


আধুনিক মানুষের কাছাকাছি প্রজাতি ছিল নিয়ান্ডারথাল। কিন্তু বিবর্তনের ধারায় তারা হারিয়ে গেল। কেমন ছিল এই আদিম মানুষদের জীবন? জানালেন স্বরূপ কুলভী।
আমাদের প্রাণীজগতের সকল প্রাণীরই ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতি রয়েছে। চারদিকে একটু খেয়াল করলেই আমরা তা দেখতে পাই। যেমন সাপ, ব্যাঙ, পাখি-সবারই মধ্যে তা রয়েছে। কিন্তু মানুষের? হ্যাঁ, মানুষেরও বেশ কয়েকটি প্রজাতি রয়েছে। তবে বিবর্তনের ধারায় বাকি সব প্রজাতিকে হারিয়ে আধুনিক মানুষ (হোমো সেপিয়েন্স) দাপটের সঙ্গে টিকে গিয়েছে। কিন্তু আমাদের আগের বা সমসাময়িক প্রজাতির মানুষগুলো কেমন ছিল? তারা দেখতে কেমন ছিল? তাদের জীবনযাপনের ধরন কেমন ছিল? এসব প্রশ্নের উত্তরের খোঁজ চলছে। তবে এই সন্ধান খুব সহজ নয়। কারণ বহু হাজার বছর আগে তারা পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে। তবে গবেষণা থেমে নেই। জানা গিয়েছে, মানব প্রজাতিগুলির মধ্যে আধুনিক মানুষের সবচেয়ে নিকটাত্মীয় বা কাছাকাছি সময়ের প্রজাতি হচ্ছে নিয়ান্ডারথাল। তারা প্রায় ৩০ থেকে ৪০ হাজার বছর আগে পৃথিবী থেকে চিরতরে বিলীন হয়ে যায় বলে বিজ্ঞানীদের অনুমান। হোমো ইরেক্টাস ছিল হোমো নিয়ান্ডারথাল ও হোমো সেপিয়েন্সের পূর্বপুরুষ। তবে নিয়ান্ডারথালদের উদ্ভব আধুনিক মানুষের তুলনায় কয়েক লক্ষ বছর আগে। কয়েক হাজার বছর ধরে পৃথিবীতে একইসঙ্গে থাকত মানুষের এই দুই প্রজাতি। তারা একে অপরের মুখোমুখিও হয়েছে। এরইমধ্যে সাম্প্রতিক একটি গবেষণায় উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। অস্তিত্বের শেষ পর্বে নিয়ান্ডারথালদের নিজেদের মধ্যেই লড়াই বেঁধে গিয়েছিল বলে ইঙ্গিত মিলেছে।
সে প্রায় চল্লিশ হাজার বছর আগের কথা। সেই সময়কার বেলজিয়ামের একটা গুহায় বেশ হাড়হিম করে দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছিল। সাম্প্রতিক গবেষণা প্রাগৈতিহাসিক যুগের গুহার গভীর অন্ধকারে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষানিরীক্ষার মাধ্যমে কিছুটা আলো ফেলেছে। তাতে কী দেখা গেল? আমাদের আদিম মানব গোষ্ঠী নিয়ান্ডারথালরা বেছে বেছে অন্য দলের মানুষদের শিকার করত। আর দুর্বলদেরই শিকার করত তারা। অর্থাৎ তাদের নিশানায় ছিল মহিলা ও শিশুরা। কীভাবে তা জানা গেল? ইউরোপের দেশ বেলজিয়ামের পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত একগুচ্ছ গুহার ভেতরে পাওয়া মানুষের হাড়গোড় পরীক্ষা করে দেখেছে ফ্রান্সের ন্যাশনাল সেন্টার ফর সায়েন্টেফিক রিসার্চ (সিএনআরএস)-এর নেতৃত্বাধীন একটি আন্তর্জাতিক দল। তাদের এই গবেষণার বিষয়বস্তু প্রকাশিত হয়েছে। গুহায় প্রাপ্ত ওই হাড়গুলি ৪১ থেকে ৪৫ হাজার বছর পুরনো। আমরা আগেই বলেছি, মোটামুটি ৩০ থেকে ৪০ হাজার বছর আগে নিয়ান্ডারথালরা বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। তাই গুহায় যে সময় ওই হাড়গোড় মিলেছে, সেই সময়টা ইউরোপের নিয়ান্ডারথালদের বিলুপ্ত হওয়ার আগের সময়কাল। এর থেকে হাজার-দেড় হাজার বছরের মধ্যে তাদের অস্তিত্ব বিলুপ্ত হয়ে যায়।
হাড়গুলো থেকে কী জানা গিয়েছে?
