


রাজা ভট্টাচার্য: 'মা, একটা কথা ছিল তোমার সঙ্গে।’ প্রদীপটাকে সাবধানে ঠাকুরের সিংহাসনের সামনে নামিয়ে রেখে ফিরে তাকালেন রাসমণি। জগদম্বা তাঁর ছোটো মেয়ে। হয়তো সেই কারণেই সবচাইতে বেশি কাছের, সবচেয়ে স্নেহের। এরকম গলায় তাকে কথা বলার অনুমতি চাইতে কখনো দেখেননি রাসমণি। একটু অবাক হয়েই বললেন, ‘কী হল মা? মন্দিরের কাজ ঠিকঠাক চলছে তো?’
‘ভবতারিণী মন্দির? হ্যাঁ হ্যাঁ, সে কাজ তো উনি নিজেই দেখছেন। আমি আজ অন্য একটা কথা বলতে এসেছি। উনিই বলতেন, কিন্তু ঠিক... তাই আমাকে বললেন তোমার সঙ্গে কথা বলতে।’
‘মথুর তোকে পাঠাল আমার সঙ্গে কথা বলতে?’ সত্যিকারের অবাক হয়ে বললেন রাসমণি, ‘কী এমন কথা রে, সে নিজে বলতে পারছে না?’
ব্যাপারটা সত্যিই অবাক হওয়ার মতোই। কারণ রাসমণির এই জামাইটি বহু বছর ধরে তাঁর সমস্ত কাজে প্রধান সহায়। ইদানীং গঙ্গার দক্ষিণ কূলে ভবতারিণীর মন্দিরের কাজ শুরু হওয়ার পর সে কাজেও মথুরই তাঁর প্রধান ভরসা। শাশুড়ির সঙ্গে তাঁর এমন কী কথা থাকতে পারে, যা তিনি নিজে মুখে বলতে পারছেন না?
সন্ধে হয়ে গিয়েছে বেশ খানিকক্ষণ আগে। জানবাজারের প্রাসাদতুল্য বাড়িটিতে জ্বলে উঠেছে অজস্র ঝাড়বাতি এবং দেওয়ালগিরি। কিছুক্ষণ আগেই একতলার রঘুনাথ জিউর মন্দিরের আরতি শেষ হয়েছে, তারপর উপরে এসেছেন রাসমণি। এখনও তাঁর চোখে লেগে রয়েছে সেই আরতির আলোকছটার মোহ। এই সময় বিষয়কর্ম আলোচনা করতে তাঁর ইচ্ছা করে না। কিন্তু মথুর যখন জগদম্বাকে তাঁর কাছে পাঠিয়েছেন, তখন কিছু একটা সমস্যা হয়েছে। মেয়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে রাসমণি গম্ভীর হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘খুলে বল দেখি, কী হয়েছে?’
সামান্য ইতস্তত করে জগদম্বা বলল, ‘মা, এই নীলকরদের নিয়ে তো বড্ড অসুবিধায় পড়তে হচ্ছে! এরপর তো রায়তদের সামনে মুখ দেখাতে পারব না!’
জানবাজার এস্টেটের মহালের মধ্যে বেশ কিছু নীলকুঠি আছে। আর নীলকর সাহেবরা থাকলে জমিদারের কিছু মাথাব্যথা থাকেই। হাজার হলেও তারা হল সাহেব। নেটিভ জমিদারের কথার তোয়াক্কা করে না তারা। প্রজাদের উপর জবরদস্তি করে।
তবে এসব হল নিত্যদিনের ঝামেলা। এর জন্য মথুর কেন হঠাৎ জগদম্বাকে পাঠাতে গেলেন, তা বুঝতেই পারলেন না রাসমণি। ভুরু কুঁচকে তিনি তাকিয়ে রইলেন মেয়ের দিকে।
‘মানে... এবার তো নীলকুঠির গোরা ফৌজিরা দিনেদুপুরে মেয়েদের হাত ধরে টান দিচ্ছে মা!’ জগদম্বা বলে চলল, ‘মেয়েরা ঘর থেকে বেরুতে সাহস পাচ্ছে না! বল দেখি, গাঁয়েগঞ্জে কি মেয়েদের ঘরে বসে থাকলে চলে? বাইরেও যে হাজারখানা কাজ থাকে! আর এই সাহেবরা যে একেবারে... যাকে বলে মান-ইজ্জত নিয়ে...।’
‘কোন মহালে হচ্ছে রে এসব?’
