


বিশেষ নিবন্ধ, তন্ময় মল্লিক: বঙ্গ বিজেপি এক কোটি নাম বাদ যাবে বলে হুংকার দিয়েছিল। নাম বাতিল এবং ‘বিচারাধীন’ ভোটার মিলিয়ে নির্বাচন কমিশন সংখ্যাটা মোটামুটি তার কাছাকাছি দাঁড় করিয়ে রেখেছে। নির্বাচনি বিধি লাগু হলে অফিসারদের দেখে নেওয়ার হুমকি দিয়েছিল বিজেপি। নির্বাচন ঘোষণা হতে না হতেই মুখ্যসচিব, স্বরাষ্ট্র সচিব, রাজ্য পুলিশের ডিজি সহ একঝাঁক জেলাশাসক ও এসপিকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। বিজেপি চেয়েছিল, বাংলায় ভোট হোক দু’দফায়। কমিশন দু’দফাতেই ভোট ঘোষণা করেছে। হতে পারে প্রতিটি ঘটনাই কাকতালীয়। আবার হতে পারে বিরোধীদের অভিযোগ একশো শতাংশ সঠিক, বিজেপির কথাতেই চলছে কমিশন। একথা ঠিক, বেশি সংখ্যক ‘বিচারাধীন’কে বাইরে রেখেই জ্ঞানেশ কুমার ভোট করাতে চাইছেন বলেই তাঁর এত তড়িঘড়ি। তবে, তা করতে গিয়ে বাংলার আইনশৃঙ্খলা নিয়ে বিরোধীদের তোলা যাবতীয় অভিযোগ পরোক্ষে তিনি নস্যাৎ করে দিয়েছেন।
একুশের নির্বাচনে বাংলাকে পাখির চোখ করেছিল দিল্লি বিজেপি। গেরুয়া শিবির মনে করেছিল, সন্ত্রাস এবং রিগিংয়ের জোরে তৃণমূল ভোটে জেতে। তথাকথিত ‘স্বশাসিত’ এবং ‘নিরপেক্ষ’ নির্বাচন কমিশনও তেমনটাই ভেবেছিল। কেন্দ্রীয় বাহিনী দিয়ে আট দফায় ভোট করিয়েছিল কমিশন। মহামারি করোনার দাপটে মানুষ যখন কার্যত গৃহবন্দি, তখনও দফা কমায়নি কমিশন। পুলিশকে বুথের ত্রিসীমানায় ঘেঁষতে দেয়নি। কারণ বিজেপির ধারণা, পুলিশ তৃণমূলকে ভোটে জেতায়। তাই বুথ সামলানোর দায়িত্ব দিয়েছিল কেন্দ্রীয় বাহিনীকে। কিন্তু, তাতেও লাভ হয়নি। উলটে আরও বেশি আসন জিতে ক্ষমতায় ফিরেছিল তৃণমূল।
এখন বিজেপি মনে করছে, বেশি দফায় ভোট করলে লাভবান হয় রাজ্যের শাসক দল। যেখানে ভোট মিটে যায় সেখানকার গুন্ডা-মস্তান গিয়ে অন্য এলাকায় ভোট করায়। তাই এবার প্রথম থেকেই দুই অথবা তিন দফায় ভোট করানোর দাবি জানিয়েছিল বিজেপি। কমিশন সেই দাবি মেনে নিয়ে দু’দফায় ভোট করছে।
এছাড়াও বিজেপি বিশ্বাস করে, দীর্ঘদিন রাজ্যের ক্ষমতায় থাকার সুবাদে পুলিশ এবং প্রশাসনের অফিসাররা তৃণমূলের ‘দলদাসে’ পরিণত হয়েছে। তাই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার যে সমস্ত অফিসারকে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসিয়েছে, তাঁদের
রেখে ভোট করালে লাভবান হবে শাসক দল। এই ভাবনা থেকেই বঙ্গ বিজেপি বেশকিছু অফিসারের নামের তালিকা দিল্লির কর্তাদের হাতে নাকি দিয়ে এসেছিল। নির্বাচন ঘোষণা হতেই সেই সব অফিসারকে সরিয়ে দিচ্ছে কমিশন। দিন যত যাচ্ছে অপসারিত অফিসারদের লিস্ট ততই দীর্ঘ হচ্ছে। এখনও পর্যন্ত মুখ্যসচিব, সচিব, বিভিন্ন জেলার ডিএম, এসপি, পুলিশ কমিশনার, আইজি,
ডিজিকে সরানো হয়েছে। আগামী দিনে ওসি, আইসিদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তার প্রস্তুতিও শুরু হয়েছে। চেয়ে পাঠানো হয়েছে একুশের নির্বাচনে যুক্ত অফিসারদের নাম। শোনা যাচ্ছে, বিজেপি তালিকা দিলেই সরানো হবে তাঁদেরও।
