


সমৃদ্ধ দত্ত: স্নেহভাজনেষু, নতুন বছরের শুভাশিস জানাই। আমাকে আপনি খুব একটা পছন্দ করেন না। ৬২ বছর আগে আমার মৃত্যু হয়েছে। স্বাধীনতার পর ১৭ বছর আমি প্রধানমন্ত্রী ছিলাম। তারপর থেকে অনেক প্রধানমন্ত্রী এসেছেন এবং চলে গিয়েছেন। কিন্তু আজও সভা, সমাবেশ, পার্লামেন্টে আপনি এবং আপনার দলের নেতামন্ত্রীদের অভ্যাস হল আমাকেই আক্রমণ করা। ১৭ বছরে আমি কী কী ভুল করেছি সেই তালিকা প্রদান করার প্রবণতা আর বন্ধ হল না। এভাবে আমাকে সবথেকে বেশি প্রাসঙ্গিক করে রাখছেন কিন্তু আপনারাই। এজন্য ধন্যবাদ। কিন্তু আপনারও তো প্রধানমন্ত্রী পদে ১২ বছর হচ্ছে।
আমার ১৭ বছর বনাম আপনার ১২ বছরের একটি প্রতিতুলনা যদি করা যায়, অর্থাৎ ভারতনির্মাণ, প্রগতি, গণতন্ত্র এবং সাংবিধানিক কাঠামোকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে কার অবদান বেশি পরিলক্ষিত হবে? শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কৃষি ও গ্রামোন্নয়ন পরিকল্পনা, অসংখ্য সরকারি সংস্থা নির্মাণে কে এগিয়ে? আর একটিও বিশ্বমানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অথবা সাংবিধানিক পরিকাঠামো কিংবা প্ল্যানিং কমিশন কেন তৈরি হল না? যা হচ্ছে সেসব তো নিছক আমার তৈরি করা স্ট্রাকচারের নামবদল। এর মধ্যে মৌলিকতা নেই। নিজস্ব ভাবনা নেই।
নতুন বছরের শুভেচ্ছা প্রদানের সময় নিজের গৌরবের কথা নিজের মুখে বলতে চাই না। সেসব ভারতবাসী জানে। বরং আপনাকে একটি সতর্কবার্তা দিয়ে রাখছি বয়োজ্যেষ্ঠ হিসেবে। সেটি হল, বিগত এক বছর ধরে আপনার শক্তি ও প্রভাব কিন্তু ক্রমেই কমতে দেখা যাচ্ছে। মাত্র ১১ বছরের মধ্যেই আপনার দাপট কমছে কেন?
কেন বলছি এই কথা? সূক্ষ্মভাবে লক্ষ করুন। ২০২৫ সাল শুরু হয়েছিল দিল্লির বিধানসভা ভোট দিয়ে। ওই শহরে আপনি নিজে বসবাস করেন। সুতরাং আপনার উপস্থিতি, আপনার সেই তথাকথিত ম্যাজিক এবং প্রচারই তো যথেষ্ট ছিল ভোটে জয়ী হওয়ার জন্য। সেটা কিন্তু হল না। দিল্লি জয়ের জন্য দল আপনার উপর আর নির্ভর করেনি। এমনকি আপনি নিজেও না। তাই ২৫০০ টাকা করে দিল্লির মহিলাদের প্রতি মাসে ভাতা দেওয়া হবে বলে প্রতিশ্রুতি দিতে হল। এবং সেটাই নাকি জিতিয়ে দিল আপনার দলকে।
এটা আপনার ব্যর্থতার প্রথম সূত্রপাত। কারণ আপনি সবথেকে বেশি বিরুদ্ধাচারণ করে এসেছেন যে, এইসব ভাতা দেওয়া হল রেউড়ি কালচার। এসব দেশের অর্থনীতিকে দুর্বল করে দেয়। অথচ আপনার দল রাজ্যে রাজ্যে এই একই ফর্মুলা চালু করেছে। আপনার কথায় গুরুত্ব না দিয়ে। আপনাকে মেনে নিতে হয়েছে। দলের উপর অথরিটি কমে যাওয়া দুর্বলতার লক্ষণ।
দিল্লির পর বিহার। আপনি একটি নতুন টার্ম নিয়ে এসেছিলেন। ডবল ইঞ্জিন। রাজ্যে এবং কেন্দ্রে একই দল তথা জোটের সরকার থাকলে, তাকে নাকি বলা হবে ডবল ইঞ্জিন। সেই অর্থে বিহার ডবল ইঞ্জিন। তাহলে তো উন্নতির জোয়ারে বিহার ভেসে যাওয়ার কথা ছিল। এবং সেই উন্নয়ন অনুভব করেই মানুষ ভোট দিত আপনার জোটকে। কই সেটা তো হল না! বরং বিহারের মুখ্যমন্ত্রী ভোটপর্বের মধ্যেই মহিলাদের ১০ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দিলেন সরাসরি ব্যাংকে টাকা পাঠিয়ে। আর সেই পদক্ষেপের ভূয়সী প্রশংসা করে আপনাকেও সভায় সভায় সেটা বলতে হল প্রচারে। ভোটের পর সর্বত্র এটাই আলোচিত হল যে, ১০ হাজার টাকার মাস্টারস্ট্রোক, বিহারের জয়।
