


রূপক বর্ধন রায়: প্রশ্ন হচ্ছে, আজকের ‘ফেক নিউজ’-এর জমানায় আলাদা করে কি আর ‘এপ্রিল ফুলস ডে’র প্রয়োজনীয়তা আছে? আদর্শ রোম্যান্টিকের মতো বলতে ইচ্ছে করে আটের দশক, নয়ের দশক, এমনকি দু’হাজার সালের আশপাশেও এপ্রিল ফুলসের রমরমা ছিল দেখার মতো। শুধু বন্ধু-বান্ধব, ভাই-বোনরা মিলে নিজেদের মধ্যে মজা করার কথা বলছি না। যাঁরা সত্যিই ‘নিউজ’ ছাপতেন, অর্থাৎ খবরের কাগজের সম্পাদকরাও সেই ‘বোকা-বানানো উৎসবে’র দিনটায় তাঁদের প্রাণের পাঠককে ঘোল খাইয়ে ছাড়তে কসুর করতেন না।
এই যেমন ধরুন, আমাদের ‘দ্য স্টেটসম্যান’! ১৯৮৭ সালের ‘এপ্রিল ফুলস ডে’র পরের রবিবার অর্থাৎ ৫ এপ্রিলের ‘মিসেলেনি’ পাতায় দুম করে ছেপে দিয়েছিল—‘জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করা একটি বিশাল ধাতব যানকে শনাক্ত করেছেন।’ শুধু তা-ই নয়, শহরের এক কোনায় পড়ে থাকা যে সল্টলেকের তখনও জল-জঙ্গলে অবস্থা, খবরে সুনির্দিষ্টভাবে সেই বিধাননগরকেই ফ্লাইং সসারের ‘অবতরণ স্থল’ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। মশকরার সত্যতা বাড়াতে সম্পাদকরা আকাশে ভাসমান অজানা উড়ন্ত বস্তুর ঝাপসা সাদাকালো ছবিও খবরে জুড়ে দিয়েছিলেন! লেখাটা ‘ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ইন্টারফেয়ারেন্স’, ‘মহাকর্ষীয় অসংগতি’র মতো একগাদা বৈজ্ঞানিক ‘জার্গনে’ ঠাসা থাকায় বিশ্বাসযোগ্যও হয়েছিল খুব। রক্ষণশীল ও তথ্যনিষ্ঠ উচ্চমানের সাংবাদিকতার জন্য যে স্টেটসম্যানের নাম তখন ‘ওল্ড লেডি অব চৌরঙ্গি’, মশকরা হলেও সে কাগজে তো আর যেমন-তেমনভাবে খবর ছাপা যায় না, তাই না? স্টেটসম্যানের নিজেরই কায়দায় অত্যন্ত গম্ভীর এবং বৈজ্ঞানিক ঢঙে লেখা সেই প্রচ্ছদকাহিনি জনমানসে যে প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছিল, তা নজিরবিহীন।
তবে মজার এখনও বাকি। লুকানো ইঙ্গিত হিসাবে খবরটায় এই দাবি করা হয় যে মহাকাশযানটি সুদূর এক ছায়াপথের এমন এক গ্রহ থেকে এসেছে, যার নামের সহজ অনুবাদ—‘প্ল্যানেট অব দ্য এপস’। কিন্তু হায়! এ কাগজের তখন এমনই বিশ্বাসযোগ্যতা যে, পাঠক-পাঠিকারা কোনো ইঙ্গিতের তোয়াক্কা না করেই তল্পিতল্পা বেধে, ট্রাম, বাস, গাড়িতে চেপে বিধাননগরে ভিড় জমিয়েছিলেন। অনেকে যেমন দূরবিন, ক্যামেরা নিয়ে ‘স্পটে’ এসেছিলেন, তেমনই আবার বহির্বিশ্বের আক্রমণের আতঙ্কে প্রয়োজনীয় রসদ মজুদ করতে বাজারে ছুটেছিলেন বহু মানুষ। ভিড় সামলাতে হিমশিম খেয়েছিল স্থানীয় পুলিশও।
