


মৃণালকান্তি দাস: পল হেনরি ও’নেইল ছিলেন বুশ প্রশাসনের ট্রেজারি সেক্রেটারি। সেই পল হেনরি ইরাক আক্রমণ নিয়ে খুল্লামখুল্লা মন্তব্য করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘২০০১ সালের জানুয়ারিতে বুশ ক্ষমতায় এসেই প্রথম মিটিং করেন ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সঙ্গে। সেই মিটিংয়ে আমিও ছিলাম। কোনো রাখঢাক না রেখেই বুশ বলেছিলেন, সাদ্দামকে উৎখাত করার একটা উপযুক্ত পথ খুঁজে বের করতে হবে। একথা শুনে আমি স্তম্ভিত। মনে মনে শুধু বললাম, বলে কী!’ রাষ্ট্রসঙ্ঘ গোপনে এবং প্রকাশ্যে অন্তত ৪০০ বার অনুসন্ধান করেও ৯/১১-এর সঙ্গে সাদ্দাম হুসেনের কোনো যোগসূত্র খুঁজে পায়নি। বুশকে যখন একথা জানানো হয়, তখন তিনি বলেছিলেন, ‘লুক ইনটু সাদ্দাম, ইরাক।’
দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর পুলিৎজার জয়ী মার্কিন সাংবাদিক রন সুসকিন্ডের লেখা ‘দ্য প্রাইস অব লয়্যালটি’ বইয়ে পল হেনরি ও’নেইলের প্রতিটি কথা লিপিবদ্ধ রয়েছে। যেখানে স্পষ্ট, জর্জ ডব্লু বুশের ইরাক আক্রমণ ছিল পূর্বপরিকল্পিত। নির্বাচনি লড়াইয়ে নামার আগেই বুশ ইরাক আক্রমণের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলেন। শুধু অজুহাত খুঁজছিলেন। এমনকি মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ, ডিফেন্স ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি এবং ব্রিটেনের গোয়েন্দা সংস্থা এমআই-৬ তন্ন তন্ন করে খুঁজেও সাদ্দাম হুসেনের সঙ্গে টুইন টাওয়ার হামলার কোন যোগসূত্র দাঁড় করাতে পারেনি। বুশ প্রশাসনকে তারা জানায়, আসলে সাদ্দামকে যতটুকু শক্তিশালী মনে করা হচ্ছে, তিনি তার অর্ধেক শক্তিরও অধিকারী নন। তাঁর কাছে গণবিধ্বংসী কোনো অস্ত্র নেই। নতুন করে বানানোর ক্ষমতাও নেই। আমেরিকা বা অন্য কোনো রাষ্ট্রের জন্য বিপদ নন সাদ্দাম। এসব রিপোর্ট পড়ে বুশ গম্ভীর গলায় বলেছিলেন, ‘ফাইন্ড এ ওয়ে’। যেভাবেই হোক, একটা রাস্তা খুঁজে বের করো।
শুধুমাত্র গোটা দুনিয়ায় নিজের কর্তৃত্ব ধরে রাখতে এবং ক্রমশ পতনের মুখে থাকা অর্থনীতিকে চাঙা করার জন্যই বুশ প্রশাসন ইরাক আক্রমণ করে। যুদ্ধের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল হাইড্রোকার্বনে একচ্ছত্র প্রভাব প্রতিষ্ঠা করা। ইরাকে আছে তেলের ভাণ্ডার। সেই তেলের ভাণ্ডারে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার পথ ছিল একটাই—যুদ্ধ। সেই যুদ্ধে আমেরিকা মোতায়েন করেছিল ২ লক্ষ ৫৫ হাজার সেনা। মার্কিন বাহিনী ইরাকের মাটিতে পা দিয়েই তেল ভাণ্ডারের চাবি হাতে তুলে নিয়েছিল। তারপর চলেছিল ‘আইওয়াশ’। সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ। ধরো আর মারো।