তবে, এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। বরং এমনটাই হওয়ার ছিল। এসআইআর পর্বে বৈধ ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার উৎসাহ দেখেই বোঝা যাচ্ছিল, প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ পাওয়ামাত্র বিজেপির দেওয়া টাগের্ট পূরণের জন্য কমিশন এবার
টি-টোয়েন্টি স্টাইলে ব্যাট হাঁকাবে। গাদাগুচ্ছের অফিসারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে বাকিদের উপর
চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করবে। সেই প্রক্রিয়া ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গিয়েছে।
একথা ঠিক, নির্বাচনের মুখে গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা প্রশাসনিক কর্তাদের সরিয়ে দিয়ে ‘সাইড লাইনে’ থাকা অফিসারদের দায়িত্ব দেওয়া নতুন নয়। কমিশন প্রশাসনের উপর নিয়ন্ত্রণ আনার জন্য এই কাজ আগেও করেছে। এটা বহু দিনের প্র্যাকটিস। তবে, আগের সঙ্গে টিম জ্ঞানেশ কুমারের কাজের তুলনা না করাই ভালো। কারণ এতদিন নিয়মের মধ্যে থেকে কমিশন কাজ করত, কিন্তু এখন কমিশন প্রভুদের খুশি করতে নিয়ম তৈরি করছে।
আগে কী হত? কোনো অফিসারের বিরুদ্ধে বিরোধীরা অভিযোগ করলে কমিশন তা খতিয়ে দেখে পদক্ষেপ করত। অভিযোগ মিথ্যে এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মনে করলে কমিশন গুরুত্ব দিত না। কিন্তু, জ্ঞানেশ কুমার নির্বাচন ঘোষণা করেই প্রশাসনের উচ্চপদে থাকা অফিসারদের একধার থেকে সরাতে শুরু করেছেন। কেন সরাচ্ছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে কী অভিযোগ, কিছুই জানাচ্ছেন না। ঠিক যেভাবে ‘লজিকাল ডিসক্রিপেন্সি’ করে বিজেপির অপছন্দের ভোটারদের ‘বিচারাধীন’ করা হয়েছে, একই কায়দায় বছরের পর বছর সুনামের সঙ্গে কাজ করে আসা অফিসারদেরও ‘গ্যারেজ’ করে দিচ্ছেন। কমিশন যা ইচ্ছা তাই করছে। কিন্তু, নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে কোনো আইনি পদক্ষেপ করা যাবে না। আইন সংশোধন করে নির্বাচন কমিশনকে ‘রক্ষাকবচ’ দিয়ে নরেন্দ্র মোদির সরকার সেই রাস্তাটা আগেই বন্ধ করে দিয়েছে।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হল, অফিসারদের বদলি করলে তার প্রভাব কি ভোটে পড়ে? অফিসারদের বদলি করলে বিরোধী দলের নেতারা অবশ্যই উৎসাহিত হন। তাঁদের দেখে নেওয়ার হুংকার আকাশ ছোঁয়। কিন্তু, তার প্রভাব সাধারণ ভোটারদের উপর পড়ে না। মানুষ ভোট দেয় সরকারের কাজ দেখে, কমিশনের অ্যাকশন দেখে নয়। মানুষ বিচার করে কোন দলকে ভোট দিলে তারা ভালো থাকবে। তাদের লাভ হবে।
ভোট পরিচালনার ক্ষেত্রেও অফিসারদের বদলি কোনো প্রভাব ফেলতে পারে না। কারণ কমিশন যাঁদেরই এসপি, আইজি, এডিজি, বা ডিজি পদে বসাক না কেন, তাঁরা প্রত্যেকে এরাজ্যের অফিসার। এই মুহূর্তে তাঁরা হয়তো ‘সাইড লাইনে’ আছেন। কিন্তু, তাঁরা প্রত্যেকেই শাসক দলের বিরোধী, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোটা অতীব সরলীকরণ হয়ে যাবে।
