


সায়নদীপ ঘোষ: মাকান্ত কামার, সুবললাল বসু, হারান রাহা। এই নামগুলোর মধ্যে কোনো মিল খুঁজে পাচ্ছ ছোটো বন্ধুরা। প্রতিটা কোনো একজন ব্যক্তির নাম। এতে কোনো সন্দেহ নেই। শুধু কি তাই? নামগুলো একটু ভালো করে দেখলেই একটি মজার জিনিস চোখে পড়বে। ডানদিক হোক বা বাঁদিক। যেদিক থেকেই পড়া হোক না কেন, নামের উচ্চারণ কিন্তু বদলায় না। একইরকম থেকে যায়। এক অদ্ভুত শব্দ জোট বলা যেতে পারে। এই ধরনের শব্দ, বাক্য বা সংখ্যাকে ইংরেজিতে বলা হয় প্যালিনড্রোম। গ্ৰিক শব্দ প্যালিনড্রোমোস থেকে এর উৎপত্তি। ‘পিছন’ আর ‘দিক’ এই শব্দ দু’টি নিয়ে প্যালিনড্রোমোস শব্দটি তৈরি হয়েছে। প্যালিনড্রোমের আবিষ্কার নিয়ে অনেক মতবিরোধ রয়েছে। তবে শোনা যায়, খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকে গ্ৰিক সম্রাট দ্বিতীয় টলেমির শাসনকালে গ্ৰিক কবি সোতাদেস এই প্যালিনড্রোম আবিষ্কার করেন। আজ এই মজার জিনিসটি নিয়েই একটু কথা
বলা যাক।
বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় প্যালিনড্রোমের উদাহরণ কম নেই। বাংলা ভাষাতেই প্রচুর রয়েছে। লেখার শুরুতেই কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া হয়েছে। তবে বাংলায় প্যালিনড্রোমের কথা বলতে গেলে একজনের নাম উল্লেখ করতেই হয়। তিনি শরৎচন্দ্র পণ্ডিত। তাঁকে অবশ্য আমরা ‘দাদাঠাকুর’ নামেই বেশি চিনি। বাংলা ভাষায় প্যালিনড্রোম নিয়ে বিস্তর গবেষণা করেছিলেন দাদাঠাকুর। ‘বিদূষক’ নামে একটি পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন তিনি। সেখানেই প্যালিনড্রোম নিয়ে একাধিক কাজ করে গিয়েছেন। তাঁর একটি লেখা পড়লেই তা স্পষ্ট বোঝা যায়। লেখাটি হল—
‘রাধা নাচে অচেনা ধারা,
রাজন্যগণ তরঙ্গরত নগণ্য জরা,
কীলক-সঙ্গ নয়নঙ্গ সকল কী?
কীর্তন মঞ্চ ’পরে পঞ্চম নর্তকী।’
প্রত্যেকটি লাইন উলটে পড়লে উচ্চারণ একই থাকবে। এছাড়াও আমাদের বিভিন্ন ধরনের প্যালিনড্রোম উপহার দিয়েছেন দাদাঠাকুর। যেমন, ‘রমা তো মামা তোমার’, ‘থাক রবি কবির কথা’। এখানেই শেষ নয়। দাদাঠাকুরের জন্ম ১৮৮১ সালে। সেটাও একটি প্যালিনড্রোম। বাংলা তারিখের নিরিখে তাঁর জন্ম ও মৃত্যু একই দিনে। ১৩ বৈশাখ। অর্থাৎ, ১৩/১। পুরোটাই প্যালিনড্রোম। দাদাঠাকুরের সৃষ্টি ছাড়াও বাংলায় একাধিক প্যালিনড্রোম রয়েছে। যেমন, বাবা, দাদা, মামা, কাকা, মরম, দরদ, বাহবা।
ইংরেজিতে প্যালিনড্রোমের সংখ্যা নেহাত কম নয়। শব্দের মধ্যে রয়েছে ম্যাডাম (MADAM), রেস কার (RACE CAR), সিভিক (CIVIC), লেভেল (LEVEL)। এছাড়াও রয়েছে, ‘ম্যাডাম ইন ইডেন আই অ্যাম অ্যাডাম।’ আরবি ভাষাতেও হাজির এই প্যালিনড্রোম। যেমন রব্বকা ফকাব্বর।
ধরা যাক একজন গণিতজ্ঞকে জিজ্ঞাসা করা হল, তোমার কী খেতে ভালো লাগে? উত্তরে সে জানাল, ‘I prefer Pi’। এই ‘Pi’ শব্দটি গণিতে অতি পরিচিত। তবে, এই বাক্যে সেটি ব্যবহার করলেই প্যালিনড্রোম তৈরি হয়ে যায়। ১১, ১২১, ২৪৪২। সংখ্যার ক্ষেত্রেও উদাহরণ কম নয়। আরও একটি মজার কথা বলা যাক। প্যালিনড্রোম না হলেও দু’টি পৃথক সংখ্যা ধাপে ধাপে অ্যালগোরিদম পদ্ধতিতে জুড়লে তা সামনে ও পিছনে একরকম হয়ে যায়। যেমন ৫৭+৭৫=১৩২। এবার একে উলটে দেওয়া হল। সংখ্যাটা দাঁড়াল ২৩১। এবার দু’টিকে যোগ করা হল। অর্থাৎ ১৩২+২৩১=৩৬৩। হয়ে গেল প্যালিনড্রোম। এভাবেই অক্ষর আর সংখ্যা সাজিয়ে দিব্যি প্যালিনড্রোম তৈরি করা যায়। তোমরাও চেষ্টা করে দেখ।