


আশিস পাঠক: স্মৃতিতে তিনি আছেন। বিস্মৃতিতেও।
রবীন্দ্রনাথের জীবন, এবং ‘জীবনস্মৃতি’ জুড়ে আছেন তাঁর জ্যোতিদাদা। কিন্তু গান আর নাটকের বাইরে যে বিচিত্র প্রতিভার রঙিন মানুষ জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর, আজ মৃত্যুর শতবর্ষ পেরিয়ে তাঁর স্থান যেন বাঙালির বিস্মৃতিতে।
মোটামুটি পঁচাত্তর বছরের জীবন জ্যোতিরিন্দ্রনাথের। জন্ম ১৮৪৯ সালের ৪ মে। ১৯২৫ সালের ৪ মার্চ মৃত্যু। প্রতি মুহূর্তে নতুন নতুন উৎসাহে বাঁচতে বাঁচতে একটা গোটা জীবন কী করে জীবন্ত হয়ে থাকে, তার এমন আলেখ্য বাঙালির ইতিহাসে হাতে-গোনা।
শেষ থেকেই শুরু করা যাক। মৃত্যুর তখন আর বছর আষ্টেক বাকি। মূল মারাঠি থেকে বাংলায় প্রকাশিত হল বাল গঙ্গাধর তিলকের ‘গীতারহস্য’। অনুবাদক জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর। অনুবাদকের ভূমিকায় তিনি লিখছেন...
‘লোকমান্য মহাত্মা তিলক তাঁহার প্রণীত গীতারহস্য বঙ্গভাষায় অনুবাদ করিবার ভার আমার প্রতি অর্পণ করিয়া আমাকে গৌরবান্বিত করিয়াছেন। তাঁহার অনুরোধ-ক্রমে, বঙ্গবাসীর কল্যাণকামনায়, বঙ্গসাহিত্যের উন্নতিকল্পে, অতীব দুরূহ ও শ্রমসাধ্য হইলেও আমি এই গুরুভার স্বেচ্ছাপূর্বক গ্রহণ করিয়াছিলাম।’
পাণ্ডিত্য প্রকাশের জন্য নয়, এই অনুবাদ বঙ্গবাসীর কল্যাণকামনায়। তাই তার ভাষা এমন হল যে, সেকালের ঘরের মেয়েরাও যেন সহজে বুঝতে পারেন। তিলকও তাই চেয়েছিলেন। সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন অনুবাদ প্রকাশের অনুমতি চেয়ে চিঠি দিলেন, তিলকের জবাব এল...
‘আমার অভিপ্রায় এই যে, অনুবাদটি মূল মহারাষ্ট্রীয়ের ন্যায় বিষয়ের প্রকৃতির সহিত সামঞ্জস্য রাখিয়া যতদূর সম্ভব সরল ভাষায় লিখিত হয়। আমি যতদূর সম্ভব সরল ভাষায় বিষয়টির আলোচনা করিতে চেষ্টা করিয়াছি, যাহাতে আমাদের মেয়েরাও অনায়াসে সকল কথা বুঝিতে পারেন। অনুবাদটিও এইরূপ হওয়া আবশ্যক।’ (চিঠির অনুবাদ মন্মথনাথ ঘোষের)
এই জ্যোতিরিন্দ্রনাথ শহর থেকে দূরের, রাঁচির শান্তিধামের জ্যোতিরিন্দ্রনাথ। বৃদ্ধ জ্যোতিরিন্দ্রনাথ। মুজতবা আলী যাঁর ‘গীতারহস্য’ পড়ে উচ্ছ্বসিত হয়ে লিখেছিলেন, ‘বৃদ্ধ জ্যোতিরিন্দ্রনাথ যৌবনে-শেখা, মরচে-ধরা, জাম-পড়া তাঁর মারাঠীজ্ঞানকে ঝালিয়ে নিয়ে বাঙলায় যে অনুবাদখানি করেছেন তার প্রশংসা করতে গিয়ে আমার অক্ষম লেখনী বার বার তার দুর্বলতা নিয়ে লজ্জিত হয়।’