বাংলা খবরের কাগজে এহেন বিরাট আকারের ‘এপ্রিল ফুলস ডে’জনিত মশকরা কম। তবে টুকটাক মজা যে করা হয়নি, তেমনও নয়। শোনা যায় ১৯৮২ সালের পয়লা এপ্রিল একটি সংবাদপত্রে কাগজে বিখ্যাত এক ক্রীড়া সাংবাদিক নাকি চাউর করে দিয়েছিলেন যে, পেলে এবার মোহন বাগান ক্লাবের কোচ হচ্ছেনই! এরপর ভক্তরা ক্লাবের গেটে ভিড় করলে কি তাদের দোষ দেওয়া যায়? তবে এ গপ্পো আমার কানে শোনা। ইন্টারনেটে হাজার খুঁজেও আমি তথ্য বের করতে পারিনি।
কলকাতার বাইরে আবার গুজরাতি সংবাদপত্র ‘আকিলা’র কথা বলতেই হয়। ২০১৬ সালের ১ এপ্রিল তাদের খবর ছিল, ‘৫০০-১০০০ টাকার নোট বাতিল’। যা বাস্তবে পরিণত হয় সেবছরই, ৮ নভেম্বরে।
দেশের গণ্ডি ছেড়ে বেরোলে, ২০১০ সালে ব্রিটেনের ‘দ্য সান’ ট্যাবলয়েডে প্রায় আধপাতা জোড়া সুস্বাদু খবরের পাতা চেখে দেখার বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হয়েছিল। এও তো কম নয়! রানির দেশের ব্যাপারই আলাদা। ১৯৭৭ সালে ‘দ্য গার্ডিয়ান’-এর মতো বিখ্যাত সংবাদপত্রের ‘সান সেরিফ’ নামে বিশেষ ক্রোড়পত্রের কথা বলতে বসলে রাত কাবার হয়ে যাবে। ‘অল ফুলস’ দিবসে ‘সান সেরিফ’ নামক একটি অস্তিত্বহীন সেমিকোলন আকৃতির দ্বীপরাষ্ট্রের জন্য সাত পাতা জোড়া ভ্রমণ ফিচার প্রকাশ করে রীতিমতো শোরগোল ফেলে দিয়েছিল গার্ডিয়ান। ‘আপার কাইস’ এবং ‘লোয়ার কাইস’-এর মতো মজাদার বিভিন্ন জায়গার নামের মাধ্যমে করা মুদ্রণজনিত কৌতুক, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে তৈরি করা গোটা দ্বীপের রাস্তা-ঘাট, নদী-পর্বতের এহেন সব বিদঘুটে নাম এতই চিত্তাকর্ষক ও বিশ্বাসযোগ্য হয় যে, বহু পাঠক ছুটির বুকিং সম্পর্কে জানতে নাকি সংবাদপত্রের দপ্তরে ফোনও করেছিলেন। বুঝুন তবে, ‘নিউজ’ বিক্রেতার বুদ্ধি ও কেরামতি! এছাড়া ১৯৫৭ ও ’৭৬ সালের বিবিসির নানান কাণ্ড তো আছেই। সে কথা আপাতত বাদ থাকল।
২০১২ সালে প্রবাসী হওয়া ইস্তক তুরস্ক, জার্মানি ও ফরাসি দেশের খবরের কাগজের ইতিহাসেও এপ্রিল ফুলস দিবস জনিত নানা খবর পড়েছি। তুরস্কের গপ্পোটা তো আমি থাকাকালীনই, মানে ২০১৬ সালের। সোজাসুজি পাঠকদের বোকা না বানালেও তুরস্কের জাতীয় সংবাদ সংস্থা ‘আনাদোলু এজেন্সি’ মশকরা করে বিভিন্ন খবরের কাগজকে জানায় যে, দেশের বিজ্ঞানীরা এক নতুন রোবট তৈরি করেছেন, যা মানুষের মতোই নিজে নিজে বড়ো হচ্ছে। খবরটা এতই তথ্যভিত্তিক ছিল যে, জাতীয় কাগজ ‘হুরিয়েত ডেইলি’ অবধি সে খবর ছাপতে বাধ্য হয়। পরে জানাজানি হওয়ায় সকলের কপালে হয়রানিও কম জোটেনি, বলাই বাহুল্য!
