


হারাধন চৌধুরী: পাঁচবছর আগে ফিরে যেতে হচ্ছে। একুশের ভোটে বঙ্গবিজয়ের স্বপ্ন দেখিয়েছিল বিজেপি। তাও যেমন তেমন জয় নয়, বিপুল জয়ই হাসিল করবে বলেছিল। গেরুয়া শিবিরের দাবি ছিল, ২৯৪ আসনের বিধানসভায় তারা শাসক পক্ষে বসবে দুশোর বেশি আসন নিয়ে। কিন্তু মোদি-শাহের অশ্বমেধের ঘোড়া মুখ থুবড়ে পড়েছিল একশো ছোঁয়ার অনেক আগেই। যেন এক বালকের ঘুড়ি গোত্তা খেল! ওড়াবার খেলা ভালোমতো না শিখেই আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্নে বিভোর হয়েছিল বলে। কেউ দেখে শেখে, কেউ শেখে ঠেকে। বিজেপি বাংলার রাজনীতি কম দেখেনি, তারা ঠেকেওছে বিস্তর। কিন্তু দুটো থেকে কোনো পাঠই নেয়নি তারা। তাই বাংলার বিজেপি কর্মী-সমর্থকরা বারবার ঠকছেন নেতৃত্বের কথায় নেচে। কথাটা কেন আসছে? ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনে বাংলায় বিজেপির ঝুলিতে এসেছিল মাত্র ১২টি আসন। অর্থাৎ ২০১৯-এর পর উত্তরণ দূর, অবনমনই হয়েছিল মারাত্মক। অথচ ভোট প্রচারে নেতাদের বাহু ফোলানো দেখে মনে হচ্ছিল, বাকি দলগুলোকে শূন্য হাতেই ফিরতে হবে। পরবর্তী বিধানসভা উপনির্বাচনেও অব্যাহত ছিল বিজেপির পতনের ধারা। সাম্প্রতিক অতীতে অনুষ্ঠিত পুরসভা এবং পঞ্চায়েত নির্বাচনেও মুখ চুন হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর দলের। বাংলায় ভরাডুবি নিয়েই দিশাহারা বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। তাই একেক সময়ে একেক কৌশল নিয়েছে। কিন্তু তাদের কোনো কৌশলই কাজে আসেনি। ব্যাপারটা ‘মরিব মরিব কৌশল করি মরিব’ই দাঁড়িয়েছে শেষমেশ।
কারণ কৌশলগুলির মধ্যে আর যাই থাক বাংলার মানুষের ভালো করার বিন্দুমাত্র সদিচ্ছা ছিল না। অথচ রাজনীতি মানুষকে বাদ দিয়ে নয়। মানুষকে সঙ্গে নিয়ে, মানুষের স্বার্থে এবং মানুষের জন্য যে রাজনীতি নয়, তাকে মানুষ যে প্রত্যাখ্যান করবেই। বিজেপি এই সত্য আজও উপলব্ধি করেনি। বাংলার রাজনীতির সঙ্গে দেশের বাকি অংশের মিল যত, অমিল তার চেয়ে বেশি। কিছু রাজ্যে সরকার বদল হয় পাঁচ-দশ বছর অন্তর। এখানে এমন সংখ্যাতত্ত্ব অচল। বাংলার মানুষ কাউকে হাভাতের মতো গ্রহণ করে না। আবার কাউকে একবার ভালোবেসে ফেললে তার মুখের উপর দরজা বন্ধ করে দেওয়ার আগে তলিয়ে ভাবে। তবে বাংলার দরজা কারো জন্য একবার বন্ধ হয়ে গেলে তা আর চট করে খোলে না। কংগ্রেস আর সিপিএমের দিকে তাকান, উত্তরটা পেয়ে যাবেন। বাংলার মানুষের কাছে প্রত্যাখ্যাত হতে হয় কী কারণে? তার দীর্ঘ পাঠ রেখে গিয়েছে কংগ্রেস, সিপিএম উভয়েই। তাদের বরাবরের সম্পর্ক ছিল সাপে-নেউলে যথা। দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার কারণে, সাম্প্রতিক অতীতে তারাই বন্ধু বন্ধু খেলায় নাম লিখিয়েছিল। তার ফল কী হয়েছে? বিধানসভায় দুজনেই শূন্য! সেই শূন্যতা কাটানোই আজ দলদুটির সামনে বৃহত্তম চ্যালেঞ্জ।
বাংলার মানুষের মন জয় করতে হয় কীভাবে? তার চলমান পাঠের নাম মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর আজীবনের রাজনীতি মানুষকে ঘিরে এবং অবশ্যই মানুষের সার্বিক কল্যাণের জন্য। দেশ স্বাধীন হয়েছে প্রায় আট দশক আগে। কিন্তু দেশবাসীর দারিদ্র্যমুক্তি হয়নি। কমেনি বঞ্চনা এবং বৈষম্য। যেকোনো সমাজ এবং অর্থনীতির সর্ববৃহৎ ব্যাধি এই দুটি। দুটিরই মূলে নির্মম কুঠারাঘাত করার সংকল্পই মমতার রাজনীতি এবং প্রশাসন পরিচালনায় অগ্রাধিকার। সমাজে সবচেয়ে পিছিয়ে তফসিলি জাতি, জনজাতি, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের একাংশ এবং সার্বিকভাবে মহিলারা। তাই ২০১১ সালে রাইটার্সের দায়িত্ব হাতে পেয়েই অন্তর্ভুক্তির নীতিতে আস্থা বৃদ্ধি করেন মমতা। নিছক কিছু ঝাঁচকচকে ইটপাথর লোহালক্কড়ের সুদৃশ্য ইমারত নির্মাণই যে একমাত্র উন্নয়ন নয়, উন্নয়নের পরিধি ও গভীরতা যে আরো বেশি, সেটা তাঁর নিরলস কর্তব্যকর্মের মধ্য দিয়েই প্রমাণ করে চলেছেন মমতা। তাঁর কাছে প্রথম গুরুত্ব পেয়েছে খিদের জ্বালা এবং অপুষ্টি কমানো। তারপরই এসেছে মহিলাদের হাতে এবং গরিব পরিবারগুলিতে নগদের জোগান বৃদ্ধি। নারী ও গরিবের ক্ষমতায়নই মমতা বন্দ্যোধ্যায়ের রাজনীতি এবং সরকারের প্রধান কীর্তি। একথা বললে অত্যুক্তি হবে না যে, উন্নয়নের সংজ্ঞাই বদলে দিয়েছে মমতা জমানা। যখন বিভেদ আর বিদ্বেষের রাজনীতির হাতে আক্রান্ত দেশ, তখন এই বিপরীত যাত্রা সহজ কথা নয়।
এজন্য তিনি অবশ্যই কতকগুলি অভিনব সামাজিক সুরক্ষামূলক কর্মসূচি ও প্রকল্প চালু করেছেন। সেগুলির মধ্যে কন্যাশ্রী, লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, স্বাস্থ্যসাথী প্রভৃতি দেশজুড়ে সাড়া ফেলে দিয়েছে। প্রকল্পগুলির আবেদন এমনই যে, তাদের নিয়ে বিজেপির সাপের ছুঁচো গেলার অবস্থা হয়েছে—না পারছে গিলতে না পারছে উগরে ফেলতে। মহারাষ্ট্র, মধ্যপ্রদেশ, ওড়িশার পর বিহারেও ভোটে পাশ করতে বিজেপি মমতাকে ভয়ংকরভাবে টুকেছে। মোদিবাবুর মুখে ‘রেউড়ি’ কটাক্ষ আর শুনতে পান? কারণ তাঁরা জানেন, এই কটাক্ষ আজকের পরিস্থিতিতে সাক্ষাৎ আত্মঘাতী। লক্ষ্মীর ভাণ্ডার ইস্যুতে সিপিএমের বিপ্লবীদের তো কান ধরে ওঠবস করার দশা হয়েছিল। এর পাশাপাশি মমতা শুধু সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পরিবেশই রচনা করেননি, ভেঙে দিয়েছেন উত্তরবঙ্গ, দক্ষিণববঙ্গ নিয়ে বিভাজনের খেলাটাকেও। তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন, বঙ্গভঙ্গ আর নয়, পুরো রাজ্যেই পশ্চিমবঙ্গবাসীর পূর্ণ অধিকার, বাংলার শক্তি কোনোরকম বিভাজনে নয়, বরং সার্বিক ঐক্যে, একতাই বল আমাদের।
