


পরামর্শে আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের প্রধান ডাঃ রূপনারায়ণ ভট্টাচার্য।
পোড়া অর্থাৎ বার্নের কতগুলি গ্রেড আছে। চামড়ার শুধু উপরের স্তর অর্থাৎ এপিডারমিস পুড়লে তাকে ফার্স্ট ডিগ্রি বার্ন বলে। এপিডারমিসের সঙ্গে চামড়ার দ্বিতীয় স্তর ডারমিসের কিছুটা অংশ পুড়ে গেলে বলা হয় সেকেন্ড ডিগ্রি বার্ন। থার্ড ডিগ্রি বার্নের ক্ষেত্রে এপিডারমিস ও ডারমিস দুটো স্তরই পুড়ে যায়। আর ফোর্থ ডিগ্রি বার্ন হল চামড়ার স্তরের পাশাপাশি মাংস পেশিও পুড়ে যায়।
গরম জল বা গরম দুধ থেকে বাচ্চাদের ফার্স্ট ডিগ্রি বার্নের ঘটনা বেশি হয়। এক্ষেত্রে ডাক্তারবাবুর পরামর্শ মতো প্রশিক্ষিত লোক দিয়ে ড্রেসিং করালে বাচ্চা সুস্থ হয়ে যেতে পারে। সেকেন্ড ডিগ্রি বার্নের এরিয়া বেশি হলে বাচ্চাকে হাসপাতালে ভর্তি করানো প্রয়োজন। আর থার্ড ডিগ্রি বার্নের ক্ষেত্রে অবশ্যই হাসপাতালে ভর্তি করাতে হবে।
এবার এরিয়া অব বার্নের বিষয়ে কথা বলা যাক। একটি মানব শরীরকে যদি ১০০ ধরা হয়, তাহলে পূর্ণবয়স্ক এক ব্যক্তির মাথা ও ঘাড় ৯ শতাংশ, একটি হাত ৯ শতাংশ, শরীরের সামনে ও পিছনের অংশ ১৮+১৮=৩৬ শতাংশ, একটি পা ১৮ শতাংশ। বাচ্চাদের ক্ষেত্রে এই হিসেবটা একটু অন্যরকম। যেমন— ছোট বাচ্চাদের ক্ষেত্রে মুখমণ্ডলকেই ১৪ থেকে ১৯ শতাংশ ধরা হয়। কোনও শিশু ৫-৬ শতাংশ পুড়লে বাড়িতে রেখেই চিকিৎসা করা সম্ভব। কিন্তু ১০-১২ শতাংশের বেশি বার্ন হলেই বাচ্চাদের হাসপাতালে ভর্তি করা প্রয়োজন। এবার দেখে নেওয়া যাক কী কী ধরনের বার্ন হয়। ১) ফ্লেম বার্ন অর্থাৎ সরাসরি আগুনের সংস্পর্শে এসে পুড়ে যাওয়া, ২) স্ক্যালড অর্থাৎ গরম তরল পদার্থের (জল, তেল) সংস্পর্শে এসে পুড়ে যাওয়া, ৩) ইলেকট্রিক বার্ন অর্থাৎ বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়া এবং ৪) কেমিক্যাল বার্ন অর্থাৎ অ্যাসিড বা কোনও রাসায়নিকের সংস্পর্শের কারণে যে পুড়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে।
কীভাবে আটকাবেন ছ্যাঁকা-পোড়া?
গরম জল বা দুধ বাচ্চার থেকে দূরে রাখুন। ইলেকট্রিক্যাল পয়েন্ট বাচ্চার হাতের নাগালের বাইরে রাখুন। প্লাগ পয়েন্ট বন্ধ রাখার আধুনিক সরঞ্জাম বাজারে আছে। বাথরুম পরিষ্কারের অ্যাসিড বা ওই জাতীয় কেমিক্যাল বাচ্চার হাতের নাগালে রাখা উচিত নয়। জ্বলন্ত ধূপ, প্রদীপ, মোমবাতি বাচ্চার হাতের কাছে রাখবেন না।
পুড়ে গেলে কী করবেন?
আগুন কিংবা গরম জল বা দুধে গা পুড়ে গেলে প্রথমেই জামা খুলে ফেলতে হবে। পোড়ার অংশে কলের ঠান্ডা জল (রানিং ওয়াটার) দিন। কেমিক্যাল বার্নের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম। তাতে ওই রাসায়নিক পদার্থটি যতটা সম্ভব ধুয়ে যায়। ইলেকট্রিক বার্ন হলে যত দ্রুত সম্ভব বাচ্চাকে ডাক্তারের কাছে বা হাসপাতালে নিয়ে যান। অল্পস্বল্প পুড়লে বা ছ্যাঁকা লাগলে একই পদ্ধতিতে ঠান্ডা জলে ধুয়ে জায়গাটি শুকিয়ে অ্যান্টিসেপ্টিক অয়েনমেন্ট লাগান। পুড়ে যাওয়ার জন্য ড্রেসিং করতে হলে, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ মতো ট্রেন্ড ড্রেসার দিয়েই করানো উচিত। প্রায় সব সরকারি হাসপাতালে বার্ন ওয়ার্ড থাকে। সেখানেই রোগীকে নিয়ে যান।
কী করবেন না?
পোড়া জায়গায় কোনও অবস্থাতেই মাজন লাগাবেন না। পোড়া জায়গায় আলুর খোসা লাগানোর মতো একাধিক টোটকা সমাজে প্রচলিত। কিন্তু এখনও পর্যন্ত এগুলির কোনও বৈজ্ঞানিক সত্যতা আবিষ্কৃত হয়নি। তাই এসব এড়িয়ে চলুন।
কালীপুজোয় দুর্ঘটনা:
বাজি ফাটাতে গিয়ে কালীপুজোয় হামেশাই বাচ্চাদের দুর্ঘটনা ঘটে। কিছু কিছু বাজি যেমন রংমশালে অ্যালুমিনিয়াম অক্সাইড থাকায় সাধারণ আগুনের শিখার থেকে বেশি উষ্ণতার সৃষ্টি হয়। তাই বাজির আগুনে অল্পতেই অনেকটা বেশি পুড়ে যায়। আবার বাজির ধোঁয়াও শিশুদের পক্ষে ক্ষতিকারক। আর চকোলেট বোমা বা কালি পটকা ফেটে হতে পারে ব্লাস্ট ইনজুরি।
সাবধানতা: বাচ্চা বাজি পোড়ানো সময় সঙ্গে যেন অবশ্যই অভিভাবকরা থাকেন। খোলামেলা জায়গায় যেন বাচ্চা বাজি পোড়ায়। কাছাকাছি এক বালতি জল রাখা উচিত। ধরুন, অসাবধানতাবশত হাতটা পুড়ে গেল বা ছ্যাঁকা লাগল, তাহলে যেন সঙ্গে সঙ্গে ওই জলে হাত চোবানো যায়। আগুনের কাছাকাছি যেন কোনও অবস্থাতেই বাজিগুলি রাখা না হয়।
কখন প্লাস্টিক সার্জারি প্রয়োজন?
পুড়ে যাওয়ার কারণে বাচ্চার অঙ্গ বিকৃতি ঘটলে প্লাস্টিক সার্জারি মাধ্যমে তা অনেকাংশে কোনও কোনও ক্ষেত্রে পুরোটাই সারিয়ে তোলা সম্ভব। তাই এমন ধরনের বড় দুর্ঘটনা ঘটলে প্লাস্টিক সার্জেনের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
লিখেছেন অয়নকুমার দত্ত।