


পরামর্শে পিয়ারলেস হাসপাতালের নেফ্রোলজিস্ট ডাঃ সৌভিক সুরাল।
কিডনি রোগ এবং ব্লাড প্রেশারের কথা উঠলেই প্রথমেই মাথায় আসে সেই আদিম তুলনার কথা— মুরগি আগে নাকি ডিম আগে! কারণ, কিডনির রোগ এবং উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা একে অপরের সঙ্গে সংযুক্ত।
জানা গিয়েছে, যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ রক্তচাপের সমস্যায় ভোগেন, তাঁদের সঠিকভাবে চিকিত্সা না করালে কিডনির সমস্যা হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়।
আবার উল্টোটাও সঠিক। যে কারও যদি কিডনি ডিজিজ থাকে তাহলে বাড়তে পারে ব্লাড প্রেশার। সেইজন্য এই সমস্যাকে দুষ্ট চক্র বলে। অর্থাত্ একটা সমস্যা বাড়লে অন্য সমস্যা মাথাচাড়া দেয়।
ব্লাড প্রেশার থাকলে দুই ধরনের কিডনির অসুখ হতে পারে। একটিকে বলে বিনাইন নেফ্রোস্ক্লেরোসিস, অপরটি হল ম্যালিগনেন্ট নেফ্রেস্ক্লেরোসিস যার ম্যালিগনেন্ট হাইপারটেনশনের সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে।
বিনাইন নেফ্রোস্ক্লেরোসিস
অনেকেরই দীর্ঘদিন ধরে মাঝারি গোত্রের ব্লাডপ্রেশার থাকে। তবে এই মাঝারি গোত্রের প্রেশারও কিডনির নেফ্রনের ফাইব্রোসিস ঘটাতে পারে। তবে এই অসুখের অগ্রগতি হয় ধীরে ধীরে। তবে ব্লাড প্রেশার কন্ট্রোলে রাখতে পারলে কিডনির অসুখের অগ্রগতিও মন্থর হয়ে যায়।
ম্যালিগনেন্ট হাইপারটেনশন
ম্যালিগনেন্ট হাইপারটেনশনের অর্থ হল, রক্তচাপ একেবারেই কন্ট্রোলে নেই। রোগীর ডায়াস্টোলিক বা নীচের প্রেশারই হয়তো রয়েছে ১২০-১৩০! এক্ষেত্রে কিডনিতে খুব চাপ পড়ে। কিডনির নেফ্রনগুলিতে যে রক্তবাহী নালীগুলি আছে, সেগুলি নষ্ট হতে থাকে। দ্রুত কিডনি খারাপ হতে থাকে। ম্যালিগনেন্ট হাইপারটেনশন নিঃসন্দেহে মেডিক্যাল ইমার্জেন্সি।
এক্ষেত্রে দরকার পড়লে রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করে হাই ব্লাড প্রেশারকে স্বাভাবিক অবস্থায় নিয়ে আসতে হবে। ব্লাড প্রেশার স্বাভাবিক অবস্থায় এলে আনা গেলে দেখা যাবে, কিডনিও ধীরে ধীরে আগের অবস্থায় ফিরে যাচ্ছে।
ম্যালিগনেন্ট নেফ্রোস্ক্লেরোসিস বা হাইপারটেনশন দ্রুত কন্ট্রোলে না এলে খুব তাড়াতাড়ি কিডনি খারাপ হওয়ার আশঙ্কা থাকে। মোট কথা এই হল দুই ধরনের হাইপ্রেশার যার থেকে কিডনি খারাপ হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
কিডনির অসুখ থেকে যখন বাড়ে ব্লাড প্রেশার
কিডনির অসুখ থেকেও কারও কারও ব্লাড প্রেশার বাড়তে থাকে। এই সমস্যাকে আবার দুইভাগে ভাগ করা যায়। একটি সমস্যার নাম রেনাল প্যারেনকাইমাল হাইপারটেনশন। অন্যটিকে বলে রেনোভাসকুলার হাইপারটেনশন।
প্যারেনকাইমাল-এর অর্থ হল কিডনির কোষ সংক্রান্ত বিষয়। কিডনির কোষ সংক্রান্ত কোনও সমস্যা হলে ও তার কারণে রক্তচাপ বাড়ে।
অন্যদিকে কিডনিতে রক্ত সরবরাহকারী রক্তবাহী নালীগুলিতে কোনও ব্লক থাকলে, তখন তাকে বলে রেনাল আর্টারি স্টেনোসিস বা রেনো ভাসকুলার হাইপারটেনশন।
রেনোভাসকুলার হাইপারটেনশনের চিকিত্সা
এই সমস্যায় আক্রান্ত রোগী হঠাত্ খুব হাই ব্লাডপ্রেশার নিয়ে চিকিত্সকের কাছে হাজির হন। তবে এই হাইপারটেনশনের চিকিত্সার একটা বড় সুবিধা আছে। তা কেমন?