২০০৩ সালের ১ মে। সন্ধ্যার দিকে প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লু বুশ ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’ যুদ্ধজাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করেছিলেন, ইরাকে বড়ো ধরনের যুদ্ধপর্ব শেষ হয়েছে। তাঁর মাথার ঠিক উপরে ঝুলছিল বিশাল ব্যানার। যেখানে লেখা, ‘মিশন অ্যাকমপ্লিশড’। যুদ্ধজাহাজটি তখন ইরাকের ধারেকাছে কোথাও ছিল না। সেটি ইরাক থেকে প্রায় সাড়ে বারো হাজার কিলোমিটার দূরে ক্যালিফোর্নিয়ার সান দিয়াগো শহরের সমুদ্রপাড়ে নিরাপদে দাঁড়িয়েছিল। এরপর থেকে টেলিভিশনের পর্দায় আর সংবাদপত্রের পাতায় দিনের পর দিন ‘মিশন অ্যাকমপ্লিশড’ লেখা হলেও বাস্তব ছবিটা ছিল আলাদা। বুশের ওই নাটকীয় ভাষণের পরই ইরাকে শুরু হয় বিদ্রোহ আর পশ্চিম এশিয়াজুড়ে আঞ্চলিক অস্থিরতা। মাথা তুলেছিল বিশ্বের অন্যতম ভয়ংকর জঙ্গি সংগঠন—আইসিস। আমেরিকার জন্য এটা ছিল বড়ো ধরনের একটা শিক্ষা। আর বুশের জন্য আজীবন যন্ত্রণা-তাচ্ছিল্য!
২০২১ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর। ডোনাল্ড ট্রাম্প (তখন পরাজিত প্রেসিডেন্ট) বলেছিলেন, বুশের মুখে লেকচার দেওয়া মানায় না। ‘নাইন-ইলেভেন’-এর সন্ত্রাসবাদী হামলায় নিহত ব্যক্তিদের স্মরণে ১১ সেপ্টেম্বর পেনসিলভেনিয়ায় আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য রেখেছিলেন বুশ। সেই স্মরণসভায় বুশ আমেরিকার বাইরের উগ্রপন্থীদের সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরে বেড়ে ওঠা ডানপন্থী উগ্রবাদীদের তুলনা করেছিলেন। ক্যাপিটল হিলে হামলায় যোগ দেওয়া উগ্রবাদী ও বাইরের দেশের উগ্রপন্থীদের চেতনা এক বলে মন্তব্য করেছিলেন তিনি। বুশের সেই বক্তব্যের জবাবে তাঁকে তুলোধনা করেছিলেন ট্রাম্প। ইমেলে ট্রাম্প লিখেছিলেন, ‘উগ্রবাদ নিয়ে জর্জ বুশের বক্তৃতা আমাদের শুনতে হচ্ছে! বুশই আমেরিকাকে টেনে নিয়ে গিয়ে যুদ্ধে নামিয়েছিলেন আফগানিস্তান ও মরু দেশগুলিতে। তিনি সেসব যুদ্ধে হেরেছেন! এখন সেই বুশই বলছেন, আমেরিকার ডানপন্থী লোকজন বাইরের উগ্রবাদীদের চেয়ে ভয়ংকর! যুদ্ধে বুশ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় কেন করেছিলেন? এই অর্থই লাখো মানুষের মৃত্যুর কারণ।’
তথ্য বলছে, ইরাক যুদ্ধে আমেরিকার খরচ হয়েছে প্রায় ২ লক্ষ কোটি মার্কিন ডলার। যার ক্ষত এখনও বয়ে বেড়াচ্ছে ইরাক। গত ১৬ বছরেও ইরাক স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে পারেনি। এই আগ্রাসনে ইরাক তো ছিন্নভিন্ন হয়েছে, আমেরিকাও হারিয়েছে অন্তত ৪ হাজার সেনা। ফলে সেদিন বুশের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের তোপকেই মান্যতা দিয়েছিল আমেরিকা।
কিন্তু দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এসেই ‘শান্তিবাদী’ নেতার মুখোশ পড়ে থাকা সেই ট্রাম্প হয়ে উঠলেন আরও ভয়ংকর। ‘শান্তিবাদী’ মুখোশ খসে সামনে এসেছে তাঁর ফ্যাসিবাদী রূপ। বুশ তবুও ইরাকের বিরুদ্ধে নানা মিথ্যা অভিযোগ তুলে মার্কিনিদের ভোলাতে পেরেছিলেন। কিন্তু ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে যে সমস্ত অভিযোগ তুলেছেন, তা তার ভোটদাতারাও বিশ্বাস করছেন না। ফলে আমেরিকার দুই-তৃতীয়াংশ মানুষই ইরান আক্রমণের বিরুদ্ধে। বর্তমানে ট্রাম্পের জনসমর্থন প্রায় তলানিতে। তালগোল পাকিয়ে তিনি এখন ইরানে ‘রেজিম চেঞ্জে’র বাহানা ধরেছেন। আমেরিকানদের কাছে স্পষ্ট, ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু এখন গোটা বিশ্বকে ঠেলে দিচ্ছে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের মুখে। নেতানিয়াহু আগেই গাজায় গণহত্যার দায়ে অভিযুক্ত। আর ট্রাম্প এখন বিশ্বের সেরা যুদ্ধবাজ হিসাবে প্রমাণিত। তাঁরা বুঝে গিয়েছেন, বর্তমান এককেন্দ্রিক ভারসাম্যহীন দুনিয়ায় তাঁদের ঠেকানোর কেউ নেই।
যুদ্ধে উসকানি দেওয়া বা নানাভাবে যুদ্ধের ক্ষেত্র তৈরি করায় আমেরিকার সুদীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। ১৯৮৬ সালে আজকের ইরানের মতোই লিবিয়াকে যুদ্ধে নামার উসকানি দিয়েছিল রোনাল্ড রেগান প্রশাসন। লিবিয়ার তৎকালীন নেতা গদ্দাফিকে যুদ্ধে টেনে আনতে দেশটির সমুদ্রসীমায় রণতরীর সমাবেশ ঘটিয়েছিল আমেরিকা। সেটি যে সুপরিকল্পিত উসকানি ছিল, তা লস এঞ্জেলস টাইমসের কাছে স্বীকারও করেছিলেন মার্কিন নৌবাহিনীর এক শীর্ষকর্তা। গদ্দাফি ওই উসকানির ফাঁদে পা দিয়ে লিবিয়ার সমুদ্রসীমায় টহল দেওয়া মার্কিন যুদ্ধবিমান লক্ষ্য করে অন্তত ছ’টি ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিলেন। যা তাঁর গায়ে চিরতরে ভয়ংকর স্বৈরাচারীর তকমা লাগিয়ে দেয়। সেটাই ছিল গদ্দাফির পতনের শুরু। ভিয়েতনাম যুদ্ধও হয়েছিল আমেরিকার উসকানির জেরে। যার পরিণতিতে ৫৭ হাজার মার্কিন সেনা ও ১০ লক্ষেরও বেশি ভিয়েতনামি সেনার মৃত্যু হয়েছিল। আজ ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের সঙ্গে যে যুদ্ধে জড়িয়েছে, তাও উসকানির পরিণতি বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেকে যতই ‘গ্রেট ডিলমেকার’ দাবি করুন না কেন, শুরু থেকেই বিশ্ব তাঁকে একজন ‘যুদ্ধবাজ’ নেতা হিসাবেই দেখেছে। হোয়াইট হাউসের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তিনি উত্তর কোরিয়া, ইরান, ভেনেজুয়েলা, কিউবা, গ্রিনল্যান্ড সহ বিভিন্ন দেশের বিরুদ্ধে নানা উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়েছেন। ২০১৭ সালে ওভাল অফিসে প্রবেশের পরই তাঁর তৎকালীন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মাইকেল ফ্লিন তেহরানকে হুমকি দিয়ে বলেছিলেন, ‘আমরা ইরানকে সতর্ক করছি।’ সেটাই ছিল প্রথম উসকানি। পরিস্থিতি এমন নয় যে, ইরান এই যুদ্ধে জিতে যাবে। তবে আমেরিকা ও ইজরায়েলকে তারা যতদিন আঘাত করে যুদ্ধকে টিকিয়ে রাখতে পারবে, ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর পায়ের তলা থেকে মাটি সরতে থাকবে তত দ্রুত।