


কাঠমাণ্ডু: নীল আকাশ। ইতিউতি সাদা মেঘ। পাহাড়ের গায়ে রোদ সবে চড়তে শুরু করেছে। আর পাঁচটা দিনের মতোই বুধবার ধীরে ধীরে কর্মব্যস্ততা শুরু হচ্ছিল নেপালজুড়ে। কাঠমাণ্ডুর ঘড়িতে তখন সকাল ন’টা। আচমকাই তিব্বতের দিক থেকে ভোটেকোশী নদীখাত ধরে খ্যাপা মোষের মতো নেপাল সীমান্ত পেরিয়ে ছুটে এল প্রবল জলোচ্ছ্বাস। চোখের নিমেষে ভাসিয়ে নিয়ে গেল একের পর এক লোহার সেতু, দুপাশের বাড়িঘর, গাড়ি। হড়পা বানে ক্ষতিগ্রস্ত বেশ কয়েকটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পও। উত্তর নেপালের তিব্বত সীমান্তবর্তী রাসুয়া এবং ধাদিং জেলায় কার্যত বন্যা পরিস্থিতি। মৃত্যু হয়েছে শতাধিকের। নিখোঁজ প্রায় হাজার। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন ১৩৩ জন ভারতীয় এবং ৩৭ জন অনাবাসী ভারতীয়। বর্তমানে কৈলাস মানসরোবর যাত্রা চলছে। নিখোঁজ ভারতীয়দের মধ্যে অন্তত ৫৯ জন সেই উপলক্ষ্যে তিব্বতের দিকে যাচ্ছিলেন বলে খবর। এর মধ্যে ৩৩ জন পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দা। তাঁরা গত ২২ আগস্ট কলকাতার একটি ভ্রমণ সংস্থার সঙ্গে মানসরোবর যাত্রায় গিয়েছিলেন। দলে ছিলেন ৩১ জন পর্যটক ও ২ জন সংস্থার ম্যানেজার। নেপালের একটি এজেন্সির মাধ্যমে তাঁদের মানসরোবর যাওয়ার কথা। এদিন সকাল সাড়ে ৮টা নাগাদ ওই পর্যটকদের সঙ্গে কথা হয়েছে কলকাতার ভ্রমণ সংস্থার। তখন তাঁরা নেপাল-তিব্বত সীমান্তে বিপর্যয়স্থলের কাছাকাছি ছিলেন। তারপর থেকে কারও খোঁজ মিলছে না। হুগলির আরামবাগ থেকে যাওয়া ৬৫ জন পর্যটক আটকে রয়েছেন বিপর্যয়স্থল থেকে ১২০ কিমি দূরে, নেপালের চেতন পার্কে। নবান্নের তরফে ইতিমধ্যেই নেপাল দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। কাঠমাণ্ডুর পর্যটন ব্যবসায়ী বসুকুমার অধিকারী বলেন, ‘বুধবার ৯৩ জন নেপালি সহ ৩৯০ জন পুণ্যার্থীর নেপাল সীমান্ত অতিক্রম করে চীনে প্রবেশের কথা ছিল।’ নেপাল ট্যুরিজম বোর্ডের (এনটিবি) পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, রাসুয়া জেলায় বন্যার জেরে মোট ৩৮৪ জন পর্যটক, ২৯১ জন বিদেশি এবং ৯৩ জন নেপালের নাগরিক নিখোঁজ হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন ব্রিটেন, আমেরিকা, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া এবং নেদারল্যান্ডসের বাসিন্দারাও। পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও সংস্থাগুলির থেকে পর্যটকদের অবস্থান এবং যাবতীয় তথ্য সংগ্রহ শুরু করেছে নেপাল ট্যুরিজম বোর্ড ও ট্যুরিস্ট পুলিশ।
ফুঁসে ওঠা জলস্রোত দু’কূল ছাপিয়ে গ্রাস করছে আশপাশের সবকিছু—নেপালে মহাপ্রলয়ের এই ভিডিয়ো দুপুর থেকেই সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল। কিন্তু কী থেকে এই বিপর্যয়? নেপালি সংবাদমাধ্যমের দাবি, তিব্বতের দিকে তুষারধসের জেরেই এই অবস্থা। কাঠমাণ্ডু বিশ্ববিদ্যালয়ের জলবায়ু গবেষক রিজন ভক্ত কায়স্থ এদিন বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে, কোনো তুষারধস তিব্বতের লেন্দে নদীকে অবরুদ্ধ করে থাকতে পারে। এর ফলে বিপুল জমা জল বাঁধ ভেঙে নিম্ন অববাহিকায় ভোটেকোশী নদী দিয়ে নেমে আসে।’ হড়পা বানে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত নেপালের তিব্বত সীমান্তবর্তী রাসুয়া পার্বত্য জেলার স্যাব্রুবেসী ও তিমুরে এলাকা এবং ধাদিং জেলা। এছাড়াও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কাঠমাণ্ডুর দক্ষিণ পশ্চিমের জেলা নৌয়াকোট। ভোটেকোশী নদী শেষে গিয়ে মিশেছে ত্রিশূলি নদীতে। নজিরবিহীন দুর্যোগের জেরে দু’টি নদীর তীরবর্তী এলাকায় সতর্কতা জারি করেছে প্রশাসন। বুধবার সকালের হড়পা বানের পর জরুরি বৈঠক ডাকেন নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলিতে উদ্ধারকাজের জন্য সেনা এবং পুলিশ মোতায়েনের নির্দেশ দেন। সাহায্যের জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে হেলিকপ্টার। প্রতিবেশী দেশের এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে উদ্বিগ্ন ভারত। বালেন্দ্রর সঙ্গে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তাঁর বার্তা, ‘নেপালে বন্যায় মৃতদের প্রতি সমবেদনা। এই কঠিন সময়ে পাশে রয়েছে ভারত।’
রাজ্যের হেল্পলাইন
০৩৩ ২৪৭৯ ৩৩১১
৯১৪৭৮৯০১৮১