


অরিজিৎ ঘোষাল, রানাঘাট: আজ থেকে প্রায় চারশো বছর আগের কথা। জঙ্গলাকীর্ণ শান্তিপুরের এক কালী মায়ের বেদিতে বলি দেওয়া হতো ১০৮টি মহিষকে। সেই থেকে জনশ্রুতি—‘মহিষখাগী কালী’। পরে মহিষের বদলে বলি হতো পাঁঠা। এখনও ‘মহিষখাগী’ নামটা থাকলেও বলিপ্রথা পুরোপুরি বন্ধ। তবে, মায়ের বিদায়ের দিনে প্রাচীন রীতি মেনে মাছের ভোগ হবেই হবে। আর সেই ভোগ মানে হরেক আয়োজন—পান্তা ভাত, খয়রা মাছের ভাজা, প্রমাণ সাইজের রই মাছের কালিয়া, নানা শাক-সব্জির ভাজা। সঙ্গে ফলফলাদি তো থাকবেই। এমন বৈচিত্রময় ভোগ নিবেদনের পর শুরু হয় ‘মহিষখাগী কালী’র বিসর্জনের পালা। শান্তিপুরে যে কয়েকটি প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী কালীপুজো আজও টিকে রয়েছে, সেগুলির মধ্যে অন্যতম ‘মহিষখাগী’ কালীপুজো।
কথিত, শান্তিপুরের এক তন্ত্রসাধক ছোট্ট একটি চালার নিচে কালী মায়ের আরাধনা শুরু করেছিলেন। দীর্ঘ সাধনার পর নিজের ১০৯ বছর বয়সে তিনি পূজোর দায়িত্ব তুলে দেন এলাকারই এক বিধবা নারী আন্দু দেবীর হাতে। পরবর্তীতে আন্দুদেবীর পরিবার বংশ পরম্পরায় পুজো আসছিলেন। আজ তা সর্বজনীন। গোটা এলাকাবাসী জোট বেঁধে মায়ের পুজোর আয়োজন ও পরিচালনা করেন।
বর্তমানে পুজো কমিটির সম্পাদক কৃষ্ণচন্দ্র সেন বলেন, ‘অতীতে এই পুজোয় প্রায় ১০৮টি মহিষ বলিদানের প্রথা চালু ছিল। সেখান থেকেই লোকোমুখে দেবীর নাম হয়ে যায় মহিষখাগী মাতা। পরে মহিষের জায়গায় বলি দেওয়া হতো পাঁঠা। এখন আর বলি হয় না। পুজোর দিন রাতে ফলমূল, হরেক রকমের ভাজা এবং খিচুড়ি ভোগ দেওয়া হয় মা’কে।’ পূজো শুরুর আগে আন্দুদেবীর বংশের বাড়িতে কালীপুজোর দিনে অনুষ্ঠিত হয় লক্ষ্মীপুজো। লক্ষ্মীপুজোর শেষে ভোর চারটের সময় আয়োজিত হয় পবিত্র দধিমঙ্গল অনুষ্ঠান। দেখতে ভিড় করেন বহু পুণ্যার্থী।
কালীপুজোর পরের দিন দুপুর বারোটার পর শুরু হয় মায়ের বিসর্জন পর্ব। তখন মায়ের সামনে সাজিয়ে দেওয়া হয় পান্তা ভাত, রুই মাছের কালিয়া ও খয়রা মাছের ভাজা। সঙ্গে অন্যান্য শাক-সব্জির ভাজাভুজি। ভোগ নিবেদনের পর বিকেল চারটে নাগাদ মাকে নিয়ে যাওয়া হয় নিরঞ্জনের পথে। প্রাচীন রীতি মেনে ভক্তরা নিজেদের কাঁধে তুলে নেন বিশালাকার প্রতিমা। আর সেই দৃশ্য দেখতে রাস্তার দু’পাশে ভিড় করেন ভক্তরা।