মারাঠা দেশ দেখা তাঁর সেই দুঃসহ আঠারো বছর বয়সে। ক্যালকাটা কলেজ থেকে এনট্রান্স পাশ করে ঢুকলেন প্রেসিডেন্সি কলেজে, ১৮৬৪-তে। মন অবশ্য পড়ে আছে পাঠ্যবইয়ের বাইরের পড়ায়। সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর তখন সিভিলিয়ান হয়ে কলকাতা এসেছেন। আছেন কাশীপুরের বাগানবাড়িতে। সঙ্গে মনোমোহন ঘোষ। ব্যারিস্টারি পাশ করে এসেছেন। জুটে গেলেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথও। শুরু করে দিলেন ফরাসী ভাষা শিখতে। ভলতেয়ারের ‘সিজার’ (Cæsar) নাটক সেখানেই প্রথম শুনেছেন মনোমোহন ঘোষের কণ্ঠে। শেষ জীবনেও মনে রেখেছেন সেই পাঠ।
এদিকে ফরাসী ভাষা শেখা, জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির বারান্দার আড্ডা চলছে আর ওদিকে শুনছেন সমুদ্রের ডাক। সত্যেন্দ্রনাথের স্ত্রী, তাঁর মেজ-বউ-ঠাকুরাণী জ্ঞানদানন্দিনীর কাছে শুনছেন সমুদ্রের কথা, নতুন শহর বোম্বাইয়ের কথা। পরীক্ষার পড়ায় আর মন বসল না। ঠিক করলেন পরীক্ষা না-দিয়েই চলে যাবেন বোম্বাই, সত্যেন্দ্রনাথের সঙ্গে।
সমুদ্রের ঢেউ ছিল তাঁর মনের ভিতরেও। সিলেবাস, রুটিনের শিকলি-বাঁধা বিদ্যায় হাঁফিয়ে উঠতেন সেই ছোটো থেকেই। হিন্দু স্কুলে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়েন। ক্লাস নিচ্ছেন জয়গোপাল শেঠ। পড়ায় মন নেই জ্যোতিরিন্দ্রনাথের। আঁকছেন ছবি। মাস্টারমশায়েরই। লুকিয়ে আঁকা সে-ছবি নিয়ে রীতিমতো আলোড়ন পড়ে গিয়েছিল স্কুলে।
মেজদা সত্যেন্দ্রনাথ জানতেন ভাইয়ের এই ভালোবাসাটার কথা। ওড়িশার মণিরামপুরে তার প্রমাণও পেয়েছেন। প্রতাপনারায়ণ সিংহ তখন মণিরামপুরে। সেই রায়পুরের সিংহ পরিবারের সন্তান, যাঁদের কাছে বোলপুর মৌজার ভুবনডাঙা গ্রামের কাছে কুড়ি বিঘা জমি মৌরসি পাট্টার বন্দোবস্ত নিয়েছিলেন দেবেন্দ্রনাথ। সে জমিতেই গড়ে উঠেছে ব্রহ্মবিদ্যালয় ও শান্তিনিকেতন। সেই প্রতাপনারায়ণের ছবি এঁকেছিলেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথ, মণিরামপুরে। ছবি-আঁকার এই প্রতিভাটাকে জল-মাটি দিতে বোম্বাইয়ে তাঁর জন্য বাড়িতে আঁকা শেখানোর বন্দোবস্ত করলেন সত্যেন্দ্রনাথ।
