


প্রদীপ্ত দত্ত, ঝাড়গ্ৰাম: দেশমাতার শৃঙ্খলা মোচনে অনেক কম বয়স থেকেই স্বাধীনতা সংগ্রামের যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন তিনি। বাংলার অগ্নিযুগের অনেক বিপ্লবীর মধ্যে তিনি আজ কালের গর্ভে হারিয়ে গিয়েছেন। বাঙালি স্মৃতিমেদুর হলেও বিপ্লবী ভোলানাথ রায়কে মনে রাখেনি। সেলুলার জেলে ১৯৩২ সাল থেকে ৩৮ পর্যন্ত কারারুদ্ধ ছিলেন তিনি। কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে ঝাড়গ্রামের জঙ্গল এলাকার সহজ সরল মানুষগুলির সঙ্গে মিশে গিয়েছিলেন।জঙ্গল এলাকার মানুষের কাছে তিনি লাঠিয়াল-ডাক্তার নামেই ছিলেন পরিচিত।
আন্দামানের সেলুলার জেলের রাজনৈতিক বন্দি তালিকায় আজও জ্বলজ্বল করছেবিপ্লবী ভোলানাথ রায়ের নাম।সেলুলার জেল থেকে ছাড়া পেয়ে ঝাড়গ্রামে চলে আসেন। আমৃত্যু ঝাড়গ্রামে ছিলেন।বিপ্লবী জীবনের আগে কোথায় তাঁর সাকিন ছিল সে কথা তিনি বলে যাননি। প্রচারের আলোর বাইরে থাকতেই স্বচ্ছন্দ ভোলাবাবুবিপ্লবী জীবনের কথা কাউকে বলতেও চাইতেননা। ঘনিষ্ঠজনেরা সে কথা জানলেও তাঁদের অধিকাংশই এখন প্রয়াত। বিপ্লবী ভোলা রায়ের আসল পরিচয় হারিয়ে গিয়েছে।
গত শতকের ছয়ের দশক থেকে ভোলাবাবুকে অরণ্য শহরে সাইকেলে করে ঘুরে বেড়াতে দেখা যেত। অকৃতদার ছিলেন। কুষ্ঠ নিবারণী কেন্দ্রে রোগীদের দেখভাল করতেন।তৎকালীন সময়ে ঝাড়গ্রামে কুষ্ঠ রোগের প্রাদুর্ভাব ছিল বেশি। জার্মান লেপ্রোসি রিলিফ অ্যাসোসিয়েশনের কার্যকরী সমিতির উপদেষ্টা সদস্য ছিলেন তিনি।সংগঠনটির উদ্যোগেই ঝাড়গ্রামে কুষ্ঠ হাসপাতাল নির্মিত হয়। শহরের ঝাড়গ্রাম স্টেডিয়ামে যাওয়ার পথে হাসপাতালের দোতলা ভবন আজও রয়েছে। ঝাড়গ্রাম শহরের গাইঘাটা এলাকায় নিজের উদ্যোগে কুষ্ঠাশ্রম গড়ে তোলেন এই বিপ্লবী। সেই কুষ্ঠাশ্রম আজও রয়েছে।তরুণতীর্থ ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সদস্যও ছিলেন। তাঁরই উদ্যোগে ক্লাবে দাতব্য চিকিৎসালয় প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। এর পাশাপাশি হোমিওপ্যাথি চিকিৎসাও করতেন। কোনওডিগ্রি না থাকা স্বত্বেও জেলার মানুষের কাছে তিনি ডাক্তারবাবু বলেই পরিচিত ছিলেন।চিকিৎসার পাশাপাশি তরুণদের লাঠিখেলার প্রশিক্ষণও দিতেন।
প্রবীণ মানুষদের স্মৃতিকথায় উল্লেখ রয়েছে, অনুশীলন সমিতির সদস্যদের কাছে লাঠিখেলা শিখেছিলেন।যে চর্চা তিনি শেষ জীবন পর্যন্ত বজায় রেখেছিলেন । দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সরকার থেকে স্বাধীনতা সংগ্ৰামী হিসেবে পেনশন পেতেন ভোলাবাবু। ভরণপোষণের জন্য যৎসামান্য রেখে সবটাই সমাজ সেবার কাজে বিলিয়ে দিতেন।
ঝাড়গ্রামে থাকাকালীন তিনি আরএসপি-র (রেভেলিউশনারি সোশ্যালিস্ট পার্টি) সঙ্গে যুক্ত থাকার কথা জানা যায়। ১৯৭৭ সালে পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় আসে। সেই সময় বামফ্রন্ট সরকারের প্রথম মন্ত্রিসভার স্বাস্থ্যমন্ত্রী ছিলেন আরএসপি নেতা ননী ভট্টাচার্য।মন্ত্রী হয়েই তিনি ঝাড়গ্রামের ‘জার্মান লেপ্রোসি রিলিফ অ্যাসোসিয়েশন পরিচালিত কুষ্ঠ আশ্রমের উদ্বোধনকরতে এসেছিলেন ঝাড়গ্রামে। সেখানে ননীবাবু দু’হাত দিয়ে বুকে চেপে ধরেছিলেন ভোলানাথবাবুকে। প্রাক্তন অধ্যাপকও গবেষক সুনীল কুমার বর্মন বলেন, ঝাড়গ্রাম শহরের মুষ্টিমেয় কিছু ব্যক্তি তাঁর সম্বন্ধে জানতেন। তিনি নিজে কিছু বলে যাননি। বিপ্লবী জীবনের পূর্বে ভোলা রায় সম্বন্ধে কোনও তথ্য পাওয়া যায়নি। শুধু অরণ্য ভূমির সহজ সরল মানুষের কাছে লাঠিয়াল - ডাক্তার হিসেবেই পরিচিত ছিলেন।