


পূর্বা সেনগুপ্ত: ‘সন্ন্যাস’! শব্দটির অর্থ, সম্যকরূপে ন্যাস। অর্থাৎ, ত্যাগ করা। সন্ন্যাসীর ত্যাগের উপর গড়ে উঠেছে ভারতীয় সংস্কৃতি। কারণ, প্রতিটি ভারতীয়ের মধ্যে একটি ধারণা খুব স্পষ্ট। এ জগতের কিছু থাকবে না, এ জীবন অনিত্য। কিন্তু এই ভূমির মধ্যেই খুঁজে পেতে হবে ভূমাকে।
কেন এই ধরিত্রীতে আসা আর যাওয়া? বিশ্বব্রহ্মাণ্ড কার ইঙ্গিতে প্রবাহিত? সেই সৃষ্টি রহস্যের মধ্যে ভারতের ঋষিরা ডুব দিয়েছেন অন্য সভ্যতার চেয়ে অনেক আগে। প্রাচীন যুগে বৈদিক ঋষিরা সমাজকে ভাগ করেছিলেন চারটি আশ্রমে—ব্রহ্মচর্য, গার্হস্থ্য, বাণপ্রস্থ ও সন্ন্যাস। অনেক মুমুক্ষু ব্রহ্মচর্য অবস্থার পরেই সন্ন্যাস নিয়ে গৃহত্যাগী হতেন। যাঁরা আশ্রমের বা চতুর্বণের বাঁধনে নিজেদের আবদ্ধ করেননি। বৈদিক যুগের আগেই মানুষের মনে সৃষ্টি হয়েছে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টির রহস্য উদঘাটিত করার ইচ্ছা। বিখ্যাত মহেঞ্জোদারোর সিলমোহরে পশুপতিকে উলঙ্গ অবস্থায় পশুদের নিয়ে বসে থাকতে দেখা যায়। শিবের অঙ্গভূষণ ছাই। আলেকজান্ডারও ভারতে এমন উলঙ্গ সন্ন্যাসীদের দেখা পেয়েছিলেন।
পরবর্তী কালে সংগঠিত সন্ন্যাসী সম্প্রদায়ের দেখা মেলে জৈন ও বৌদ্ধ যুগে। গৌতম বুদ্ধ ও মহাবীর এমন এক সন্ন্যাসী সংঘের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন, যা এক বিপ্লবের আকার ধারণ করেছিল। সমাজ বিজ্ঞানীদের মতে শ্রেষ্ঠী বা বণিক শ্রেণির পৃষ্ঠপোষকতায় বৌদ্ধধর্ম জগতে প্রসারিত হয়। আর বৌদ্ধধর্মের এই বৈশিষ্ট্যই ভারতে ধনতন্ত্রের জন্ম দিয়েছিল। পাঠক চমকে যাবেন না, খ্রিস্টধর্ম যখন ক্যাথলিক থেকে প্রোটেস্ট্যানিজমের সৃষ্টি করেছিল, ঠিক তখনই পাশ্চাত্যে এসেছিল ক্যাপিটালিজম। সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবারের মতে, ধর্মীয় মত সমাজকে পরিচালিত করে। বুদ্ধের জীবনকাল দীর্ঘ ছিল। তিনি নিজের জীবদ্দশাতেই সঙ্ঘের মধ্যে নানা স্বাভাবিক দ্বন্দ্বের অস্তিত্ব দেখতে পেয়েছিলেন। বিশেষ করে সন্ন্যাস আশ্রমকে অত্যধিক গুরুত্ব প্রদানের ফলে অনেক অযোগ্য ব্যক্তিও সন্ন্যাস লাভ করতেন এবং সঙ্ঘের অবাধ্যতা করে সমস্যা সৃষ্টি করতেন। এর বড়ো উদাহরণ হলেন তথাগত পুত্র রাহুল। তিনি মাতা যশোধরার শেখানো দাবি নিয়ে তথাগতের কাছে উপস্থিত হলেন, ‘পিতা আমায় পিতৃধন প্রদান করুন।’ পিতা ভিক্ষু তাই ভিক্ষার ঝুলিই পুত্রকে প্রদান করলেন। অর্থাৎ সন্ন্যাস দিলেন। কিন্তু সন্ন্যাসের জন্য উপযুক্ত ছিলেন না রাহুল। উপরন্তু আধ্যাত্মিক ক্ষমতাবান পিতার সংঘকে তিনি পৈতৃক সম্পত্তি বলেই মনে করতেন। তাঁর চূড়ান্ত অবাধ্যতায় বিহারের ভিক্ষুরা ব্যতিব্যস্ত হয়ে যেতেন। জাতক কাহিনির মধ্যে, থেরগাথা ও থেরিগাথার কাহিনিগুলিতে বৌদ্ধ সন্ন্যাসী সঙ্ঘের এই সমস্যাগুলি খুব স্পষ্ট। আরেকটি বিশেষ সমস্যার বীজ বুদ্ধ রোপন করেছিলেন। তা হল ভিক্ষুণী সংঘ সৃষ্টি করে তাঁদেরও ভিক্ষুদের অধীনে সন্ন্যাস জীবন গড়ে তোলার নিয়ম। হয়তো তৎকালীন সমাজে তার প্রয়োজন ছিল, পরবর্তীতে এখান থেকেই সংঘের আদর্শচ্যুতি ঘটে।
বিভ্রান্ত হবেন না পাঠক, ধর্মীয় তত্ত্বকথার বেড়াজাল বিছানো এ প্রবন্ধের উদ্দেশ্য নয়। বিখ্যাত হিমালয় পর্যটক ও প্রবন্ধকার শ্রদ্ধেয় উমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় হিমালয় ভ্রমণের সময় প্রচুর সাধুর দেখা পেয়েছিলেন। প্রতিটি সম্প্রদায়ের সন্ন্যাসী তাঁদের একটা কুঠিয়া তৈরি করে রাখে হিমালয়ের কন্দরে। উমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে অনেকেরই দেখা হয়েছিল, কথা হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতায় পুষ্ট হয়েই তিনি বলেছেন, সত্যকারের সন্ন্যাসীর মধ্যে চমকপ্রদ কিছু নেই, তাঁরা সকলেই ঈশ্বরের প্রতি তদগতচিত্ত। বিষয়ে বিরাগী। কিন্তু সেই সন্ন্যাসী যদি নিজের সাধন অপূর্ণতাকে ঢাকার জন্য নিজের বৃত্তিগুলিকে সংযত করতে অক্ষম হয়, তবে সেই আধা সন্ন্যাসীর চরিত্র অনুধাবনযোগ্য, শিক্ষণীয় ও কৌতূহল জাগিয়ে তোলার জন্য যথেষ্ট। তিনি এক সন্ন্যাসীর কথা আলোচনা করেছে, যিনি হিমালয়ে বাস করছেন বটে, কিন্তু সেখানে আশ্রম তৈরি করে হয়ে উঠেছেন ক্ষমতাশালী কাঠের ব্যবসায়ী।
বৌদ্ধ সন্ন্যাস যখন তন্ত্রের সঙ্গে মিশ্রিত হয়ে বহুজনের হিতকামিতা থেকে সরে এল। তখন ভারতে শংকরাচার্যের আবির্ভাব। তিনি অগণিত সন্ন্যাসীদের সংগঠিত করলেন। তৈরি হল সাধুসমাজ। বুদ্ধ ও মহাবীর নিজ নিজ ভাবকে বিকশিত করার জন্য নিজেদের নামাঙ্কিত সন্ন্যাসী সংঘের সৃষ্টি করেছিলেন। তাঁরা কিন্তু তান্ত্রিকধারার সঙ্গে মিশ্রিত হল। এছাড়াও বেদ ও বেদান্ত অনুসারী প্রচুর সংখ্যক রমতা বা পরিভ্রমণকারী সন্ন্যাসী ছিলেন। মহান আচার্য আদি শংকরাচার্য সমস্ত বৈচিত্র্যপূর্ণ ভাবনাকে একটি নামের তলায় এনে ফেললেন। সেই নামটি হল দশনামী সম্প্রদায়। সন্ন্যাসীদের তিনি দশটি সম্প্রদায়ে ভাগ করলেন। প্রত্যেকের বেশভূষা নামকরণ, সন্ন্যাসীর চিহ্ন পৃথক। আর তার সঙ্গে যুক্ত হল সন্ন্যাস গ্রহণের আচার, বিরজাহোম ও মহাবাক্য।