ছবি জ্যোতিরিন্দ্রনাথ এঁকেছিলেন জীবনজুড়ে। কেবল পেনসিলে। কেবল মুখের ছবি। ২১ বছর বয়সে সেই যে চিত্রচর্চার শুরু, তা চলল মৃত্যু পর্যন্ত। ১৮৭০ থেকে ১৯২৫—৫৫ বছরে এঁকেছেন প্রায় ১৭০০ ছবি। কোনো কাজেই একটানা বেশিদিন মন বসত না তাঁর। কিন্তু ছবি আঁকাটি ছাড়েননি কোনোদিন। ১৯২৫, মৃত্যুর বছরেও ছবি এঁকেছেন ছ’জনের... শশিভূষণ দত্ত, চপলা দত্ত, গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর, লীলা মৈত্র, সুজাতা দেবী আর জনক গঙ্গোপাধ্যায়।
মুখ আঁকতে ভালোবাসতেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথ। আঁকতেন সামনে বসিয়ে। নানা রকমের মুখ। ভারতে প্রতিকৃতি বা পোর্ট্রেট আঁকার ধারা রাজা-মহারাজা আর বিখ্যাত মানুষদের ধরেই ঘুরপাক খায়। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ তা থেকে বেরিয়ে এলেন। রবীন্দ্রভারতী সোসাইটি থেকে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে তাঁর আঁকা যে-ছবিগুলো আছে, সেই তালিকায় ১৮৭০-এ আঁকা ছবিগুলোর কথাই ধরা যাক। জনৈক ভদ্রলোক (শ্মশ্রুধারী), শিল্পী হরিশচন্দ্র হালদার, কবি বড়াল [অক্ষয়কুমার], দৌলত মাঝি, সত্যপ্রসাদ গঙ্গোপাধ্যায়, গোপালচন্দ্র মজুমদার, নরনাথ মুখোপাধ্যায়।
আসলে মানুষের মুখ তাঁর ভাল লাগত। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর সে-কথাটাই লিখেছেন, ‘...আমরা মুখ বাছি। কিন্তু এই একটি মানুষ তিনি কত বড় চিত্রকর হবার সাধনা করেছিলেন যে, সব মুখ তাঁর চোখে সুন্দর হয়ে উঠল, কি চোখে তিনি দেখতেন যে বিধাতার সৃষ্টি সবই তাঁর কাছে সুন্দর ঠেকল, কোনো মুখ অসুন্দর রইল না। রূপবিদ্যার সাধনা পরিপূর্ণ না করলে তো মানুষ এমন দৃষ্টি পায় না!’
কিন্তু এ কেবল চিত্রকর হওয়ার সাধনা ছিল না। এ আসলে ছিল জ্যোতিরিন্দ্রনাথের ফিজিয়োনমি চর্চার অঙ্গ। ফিজিয়োনমি এখন আর বিজ্ঞান বলে স্বীকৃত নয়, কিন্তু জ্যোতিরিন্দ্রনাথের সময়ে রীতিমতো তার চর্চা ছিল। জ্ঞানদানন্দিনী দেবী সম্পাদিত ঠাকুরবাড়ির ছোটোদের পত্রিকা ‘বালক’-এ সেই কথা লিখছেন ‘মুখ চেনা’ প্রবন্ধে...