এটা থেকে প্রমাণিত হয় যে, উন্নয়ন সম্পর্কে আপনারা নিজেরাই আত্মবিশ্বাসী নয়। সবথেকে ধনী রাজ্য দিল্লিতেও ২৫০০ টাকা করে মাসে ভাতা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোট চাইতে হয়, আবার সবথেকে অনগ্রসর রাজ্য বিহারেও ১০ হাজার টাকা এককালীন অনুদান দিতে হয়। তার মানে আপনার সেই বহুচর্চিত ম্যাজিক আর কাজ করে না।
স্বাধীনতার পর একটি রাষ্ট্র দেশভাগ, উদ্বাস্তু এবং অর্থনীতির সংকটের চাপে দিশাহারা ছিল। সেই সময় সোভিয়েত অথবা আমেরিকা, যে কোনও একটি শিবিরের অনুগামী হয়ে এগিয়ে চললে অনেকটাই সুরাহা হত। কিন্তু আমরা ভারত নামক ৫ হাজার বছরের প্রাচীন সভ্যতাকে নবীন সভ্যতাদের সামনে অবনত হতে দিইনি। তাই নির্জোট নামক একটি সাহসী মঞ্চ গঠন করেছিলাম আমি। উন্নয়নশীল দেশগুলি তো বটেই, শক্তিশালীরাও আমাকে ও ভারতকে তাই সম্মান করেছিল।
কিন্তু ২০২৫ সালে আমরা কী দেখলাম। বছরের মধ্যপর্বে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হঠাৎ আপনাকে যখন তখন অস্বস্তিতে ফেলে অসম্মানজনক কথা বলতে শুরু করলেন। দাবি করেই গেলেন যে, তিনিই নাকি ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধবিরতির কারিগর। এরপর আবার আমেরিকা ভারতের উপর ৫০ শতাংশ আমদানি শুল্ক চাপিয়ে দিল। বছরের শেষ লগ্নে এসে চীন সেই একই দাবি করল। অর্থাৎ তারাই নাকি ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা প্রশমনের মধ্যস্থতা করেছে। তাদের জন্যই যুদ্ধবিরতি। প্রশ্ন হল, এভাবে আমেরিকা ও চীন ভারতকে পাকিস্তানের সমতুল দেখানোর সাহস পাচ্ছে কেন? রাশিয়া ছাড়া অন্য কেউ সরাসরি ভারতের পাশে দাঁড়ায় না কেন? এটা কি দুর্বলতা ভাববে না ভারতবাসী?
দেরাদুনে এক ত্রিপুরার তরুণ ম্যানেজমেন্ট পাঠ করতে গিয়েছিল। তাকে স্থানীয় কিছু যুবক চাইনিজ বলে অপমান করে। প্রতিবাদ করলে মারধর করে। এবং পিটিয়ে পিটিয়ে হত্যা করে। মৃত্যুর আগে সেই তরুণ শেষ বাক্য বলে বাঁচতে চেয়েছিল যে, আমি ইন্ডিয়ান…আমি চাইনিজ নই।
উত্তরপ্রদেশের বেরেলি, মধ্যপ্রদেশের ইন্দোর, দিল্লি, অসমের নলবাড়ি, ছত্তিশগড়ের রায়পুর। একের পর এক শহরে খ্রিস্টমাস পালন করার অপরাধে উগ্র হিন্দুত্ববাসী সংগঠন হামলা করেছে। মারধর করেছে। শিশু মহিলাদের সন্ত্রস্ত করেছে। ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে। গাজিয়াবাদে ঘরে ঘরে অস্ত্র বিলি করা হয়েছে। অথচ এরা কিন্তু সকলেই দেখেছে এবং জানে যে, খ্রিস্টমাসের দিন আপনি দিল্লির চার্চে গিয়ে প্রেয়ারে যোগ দেন। যাজকদের সঙ্গে সময় কাটান। গোটা দেশবাসীকে প্রদান করেন বড়দিনের শুভেচ্ছা। ইদে শুভেচ্ছা জানান দেশবাসীকে। মুসলিম রাষ্ট্রগুলির সঙ্গে আপনার অত্যন্ত সুসম্পর্ক।