এক্ষেত্রে শুধুমাত্র ওই ভেসেল-এর ব্লকের চিকিত্সা করলে রোগী অনেকখানি সুস্থ হয়ে যান। প্রশ্ন হল, কী কী কারণে রেনোভাসকুলার হাইপারটেনশন হয়? বয়স এবং বয়সের বৃদ্ধির সঙ্গে অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিস (রক্তবাহী নালীতে প্লাক জমে নালী সরু ও শক্ত হয়ে পড়ার সমস্যা) একটি বড় কারণ।
এছাড়াও কিছু পরিস্থিতি আছে, যেগুলিকে বলে আর্টারাইটিস। এই ধরনের সমস্যা জাপানে বেশি পাওয়া যেত। এখন ভারতেও প্রচুর পাওয়া যাচ্ছে। এক্ষেত্রে শরীরের নানা রক্তবাহী নালী সরু হয়ে যায়। সরু হয়ে যায় কিডনির রক্তবাহী নালীও। এই সমস্যার সুনির্দিষ্ট উপসর্গও রয়েছে। অনেকক্ষেত্রেই দেখা যায়, রোগীর হাতে পালস পাওয়া যাচ্ছে, অথচ পায়ে পাওয়া যাচ্ছে না! কিংবা এক হাতে খুব ভালো পালস পাওয়া যাচ্ছে, অথচ অন্য হাতে পালস মিলছে না!
এই কারণে যখনই প্রেশারের সমস্যা নিয়ে রোগী আসেন, শুধু এক হাতের প্রেশার দেখলে হবে না। চার হাত-পায়ের প্রেশারই দেখতে হবে।
যদি দেখা যায় যে দু’টি হাতের প্রেশার রিডিং আলাদা রয়েছে, তাহলে অবশ্যই একবার আর্টারাইটিস বা রেনাল আর্টারির কোনও সমস্যা আছে কি না তা খতিয়ে দেখা দরকার। এক্ষেত্রে বুঝতে হবে কোনও হাতের আর্টারির মতোই হয়তো রেনাল আর্টারির একটা দিক হয়তো ব্লক হয়ে আছে!
এখন ব্লক থাকলেই কিডনি থেকে রেনিন গ্রুপের হর্মোন বেরতে থাকে। সুতরাং কম বয়সে ব্লাড প্রেশার বাড়তে থাকলে দুটো টেস্ট করা দরকার। প্রথমটি হল আলট্রাসাউন্ড, দ্বিতীয়টি হল ডপলার স্টাডি। ডপলার স্টাডি করলেই ভেসেলগুলোর কী অবস্থায়, তা পরিষ্কার বোঝা যায়।
সমস্যা ধরা পড়লে তখন এমআরআই বা সিটি অ্যাঞ্জিওগ্রাম করার প্রয়োজন হতে পারে। রোগ সম্পর্কে নিশ্চত হয়ে গেলে তখন ঠিক করতে হবে। ঠিক কীভাবে হবে চিকিত্সা?