‘কতকগুলি অক্ষর ও তাহার যোগাযোগে যত বাক্য হয় তাহা শিখিলে যেমন আমরা একটি ভাষা শিখিতে পারি, সেইরূপ মুখ-চিহ্ন দেখিয়াও আমরা মানুষের চরিত্র বুঝিতে পারি। কিন্তু মনুষ্য-চরিত্র এত বিভিন্ন যে তাহার অনুরূপ মুখের গঠন-চিত্রও অসংখ্য। তাহা আয়ত্ত করা সহজ নহে। সেই জন্য পণ্ডিতেরা এখনও ইহাকে বিজ্ঞানে পরিণত করিতে পারেন নাই। এই বিষয় অনুশীলন করিয়া তাঁহারা যে সকল চিহ্ন ও নিয়ম বাহির করিয়াছেন তাহা সকলেই অনায়াসে পরীক্ষা করিয়া দেখিতে পারেন। এইরূপ পরীক্ষায় আমোদও আছে, উপকারও আছে।’
উপকার কী? দেখতে শেখা। দেখা অভ্যেস করা। লিখছেন, ‘আমরা বাঙ্গালী আমরা চতুর্দিকে যাহা দেখি, কিছুই ভাল করিয়া দেখি না। সব জিনিসই যেন আমরা চোক বুজিয়া দেখি। সম্প্রতি কলিকাতায় যে মহামেলা হয় তাহা দেখিবার জন্য অসংখ্য লোক ত গিয়াছিল, কিন্তু কাহাকেও জিজ্ঞাসা কর দেখি, অমুক জিনিসটা কিরূপ দেখিলে—অমনি চক্ষুস্থির। কেহ হয়তো বলিবে “বেশ দেখিলাম, চমৎকার দেখিলাম, এমন ভাল যে না দেখিলে বুঝান যায় না” — কেহ বলিবে —“তাতে এমন একটা ইয়ে আছে যে ইয়ে হয়েছে সেটা কিছুতেই ইয়ে করা যায় না।” — একজন ইংরাজকে জিজ্ঞাসা কর, তিনি প্রত্যেক জিনিসের তন্নতন্ন বর্ণনা করিবেন— একটি খড়িকা পর্যন্ত তিনি ছাড়িবেন না। তাই বলিতেছি যদি এই মুখ পরীক্ষায় আর কোন ফল না হয়, অন্ততঃ খুঁটিনাটি করিয়া দেখিবার অভ্যাসটি হয়।’
সেই অভ্যাসটা, খুঁটিনাটি করে মানুষকে দেখার ওই আশ্চর্য আগ্রহেই তো উনিশ শতকের কলকাতার জাহাজের কাপ্তেন, ইঞ্জিনিয়ার, মিস্ত্রিদের ছবি রয়ে গেল শহরের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে। ১৮৮৩-তে ক্যাপ্টেন রাসেল, মিস্টার লো (স্টিমারের ইঞ্জিনিয়ার), ক্যাপ্টেন বরকার, মিস্টার লাইং, মিস্টার সি আই গিবসন ও মিস্টার রক্স বোরো (স্টিমারের অফিসার) এবং ১৮৮৪-তে জনৈক মিস্ত্রি ও সরোজিনী স্টিমারের করণিক শশীর মুখ আঁকলেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথ। জাহাজ-ব্যবসা হয়তো তাঁর তলিয়ে গিয়েছিল, রয়ে গিয়েছে এই জল-ছবিগুলি।
নিছক জ্ঞানার্জনে আগ্রহ ছিল না জ্যোতিরিন্দ্রনাথের। ভাবতেন যা, করে দেখতে চাইতেন। শিরোমিতিবিদ্যা বা ফ্রেনোলজি নিয়ে পড়লেন যখন, সে নিয়ে কেবল প্রবন্ধই লিখলেন না, রীতিমতো তার প্রয়োগ করতে চাইলেন। মস্তক পরীক্ষা শিরোনামে বিজ্ঞাপন দিলেন ১৮৮৬ সালে ‘ভারতী ও বালক’ পত্রিকায়—