এইটুকু সময়ের মধ্যে কোনো মানুষের সমস্ত চেহারা যে এমন আমূল বদলে যেতে পারে, তা বোধহয় কেউ চোখে না দেখলে বিশ্বাস করবে না। রাসমণির গৌরবর্ণ মুখ এখন টকটকে লাল, গলায় মেঘ ডাকছে যেন চোখ অগ্নিবৃষ্টি করছে।
‘সে তো উনি বলতে পারবেন।’ কাঁপা গলায় বলল জগদম্বা।
কয়েক মুহূর্তের জন্য খর দৃষ্টিতে মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন রাসমণি। এবার তিনি বুঝতে পারছেন, কেন মথুর নিজে এই কথাটি বলতে আসেননি। তাঁর মহালের রায়তের মেয়েবউদের সম্ভ্রম নিয়ে সাহেবরা ছিনিমিনি খেলছে, একথা শাশুড়ির সামনে বলতে তিনি লজ্জা পেয়েছেন।
‘আমার জানার দরকার নেই। শোন। মথুরকে গিয়ে বলবি, আমি বলেছি— কালই যেন পাইক পাঠিয়ে দোষী ফৌজিদের সদরে নিয়ে গিয়ে কয়েদ করে রেখে দেয়। কুঠির সাহেবরা এলেও যেন ছেড়ে না দেয়। তাদের যেন বলে মামলা করে দিতে। তারপর আমি দেখে নেব।’
জগদম্বার আর মায়ের সামনে বসে থাকার সাহস হল না। এই মূর্তি সে ছেলেবেলা থেকে দেখে এসেছে। অন্যায়ের মুখোমুখি হলে রাসমণির চোখমুখ পালটে যায়। তখন তাঁর সামনে দাঁড়ানোর সাহস কারও নেই।
মথুর অবশ্য কালবিলম্ব করলেন না। সেই রাতেই লোক পাঠিয়ে দিলেন মহালে। রাসমণির প্রতিটি আদেশ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বলে দেওয়া হল সেই লোককে।
তিনদিনের মধ্যেই মহাল থেকে খবর চলে এল— রাসমণির আদেশ পালিত হয়েছে। ছয়জন সাহেব ফৌজিকে পাইকরা কয়েদ করে রেখে দিয়েছে। খোদ নীলকর সাহেব হাতে বন্দুক নিয়ে ঘোড়ার পিঠে চড়ে এসেছিল তাদের ছাড়িয়ে নিয়ে যেতে। নায়েবের হুকুমে পাইকরা তাকেও বের করে দিয়েছে কাছারি থেকে। বলে দিয়েছে, ফের এরকম চেষ্টা করলে তাকেও কয়েদ করে রেখে দেবে।
এবার অবশ্য আর বউকে না পাঠিয়ে মথুর নিজেই এলেন কথা বলতে। থমথমে গলায় বললেন, ‘সাহেবরাও কিন্তু এত সহজে ছেড়ে দেবে না মা। একে তো ফিরিঙ্গি ফৌজিদের আটকে রাখাই মুশকিল, কেন না গ্রামের দিকে প্রায় সব আদালতেই দেশি হাকিম। ফিরিঙ্গি নীলকর বা ফৌজির বিচার করার অধিকার নেই তাঁদের। তার উপর সব নীলকর সাহেবেরই কলকাতার সরকারি দপ্তরে চেনাজানা থাকে। এতক্ষণে যে শহরের ফিরিঙ্গি মহলে একেবারে হইচই পড়ে গিয়েছে, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।’
সম্প্রতি একটি অদ্ভুত কাজে হাত দিয়েছেন রাসমণি। সুবর্ণরেখা থেকে পুরী পর্যন্ত পাকা রাস্তা তৈরি করে দিচ্ছেন তিনি। সেখান থেকে আজ একজন লোক এসেছিল খবর নিয়ে। তারই হাত দিয়ে কাজের টাকাও পাঠিয়ে দিচ্ছেন রাসমণি। মন দিয়ে সেই কাগজপত্রগুলিতে দস্তখত করতে করতেই রাসমণি বললেন, ‘এ আর নতুন কথা কী বাবা! সাহেবদের নিয়ম অমনই। অন্যদের তারা ভারী আইন শেখায়, কিন্তু নিজেদের বেলায় আইন চলে তাদের সুবিধা অনুযায়ী। এ যাত্রায় তাদের অন্তত এইটুকু শিখিয়ে দেওয়া যাক যে, জানবাজার রাজের মহালে ওসব চলবে না।’
মথুর খুব ভালো করেই জানতেন, তাঁর শাশুড়ি এইরকম কিছুই বলবেন। শক্ত গলায় তিনি বললেন, ‘আমি বলি কী, এখানেও পাহারা একটু বাড়িয়ে দেওয়া যাক। কখন কে যে কী গোল পাকায়, তার তো কোনো ঠিক নেই!’