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের কূটনীতি বিষয়ক লেখক সাইমন টিসডল লিখছেন, ২০০৩ সালে ইরাকে জর্জ ডব্লু বুশের আক্রমণের নির্দেশের সঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরান অবরোধের বিস্ময়কর মিল দেখা যায়। দু’টি ঘটনাই ভিয়েতনাম যুদ্ধ থেকে শুরু করে ১৯৫৩ সালের সিআইএ নেতৃত্বাধীন ইরান অভ্যুত্থান পর্যন্ত ব্যর্থ ও ব্যয়বহুল মার্কিন হস্তক্ষেপের দীর্ঘ ইতিহাসের ধারাবাহিক কাহিনি। ট্রাম্প বিদেশে অযথা যুদ্ধ এড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি সেই প্রতিশ্রুতি ভেঙেছেন। মার্কিন বিদেশনীতিতে মৌলিক পরিবর্তন এসেছে বলে যাঁরা ভাবেন, তাঁরা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সাম্রাজ্যবাদী অহংকারের ইতিহাস দেখে নিতে পারেন। সেদিক থেকে ট্রাম্প অতীতের কর্তৃত্ববাদীদেরই উত্তরসূরি।
ট্রাম্প একটু ভিন্ন। কারণ, তিনি ‘স্বাধীনতা রক্ষা’র মতো প্রচলিত অজুহাত বেশি ব্যবহার করেন না। ভেনেজুয়েলায় হামলার সময় তিনি খোলাখুলি বলেছিলেন, তিনি তেলের দখল চান। এই পার্থক্য থাকলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের সঙ্গে অতীতের অনেকের মিল পাওয়া যায়। বুশের মতো ট্রাম্পও মিথ্যার ভিত্তিতে সংকট তৈরি করেছেন এবং নিজেই সেই ফাঁদে পড়েছেন। গত বছর ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা ‘সম্পূর্ণ ধ্বংস’ করার দাবি করেছিলেন। এখন সেই দাবির ভারে তিনি নিজেই বন্দি। বুশ ও টনি ব্লেয়ার যেমনটি করেছিলেন, ট্রাম্পও ইরানকে আমেরিকার জন্য বড়ো বিপদ হিসাবে তুলে ধরে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে জাহির করছেন। ভিত্তিহীনভাবে দাবি করছেন, ইরানের ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ‘শীঘ্রই’ মার্কিন ভূখণ্ডে পৌঁছাতে পারে। তাঁর এই দাবি সাদ্দাম হুসেনের গণবিধ্বংসী অস্ত্র নিয়ে মার্কিন ও ব্রিটিশ রাজনীতিকদের মিথ্যা দাবির কথা মনে করিয়ে দেয়। ইজরায়েলের ‘প্রতিরোধমূলক হামলা’র দাবিও বিভ্রান্তিকর। এমন কোনো প্রমাণ নেই যে, এবার ইরান আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। বরং গত জুনে দেশটির উপর ভয়াবহ হামলার পর শান্তি বজায় রাখতেই মরিয়া ছিল তেহরান।
ইরানে হামলার পর ওবামার প্রাক্তন উপদেষ্টা বেন রোডস লিখেছেন, ‘ট্রাম্প আমেরিকা ও বিশ্বের জন্য আরও বড়ো বিপদ।’ রোডস প্রশ্ন তুলেছেন, ‘কীসের ভিত্তিতে আমেরিকা এমন এক বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, যে তাদের আধিপত্য মানতে চায় না? আমরা আবারও প্রয়োজনের অজুহাত দেখিয়ে আগ্রাসনের এক নতুন পর্বে প্রবেশ করছি।’ যার জন্য প্রথম ২৪ ঘণ্টায় আমেরিকার ব্যয় হয়েছে ৭৭৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ৬,৯০০ কোটি)। আমেরিকার আর্থিক বিশ্লেষক কেন্ট স্মেটার্সের মতে, এই যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে আমেরিকাকে অন্তত ১৮.৮৭ লক্ষ কোটি টাকা ব্যয় করতে হবে। মার্কিনিরা কি তা মেনে নেবেন? মার্কিন সেনেট ইন্টেলিজেন্স কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান মার্ক ওয়ার্নারের কথায়, ট্রাম্পের নীতিতে ইরাকের মতো ইরানেও যুদ্ধের ফাঁদে আটকে গিয়েছে আমেরিকা।