‘যাঁহারা নিজ মানসিক শক্তি ও স্বাভাবিক প্রবণতা জানিতে ইচ্ছা করেন এবং যাঁহারা জানিতে চাহেন যে কোন্ ব্যবসায়ের জন্য কিম্বা কোন্ বিদ্যালোচনার জন্য উপযুক্ত তাঁহারা নিম্নলিখিত ঠিকানায় আসিলে শিরোমিতি (Phrenology) বিদ্যার নিয়মানুসারে তাঁহাদের মস্তক পরীক্ষা করিয়া উপরোক্ত জিজ্ঞাস্য বিষয় সকল তাঁহাদিগকে বিনা মূল্যে, অবগত করা যাইবে। সময়।—প্রতি রবিবার প্রাতঃকাল ৮টা হইতে ১০টা পর্যন্ত। এবং অপরাহ্ণ ২টা হইতে ৪টা পর্যন্ত। ৬ নং দ্বারিকানাথ ঠাকুরের লেন, যোড়াসাঁকো কলিকাতা।’
৬ নম্বর দ্বারকানাথ ঠাকুর লেনের জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি তখন এ ভারতে নিত্য বিচিত্রের দূত। আর তার সব থেকে রঙিন মানুষটি জ্যোতিরিন্দ্রনাথ। দেশের জন্য গান লিখেছেন, নাটক লিখেছেন... সে-সবই আমরা বেশি মনে রাখি। তার চেয়েও বেশি যে সারা জীবন দেশের বোধ জাগিয়ে তুলতে চেয়েছিলেন বাঙালির মধ্যে, সেটা মনে রাখি না। সেই চেষ্টাতেই একদিন তিনি উতলা হয়ে উঠলেন দেশের মানুষের জন্য সর্বজনীন একটা পোশাক তৈরি করতে। ভারতীয় বলে চেনা যায়, এমন একটা সার্বজনিক পোশাক চাই সবার জন্য। কেমন হবে সে পোশাক? ভেবে বের করলেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথই। রবীন্দ্রনাথ লিখছেন, ‘ভারতবর্ষের একটা সর্বজনীন পরিচ্ছদ কি হইতে পারে এই সভায় জ্যোতিদাদা তাহার নানাপ্রকারের নমুনা উপস্থিত করিতে আরম্ভ করিলেন। ধুতিটা কৰ্ম্মক্ষেত্রের উপযোগী নহে অথচ পায়জামাটা বিজাতীয়, এই জন্য তিনি এমন একটা আপোষ করিবার চেষ্টা করিলেন যেটাতে ধুতিও ক্ষুণ্ণ হইল, পায়জামাও প্রসন্ন হইল না। অর্থাৎ তিনি পায়জামার উপর একখণ্ড কাপড় পাট করিয়া একটা স্বতন্ত্র কৃত্রিম মালকোঁচা জুড়িয়া দিলেন। সোলার টুপির সঙ্গে পাগড়ির মিশাল করিয়া এমন একটা পদার্থ তৈরি হইল যেটাকে অত্যন্ত উৎসাহী লোকেও শিরোভূষণ বলিয়া গণ্য করিতে পারে না। এইরূপ সর্বজনীন পোষাকের নমুনা সর্বজনে গ্রহণ করিবার পূর্বেই একলা নিজে ব্যবহার করিতে পারা যে-সে লোকের সাধ্য নহে। জ্যোতিদাদা অম্লানবদনে এই কাপড় পরিয়া মধ্যাহ্নের প্রখর আলোকে গাড়িতে গিয়া উঠিতেন—আত্মীয় এবং বান্ধব, দ্বারী এবং সারথি সকলেই অবাক্ হইয়া তাকাইত, তিনি ভ্রুক্ষেপমাত্র করিতেন না। দেশের জন্য অকাতরে প্রাণ দিতে পারে এমন বীরপুরুষ অনেক থাকিতে পারে কিন্তু দেশের মঙ্গলের জন্য সর্বজনীন পোষাক পরিয়া গাড়ি করিয়া কলিকাতার রাস্তা দিয়া যাইতে পারে এমন লোক নিশ্চয়ই বিরল।’