অন্যদিকে, বাংলায় এবং বাংলা ও বাঙালিকে নিয়ে বিজেপি যে রাজনীতি আমদানি করেছে তার সঙ্গে বাংলা ও বাঙালির কোনো সম্পর্ক নেই। বাংলা ও বাঙালির ঐতিহ্য ও চেতনার সঙ্গে ওসব কোনোভাবেই খাপ খায় না। হিন্দু এবং মুসলমানের কাউকেই বাদ দিয়ে বাংলার কথা কল্পনা করা যায় না। কিন্তু সংঘের অনুসারীরা চায় কেবল হিন্দুর বাংলাকে। তাদের কাছে মুসলিম জনগোষ্ঠীর কোনো কদর নেই। এই অবাঞ্ছিত প্রশ্নে তারা এতটাই বেপরোয়া যে, একথা তারা গোপনও করছে না। রাজনৈতিক প্রচারে তা সরাসরি উচ্চারণ করছে নির্লজ্জের মতোই। এজন্য বিজেপিসহ উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা ভগবান রামচন্দ্রকে তো বটেই, সামনে রাখছে গীতার মতো পবিত্র গ্রন্থ এবং স্বামী বিবেকানন্দ, ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ ও সারদা মায়ের মতো প্রাতঃস্মরণীয় মনীষীদের। হিন্দুদর্শন এবং সনাতন ধর্মে ঘৃণা ও অসহিষ্ণুতার যে কোনো স্থান নেই—এই পরম সত্যটা তারা গুলিয়ে দিতে চাইছে। ‘মিলাবে মিলিবে যাবে না ফিরে’ আর ‘যত মত তত পথ’ই আমাদের মহামন্ত্র। সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করার মতলবে ধর্মীয় মেরুকরণের রকমারি পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ব্যস্ত গেরুয়া মাতব্বররা। গোবলয়ের ফলিত রাজনীতি বাংলায় অচল বুঝে গিয়ে হাতিয়ার করা হয়েছে এসআইআর। মুসলিম ভোটারের একটা বড়ো অংশকে ‘মাইনাস’ করে দেওয়ার মরিয়া চেষ্টা চলছে। ইসিআইয়ের মতো একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা ও পবিত্রতা যে তাতে নষ্ট হচ্ছে, তা নিয়ে ভাবছেন না মোদিবাবুরা। এখানেই শেষ নয়, একাধিক মুসলিম সংগঠন ও নেতাকে নামানো হচ্ছে ‘ভোটকাটুয়া’র ভূমিকায়। কারণ বিজেপি জানে, মুসলিম ভোটারদের বেশিরভাগেরই সমর্থন থাকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনীতির প্রতি। অর্থাৎ হিন্দু ভোট সংহত করার পাশাপাশি তৃণমূল কংগ্রেসের সংখ্যালঘু ভোটভিত্তি দুর্বল করেই ছাব্বিশে কামাল করার খোয়াব দেখছেন মোদি-শাহরা।
কিন্তু বাংলার মানুষ এই বিজেপিকে মানবে কোন যুক্তিতে? বিগত দুটি লোকসভা এবং গত বিধানসভা নির্বাচনে বাংলার যতটুকু সমর্থন বিজেপি পেয়েছে, তার কোন প্রতিদান ফিরিয়ে দিয়েছে? একশো দিনের কাজ, আবাস যোজনায় বেনজির বঞ্চনাই জুটেছে কেবল। এছাড়া বাংলার বাইরে গিয়ে বাংলায় কথা বলার অপরাধে জুটেছে ‘বাংলাদেশি’ কিংবা ‘রোহিঙ্গা মুসলমান’ তকমা! এমনকি বহুজনের উপর অমানুষিক অত্যাচার হয়েছে, প্রাণও গিয়েছে একাধিক গরিব মানুষের। সোনালি বিবির মতো কাউকে কাউকে রাতের অন্ধকারে পুশব্যাক করা হয়েছে বাংলাদেশে। বাংলার মর্যাদা ও অর্থনীতিকে দুর্বল করার এই নোংরা খেলার কথা বাঙালি ভুলে যাবে? আমাদের স্মৃতি এখনও এতটা দুর্বল হয়নি যে!
জাতির কথা ছেড়েই দিলাম। বঙ্গ বিজেপিকেই-বা কী দিয়েছেন দিল্লিওয়ালারা? দু দু-বার একগুচ্ছ এমপি বাগিয়েও মোদিবাবু বাংলাকে একজনও পূর্ণমন্ত্রী দেননি। মন্ত্রিসভায় সিকি আধুলির কোনো মূল্য নেই। বাংলা থেকে দু-চারজন দাপুটে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী থাকলে তাঁরা অন্তত রাজ্যের দাবি নিয়ে কিছুটা লড়তে পারতেন। কিন্তু সেই সহজ পথ গোড়া থেকেই রুদ্ধ। বিজেপির জাতীয় নেতৃত্বেও বাংলার কোনো প্রতিনিধিত্ব নেই। আরও পরিতাপের বিষয় হল, বাংলার নির্বাচনেও বঙ্গ বিজেপি নেতাদের স্বাধীনতা ও ভূমিকা বহুলাংশে নাকচ হতে চলেছে। সবটাই যেন মালিক যা করেন। মালিক উপর থেকে একগুচ্ছ নেতা চাপিয়ে দিয়েছেন। বাঙালিরা তাঁদের ফাইফরমাশ খেটে এবার ধন্য হবেন বলে প্রস্তুত হচ্ছেন। মোদির সরকার এবং দল দেখে মনে হয়, বিজেপি নয়, গুজরাতের কোনো পার্টিই সারা দেশের উপর ছড়ি ঘোরাচ্ছে। ভারত নামক সুবৃহৎ দেশটি প্রকারান্তরে গুজরাতের উপনিবেশ মাত্র। অর্থাৎ কোনো কৌশলে এই বেনিয়ারা বাংলার ক্ষমতা একবার দখলে নিতে পারলে, বাঙালি দু-কূলই হারাবে। কেন্দ্রে এখন বাঙালির কিছু নেই। রাজ্যটাকে শক্ত হাতেই ধরে রেখেছেন মমতা। বাঙালির এই সবেধন নীলমণিটাও হাতছাড়া হবে রাত পোহাতে না পোহাতে। তাই সাধু সাবধান! মাঝেমধ্যে বিজেপির সভায় শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ছবি দেখে এবং মোদিবাবুর মুখে বাংলাভাষায় দু-চারটি শব্দবন্ধ কিংবা বিকৃত উচ্চারণের বাক্য শুনে আহ্লাদ করার কিছু নেই। সবটাই ঔপনিবেশিক ধাঁচের ধান্দাবাজি।
এসব কৌতুকে কিছু হাততালি মিলতেই পারে, কিন্তু জেতার মতো ভোট মিলবে না বিজেপির। সেদিন একজন অটোচালক বলছিলেন, এগারোর ভোটের আগে ব্রিগেডে বামফ্রন্টের ডাকে এত মানুষ ভিড় জমিয়েছিল যে সবার জায়গা দেওয়া যায়নি! কিন্তু ভোটের রেজাল্টে দেখা গেল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়েরই জয় জয়কার। ভিড় এবং হাততালি মানেই ভোট নয়। সার্কাসপ্রেমী মানুষ কিন্তু কম নেই এই বঙ্গে। সার্কাসের তাঁবু পড়েছে শুনলেই তারা ভিড় জমাবে। বিজেপির রমকারি সার্কাসে কিছু ভিড়টিড় হয় বটে, ভোটযন্ত্রে বিজেপির বোতাম অব্দি তা পৌঁছায় না।