


অমিতাভ ভট্টাচার্য: তিনতলার বাথরুমে ঢুকেই মাথাটা গরম হয়ে গেল অবিনাশের। এ কী ছন্নছাড়া অবস্থা! মাত্র চার দিন বাইরে ছিল সে সপরিবারে। তোপচাচি, হাজারিবাগ বেড়াতে গিয়েছিল। আজকে সকালেও তোপচাচি লেকে বোটিং করেছে। ভরা সন্ধ্যায় চোখের সামনে এসব কী দেখছে! শুকনো ডালের টুকরো, গাছের শুকনো পাতা— আরও কত কী! সব জড়ো করে রাখা টয়লেটের এককোণে যে তাক রয়েছে, তার উপর।
অবিনাশের বুঝতে বাকি রইল না, এসব ওই ঘুঘু পাখির কাণ্ড! বাসা তৈরি করছে ডিম পাড়বে বলে। সকালবেলা চা খাওয়ার পর তিনতলার খোলা ছাদে আধঘণ্টা চক্কর মেরে নেয় অবিনাশ। আর তখনই একজোড়া ঘুঘুর সঙ্গে প্রায় প্রতিদিনই মোলাকাত হয় ওর। অবিনাশ যেমন ওদের দেখে, ওরাও তেমনই ছাদের দেওয়ালে বসে, কখনো বা কাপড় টানানোর দড়িতে বসে অবিনাশকে দেখে। মাঝে মাঝে ডেকে ওঠে।
সেই ঘুঘুদের আজ এই অনাসৃষ্টি কাণ্ড দেখে মাথা গরম হয়ে গেল অবিনাশের। কিন্তু কোনো উপায় নেই। অকুস্থলে হাজির নেই কেউই। অগত্যা বাথরুম পরিষ্কারের দিকে মন দিল সে। একে একে সমস্ত গাছের ডালের টুকরো, আরও নানা হাবিজাবি কুড়িয়ে ময়লার বালতিতে ফেলল। শেষ পর্যন্ত রাগ গিয়ে পড়ল অর্ধসমাপ্ত ওই ঘুঘুর বাসার উপর। সেটা তাকের কোণ থেকে তুলে নিয়ে জানলা দিয়ে ছুড়ে দিল বাইরের দিকে। ঘেমেনেয়ে পুরো বাথরুম পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে দোতলায় নেমে এল অবিনাশ। অর্ধাঙ্গিনী শ্যামলীকে পুরো ঘটনাটা বিস্তারিত জানাল।
সব শুনে সিমপ্যাথি দেখানো তো দূরে থাক, শ্যামলী রীতিমতো রেগে গেল। এ তুমি কী করলে! বাসাটা ভেঙে ফেলে দিলে। ডিম পাড়বে বলে ওরা কত কষ্টে বাসাটা তৈরি করছিল! অবিনাশ মিন মিন করে আত্মপক্ষ সমর্থনের চেষ্টা করল। শ্যামলী পাত্তাই দিল না। উলটে সে দু’জনের কথা বন্ধ রইল। পরের দিন সকালে এসে শ্যামলী একবার সরেজমিনে বাথরুম পর্যবেক্ষণ করে গেল। ওদের যেন আর ডিস্টার্ব না করা হয়, সেই হুঁশিয়ারিও দিয়ে গেল। অবিনাশদের এই বাথরুমে একটা ডিফেক্ট আছে। কাচের দুটো জানলা আছে বটে, কিন্তু সেগুলো আধখোলা অবস্থাতেই থাকে। ঠিকমতো বন্ধ করা যায় না। শ্যামলী বলেছিল, মিস্ত্রি ডেকে ঠিক করে নাও। সেটাও আর হয়ে ওঠেনি। তার ফল যা হওয়ার তাই হল। সেই একজোড়া ঘুঘু বাসা তৈরির চেষ্টায় মেতে রইল। অবিনাশও ছাড়বার পাত্র নয়। বউয়ের কাছে ঝাড় খেয়েছে ওদের জন্য। তাই ঘুঘু দেখেছ ফাঁদ দেখনি— এই মন্ত্র মাথায় নিয়ে ওদের উপর গায়ের ঝাল মেটাতে প্রত্যেকবারই সেই খড়কুটোগুলো পত্রপাঠ বিদায় করে দেয়। দু-একদিনের মধ্যে ঘুঘু দুটো আবার বাসা সাজানোর চেষ্টা করে। দু’পক্ষের মধ্যে এই খেলা কয়েকদিন ধরে চলতেই থাকল।
নাহ্! এভাবে হবে না। জানলা যখন বন্ধ করা যাবেই না, তখন অবিনাশ গ্রিলের ফাঁকফোকরগুলো সব ঢেকে দিল পুরানো কাপড় গুঁজে। আর কোনো ঢোকার জায়গা না পেয়ে ঘুঘু জোড়া রণে ভঙ্গ দিল। অবিনাশও মনের সুখে দিনাতিপাত করতে লাগল।