ভারতীয় রসশাস্ত্রে বলে, বীররসের মূল ভাব উৎসাহ। অদম্য উৎসাহেই রবীন্দ্রনাথের জ্যোতিদাদা বীরপুরুষ। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘তিনি নিজে উৎসাহী এবং অন্যকে উৎসাহ দিতে তাঁহার আনন্দ।’ প্রবল আনন্দময় উৎসাহেই দিশি তাঁতে তৈরি গামছা মাথায় বেঁধে হিন্দুমেলায় গিয়েছিলেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথ।
তখন স্বদেশির যুগের আগমনি হাওয়া বইছে শহরে। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ তৈরি করলেন ‘হা ম চূ পা মূ হা ফ’। ‘হ য ব র ল’-র মতো শোনাচ্ছে বটে, তবে সংকেত-সূত্রটি বলে দিলে ব্যাপারটা আর ধাঁধার চেয়েও জটিল থাকবে না। সূত্রটার মূল কথা উলটে দেখ, পালটে গিয়েছে। আ-কারের জায়গায় অ-কার হবে। ই হবে উ। এই তো গেল স্বরবর্ণ। ব্যঞ্জনবর্ণের ক্ষেত্রে ‘ক খ গ ঘ’ হবে ‘গ ঘ ক খ’। বাকি সব বর্গেই একই নিয়ম। শ হবে ষ। স হবে হ। হ হবে স। ম হবে ন। ঞ নেই, ন পড়তে হবে। সব ক্ষেত্রেই উলটোটা হবে। এই বার সংকেত অনুযায়ী লিখে দেখুন, দাঁড়াবে ‘সঞ্জীবনী সভা’।
সংকেত কেন? কারণ, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের খেয়ালে তৈরি এই সভাটি গুপ্ত। ঠনঠনের এক পোড়ো বাড়িতে অধিবেশন বসত সভার। দেড়শো বছর আগে। সভাপতি রাজনারায়ণ বসু। সভার কাজ কী? ভারত-উদ্ধার। ‘জ্যোতিদাদা এক গুপ্তসভা স্থাপন করেছেন, একটি পোড়ো-বাড়িতে তার অধিবেশন; ঋগ্বেদের পুঁথি, মড়ার মাথার খুলি আর খোলা তলোয়ার নিয়ে তার অনুষ্ঠান; রাজনারায়ণ বসু তার পুরোহিত; সেখানে আমরা ভারত-উদ্ধারের দীক্ষা পেলেম।’ মৃত্যুর দশ বছর আগে, ১৯৩১-এ কলকাতার টাউন হলে এই স্মৃতিচারণ রবীন্দ্রনাথের। বয়স তখন সত্তর। কুড়ি বছর আগে বয়স যখন পঞ্চাশ, তখনও জ্যোতিদাদার ওই গুপ্তসভার কথা লিখেছেন ‘জীবনস্মৃতিতে’... ‘জ্যোতিদাদার উদ্যোগে আমাদের একটি সভা হইয়াছিল, বৃদ্ধ রাজনারায়ণবাবু ছিলেন তাহার সভাপতি। ইহা স্বাদেশিকের সভা। কলিকাতার এক গলির মধ্যে এক পোড়ো বাড়িতে সেই সভা বসিত। সেই সভার সমস্ত অনুষ্ঠান রহস্যে আবৃত ছিল। বস্তুত, তাহার মধ্যে ওই গোপনীয়তাটাই একমাত্র ভয়ংকর ছিল। আমাদের ব্যবহারে রাজার বা প্রজার ভয়ের বিষয় কিছুই ছিল না। আমরা মধ্যাহ্নে কোথায় কী করিতে যাইতেছি, তাহা আমাদের আত্মীয়রাও জানিতেন না। দ্বার আমাদের রুদ্ধ, ঘর আমাদের অন্ধকার, দীক্ষা আমাদের ঋকমন্ত্রে, কথা আমাদের চুপিচুপি—ইহাতেই সকলের রোমহর্ষণ হইত, আর বেশি-কিছুই প্রয়োজন ছিল না।’