রাসমণি একটু অবাক হয়ে বললেন, ‘এই জানবাজারের বাড়িতে কে গোল পাকাতে আসবে বাবা? ঝামেলা তো চলছে সেই মফস্সলে! তবু তুমি যখন বলছ, তখন না হয় আর ক’জন পাইককে বলে দাও দোর আগলাতে।’
...
সেদিন রাতেই অবশ্য বোঝা গেল, অন্তত এই একটি ক্ষেত্রে রাসমণি ভুল ভেবেছিলেন।
রাত প্রায় দশটার সময়, বাড়ির লোকজন যখন খেয়েদেয়ে শোয়ার তোড়জোড় করছে, চাকরেরা আঁকশি হাতে ঝাড়বাতি নিভিয়ে দিচ্ছে একে একে, ঠিক তখনই একদল সাহেবের প্রচণ্ড চিৎকারে কেঁপে উঠল জানবাজারের গলি। তার সঙ্গে শোনা যাচ্ছে ভারী লোহার দরজায় ক্রমাগত বুট পরা পায়ের লাথি মারার শব্দ।
রাসমণি নিজেও শুয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু এ এমনই শব্দ যে, সেই রাস্তা থেকে এই অন্দরমহল পর্যন্ত যেন কেঁপে উঠল। ধড়মড় করে উঠে বসে কান পাতলেন তিনি। এ কীসের শব্দ?
পরক্ষণেই অবশ্য স্পষ্ট শোনা গেল গোরাদের চিৎকার। স্বজাতীয়দের উপর এইরকম ‘অত্যাচার’ মেনে নেওয়া তাদের অভ্যাস নয়। বিজয়ী শ্বেতাঙ্গ জাতি নিজের অত্যাচারের হিসাব না কষে চলে এসেছে প্রতিবাদীর উপর প্রতিশোধ নিতে।
বিছানা থেকে নেমে দ্রুত পায়ে রাসমণি হেঁটে এলেন অন্দরমহলের বাইরের বারান্দা পর্যন্ত। এখান থেকে নীচের সদর দরজা দেখা যায়। সেই প্রকাণ্ড দরজা এখন কেঁপে কেঁপে উঠছে সম্মিলিত পদাঘাতে। উঠোনে দারোয়ানগুলো কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে, বুঝে উঠতে পারছে না— কী করা উচিত।
পরক্ষণেই মড়মড় শব্দে ভেঙে পড়ল জানবাজার রাজবাড়ির সদর দরজা। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই উঠোনে ঢুকে পড়ল অন্তত পঞ্চাশজন শ্বেতাঙ্গ যুবক। দেখলেই বোঝা যায়, তাদের মধ্যে অধিকাংশই প্রকৃতিস্থ অবস্থায় নেই।
শহরের রাস্তায় গোরা মাতালের উৎপাতের কথা আর সকলের মতোই শুনেছেন রাসমণি। কিন্তু তারা যে রাতের বেলায় তাঁরই প্রাসাদের সদর দরজা ভেঙে বাড়িতে ঢুকে পড়বে, এ কথা কখনো ভাবতেও পারেননি তিনি।
অন্য কোনো মধ্যবয়সি মহিলা এক্ষেত্রে সম্ভবত মূর্ছা যেতেন। এদের অধিকাংশই সারা জীবনে কখনো কোনো শ্বেতাঙ্গ পুরুষ চোখেই দেখেন না।
কিন্তু রাসমণি অন্য ধাতুতে তৈরি। মূর্ছিত হয়ে গেলেন না তিনি। তার বদলে চড়া গলায় আদেশ দিলেন, ‘একজনকেও উঠোন পেরতে দিবি নে! মেরে রাস্তায় বের করে দে মাতালগুলোকে।’
এইবার নীচের উঠোনে রীতিমতো খণ্ডযুদ্ধ শুরু হল। তুমুল শোরগোল ভেসে আসছে নীচ থেকে। দু’পক্ষের হাতেই লাঠিসোটা আছে। কয়েকজন গোরার হাতে পিস্তলও দেখা যাচ্ছে, যদিও তা চালানোর সাহস তারা এখনও সঞ্চয় করে উঠতে পারেনি ।