প্রথমে এই দশটি সম্প্রদায়ের নামগুলি জানা যাক। সেগুলি হল—গিরি, পুরী, ভারতী, বন, অরণ্য, পর্বত, সাগর, তীর্থ, আশ্রম বা সরস্বতী। দীক্ষা নেওয়ার পর একজন সন্ন্যাসীকে কয়েকটি কঠোর প্রতিজ্ঞা পালনের কথা বলা হয়েছে। দিনে একবারের বেশি খাবেন না, সাতটির বেশি বাড়ি থেকে ভিক্ষা চাইবেন না। মাটি ছাড়া অন্য কোথাও ঘুমাবেন না, কাউকে অভিবাদন করবেন না, কারও প্রশংসা বা নিন্দা করবেন না। নিজের চেয়ে উচ্চতর কোনো সন্ন্যাসী ছাড়া কাউকে প্রণাম করবেন না এবং খয়েরি লাল রঙের গেরুয়া কাপড় ছাড়া অন্য কোনো কাপড় দিয়ে নিজের শরীর আবৃত করবেন না। শংকরাচার্য সন্ন্যাসীদের জন্য সন্ন্যাস-উপনিষদও রচনা করেন, এ হল বৈদিক সন্ন্যাস পদ্ধতি। এছাড়াও তান্ত্রিক সন্ন্যাস পদ্ধতি মহানির্বাণ তন্ত্র অনুযায়ী, সন্ন্যাসের আচার, বিরজাহোম পদ্ধতি অনুষ্ঠিত হয়। এ হল পৃথক ধারা। তবে ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব দশনামী সম্প্রদায়ভুক্ত হলেও নিজের সম্প্রদায়ের সন্ন্যাসীদের জন্য কিছু পৃথক নীতি ও রীতির প্রচলন করেন। যেমন স্বামী বিবেকানন্দ। তিনি অদ্বৈত বেদান্তের কার্যে পরিণতরূপ চেয়ে তাঁর প্রতিষ্ঠিত সন্ন্যাসী সঙ্ঘকে শিবজ্ঞানে জীব সেবার ব্রতে উৎসর্গ করেছেন। এক্ষেত্রে তিনি একদিকে সমাজ ও সন্ন্যাস আশ্রমকে কাছাকাছি এনে ফেলেছেন অন্যদিকে শংকরাচার্যের থেকে যুগপরিক্রমায় এগিয়ে গিয়েছেন বা সরে এসেছেন।
সন্ন্যাসের বিরজাহোম হল এমন পদ্ধতি যাতে যজ্ঞের অগ্নিতে নিজ আমিকে, সমস্ত পূর্ব পরিচয়কে, আহুতি দেন নবীন সন্ন্যাসী। নিজের শ্রাদ্ধ নিজেই করে ফেলার রীতি আছে। আর মহাবাক্য কথাটি বুঝতে গেলে আমাদের ধর্মপালনের মূল বিষয়টিকে বুঝতে হবে।জগতে এতগুলি ধর্মের অস্তিত্ব আছে কেন? তাদের মধ্যে মূল পার্থক্য কোন বিষয়কে কেন্দ্র করে? কারণ, ধর্মের মূল কথা শ্রীরামকৃষ্ণ খুব সুন্দর ভাবে ব্যক্ত করেছেন, তিনি বলেছেন, একপ্রকার ভক্ত আছে যাঁরা ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করে, হে ভগবান আমাকে রক্ষা কর। কিন্তু আরেক প্রকার ভক্ত বলে, হে ঈশ্বর, তুমি কে? তোমার সঙ্গে আমার সম্বন্ধ কি? ভক্তের সঙ্গে ভগবানের সম্পর্ক নিয়ে হিন্দু ধর্মে তিনটি মত। এক, দ্বৈতবাদ। ঈশ্বর আর আমি পৃথক অস্তিত্ব। বিশিষ্টাদ্বৈতবাদ— এই মতে ঈশ্বর আর আমি এক কিন্তু অস্তিত্ব সর্বদা পৃথক। অদ্বৈতবাদ, তিনি আর আমি এক। সন্ন্যাসীর মহাবাক্য এই অদ্বৈত বেদান্তের তত্ত্বকে ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। শংকরাচার্য কেবল সন্ন্যাসীদের জন্য দশনামী