বিপ্লবের আঁচ পোয়ানোর কথাটা বলেছেন বিপ্লবী বারীন্দ্রকুমার ঘোষও। বারীন্দ্রকুমার ছিলেন রাজনারায়ণ বসুর মেয়ের দিকের নাতি। তাঁর ‘বোমার যুগের কাহিনী’ বলছে,
‘আমাদের এই সত্যিকার দেশ উদ্ধারের আগে পোষাকী দেশ উদ্ধারের চেষ্টা অনেকবার হয়ে গেছে, অন্ততঃ দুটি গুপ্ত সমিতির কথা আমিই জানি। প্রথম যখন দাদাবাবুরা যুবা ও হাজার হুজুগের রঙ্গী ছিলেন, তখন তাঁরা একবার গুপ্ত সমিতি স্থাপন করেন; এখনকার অনেক বড় বড় মানুষ তা’তে ছিলেন, তাঁদের কয়েকজন এখনও ইহলোকে, বাকি পরলোকে। তা’তে দীক্ষা দেওয়া হতো একটি অন্ধকার ঘরে। সেখানে বেদীতে লাল সালুর ওপর মড়ার মাথা রাখা হোত, তার দু'পাশে দেশানুরাগের প্রতীক দু’টি মোমবাতি জ্বলতো আর তলোয়ার ঝল্ মল করতো। বাঙ্গালীর দেশানুরাগ তখন ছিল যা', তার ঠিক প্রতীক মোমবাতিই বটে, যতক্ষণ সুতো আর মোম ততক্ষণ আলো। তাঁদের অতি গম্ভীর চালে সভা বসতো তাতে দেশে বিদ্রোহ জাগাবার লাখ ফন্দী দরিদ্রের মনোরথের মতো উঠতো আর হৃদি-হ্রদে লীন হ’তো। ঘরটির কোণে একজন কিন্তু সভ্য বসে থাকতেন আর মাঝে মাঝে প্রত্যেক প্রস্তাবের উত্তেজনার মুখে বলতেন, ‘কিস্সু হবে না’। শেষে সেই বুদ্ধিমানের কথাই ফললো, জীবনের নাগর-দোলায় পাক খেতে খেতে কে কোথায় গেলেন তার পাত্তা রইলো না।’
তবু উদ্যমটা বৃথা হয়ে যায়নি। দ্বারকানাথের পরে ঠাকুর পরিবারে একমাত্র বাণিজ্যেতে যাওয়া পুরুষ জ্যোতিরিন্দ্রনাথ। অলক্ষ্মীকেই পেয়েছিলেন হয়তো। তবু, নীল আর পাট চাষে কিছু লাভ করে স্টিমারের ব্যাবসা শুরু করলেন। দ্বারকানাথের মতো কেবল টাকা করার জন্য নয়। জ্যোতিরিন্দ্রনাথের বাণিজ্য-উদ্যোগের নেপথ্যে ছিল স্বদেশ সম্পর্কে গভীর আগ্রহ। নীল নিয়ে শুধু মূলধন খাটিয়ে ব্যবসাই করেননি তিনি, বুঝতে চেয়েছেন পণ্যটিকে, তার ইতিহাস ও আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষিতকে। লিখেছেন প্রবন্ধও, ‘নীলের বাণিজ্য’! ‘এই বাণিজ্যের ইতিহাস পর্যালোচনা করিয়া দেখা যায় যে, যেইমাত্র য়ুরোপীয়েরা ওয়েষ্ট-ইণ্ডিস ও উত্তর আমেরিকার দক্ষিণ অংশে নীলের চাষ ও তাহার কারখানাকার্য্যে মনোযোগী হইলেন অমনি ভারতবর্ষীয় নীল হীনপ্রভ হইয়া পড়িল, আবার যখনই য়ুরোপীয়েরা এখানে আসিয়া তাঁহাদিগের উদ্যম ও নৈপুণ্য নিয়োগ করিলেন, অমনি আবার আমাদের নীল পৃথিবীর মধ্যে সর্ব্বোৎকৃষ্ট হইয়া উঠিল। অতএব দেখা