ফ্রান্স বা জার্মানির গপ্পো অবশ্য আরও একটু আগের। ১৯৮৬ সালে ‘লু পারিসিয়ান’ আইফেল টাওয়ার ভেঙে ফেলার খবর প্রচার করে। বলা হয়, ফ্রান্সের জাতীয় প্রতীককে ভবিষ্যতে প্যারিসের ডিজনিল্যান্ডে সরিয়ে নেওয়া হবে। এ খবরের পিছনে নিছক মশকরা ছাড়াও কিছুটা রাজনীতি ছিল। শুধু ‘এপ্রিল ফুল’ নয়, পত্রিকাটিতে নগর পরিকল্পনা এবং মার্কিনি বাণিজ্যিকীকরণের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের ব্যঙ্গাত্মক প্রতিবাদস্বরূপ এই নির্দিষ্ট ‘স্কুপ’ ছাপা হয়। খবরের সঙ্গে সঙ্গে নির্মাণ-সংক্রান্ত বৈজ্ঞানিক নকশাগুলি অন্তর্ভুক্ত করায় এই অদ্ভুত কাণ্ডে প্রযুক্তিগত বাস্তবতার প্রলেপও পড়েছিল—যা ফরাসি ‘ক্যানার্ড’ বা মশকরার এক বৈশিষ্ট্য। অন্যদিকে, ১৯০৫ সালের ‘বার্লিনার ট্যাগব্ল্যাট’-এর রিপোর্টে ‘মার্কিন ফেডারেল ট্রেজারিতে চুরি’ নামক ‘ঢপ’-এর প্রভাব যে দেশ ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলিতে পৌঁছে যায়, সে গপ্পোও সমান উল্লেখযোগ্য।
এখন কথা হল, ‘ফেক নিউজ’ দিয়ে শুরু করে ‘এপ্রিল ফুলস ডে’র খবরের কাগজের মুদ্রণ আখ্যান নিয়ে এত কথা কেন বললাম? বললাম, কারণ সত্যোর্ধ্ব বা পোস্ট ট্রুথের দুনিয়ায় যতই আমরা ‘খবরের কাগজ শেষ’ বলে লাফালাফি করি, এই গল্পগুলি বারবার আমাদের একথাই বলতে চায় যে, কোনটা মজা, কোনটা মিথ্যে, কোনটা গল্প, কোনটা সত্যি—তার ইঙ্গিতটুকু খবরের অভ্যন্তরেই লুকিয়ে থাকে। চিরকালই তা-ই ছিল। হ্যাঁ, কনফার্মেশন বায়াস ব্যবহার করে, অর্থাৎ পাঠক যা বিশ্বাস করতে চান, সেটা তথ্যবিকৃত করে প্রকাশ করে অনেক সংবাদমাধ্যমই। যেমন, স্টেটসম্যানের সেই ফ্লাইং সসারের ঘটনা সাংবাদিকের নৈতিকতা নিয়ে দেশজুড়ে বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল। ‘দ্য স্টেটসম্যান’ তার সম্মানকে পুঁজি করে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করেছে, সমালোচকরা এমন যুক্তিও দিয়েছিলেন। বিশ্বাসযোগ্যতার জোরে প্রাতিষ্ঠানিক কর্তৃত্ব কীভাবে সাধারণ বুদ্ধিকে আচ্ছন্ন করে ফেলতে পারে— সে কথা বোঝাতে সাংবাদিকতার কোর্সে উদাহরণস্বরূপ পড়ানোও হয় সেই ঘটনা। কিন্তু মজাকে মজার মতো করে, খবরকে খবরের মতো করে নিয়ে আমরা পাঠকরা কেন দুটোকে আলাদা করে দেখতে পারলাম না, সেকথা কোথাও জানতে চাওয়া হল না কেন?
ফেক নিউজ এল, না আমরা নিজেদের সুবিধার্থে প্রশ্ন করা এড়িয়ে যাব বলে তাকে নিয়ে এলাম? খবরের কাগজের বিশ্বাসযোগ্যতা মাথায় উঠল, নাকি রিলের গুঁতোয় সময় নিয়ে পড়ার অভ্যাস নষ্ট করে নিজেদের ভাবার এবং তারই সঙ্গে কোনটা বিশ্বাস করব বা করব না, তা বোঝার ক্ষমতাকে খুন করলাম? এসব প্রশ্ন থেকে যাবে। সমাজবিজ্ঞানীরা বিরাট বিরাট নামও দিলেন... পোস্ট-ট্রুথ, কনফার্মেশন বায়াস! সবই হল। শুধু মুদ্রণের মহীরুহরা যে নিখাদ মজাটা এই এপ্রিল ফুলের দিন আমাদের উপহার দিতেন, পাঠকের সঙ্গে তাঁর পড়ার ঘরে বা চায়ের টেবিলে যে নিখাদ আত্মীয়তাটুকু তৈরি করতেন, সেটুকু চলে গেল ইতিহাসের পাতায়। এখন সবই কেবল তেতো, কেবলই ডুম স্ক্রোলিং, কেউই আর আনন্দ ছাপে না! তার দায়িত্ব আমাদের অর্থাৎ পাঠকদের উপরও কম বর্তায় কি?
মাঝে মাঝে মনে হয়, রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে গথাম শহরের জোকারের মতো চিৎকার করি— ‘হোয়াই সো সিরিয়াস?’