


মণিরাজ ঘোষ, খড়্গপুর: উষ্ণ থেকে উষ্ণতর হচ্ছে পৃথিবী। বাতাসে বাড়ছে জলীয় বাষ্প। তেতেপুড়ে উঠছে ভূপৃষ্ঠ। আদতে, এসব প্রকৃতির খামখেয়ালিপনা মনে হলেও এর পিছনে লুকিয়ে সুপার এল নিনোর পূর্বাভাস! যা আগামী কয়েক দশকের মধ্যেই সম্পূর্ণ বদলে দিতে পারে জলবায়ুর স্বাভাবিক ছন্দ ও গতিপ্রকৃতিকে! খড়্গপুর আইআইটির সাম্প্রতিক গবেষণায় এমনই সতর্কবার্তা সামনে আসছে। গবেষকদের মতে, বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রভাবে শুধু পৃথিবীর তাপমাত্রাই বাড়ছে না, বদলে যাচ্ছে বায়ুমণ্ডলের জলচক্রও। ফলে, বাতাসে বাড়ছে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ। তাতে দেখা যাচ্ছে, কোথাও অতিবৃষ্টি বা বন্যা, আবার কোথাও অনাবৃষ্টি বা খরা। খড়্গপুর আইআইটির সমুদ্র, নদী, বায়ুমণ্ডল ও ভূমি বিজ্ঞান বিভাগের (কোরালের) অধ্যাপক জয়নারায়ণন কুট্টিপ্পুরথ ও তাঁর গবেষক দলের নতুন গবেষণায় উঠে এসেছে এমনই চাঞ্চল্যকর তথ্য।
সম্প্রতি গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে জার্নাল অফ হাইড্রোলজিতে। গবেষণায় ১৯৮০ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত বায়ুমণ্ডলীয় জলীয় বাষ্পের পরিবর্তন-ধারাকে নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। পাশাপাশি, সিএমআইপি-৬ জলবায়ু মডেলের সাহায্যে ২১০০ সাল পর্যন্ত সম্ভাব্য জলবায়ু বর্তনের পর্যালোচনাও করা হয়েছে। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, বিশেষত গ্রীষ্মমণ্ডলীয় সমুদ্র ও বর্ষাপ্রবণ অঞ্চলগুলিতে মোট স্তম্ভীয় জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বাড়ছে। পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২১০০ সালের মধ্যে তা যথাক্রমে ৫–১৮ মিলিমিটার এবং ৭–২৮ মিলিমিটার (উচ্চ নিঃসরণ পরিস্থিতিতে) পর্যন্ত বাড়তে পারে। গবেষকরা জানিয়েছেন, উষ্ণ বায়ুমণ্ডল বেশি জলীয় বাষ্প ধারণ করতে পারে। তা ঘনীভূত হলে প্রবল বৃষ্টিপাত ও বন্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে। অন্যদিকে, মাটির আর্দ্রতা হ্রাস এবং বায়ু-সঞ্চালনের পরিবর্তনে কিছু অঞ্চলে শুষ্কতা ও খরার আশঙ্কাও তৈরি হবে।
আইআইটির এই গবেষণার সঙ্গে সাম্প্রতিক এল নিনোর পরিস্থিতি যুক্ত করলে জলবায়ু ঝুঁকির বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা জানিয়েছে, ২০২৬ সালের এল নিনো ক্রমশ শক্তিশালী হচ্ছে এবং আগামীদিনে এর প্রভাব বাড়তে পারে। এর ফলে ভারতে বর্ষা দুর্বল হওয়া, বৃষ্টির ঘাটতি এবং তাপপ্রবাহের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা বলেন, এল নিনোর প্রভাব অঞ্চল ও সময়ভেদে ভিন্ন হয়। অধ্যাপক কুট্টিপ্পুরথ বলেন, ‘এই জলবায়ু পরিবর্তন পৃথিবীর সংবেদনশীল অঞ্চলগুলিতে ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। এর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব পড়তে পারে হিমালয়–তিব্বত মালভূমি, আমাজনিয়া, মধ্য আফ্রিকা, সাহেল, সাহারা এবং পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে। ভারতের বর্ষা-প্রধান অঞ্চলগুলিতেও জলীয় বাষ্প বৃদ্ধির প্রবণতা গবেষণায় চিহ্নিত হয়েছে।‘ গবেষক শুভদীপ সরকার বলেন, ‘বিশ্ব উষ্ণায়ন ও ভবিষ্যতের জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে জলীয় বাষ্প একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগসূত্র হিসেবে উঠে এসেছে। তবে, আর্দ্রতা বাড়লেই বৃষ্টিপাত একই হারে বাড়বে, এমন নিশ্চয়তা নেই!’ বন্যা ও খরা মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি এবং আঞ্চলিক জলবায়ু মডেলের উন্নয়নের উপর জোর দিয়েছেন গবেষকরা।