল। শচীনও ক্রিজে তৈরি। চোখ স্থির, মুখ শান্ত। প্রথম বল— চওড়া ব্যাটে নিখুঁত ডিফেন্স। দ্বিতীয় ডেলিভারি— ঠেলে দিলেন মিড অনে। তৃতীয় বল— দেখেশুনে ছেড়ে দিলেন। পরের ডেলিভারি— এবার স্ট্রেট ড্রাইভ। পুরো সেশনে আর ছেলেটি আউট হল না। আচরেকর স্যারও হাসিমুখে এক টাকার কয়েনটি স্টাম্প থেকে তুলে শচীনের হাতে দিলেন। এরপর এটাই হয়ে উঠল খুদে ব্যাটারের ডেইলি রুটিন। যখনই শচীন আউট হত, কয়েন যেত বোলারের পকেটে। আর শচীনের মনে জ্বলত নিজেকে প্রমাণের আগুন। স্যারকে বলতেন, ‘কাল আর এই ভুল হবে না।’ তবে বেশিরভাগ দিনই তিনি কয়েন নিয়ে বাড়ি ফিরতেন। একদিন তো মা রজনী তেন্ডুলকর জিজ্ঞাসা করেই ফেললেন, ‘এত কয়েন জমাচ্ছিস কেন?’ আদুরে গলায় ছেলের জবাব, ‘এগুলো
টাকা নয় মা। যতগুলো এক টাকা, ততবার আমি
আউট হইনি!’
১৯৭৩ সালের ২৪ এপ্রিল মুম্বইয়ের দাদারে জন্ম শচীন রমেশ তেন্ডুলকরের। ছোটো থেকেই তিনি ছিলেন খুব ছটপটে। তাঁর এনার্জি সঠিকভাবে কাজে লাগাতে শিবাজি পার্কে কোচ রমাকান্ত আচরেকরের কাছে শচীনকে ভরতি করেন দাদা অজিত। সেই একই মাঠে, একই কোচের কাছে আরও একটি ছেলে প্র্যাকটিস করতেন। নাম বিনোদ কাম্বলি। শচীনের পরম বন্ধু। দু’জনে একসঙ্গে স্কুলে যাওয়া, একসঙ্গে প্র্যাকটিসে ফেরা। তবে অনেকেই বলতেন, শচীনের থেকেও কাম্বলির প্রতিভা বেশি। তাঁর সহজাত ব্যাটিং, ব্যাটে বলে সংযোগ— সব দেখে আচরেকর স্যারও বলতেন, এই ছেলে অনেক দূর যাবে। কিন্তু প্রতিভা আর সাফল্য— এই দুটো জিনিস সবসময় হাতে হাত ধরে চলে না। আচরেকর ছিলেন কঠোর হেডমাস্টার। তিনি বিশ্বাস করতেন, ঘাম ঝরানো ছাড়া স্বপ্নপূরণ হয় না। একদিন কুয়াশায় ঢাকা শীতের সকালে পিচ ভিজে গিয়েছিল। বাকি ছেলেরা বলল, ‘আজ থাক, মাঠ ভালো না।’ কিন্তু শচীন ব্যতিক্রম। একা ভেজা মাঠে, কুয়াশার মধ্যে ঘণ্টা দুয়েক ব্যাটিং করলেন। স্যার দূর থেকে দেখছিলেন। মুখে কিছু বলেননি। শুধু মৃদু হাসলেন।
আরও একদিন শচীন একই শট একটানা প্র্যাকটিস করে যাচ্ছিলেন। বাড়ি ফিরতে রাত হয়ে গেল। হাতের তালু লাল, চোখ ঘুমে ঢুলু ঢুলু। মা দরজা খুলে দেখলেন, ছেলের এই অবস্থা। আচরেকর স্যার সবসময় বলতেন, ‘মাঠে সময় দিলে, সেটা কখনো বৃথা যাবে না। কিন্তু মাঠের বাইরে সময় নষ্ট করলে, তুমি পিছিয়ে পড়বে।’ শচীন এই কথাটা মনে-প্রাণে গেঁথে নিয়েছিলেন।
১৯৮৮ সালে শচীন-কাম্বলির জুটি ক্রিকেট দুনিয়াকে তাক লাগিয়ে দেয়। হ্যারিস শিল্ড টুর্নামেন্টে এই দুই বন্ধু মিলে ৬৬৪ রানের অবিশ্বাস্য জুটি গড়েছিলেন। ওই ম্যাচে শচীনের ব্যক্তিiগত সংগ্রহ ৩২৬ রান এবং কাম্বলির রান ৩৪৯। দু’জনেই অপরাজিত ছিলেন। শহরজুড়ে তখন এই দুই কিশোরকে নিয়েই আলোচনা চলছে। সবার মুখে একটাই কথা— একদিন ভারতীয় ক্রিকেটকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবেন এই দু’জন।