তবু, গোরারা একে সংখ্যায় বেশি, তায় বেশিরভাগই আদতে সৈনিক। তারা কলাকৌশল জানে ঢের বেশি। রাসমণির পাইকরা ক্রমে পিছু হটতে শুরু করল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই গোরারা সরু প্রবেশপথ পেরিয়ে ঢুকে পড়ল ভিতরে। তাদের সামনে এখন একটা চৌরস উঠোন, তারপর ডাইনে ঘুরলেই...।
ঝড়ের বেগে ঘুরে দাঁড়ালেন রাসমণি। তারপর ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে টানা বারান্দা পেরিয়ে, সিঁড়ি বেয়ে নামতে লাগলেন নীচে।
গোরা বাহিনীর সামনে এখন রঘুনাথ জিউর মন্দির। এরা নিশ্চিতভাবে সেটাকে অপবিত্র করবে বলেই ঠিক করেছে।
এবং রাসমণির দেহে প্রাণ থাকতে সেটা তিনি হতে দিতে পারেন না।
শ্বেতাঙ্গ সৈনিকেরা মারমার করে ঢুকে এল উঠোনে। তাদেরও চোখে পড়েছে, ডানদিকে উঠে গেছে কয়েক ধাপ সিঁড়ি। তার পরেই এক প্রকাণ্ড পূজাবাটি। সেখানে শোভা পাচ্ছে রঘুনাথ জিউর বিগ্রহ। সেই অপরূপ মূর্তির সর্বাঙ্গে সোনার অলংকার। অনির্বাণ প্রদীপের আলোয় সেই অলংকার ঝলসে উঠছে।
উন্মত্ত কোলাহলে সেদিকেই ছুটে গেল তারা। সামান্য নেটিভের স্পর্ধার মূল্য দেবে তাদের দেবতা।
আর ঠিক তখনই তাদের সামনে এসে দাঁড়াল এক অপার্থিব নারীমূর্তি। তার পরনে অতি সাধারণ শাড়ি, মাথার ঘোমটা ঘাড়ে নেমেছে, আঁচল কোমরে জড়ানো।
কিন্তু সেই মূর্তির হাতে খোলা তলোয়ার। চোখ থেকে ঠিকরে বেরচ্ছে আগুন।
‘আয় দেখি কার সাহস আছে ঠাকুরদালানে পা রাখার। কার এত সাহস, যে দেবতার ঘর অপবিত্র করে। আয়, এগিয়ে আয় সাহস থাকলে!’ বলে উঠল সেই নারীমূর্তি!
অসম্ভব আতঙ্কে থমকে দাঁড়াল শ্বেতাঙ্গ সৈনিকেরা। এই মূর্তি তাদের চেনা! ইনি হিন্দুদের দেবী— মা কালী! প্রত্যেকটা উপলক্ষ্যে খোদ কোম্পানি বাহাদুর কালীঘাটে পুজো পাঠান— এমনই এই দেবীর শক্তি! তিনিই কি আজ স্বয়ং আবির্ভূত হয়েছেন মানবীর রূপ ধারণ করে?
পায়ে পায়ে পিছিয়ে যেতে লাগল গোরা সৈন্যের দল। তারা ভয় পেয়েছে।
‘যা বলছি! বেরিয়ে যা! এই বাড়িতে নিত্য পূজা হয়। তাকে অপবিত্র করিস নে! পাপ হবে! মহাপাপ! সে আমি করতে দেব না! এই খোলা তলোয়ার আজ দরকারে রক্ত পান করবে! যা এখান থেকে!’
লাঠি খসে পড়ল পাকা সৈন্যের হাত থেকেও। পিছু হটল মারমুখী গোরারা। বিস্ফারিত চোখে আরও একবার সেই রণরঙ্গিণী নারীমূর্তির দিকে তাকিয়ে সভয়ে পালিয়ে গেল তারা।
এইবার উপরের তলা থেকে ছুটতে ছুটতে নেমে এল অন্যরা। তাদের সর্বাঙ্গ থরথর করে কাঁপছে ভয়ে।
ধীরে ধীরে রঘুনাথের পায়ের কাছে তলোয়ার নামিয়ে রাখলেন রাসমণি। তারপর শান্ত গলায় বললেন, ‘আর ভয় নেই। গোরারা আর কখনো এই বাড়িতে ঢোকার সাহস পাবে না। ওরে, কাল লোক ডেকে সদর দরজাটা সরিয়ে নিস।’
তারপর শান্তভাবে মাথায় ঘোমটা তুলে মথুরকে বললেন, ‘নায়েবমশাইকে বোলো, এরপর নীলকুঠির সাহেব এলে যেন বন্দুকের আওয়াজ করে। যে যে-ভাষা বোঝে, বুঝলে বাবা!’