অফিসাররা খুব ভালো করেই জানেন, কমিশনের ক্ষমতার মেয়াদ নির্বাচন প্রক্রিয়া শুরু থেকে ফল ঘোষণা পর্যন্ত। অন্যান্যবার এর মেয়াদ থাকে দু’, আড়াই মাস। এবার সেটা মাস দেড়েক। কিন্তু, নির্বাচন মিটে গেলে নবগঠিত সরকারই তাঁদের নিয়ন্ত্রক হয়। এখন কমিশন যাঁদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে বসাচ্ছে নির্বাচন মিটে গেলেই তাঁরা চাকরি থেকে অবসর নেবেন, এমনটা নয়। বেশিরভাগ অফিসারই আরও অনেক দিন এরাজ্যে চাকরি করবেন। ফলে কমিশনের নির্দেশে চেয়ারে বসা কোনো অফিসারই এমন কাজ করতে যাবেন না যাতে তাঁকে কর্মজীবনের বাকি দিনগুলি সমস্যার মধ্যে কাটাতে হয়।
একুশের নির্বাচনের আগেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘোষণা করেছিলেন, কমিশন যে সমস্ত অফিসারকে সরিয়ে দিচ্ছে, তাঁদের ফের পুরানো পদে ফিরিয়ে আনবেন। তিনি মিথ্যে আশ্বাস দেননি। অধিকাংশ অফিসারকেই আগের পদে ফিরিয়ে এনেছিলেন। ফলে দায়িত্বপ্রাপ্ত অফিসাররা জানেন, কমিশনের সৌজন্যে তাঁরা আসলে ‘দেড় মাহিনা কা বাদশা’। সেই কারণে কোনো ঝুঁকি নিতে চাইবেন না।
নগেন্দ্র ত্রিপাঠীকে মনে আছে? হ্যাঁ, ঠিক ধরেছেন। তাঁর সেই বিখ্যাত উক্তি, ‘উর্দি পরে দাগ নেব না ম্যাডাম।’ নন্দীগ্রামের বয়ালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মুখে বুথ দখলের অভিযোগ শুনে বলেছিলেন, ‘আমি দেখে নিচ্ছি। আপনি চিন্তা করবেন না। এই উর্দিতে দাগ নেব না।’
মুহূর্তে ভাইরাল হয়েছিল, সেই ভিডিও। রাতারাতি নির্বাচন কমিশনের চোখে ‘গুড বয়’ হয়ে গিয়েছিলেন নগেন্দ্র ত্রিপাঠী। পরের দফার নির্বাচন পরিচালনার জন্য কমিশন তাঁকে বীরভূমে পাঠিয়ে ছিল। উদ্দেশ্য, চড়াম চড়াম, গুড় বাতাসার স্রষ্টা অনুব্রত মণ্ডলকে শায়েস্তা করা। কিন্তু, তাতেও বদলানো যায়নি ভোটের ফল। বীরভূম জেলার একটি বাদে সব আসনেই জয়ী হয়েছিল তৃণমূল কংগ্রেস। আর কী হয়েছিল? নতুন সরকার গঠনের পর কমিশন নিযুক্ত একমাত্র বীরভূম জেলার এসপিরই বদল হয়নি। তারপর প্রায় দু’বছর বীরভূমের এসপি ছিলেন নগেন্দ্র ত্রিপাঠী।
দীর্ঘদিন প্রশাসনের উচ্চপদে কাজ করেছেন এমন এক কর্তার কথায়, অস্থায়ীভাবে দায়িত্ব পাওয়া অফিসাররা কোনো ঝুঁকি নিতে চান না।
সবচেয়ে বড়ো কথা, এলাকা চিনতেই ভোট শেষ হয়ে যায়। আর এলাকা সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান না
থাকলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া অসম্ভব। তবে কমিশন নিযুক্ত কিছু অফিসারের কাছে এই পোস্টিং ‘ঘুরে দাঁড়ানো’র একটা সুযোগ। এই সময় তাঁরা এমনভাবে কাজ করেন যাতে তাঁরা ফের
শাসক দলের ‘গুড বুকে’ জায়গা করে নিতে
পারেন। ফলে কমিশনের ঢালাও বদলির নির্দেশে ভোটের ফল না বদলালেও বদলে যেতে পারে কিছু অফিসারের ভাগ্য।