স্বপ্নটা অবশ্য আংশিক সত্যি হয়েছিল। ১৯৮৯ সালের ১৫ নভেম্বর মাত্র ষোলো বছর বয়সে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে টেস্ট অভিষেক শচীনের। ওয়াকার ইউনুস, ওয়াসিম আক্রামের মতো ভয়ংকর পেসারদের সামনে সেই কিশোর নির্ভয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। বলের আঘাতে নাক থেকে রক্তও ঝরেছিল। আম্পায়ার জিজ্ঞেস করলেন, ‘খেলবে?’ শচীন মাথা নাড়লেন— ‘ম্যায় খেলে গা।’
সেই মুহূর্তটাই জানান দিয়েছিল— এই ছেলে অন্যরকম। কাম্বলিও কিছু বছর পরে জাতীয় দলে এলেন। শুরুটা ছিল অসাধারণ। কেরিয়ারের তৃতীয় ও চতুর্থ টেস্টে ডাবল সেঞ্চুরি হাঁকান। ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ২২৪। একই বছর জিম্বাবোয়ের বিরুদ্ধেও তাঁর ব্যাট থেকে আসে ২২৭ রানের ইনিংস। বিশ্বক্রিকেট চমকে উঠল। অনেকে বললেন, এই ছেলে একদিন শচীনকেও ছাপিয়ে যাবেন। কিন্তু ধীরে ধীরে কাম্বলির মনোযোগ সরে গেল। গ্ল্যামার, প্রচারের আলো, বিনোদন জগতের হাতছানি তাঁকে মাঠ থেকে দূরে টানতে লাগল। ফিটনেস কমল, পারফরম্যান্স গ্রাফও নিম্নমুখী। ১৯৯৬-’৯৭ সালের পর তাঁর আন্তর্জাতিক কেরিয়ার কার্যত শেষ। মাত্র সতেরোটি টেস্ট খেলে থামলেন — অথচ শুরুটা কী অসাধারণই না ছিল। আর শচীন? তিনি এগিয়ে চললেন। বছরের পর বছর। দশকের পর দশক। চোট এল, সমালোচনা এল, ব্যর্থতা এল— প্রতিবার ফিরে এলেন আরও ক্ষুরধার হয়ে। ১৯৯৮ সালে শারজায় অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে ঝড়ের মধ্যে ম্যাচ জেতানো সেই ইনিংস, ২০০৩ বিশ্বকাপে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ৯৮ রানের ঝড়, টেস্টে দশ হাজার রানের মাইলফলক— একের পর এক ইতিহাস লিখে গেলেন। একশোটি আন্তর্জাতিক সেঞ্চুরি— যা আজও কেউ স্পর্শ করতে পারেননি। দুশোটি টেস্ট ম্যাচ। ৪৬৩টি ওয়ানডে। ক্রিকেটের প্রায় প্রতিটি রেকর্ডেই জ্বলজ্বল করছে মাস্টার ব্লাস্টারের নাম। ক্রমেই শিবাজি পার্কের সেই ছোট্ট ছেলে হয়ে উঠলেন ক্রিকেটের ঈশ্বর। অথচ শচীন ও কাম্বলি দু’জন একই মাঠে খেলেছেন, একই কোচের কাছে শিখেছেন, একই স্বপ্ন দেখেছেন। একজনের গল্প শেষ হয়েছে অনুতাপে, আরেকজনের গল্প শেষ হয়েছে ইতিহাসে। পার্থক্য শুধু একটাই— ফোকাস। তাই কাম্বলি এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘শচীন যেটা পেরেছে আমি পারিনি।’
শচীন-কাম্বলির এই গল্প সত্যিই নতুন প্রজন্মকে অনেক কিছু শেখায়। ছোট্ট বন্ধুরা, তোমাদের মধ্যেও প্রতিভা আছে। হয়তো পড়াশোনা, খেলাধুলা, গান কিংবা ছবি আঁকার। কিন্তু সেই প্রতিভাকে বড়ো আকার দিতে গেলে দরকার একটাই জিনিস—ফোকাস। মনোসংযোগ। যা করছ তা মন দিয়ে কর। অন্যদিকে চোখ না ঘুরিয়ে লক্ষ্যের দিকে তাকিয়ে থাক। শচীন মাঠে নেমে শুধু বলটাকে দেখতেন। বাইরের শব্দ, দর্শকের চিৎকার, সমালোচকের কথা— কিছুই তাঁকে বিচলিত করতে পারত না। আর সেই এক টাকার কয়েনগুলো? শচীন সারাজীবন সযত্নে রেখে দিয়েছেন। কারণ ওই ছোট্ট কয়েনগুলোই তাঁকে শিখিয়েছিল জীবনের সবচেয়ে বড়ো পাঠ। ‘উইকেটটা তোমার সবচেয়ে দামি সম্পদ। সেটা বাঁচাও। ফোকাস হারিও না। স্বপ্ন দেখ। কঠোর পরিশ্রম কর। বাকিটা সময় নিজেই বলে দেবে।’