


ঢাকা: উসকানি, পুলিশকে নিষ্ক্রিয় রাখা এবং গণহত্যার নির্দেশ। জুলাই অভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ প্রমাণিত! দোষী সাব্যস্ত বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সোমবার ফাঁসির সাজা দিল ঢাকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবিউনাল। মুজিব-কন্যা সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকেও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। দু’জনের সব সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হবে। তৃতীয় অভিযুক্ত তথা বাংলাদেশ পুলিশের প্রাক্তন আইজি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন বর্তমানে রাজসাক্ষী। তাঁকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ডের নির্দেশ ট্রাইবিউনালের। এই রায় ঘোষণা হতেই হাততালিতে ফেটে পড়ে গোটা এজলাস। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ৩২, ধানমন্ডিতে শুরু হয়ে যায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাসভবন নতুন করে ভাঙার তোড়জোড়। হাজির হয়ে যায় বুলডোজারও। যদিও পুলিশ-সেনার অতি তৎপরতার জেরে শেষপর্যন্ত সন্ধ্যায় রণে ভঙ্গ দেয় বিক্ষোভকারীরা।
গণঅভ্যুত্থানের পর গত বছর ৫ আগস্ট পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যান হাসিনা। এরপর মহম্মদ ইউনুসের অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। গত বছর ১৭ অক্টোবর হাসিনার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে ট্রাইবিউনাল। সেই আদালত প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীকে কী সাজা দিতে চলেছে, তা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল আগেই। এদিন ঘোষণা হল রায়। আড়াই ঘণ্টা ধরে রায় ঘোষণা করে ট্রাইবিউনাল জানায়, হাসিনার বিরুদ্ধে তিনটি অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। উসকানিমূলক বক্তৃতা দিয়ে ছাত্র-জনতাকে হত্যার প্ররোচনা দেওয়ার অপরাধে আমৃত্যু কারাদণ্ডের সাজা দেওয়া হয়েছে তাঁকে। এছাড়া হেলিকপ্টার, ড্রোন ও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে আন্দোলনকারীদের নির্মূলের নির্দেশ, চানখাঁরপুল এলাকায় ৬ জনকে হত্যা এবং আশুলিয়া ৬ জনকে খুন করে দেহ পুড়িয়ে দেওয়ার অপরাধে ফাঁসির সাজা ঘোষণা হয়েছে। সন্ধ্যার মধ্যেই নয়াদিল্লির কাছে হাসিনাকে ফেরত চেয়ে কাছে চিঠি পাঠিয়েছে ঢাকা। এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বাংলাদেশের বিদেশ মন্ত্রক জানিয়েছে, ‘আমরা ভারত সরকারের কাছে আহ্বান জানাচ্ছি, অবিলম্বে দণ্ডপ্রাপ্ত দুই ব্যক্তিকে বাংলাদেশ সরকারের কাছে হস্তান্তর করুক। দুই দেশের মধ্যে প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুসারে এটি ভারতের অবশ্য পালনীয় দায়িত্ব।’ পালটা প্রতিক্রিয়া দিয়েছে ভারতও। ভারতের বিদেশ মন্ত্রক এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবিউনালের রায় সম্পর্কে ভারত অবহিত। প্রতিবেশী হিসেবে বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থরক্ষার বিষয়ে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এর মধ্যে শান্তি, গণতন্ত্র ও স্থিতিশীলতার মতো বিষয়গুলি রয়েছে। গোটা বিষয়টিতে জড়িত সকলের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলা হচ্ছে।’
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানের হয়ে লড়াই করা রাজাকারদের বিচারের জন্য এই ট্রাইবিউনাল তৈরি করেছিলেন স্বয়ং হাসিনা। সেই আদালতেই তাঁর বিচার হল। বাংলাদেশে প্রথম কোনও প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী এভাবে শাস্তি পেলেন। যদিও বিচার প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন মুজিব-কন্যা। এদিন তিনি বলেছেন, ‘আমি একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করেছিলাম, তার বদলা নেওয়া হল। বিচার ব্যবস্থা এতটাই প্রহসনে পরিণত হয়েছে যে, পাঁচ মাসের মধ্যেই সব শুনানি শেষ হয়ে ৪৫৩ পাতার রায় ঘোষণা পর্যন্ত হয়ে গেল। আমাদের কথাই শোনা হল না।’ তাঁর আরও অভিযোগ, ‘পাকিস্তান সেনার সহযোগীদের বিচারের জন্য এই আন্তর্জাতিক ট্রাইবিউনাল তৈরি হয়েছিল। কিন্তু আমি তো বাংলাদেশেরই নাগরিক। এই ট্রাইবিউনালে আমার বিচার হয় কীভাবে?’ হাসিনার দল আওয়ামি লিগের তরফেও এই রায় প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। দলের নেতা জাহাঙ্গির কবির নানক ভিডিয়ো বার্তায় জানিয়েছেন, ‘বাংলাদেশের জনগণ এই রায় মানে না, মানবে না।’ দেশজুড়ে বন্ধের ডাকও দিয়েছে আওয়ামি লিগ।
ঢাকা সহ বিভিন্ন শহরে রবিবার থেকেই রেড অ্যালার্ট জারি করা হয়েছিল। রায় ঘোষণা হতেই ঢাকার রাস্তায় উচ্ছ্বাস দেখাতে শুরু করে হাসিনা বিরোধীরা। বিলি হয় মিষ্টিও। এর মধ্যেই ঢাকার ধানমন্ডিতে ব্যাপক উত্তেজনা ছড়ায়। ১০ মাস আগে জ্বালিয়ে দেওয়া বঙ্গবন্ধুর বাসভবন ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে দু’টি বুলডোজার নিয়ে হাজির হয় ছাত্র-জনতার একাংশ। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ শুরু হয়ে যায় তাদের। শেষপর্যন্ত লাঠিচার্জ ও সাউন্ড গ্রেনেড ফাটিয়ে তাদের সরিয়ে দেয় প্রশাসন।