যাইতেছে, য়ুরোপীয় উদ্যম ও নৈপুণ্যের নিকট আমরা অনেক বিষয়ে ঋণী। অনেকে ক্রমাগত এই বলিয়া আক্ষেপ করেন যে, ইংরাজেরা আমাদের দেশ হইতে অজস্র ধনরত্ন লুটিয়া লইয়া যাইতেছেন, কিন্তু তাঁহাদের জানা উচিত যে উদ্যোগী পুরুষকেই লক্ষ্মী আশ্রয় কবেন। আমাদের লক্ষ্মী আমাদিগকে ত্যাগ করিয়া যে বিদেশীয়দিগকে আশ্রয় করিতেছেন, তাহার কারণই এই যে আমরা তাঁহার অযোগ্য, আমাদের নিজের দোষেই আমরা তাঁহার প্রসাদ হইতে বঞ্চিত হইয়াছি। তার জন্য আক্ষেপ করা বৃথা।’
রবীন্দ্রনাথের কলমে জ্যোতিরিন্দ্রনাথের ব্যর্থতার সরস স্মৃতি আছে, ‘কাগজে কী একটা বিজ্ঞাপন দেখিয়া একদিন মধ্যাহ্নে জ্যোতিদাদা নিলামে গিয়া ফিরিয়া আসিয়া খবর দিলেন যে, তিনি সাত হাজার টাকা দিয়া একটা জাহাজের খোল কিনিয়াছেন। এখন ইহার উপরে এঞ্জিন জুড়িয়া কামরা তৈরি করিয়া একটা পুরা জাহাজ নির্মাণ করিতে হইবে। দেশের লোকেরা কলম চালায়, রসনা চালায় কিন্তু জাহাজ চালায় না, বোধ করি এই ক্ষোভ তাঁহার মনে ছিল। দেশে দেশালাইকাঠি জ্বালাইবার জন্য তিনি একদিন চেষ্টা করিয়াছিলেন, দেশালাইকাঠি অনেক ঘর্ষণেও জলে নাই; দেশে তাঁতের কল চালাইবার জন্যও তাঁহার উৎসাহ ছিল কিন্তু সেই তাঁতের কল একটিমাত্র গামছা প্রসব করিয়া তাহার পর হইতে স্তব্ধ হইয়া আছে। তাহার পরে স্বদেশী চেষ্টায় জাহাজ চালাইবার জন্য তিনি হঠাৎ একটা শূন্য খোল কিনিলেন, সে-খোল একদা ভরতি হইয়া উঠিল শুধু কেবল এঞ্জিনে এবং কামরায় নহে—ঋণে এবং সর্বনাশে।’
এই মজাটুকুই আমাদের মনে থাকে। আর মনে থাকে জ্যোতিরিন্দ্রনাথের কলম চালানোর কথা, সুরের সাধনার কথা। সাহিত্য আর সংগীতচর্চা ছাড়া, রবীন্দ্রনাথকে নিজের আলোয় নিজের আকাশে মুক্তি দেওয়ার কথাটা ছাড়া ওই অন্য জ্যোতিরিন্দ্রনাথকে আমরা সেভাবে মনেই রাখিনি। তাতে কী! রাঁচির শান্তিধামে একা একা শেষ জীবন কাটানো জ্যোতিরিন্দ্রনাথ তো রইলেন দেশের খাতায় সেই দুর্লভ মানুষদের একজন হয়ে যাঁরা,
‘দেশের কর্মক্ষেত্রের উপর দিয়া বারম্বার নিষ্ফল অধ্যবসায়ের বন্যা বহাইয়া দিতে থাকেন; সে-বন্যা হঠাৎ আসে এবং হঠাৎ চলিয়া যায় কিন্তু তাহা স্তরে স্তরে যে-পলি রাখিয়া চলে তাহাতেই দেশের মাটিকে প্রাণপূর্ণ করিয়া তোলে-তাহার পর ফসলের দিন যখন আসে তখন তাঁহাদের কথা কাহারও মনে থাকে না বটে, কিন্তু সমস্ত জীবন যাঁহারা ক্ষতিবহন করিয়াই আসিয়াছেন, মৃত্যুর পরবর্তী এই ক্ষতিটুকুও তাঁহারা অনায়াসে স্বীকার করিতে পারিবেন।’