


সংবাদদাতা, কাটোয়া: সাধক রামানন্দ প্রতিষ্ঠিত মা সিদ্ধেশ্বরীর পুজো আজও প্রাচীন রীতি মেনেই হয় দাঁইহাটের বেড়াতে। ভাতৃদ্বিতীয়ার ফোঁটা নিয়েই মা সিদ্ধেশ্বরীর বিসর্জন হয়। পুজোয় কারণবারি ছাড়াও ইলিশ, পোস্ত, মাগুর, পোনা ও শোল মাছের ভোগ নিবেদন করা হয়। এমনকী চালভাজা, নাড়ুও দেওয়া হয়। সাড়ে তিনশ বছরের বেশি সময় ধরে মা সিদ্ধেশ্বরী পূজিত হয়ে আসছেন।
সাধক রামানন্দের পূর্বাশ্রম ছিল নদীয়া জেলার মাটিয়ারিতে। দাঁইহাটে গঙ্গার অপর পাড়েই মাটিয়ারি। রামানন্দ সাধন ভজনের জন্য নিরিবিলি জায়গা খুঁজছিলেন। নির্জন জায়গা হিসাবে বেড়াকেই পছন্দ করেছিলেন। এখানে সাধক প্রতিষ্ঠা করেন পঞ্চমুন্ডির আসন। রামানন্দের পর থেকে তাঁর অনুরাগী বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবার এই পুজো চালিয়ে আসছেন।
বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের সদস্য তথা সেবাইত কল্যাণী জানান, প্রায় সাড়ে তিনশ বছরের আগে রামানন্দ নামে এক সাধক এই দক্ষিণাকালীর প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। কার্তিকী অমাবস্যায় পুজো হয় সিদ্ধেশ্বরী মাতার। ভাই দ্বিতীয়ার ফোঁটা নিয়ে মায়ের বিসর্জন হয়। সবার আগে মাকে ফোঁটা না দিলে ভাই দ্বিতীয়া হয় না। মায়ের পুজোর অনেক নিয়ম রয়েছে। মা সিদ্ধেশ্বরীদেবীর পুজোয় তিনদিনে তিন বোতল কারণবারি দিতে হয়। কারণবারি দিয়ে মায়ের চোখ, মুখ ধুইয়ে দিতে হয়। এছাড়া দেবীকে ইলিশ মাছের তেলঝাল করে দিতে হয়। মাগুর ও শোল মাছের ঝোল, পোনা মাছ ভাজা, আলুভাজা দিতে হয়। তাছাড়া ঝিঙে, আলু পোস্ত, টমেটো পোস্ত দিতে হয়। তাছাড়া ন’ পোয়া চাল ভাজা দিতে হয়। নতুন মাটির খোলায় স্নান সেরে ভাজতে হয়। পুজোর দিন চালভাজা, নাড়ু দিতে হয়। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সিদ্ধেশ্বরী মাতা জাগ্রতা দেবী। অনেকেই মানত করেন এখানে। মনোবাসনা পূর্ণ হলে পরের বছর পুজো দেন।
অন্যদিকে কেতুগ্রামের আনখোনা গ্রামে বর্ধমানের মহারাজা উদয়চাঁদ মহতাবের প্রতিষ্ঠা করা দক্ষিণাকালী আজও মহাসমারোহেই পূজিত হয়। গ্রাম্যদেবী হিসাবেই দক্ষিণাকালীকে মানেন বাসিন্দারা। তাই তো গ্রামে আর কোনো কালীমূর্তি পলজো হয় না। মহারাজা উদয়চাঁদ মহতাবের ঠিক করা এখনও গ্রামের চার ‘মোড়ল’-এর বংশধররা পুজো পরিচালনায় অংশ নেন। তবে দক্ষিণাকালী আনখোনা গ্রামে এখন সর্বজনীন কালীপুজোয় পরিণত হয়েছে।
গ্রামের বাসিন্দারা জানান, একসময় বর্ধমানের মহারাজা উদয়চাঁদ মহতাব কেতুগ্রামের আনখোনা গ্রামে দক্ষিণাকালী প্রতিষ্ঠা করেন। কেন তিনি ওই গ্রামে কালী প্রতিষ্ঠা করেন, তা কেউ বলতে পারেন না। মহারাজা তখন পুজোর পরিচালনা করার জন্য গ্রামের চার মোড়লকে দায়িত্ব দেন। পাশাপাশি তিনি পুজোর জন্য সবকিছু ঠিক করে দেন। এমনকী দক্ষিণাকালী পুজোর জন্য পাঁচ টাকা অনুদান পাঠাতেন। সেই দক্ষিণাকালী আনখোনা গ্রামে জাগ্রত গ্রাম্যদেবী হিসাবে আজও পূজিত হন। এখন মহারাজা উদয়চাঁদ মহতাবের নামে সংকল্প হয়। দক্ষিণাকালীকে ঘিরে রয়েছে নানা জনশ্রুতি। আনখোনা গ্রামে মা দক্ষিণাকালী পুজোর সমস্ত নিয়মরীতি এখনও ঢেঁড়া দিয়ে জানানো হয়। পুজোর সময় গ্রামে উৎসবের আমেজ থাকে। গোটা গ্রামের মানুষের মূল আকর্ষণ এই পুজো।-নিজস্ব চিত্র