সকালবেলা ছাদে হাঁটাহাঁটি করার সময় বেশ কয়েকটি ঘুঘুর দেখা পাওয়া যেত । কিন্তু তাদের মধ্যে ওই ঘুঘু দুটো রয়েছে কি না, অবিনাশ ঠিক বুঝে উঠতে পারত না। আসলে ওরা তো আগে আলাদা করে যুগলে দর্শন দিত! এভাবেই দিন দশেক কাটার পর নিশ্চিন্ত হল যে, ওই দুষ্টু পাখি দুটো পার্মানেন্টলি বিদায় নিয়েছে। বাথরুমের জানলার গ্রিলের ফাঁকফোকরে গুঁজে রাখা কাপড়গুলো ধীরে ধীরে সরিয়ে দিল।
এরমধ্যে দিন কুড়ি থেকে কেটে গিয়েছে। ঘুঘু কাহিনি সম্পূর্ণ ভুলে গিয়েছে সবাই। এক সকালে বাথরুমে ঢুকে কী মনে হল, অর্ধেক না খোলা জানলাটা পুরোপুরি খোলা যায় কি না, সেই চেষ্টা শুরু করল অবিনাশ। শুরু করতেই ঝটপটানি, হাত ছুঁয়ে একটি ঘুঘু উল্টো দিকের তাকের আলসেতে গিয়ে বসল, তারপর একটানা ডাকতে লাগল। কী হল ব্যাপারটা! এটা তো তাহলে সেই ঘুঘুটাই, যে বাথরুমের তাকে বাসা করার ব্যর্থ চেষ্টা করে রণে ভঙ্গ দিয়েছিল। গ্রিলের ফাঁক দিয়ে একটু ঝুঁকে দেখল, ওই আধখোলা জানলার ফাঁকফোকরে ছোট্ট একটি বাসা, মানে ঘুঘুর বাসা এবং তার মধ্যে ছোট্ট দুটি ডিম। অবিনাশ জীবনে কোনোদিন ঘুঘুর ডিম দেখেনি। হাঁসের, মুরগির বা কোয়েলের ডিম দেখেছে, ঘোড়ার ডিমের গল্প শুনেছে। কিন্তু ঘুঘুর ডিমের গল্পই শোনেনি , দেখা তো দূরে থাক! সেই একজোড়া ঘুঘুর ডিম এখন চোখের সামনে!
পুরো বাড়ি জুড়ে হইচই শুরু হয়ে গেল। ছুটে এল শ্যামলী, ক্লাস টু-এ পড়া বাবিন, বাড়ির কাজের লোক, রান্নার মাসি— এমনকি খবর পেয়ে এসে হাজির হল দু-একজন প্রতিবেশীও। ঘুঘুর ডিম দর্শনের পরেই সবাই একমত হল, এ সময় ঘুঘুমাকে ডিস্টার্ব না করাই উচিত। একটু দূরে তাকের আলসেতে বসে ঘুঘুমা পুরো পরিস্থিতিটাই পর্যবেক্ষণ করছিল। সবাই চলে যাওয়ার পরে আবার উড়ে চলে এল তার বাসায়, ডিমে বসে তা দিতে শুরু করল।
অবিনাশ এরপর থেকে যতক্ষণ বাড়িতে থাকে, প্রায় ঘণ্টায় ঘণ্টায় বাথরুমে গিয়ে দেখে আসে। ধূসর রঙের ডানা মেলে বসে থাকা ঘুঘুমায়ের সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় হয়। প্রথম প্রথম ভয় পেলেও ঘুঘু পাখিটি এখন আর অবিনাশকে ভয় পায় না। অবিনাশ অদ্ভুত একটা টান অনুভব করে। একসময় ওদের ঘর তো সে-ই ভেঙে দিয়েছিল, একবার নয় বারবার। অথচ এখন সেই অবিনাশই মনে মনে প্রার্থনা করে, ডিম দুটো যেন অক্ষত থাকে, ডিম ফুটে সময় মতো যেন ছানা বের হয়। নিজের ছেলেমানুষির কথা ভেবে কেমন লজ্জা লাগে অবিনাশের। তবুও সে প্রায় নিয়ম করে দিনে তিন-চারবার পর্যবেক্ষণ করে যায়। সঙ্গে থাকে তার একমাত্র সন্তান বাবিন। গুগল সার্চ করে সে ইতিমধ্যেই তার বাবাকে ঘুঘু পাখি সম্পর্কিত বহু তথ্য সাপ্লাই করেছে। অবিনাশ এখন ঘুঘু অবসেশনে ভুগছে।