তা সত্ত্বেও এই সংঘ পরিবারের সরাসরি সংগঠনগুলির সদস্যরা এভাবে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে ভারতে অস্থিরতা, অশান্তি এবং অরাজকতার একটি আবহ তৈরি করতে চাইছে কেন? তার কারণ কি এরা আর আপনাকে ভয় পায় না? আপনি ক্রুদ্ধ হবেন, ক্ষুব্ধ হবেন কিংবা আপনি নিজেই চার্চে যাচ্ছেন এসব নিয়ে তারা আর চিন্তাই করে না। তাহলে কি এরা আর আপনার প্রভাব স্বীকারই করে না? আপনার নীরবতাও কিন্তু এই সাহস আরও বাড়াচ্ছে।
এই উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা এত সাহস পাচ্ছে কীভাবে? তারা ধরেই নিচ্ছে সরকার বা আইন আমাদের কিছু করবে না। যা অত্যন্ত বিপজ্জনক ও উদ্বেগজনক এক প্রবণতা। বিপদ ভারতের। উদ্বেগ আপনার। কারণ, এসব থেকে যেটা স্পষ্ট হয়, সেটি হল, নিজের দল ও সংঘের উপর আপনার প্রভাব কমে যাচ্ছে। আপনার অথরিটি কি দলের মধ্যে ক্রমহ্রাসমান?
নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রথম পৃষ্ঠায় সম্প্রতি বিরাট আকারে লেখা হয়েছে ঐতিহ্যশালী ভারতের চরিত্র বদলে দিচ্ছে ধর্মীয় উগ্রতা। ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলির অবস্থা দেখে বুঝতে পারছেন নিশ্চয়ই যে, ভারতের সবথেকে বড় শক্তি হল গণতন্ত্র এবং ধর্মনিরপেক্ষতা। খুব কম দেশে এরকম শক্তি আছে। সেই শক্তিটাকে নষ্ট হতে দেবেন না।
আমার লেখা একটি বই আছে আশা করি জানেন। ডিসকভারি অফ ইন্ডিয়া। সেখানে একটি বাক্য রয়েছে, ভারত এমন একটি রাষ্ট্র যার মধ্যে একঝাঁক পরস্পরবিরোধিতা শক্তপোক্তভাবে নিজেদের ঐক্যবদ্ধ রেখেছে এক অদৃশ্য সুতোর বন্ধনে। ভারত বারংবার ঘৃণার দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে। কিন্তু ভারতবাসী ঘৃণাকে দীর্ঘকাল ধারণ করে রাখতে পারে না। তারা আবার ফিরে যায় বন্ধুত্ব ও সৌহার্দ্যে। এটাই ভারতের একটি আশ্চর্য বৈশিষ্ট্য। আর এই বৈশিষ্ট্য ভারতকে সকল জাতির থেকে পৃথক করেছে।
২০২৬ সালে একটাই আশা করব। ভারতকে যা বদনাম করে দিচ্ছে, দুর্বল করে দিচ্ছে সেসব সক্রিয়তাকে কড়া হাতে দমন করুন। এআই, সেমিকন্ডাকটর, মেশিন লার্নিং, রেয়ার আর্থ মেটাল, মাইক্রোচিপস, ইত্যাদি বিষয়ে ভারতকে আত্মনির্ভর করতে হিন্দু মুসলিম খ্রিস্টান বৌদ্ধ সকলেই যেন নেমে পড়ে এক উন্নয়নের মহাযজ্ঞে। যারা বাধা দেবে, যারা দাঙ্গা বাধাতে চাইবে তারা কিন্তু প্রকৃত অ্যান্টি ন্যাশনাল। যারা অরাজকতা সৃষ্টি করে তারা ভারতের উন্নতি চায় না।
ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক শক্তিই পারবে অন্যতম শ্রেষ্ঠ দেশে পরিণত করতে। মনে রাখবেন, বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য, আর্থিক উন্নতি বৃদ্ধির সেরা ফর্মুলা! ১৪৫ কোটি নাগরিক। ১৯ হাজার পৃথক মাতৃভাষা। সব ধর্ম পালনের সমান সুযোগ। কৃষি, হস্তশিল্প, অলঙ্কার, আইটি রপ্তানিতে ফার্স্ট। এইসব শক্তি অবিশ্বাস্য! কাজে লাগান! শুভেচ্ছাসহ...
এক প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী