


সংবাদদাতা, কাকদ্বীপ: ‘ভিতরে ঢুকিস না। ভাইপোকে বাঁচা। আমাদের যা হওয়ার হবে।’ অগ্নিদগ্ধ বড় বৌদির আর্তনাদ শুনে ছুটে গিয়েছিলেন সাহায্যের হাত বাড়াতে। কিন্তু সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়। হৃদয়বিদারক সেই দৃশ্যের কথা বলতে গিয়ে চোখ ছল ছল করছিল পাথরপ্রতিমার ঢোলাহাট থানার রায়পুরের তৃতীয় ঘেরিতে বাজি বিস্ফোরণে মৃত সান্ত্বনা বণিকের এক দেওর অরিন্দম বণিকের। দুর্ঘটনার পর সর্বপ্রথম তিনি ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন ওই পরিবারকে বাঁচানোর জন্য। থমথমে মুখ নিয়ে মঙ্গলবার সকালে তিনি বলেন, ‘রাত সাড়ে আটটা নাগাদ হঠাৎই বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে চন্দ্রকান্ত দা’র বাড়ি। বাইরে বেরোতেই দেখি দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। জানালার কাছে বড় বৌদি সাহায্যের জন্য চিৎকার করছেন। সারা গায়ে আগুন জ্বলছে। ছোট ভাইজি অস্মিতা বিছানায় আগুনের তীব্রতায় ছটফট করছে। বড় ভাইপো বাড়ির ভিতর থেকে চিৎকার করছে, আমার মাকে বাঁচাও। ওকে কোনওমতে টেনে বাড়ির বাইরে বের করে নিয়ে আসছিলাম।’ বড়মাপের নিঃশ্বাস নিয়ে বলে চললেন অরিন্দম—‘সেই সময় চন্দ্রকান্ত দা ছুটে এসে ভিতরে ঢুকতে যাচ্ছিল। তাঁকে আটকে বাড়ির বাইরে বের করে নিয়ে আসি। পিছনে ফিরে আর ভাইপোকে দেখতে পাইনি। কাকু (অরবিন্দ বণিক) হঠাৎই তাঁর বড় বৌমা ও ছোট নাতনিকে বাঁচানোর জন্য সেই ঘরে ঢুকে পড়েন। কাকুর পিছনে বড় ভাইপো ফের ঢুকে পড়েছিল। আর কেউ বেরোতে পারিনি। আগুনের তীব্রতা বাড়তে থাকায় আমিও হাল ছেড়ে দিতে বাধ্য হই। চোখের সামনেই দেখলাম, সবাই দাউদাউ করে জ্বলে শেষ হয়ে গেল! ১১জনের পরিবারের আট সদস্যই শেষ!’ ঘটনায় পুলিসের ভূমিকায় ক্ষুব্ধ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্দেশে মুখ্যসচিব মনোজ পন্থ জেলাশাসক সুমিত গুপ্তের কাছ থেকে রিপোর্ট তলব করেছেন।
এদিকে, ঢোলাহাটের বিস্ফোরণের ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে হল আট। সোমবার গভীর রাতে এসএসকেএম হাসপাতালে মৃত্যু হয়েছে বণিক পরিবারের ছোট বউমা সুতপার। দুর্ঘটনা যখন ঘটে তখন তিনি তাঁর সন্তানকে দুধ খাওয়াচ্ছিলেন। বিস্ফোরণের পর তাঁকে গুরুতর জখম অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছিল। বিস্ফোরণের ঘটনায় বণিকবাড়ির দুই ভাই চন্দ্রকান্ত ও তুষারের নামে একাধিক ধারায় কেস রুজু করেছে ঢোলাহাট থানা। চন্দ্রকান্তকে জেরা করা হচ্ছে। আর তুষার পলাতক। এদিন সকাল থেকেই পুরো গ্রাম থমথমে ছিল। পোড়া গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে গ্রামের অলিগলিতে। দুর্ঘটনাগ্রস্থ বাড়ির চারদিকে ঘিরে রাখা হয়েছে। পাশে পুকুরে ভাসছে দুটি সিলিন্ডার। যে সময় আগুন লেগেছিল ঘরে, তখন সেগুলি যাতে ফেটে না যায় তার জন্য এলাকাবাসী কোনওমতে জলে ফেলে দিয়েছিলেন। আশপাশের গ্রাম থেকে মানুষজন ভিড় করছেন, কিন্তু বাড়ির কাছে আসতে দেওয়া হয়নি। দুর্ঘটনাস্থলের কাছেই বসানো হয়েছে পুলিস পিকেটিং। চন্দ্রকান্তের বাড়ির অদূরে মাটিতে ড্রাম চাপা দেওয়া বিপুল পরিমাণ বারুদ পাওয়া গিয়েছে। খড়ের গাদা, টমেটো খেত সহ আরও কয়েকটি জায়গায় মজুত করা বিপুল পরিমাণ বারুদের বস্তা ঘিরে এলাকায় আতঙ্ক শুরু হয়েছে।
বরাত জোরে বেঁচে গিয়েছেন বণিক পরিবারের তিন সদস্য। চন্দ্রকান্তের মা মেনকা বণিক দুর্ঘটনার ঠিক আগে বাড়ির পাশের পুকুরে শাক ধুতে বেরিয়েছিলেন। বাড়ির ছোট ছেলে তুষার ছিলেন বাইরে। ফোন আসায়, চন্দ্রকান্ত বাড়ির বাইরে যান। তবে বিস্ফোরণের সঠিক কারণ এখনও স্পষ্ট হয়নি। এলাকার অনেকেই বলছেন, ঘরে আগুনের ফুলকি বাজিতে পড়েনি। গরমের থেকে হয়ে থাকতে পারে। এই ঘটনা নিয়ে এডিজি (দক্ষিণবঙ্গ) সুপ্রতিম সরকার বলেন, গ্যাস সিলিন্ডার ফেটে বাজিতে আগুন লেগেছিল নাকি উল্টোটা, সেটা ফরেন্সিক পরীক্ষার পর স্পষ্ট হবে। এদিন বিকেলে তিন সদস্যের প্রতিনিধি দল ঘটনাস্থল থেকে নমুনা সংগ্রহ করেছেন।