হাড়গুলোর দশা দেখে সেই তুষার যুগের কঠিন পরিবেশে অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ের চমকপ্রদ কাহিনির খোঁজ পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। নিয়ান্ডারথালদের আস্তানায় পাওয়া অনেক হাড়েই কাটার দাগ, ভেঙে ফেলা ও মাংস বের করার চিহ্ন দেখা গিয়েছে। আর এই সব দাগ বা চিহ্ন লড়াইয়ের সময় হতে পারে না। বরং অন্য বন্যপ্রাণী শিকার করে যেভাবে খাওয়ার জন্য তারা তৈরি করত, এগুলিও সেভাবেই কাটা-ছেঁড়া হয়েছে। ডিএনএ বিশ্লেষণ থেকে দেখা গিয়েছে, শিকাররা স্থানীয় নিয়ান্ডারথাল গোষ্ঠীর নয়। এর মানে হল, গুহাবাসী নিয়ান্ডারথালরা নিজেদের বাইরের গোষ্ঠীর মানুষদের শিকার করত। হাড়ের রাসায়নিক বিশ্লেষণ থেকে দেখা গিয়েছে, শিকাররা অন্য কোথাও থেকে এসেছিল। তারা ছিল ‘বহিরাগত’। তাদের গুহায় আশ্রয় দিতে নয়, শিকার হিসাবে নিয়ে আসা হয়েছিল।
তাহলে কি ওই সময় নিয়ান্ডারথালরা নিজেদের মধ্যেই লড়াই করত? গবেষকরা বলছেন, সময়টা ছিল অত্যন্ত কঠিন ও প্রতিকূল। ওই সময় থেকে ইউরোপে আধুনিক মানুষ তথা হোমো সেপিয়েন্সদের আনাগোনা শুরু হয়েছিল। ফলে এলাকার সম্পদের দখল নিয়ে চাপ বাড়ে। খাবার ও নিরাপদ বাসস্থানের জন্য টক্কর তীব্র হয়। এই পরিস্থিতিতে অন্য গোষ্ঠীর দুর্বলদের বেছে বেছে হত্যা করার নিশানা কী ইঙ্গিত দিচ্ছে? গবেষকদের অনুমান, নিয়ান্ডারথালদের এক গোষ্ঠী অন্য গোষ্ঠীর মধ্যেও লড়াই চলত। আর তা ছিল পরিকল্পিত। অন্য দলকে ধ্বংস করাই ছিল এর লক্ষ্য। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ব্রাসেলসের রয়্যাল বেলজিয়ান ইনস্টিটিউট অব ন্যাচারাল সায়েন্সে সংরক্ষিত এই হাড়গুলো নিয়ে বিজ্ঞানীরা গবেষণা করেছেন। আগে নিয়ান্ডারথালদের সরল সাদাসিধে গুহাবাসী বলে মনে করা হত। কিন্তু এই গবেষণা থেকে ইঙ্গিত মিলেছে, তাদের দুনিয়াতেও ছিল সামাজিক টানাপোড়েন। অস্তিত্ব রক্ষার প্রবল লড়াই।