অপেক্ষার অবসান। অবশেষে এল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। ডিম দুটো ফুটে ছোট্ট ছোট্ট দুটো ছানা বের হল। অভ্যেসমতো অবিনাশ রোজই উঁকি মেরে দেখত। সেদিন সকালে বাথরুমে তার উপস্থিতি টের পেয়ে ঘুঘু পাখিটি ডানা ঝাপটে কী যেন বলতে চেয়ে উড়ে গিয়ে বসল উলটো দিকে তাকের আলসেতে। অবিনাশ তাকিয়ে দেখল, ছোট্ট দুটো ছানা ঊর্ধ্বপানে গলা তুলে চিঁ চিঁ করে ডাকছে। পাশে ভাঙা ডিমের খোল। যথারীতি শুরু হয়ে গেল হই হট্টগোল। ছুটে এল শ্যামলী, বাবিন, কাজের মেয়ে লক্ষ্মী। অবাক চোখে সবাই দেখল, মোবাইলে ছবি তুলল, যথারীতি সেই ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট হয়ে গেল পাঁচ মিনিটের মধ্যেই।
সপ্তাহ খানেকের মধ্যেই ছানা দুটো বেশ বড়োসড়ো হয়ে উঠল, ডানা ঝাপটাতেও শিখে গেল। বাবিন বাবাকে বলল, এবার কিন্তু ওরা যে কোনোদিন উড়ে যাবে। শুনে বুকের মধ্যে যেন একটা ধাক্কা খেল অবিনাশ। মাসখানেক ওদের নিয়ে বেশ কাটছিল সময়। হঠাৎ সব শূন্য হয়ে যাবে! সত্যিই তাই হল একদিন। সকালে উঠে অবিনাশ দেখল বাচ্চা দুটো নেই, বড়ো পাখিও উড়ে গিয়েছে অন্য কোনো ঠিকানায়। হয়তো মা-বাবা ওদের জীবন যুদ্ধে নামানোর কৌশল শেখানোর প্রশিক্ষণে নিয়ে গেল। মনটা বড় বিষণ্ণ হয়ে গেল অবিনাশের। খাওয়ার টেবিলে সব শুনে শ্যামলী বলল, যত সব আদিখ্যেতা! রোজ সকালে উঠে একবার করে ওই গানটা এখন থেকে গাইবে— ‘শূন্য এ বুকে পাখি মোর ফিরে আয় ফিরে আয়।’ কিন্তু অবিনাশের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, একদিন না একদিন ওই ঘুঘু পরিবার তাদের ফেলে যাওয়া আস্তানা দেখতে ঠিক এখানে ফিরে আসবে। মা ঘুঘু সন্তানদের বলবে, এটাই হল তোদের আঁতুড় ঘর।
প্রায় তিন মাস কেটে গেল। ওরা কিন্তু আর এল না। অবিনাশ অনেকবারই ভেবেছে ফাঁকা বাসাটা এবার ভেঙে ফেলে দেবে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত পারেনি। ঘুঘু কাহিনি এখন ক্লোজড চ্যাপ্টার। তবুও বাথরুমে ঢুকলে অবিনাশ প্রতিদিন একবার হলেও খালি বাসাটার দিকে একটু তাকায়। সেদিন তাকাতেই চমকে উঠল! একটা ঘুঘু এসে ডানা ছড়িয়ে বেশ আয়েশ করে বসে আছে বাসাটায়। অবিনাশকে দেখে এতটুকু ভয় পেল না, উড়ে যাবারও চেষ্টা করল না। কিন্তু অবিনাশ ভালো করে পর্যবেক্ষণ করে বুঝল, এটা সেই ঘুঘুমা নয়, এর চেহারাটা একটু ছোটোখাটো, গায়ের ছোপগুলোও খুব ঘন। কিন্তু এই ঘুঘুটা অবিনাশকে দেখে ভয় পাচ্ছে না কেন! ডানা ঝাপটিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে না কেন!
রাতে খাবার টেবিলে অবিনাশের মুখে সব শুনে শ্যামলী বলল, আবার শুরু হল ঘুঘু আদিখ্যেতা- পার্ট টু। বাবিন ফিসফিস করে বাবার কানে বলল, মনে হয় আগের ঘুঘু পরিবার এই ঘুঘুটাকে বলে দিয়েছে, এখানে নিশ্চিন্তে থাকা যায়। কেউ কোনো ক্ষতি করবে না। সেই ভরসাতেই এই ঘুঘুটা এখানে এসেছে। তুমি কিন্তু এবার আর বাসাটা ভেঙে দিও না বাবা। ছেলের দিকে তাকিয়ে সস্নেহে অবিনাশ বলে উঠল, না রে, এবার আর ওই ভুল করব না।