


অগ্নিভ ভৌমিক, কৃষ্ণনগর: নির্বাচন কমিশনের টার্গেট বাংলার মহিলা ভোটার—এসআইআরের শুরু থেকেই এই অভিযোগ তুলে আসছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর অভিযোগ যে অমূলক নয়, সেটা শেষ পর্বে টের পাচ্ছেন গ্রামগঞ্জের মহিলারা। বাবা-মা’র নাম দিয়ে প্রোজেনি ম্যাপিং করলেও বাদ গিয়েছে তাঁদের মেয়েদের নাম। আর এমনই ঘটনা সামনে এসেছে বিজেপি প্রভাবিত কৃষ্ণগঞ্জ বিধানসভার সীমান্তবর্তী গেদে গ্রামে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি চূড়ান্ত ভোটার তালিকা বেরোনোর পর দেখা যায়, কোনো কারণ ছাড়াই গ্রামের শতাধিক মহিলার নাম বাদ পড়েছে। তাঁদের মধ্যে অধিকাংশই গৃহবধূ। বৃহস্পতিবার জেলা প্রশাসনকে বিষয়টি লিখিতভাবে জানিয়েছেন তাঁরা। এর পিছনে কমিশনের ষড়যন্ত্র দেখছে তৃণমূল। তাদের যুক্তি, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বড় ভোটব্যাঙ্ক হলেন মহিলারা। লক্ষ্মীর ভাণ্ডার সহ নানা স্বনির্ভরমূলক প্রকল্পের হাত ধরে তাঁদের আর্থিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই মহিলাদের নাম বাদ পড়লে ভোটে ফায়দা তোলার সুযোগ পাবে বিজেপি।
কৃষ্ণগঞ্জ বিধানসভায় একুশের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি ২১ হাজার ভোটে জয়ী হয়েছিল। চব্বিশের লোকসভা ভোটে ২৭ হাজার ভোটে এগিয়ে ছিল তারা। এই বিধানসভা কেন্দ্রে কমবেশি প্রায় ৪০ শতাংশ মতুয়া ভোট রয়েছে। এখানকার সীমান্ত ঘেঁষা গ্রাম হল গেদে। গ্রামের ১৭ এবং ১৯ নম্বর বুথের ১৩০ জন ভোটার এদিন জেলা প্রশাসনের কাছে অবৈধভাবে নাম বাদ দেওয়ার বিষয়টি লিখিতভাবে জানিয়েছেন। তাৎপর্যপূর্ণভাবে তাঁদের মধ্যে ১২০ জনই মহিলা! অভিযোগকারীদের দাবি, ইনিউমারেশন ফরম পূরণ করার সময় কমিশনের নির্দেশিকা মেনে পারিবারিক লিংক প্রদান করা হয়েছিল। অর্থাৎ, শুরু থেকেই তাঁরা ম্যাপড ভোটার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। কিন্তু গ্রামবাসীদের অভিযোগ, বৈধ লিংক থাকার পরও তাঁদের শুনানিতে ডাকা হয়েছিল। সেখানে নথিপত্র জমা দিয়েছিলেন তাঁরা। তা সত্ত্বেও তালিকায় নাম নেই। অবিলম্বে তদন্ত করে প্রকৃত সত্য উদঘাটনের দাবি তুলেছেন অভিযোগকারীরা।
অভিযোগকারিণীদের একজন কৃষ্ণগঞ্জের বাসিন্দা পায়েল বিশ্বাস হালদার। ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় তাঁর বাবা উত্তম হালদারের নাম রয়েছে। ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ভোটার তালিকাতেও জ্বলজ্বল করছে উত্তমবাবুর নাম। কমিশনের নিয়ম মেনে পায়েলদেবী বাবা হিসেবে উত্তমবাবুকে ম্যাপিংয়ে এনেছিলেন। তারপরও তাঁকে শুনানিতে ডাকা হয়। তখন মাধ্যমিকের অ্যাডমিট, সার্টিফিকেট, জাতিগত শংসাপত্র, বাবা ও মায়ের জাতিগত শংসাপত্র জমা দিয়েছিলেন। তাতেও কাজ হয়নি। নাম বাদ পড়ছে পায়েলদেবীর। স্বাভাবিকভাবেই তৃণমূলের প্রশ্ন, ‘পায়েলদেবীকে কোন যুক্তিতে কমিশন অবৈধ ভোটার বলতে পারে?’
ওই এলাকার জেলা পরিষদের শিক্ষা কর্মাধ্যক্ষ কার্তিক মণ্ডল বলেন, ‘আমাদের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মহিলাদের জন্য নানা প্রকল্পের মাধ্যমে নারী ক্ষমতায়ন ঘটিয়েছেন। বিজেপির কথায় কমিশন তাই মহিলা ভোটারদের টার্গেট করে তাঁদের নাম বাদ দিয়েছে। যে লিঙ্কের মাধ্যমে বাবা-মা বৈধ ভোটার হলেন, সেই একই লিঙ্কের মাধ্যমে তাঁদের সন্তানরা কীভাবে অবৈধ ভোটার হন? সব গুলিয়ে দিচ্ছে কমিশন।’
নাম বাদ যাওয়া ভোটার নিলীমা হালদার বলেন, ‘আমার মা-বাবার নাম ভোটার তালিকাতে রয়েছে। তাঁদের মাধ্যমেই আমি ম্যাপিং করেছিলাম। তারপরেও শুনানির নোটিস ধরানো হয়। সেইমতো আমি সমস্ত কমিশন নির্ধারিত নথিপত্র জমা করেছিলাম। কিন্তু, আমার নাম বাদ দিয়েছে।’ ওই গ্রামের আর এক মহিলা সুস্মিতা মণ্ডলও বলেন, ‘আমার বাবার বাড়ি মুর্শিদাবাদ। শ্বশুরবাড়ি গেদে গ্রামে। আমার পরিবারের সকলের নাম রয়েছে। আমার নামটাই নেই।’ বিজেপি বিধায়ক আশিসকুমার বিশ্বাস বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন নিজে এসে নাম বাদ দিতে যায়নি। মানুষের এই হয়রানির জন্য রাজ্য সরকারই দায়ী।’