যদি দেখা যায় রেনোভাসকুলার ডিজিজ আছে, ওষুধ দিয়ে সমস্যাও নিয়ন্ত্রণে আসছে, তাহলে সার্জারির প্রয়োজন নেই। তবে ওষুধ দেওয়ার পরেও ব্লাড প্রেশার নিয়ন্ত্রণে না এলে সেক্ষেত্রে অপারেশন বা ইন্টারভেনশনে যেতে হবে।
তবে রোগীকে অবশ্যই পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে। কারণ হঠাত্ প্রেশার খুব বেড়ে গিয়ে তা লাংস-এ জল জমার মতো সমস্যা তৈরি করতে পারে। এছাড়া যদি ওষুধের মাত্রা ঘন ঘন বাড়িয়েও সমস্যা নিয়ন্ত্রণে না আনা যায়, তাহলেও অপারেশনের প্রয়োজন হতে পারে।
বিষয়টা অনেকটা করোনারি অ্যাঞ্জিও করার মতো। অর্থাত্ হার্টের ধমনিতে যেমন অ্যাঞ্জিওগ্রাম করে ব্লক আছে ধরা পড়লে সেখানে অ্যা়ঞ্জিওপ্লাস্টি করা হয়— কিডনির ক্ষেত্রেও বিষয়টা তাই। কিডনির রক্তবাহী নালীতে অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টি করে রোগীর রক্তচাপ খুব ভালোভাবে কন্ট্রোল করা সম্ভব হয়। তবে স্টেনোসিস খুব বেশি মাত্রায় থাকলে, তখন বাইপাস গ্রাফ্ট বসানোর দরকার পড়তে পারে।
রেনোভাসকুলার হাইপারটেনশনের সঙ্গে সঙ্গে, সরু ও শক্ত ধরনের স্টেনোসিস থাকলে কিডনিতে রক্ত সরবরাহ কমতে থাকে। ফলে কিডনি খারাপ হওয়ারও আশঙ্কা থাকে। এই সমস্যাকে তখন বলে ইস্কিমিক নেফ্রোপ্যাথি। এক্ষেত্রে ওষুধের সঙ্গে ইন্টারভেনশনের প্রয়োজন হয়। মোট কথা স্টেনোসিস খুব বেশি থাকলে অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টি, স্টেন্টিং করা হয়। এর ফলে কিডনি একেবারে স্বাভাবিক হয়ে যায়।
রেনাল প্যারেনকাইমাল হাইপারটেনশন
কিডনির অন্য ধরনের সমস্যা বা ডায়াবেটিস, পলিসিস্টিক কিডনি ডিজিজ কিংবা অন্য ধরনের কিডিন ডিজিজ হয়তো আছে। সে কারণে কিডনির কোষগুলি ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এক্ষেত্রেও রক্তচাপ খুব ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। লক্ষ্য হবে রক্তচাপ ১৩০/৮০-এর নীচে রাখা। প্রয়োজনে ওষুধ দিয়েও কন্ট্রোলে রাখতে হবে।
তাতে কিডনি ডিজিজ-এর অগ্রগতি বন্ধ হয়ে যাবে। এমনকী পিছিয়ে দেওয়া যায় ডায়ালিসিস। সুতরাং প্রেশার কন্ট্রোল খুব গুরুত্বপূর্ণ!
ওষুধ প্রসঙ্গে
আমাদের দেহের সিস্টেমিক ব্লাড প্রেশার থাকে তা সকলেই জানেন। এছাড়া কিডনির নিজস্ব একটা রক্ত চাপ থাকে যাকে বলে ইন্ট্রাগ্লোমেরুলার ব্লাড প্রেশার। দেখা গিয়েছে, ইন্ট্রাগ্লোমেরুলার প্রেশার কন্ট্রোল করতে পারলে কিডনি ডিজিজ-এর অগ্রগতিও রোধ করা যায়। সাধারণভাবে সিস্টেমিক ব্লাড প্রেশার কন্ট্রোল করা গেলে ইন্ট্রাগ্লোমেরুলার প্রেশারও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়।
তবে এখন বেশ কিছু ওষুধ আছে, যা সিস্টেমিক প্রেশারের সঙ্গে ইন্ট্রাগ্লোমেরুলার প্রেশার কন্ট্রোল করতেও সক্ষম। এস ইনহিবিটর বা অ্যাঞ্জিওটেনসিন রিসেপটর ব্লকার হল এমনই এক ওষুধ। এই ওষুধগুলি গ্লোমেরুলাস থেকে বেরিয়ে আসা রক্তবাহী নালীগুলিকে প্রসারিত করে। ফলে ইন্ট্রাগ্লোমেরুলার প্রেশার আরও কমে যায়। কিডনির দ্রুত ক্ষতি হওয়া প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়। কিডনি ডিজিজ-এ ইউরিন দিয়ে অনেকটা প্রোটিনও বেরিয়ে যায় অনেকের। দেখা গিয়েছে, ব্লাড প্রেশার কন্ট্রোল করতে পারলে প্রোটিন বেরনোও অনেকখানি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। তবে কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে। তাই রোগী নির্বাচনে সতর্ক হতে হবে।
জীবনযাত্রার পরিবর্তন
শুধু ওষুধ খেলেই হবে না। তার সঙ্গে এক্সারসাইজ করাও দরকার। প্রয়োজন জাঙ্কফুড, মাত্রাতিরিক্ত তৈলাক্ত খাদ্যগ্রহণ ত্যাগ করা। এছাড়া কিডনি ডিজিজ শুরু হয়ে গেলে চিকিত্সকের পরামর্শ মেনে খেতে হবে খাবার।
লিখেছেন সুপ্রিয় নায়েক