সম্প্রদায় সৃষ্টি করেননি। তাঁদের জন্য ভারতের চারদিকে চারটি মঠ নির্মাণ করেছেন। দক্ষিণে শৃঙ্গেরী, উত্তরে হিমালয়ের কোলে যোশীমঠ। পূর্বে নীলাচলে গোবর্ধন মঠ ও পশ্চিমে দ্বারকায় একটি মঠ, যা দ্বারকা পীঠ নামে পরিচিত। আদি শংকরাচার্য তাঁর চার শিষ্যকে চার মঠের প্রথম আচার্য রূপে নির্বাচন করেন এবং প্রতিটি মঠ একটি নির্দিষ্ট বেদের মাধ্যমে পরিচালিত হবে বলে নির্দেশ করেন। উত্তরের যোশীমঠ বা জ্যোর্তিমঠের প্রথম আচার্য তোটোকাচার্য। বেদ অথর্ব, মহাবাক্য-অয়আত্মা ব্রহ্ম -আমিই ব্রহ্ম। গোবর্ধন মঠের প্রথম আচার্য, পদ্মপাদ। বেদ হল ঋকবেদ, মহাবাক্য হল- প্রজ্ঞানং ব্রহ্ম-চেতনাই ব্রহ্ম। শৃঙ্গেরী মঠের প্রথম আচার্য হলেন, সুরেশ্বরাচার্য।বেদ হল, যজুর্বেদ। মহাবাক্য- অহম ব্রহ্মাস্মি- আমিই ব্রহ্ম। পশ্চিমে দ্বারকাপীঠ, প্রথম আচার্য হলেন হস্তামলকাচার্য, বেদ সামবেদ। মহাবাক্য হল, তত্ত্বমসি। তুমিই সেই। এই চারটি মঠের অধীনে নিজেদের সন্ন্যাস জীবনকে পুষ্ট করেন দশনামী সম্প্রদায়ের সন্ন্যাসীরা। যদিও পূর্বভারতের তান্ত্রিক ধারার বা প্রাচীন ও নব্য বৈষ্ণব ধারার সন্ন্যাসীদের এর সঙ্গে যুক্ত করা যাবে না। ভারতে তাঁদের সংখ্যাও কম নয়। একটি ধর্মান্দোলনের অস্তিত্ব টিকে থাকে তার গৃহস্থ ভক্তদের উপর। কোনো গৃহী নিজেকে সঠিক ও মূল ধারার সঙ্গে সংযুক্ত করতে চাইলে এই তত্ত্বগুলি জানা আবশ্যক।
শ্রীরামকৃষ্ণ তোতাপুরীর কাছে সন্ন্যাস গ্রহণ করেছিলেন বলে তিনি পুরী সম্প্রদায় অন্তর্ভুক্ত। রামকৃষ্ণ মিশন পুরী সম্প্রদায়ের ধারাকে অনুসরণ করে। এঁদের মূল মঠ শৃঙ্গেরী। আমরা যেমন বৌদ্ধ সন্ন্যাসের ক্ষেত্রে দেখি বুদ্ধ ভিক্ষুর হাতে সন্ন্যাসের নিদর্শন চীবর তুলে দিচ্ছেন।এছাড়া ও চীবর দিয়ে নির্মিত বিশেষ পোষাকের কথাও আমরা পাই। তিনি ভিক্ষুদের জীবনের লক্ষ্য নির্দেশ করছেন,-‘চরত্থ ভিক্ষবে, বহুজন হিতায়, বহুজন সুখায়, লোকানুকম্পায়।’ হে ভিক্ষু তুমি বহুজনের সুখের জন্য, বহুজনের হিত কামনায় চল, চল, এক বুক অনুকম্পা নিয়ে জগত পরিভ্রমণ কর।আমরা বুদ্ধের পরে স্বামী বিবেকানন্দের প্রতিষ্ঠিত সন্ন্যাসী সংঘের বৈশিষ্ট্য আলোচনা করব। আলোচনাটি প্রাসঙ্গিকও বটে। রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের সন্ন্যাস বৈদিক সন্ন্যাস। শ্রীরামকৃষ্ণ তোতাপুরীর কাছে সন্ন্যাস গ্রহণ করেছিলেন বলে ধারা অনুযায়ী এই সংঘ পুরী সম্প্রদায়ভুক্ত, এও আমরা উল্লেখ করেছি। শ্রীরামকৃষ্ণ কাশীপুরে মূল ১৬ জন সাক্ষাৎ পার্ষদদের মধ্যে বারো জনকে বুদ্ধের মতোই গেরুয়া বস্ত্র প্রদান করেন। তিনি তখন অসুস্থ। সাক্ষাৎ পার্ষদ বুড়ো গোপাল সাগরমেলাগামী সন্ন্যাসীদের গেরুয়া প্রদানের ইচ্ছা প্রকাশ করলে নরেন্দ্র, রাখাল প্রমুখ যুবক ভক্তদের দেখিয়ে শ্রীরামকৃষ্ণ বলেন, ‘এদের থেকে আধ্যাত্মিকতায় উচ্চ উপলব্ধিবান সন্ন্যাসী কোথায় পাবে?’ তখন বুড়ো গোপালদার ইচ্ছাতে শ্রীরামকৃষ্ণ সেই গেরুয়া বারোজনকে প্রদান করেন। সেদিন ভিক্ষা করার আদেশও করা হয়। তাঁরা প্রথম ভিক্ষা গ্রহণ করেন শ্রীমা সারদা দেবীর কাছ থেকে। আদি শংকরাচার্য বিরচিত অন্নপূর্ণা স্তোত্রম থেকে স্তবমন্ত্র উচ্চারণ করে... ‘অন্নপূর্ণে সদাপূর্ণে শঙ্করে প্রাণবল্লভে/জ্ঞানবৈরাগ্য সিদ্ধ্যর্থং ভিক্ষাং দেহি নমোহস্তুতে।’ উচ্চারণ শেষ হলে তাঁদের ‘ষোলো আনা’ ভিক্ষা প্রদান করেন সংঘজননী। তবে এটুকুই কি শেষ ছিল? না, কাশীপুরে কাঠপাতা জ্বালিয়ে ধুনি তৈরি করে গুরুভাইদের নিয়ে ত্যাগের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন বিবেকানন্দ। আঁটপুরে প্রাক বড়দিনের সন্ধ্যায়ও এইরকম ধুনি প্রজ্জ্বলিত হয়েছিল। কিন্তু বৈদিক সন্ন্যাসের রীতিটি লিখিতভাবে সূচনা হয় পরে। পরিব্রাজক অবস্থায় গয়ার বরাবর নামক পাহাড়ে এক বৈদিক সন্ন্যাসীর কাছ থেকে সন্ন্যাসের নিয়ম ও মন্ত্র লেখা খাতা থেকে পুরী সম্প্রদায়ের সন্ন্যাসের আচার ও মন্ত্র টুকে নেন শ্রীরামকৃষ্ণের আর এক সন্ন্যাসী সাক্ষাৎ পার্ষদ স্বামী অভেদানন্দ। সেই লিখিত আচারই গুরু পরম্পরায় প্রবাহিত। যেহেতু সন্ন্যাসের মন্ত্র, আচার, মহাবাক্য গুপ্ত থাকে তাই এ সম্বন্ধে কিছু জানার অবকাশ নেই। কিন্তু বুদ্ধের মতোই সন্ন্যাস আশ্রমকে সমাজের খুব কাছাকাছি এনে দিয়েছেন স্বামী বিবেকানন্দ। বুদ্ধ দয়ায় গলেছিলেন। বিবেকানন্দ শ্রীরামকৃষ্ণের নির্দেশে সেই দয়াকে পূজায় পর্যবসিত করেছেন। অনাথ, আতুরের সেবাই পূজা।
প্রশ্ন হল, বৈদিক দশনামী ধারায় অবস্থিতি লাভ করেও বুদ্ধের প্রভাব ও শিব জ্ঞানে জীবসেবার ধারণা কি তৎকালের অন্যান্য দশনামী সম্প্রদায়ের সন্ন্যাসীরা নেমে নিয়েছিলেন? অবশ্যই নয়। কাশীতে যখন রামকৃষ্ণ সেবাশ্রম স্থাপিত হল তখন সেখানে একটি হসপিটাল গড়ে তোলার খুব প্রয়োজন ছিল। কারণ কাশী আর বৃন্দাবন তখন পরিত্যক্ত বিশেষত বাঙালি বিধবাদের শেষ বয়সের শাস্তি। তাদের দেখার কেউ নেই, রোগ হলে দুর্দশার অন্ত নেই। এই অবস্থায় সন্ন্যাসীরা যখন রোগীদের সেবা করছেন, তাঁদেরকে ‘ভাঙ্গী সাধু’ বা মেথর সাধু বলে চিহ্নিত করতেন অন্যান্য সম্প্রদায়ের সাধুরা। সাধু সমাবেশে তাঁদের নিমন্ত্রণ পাঠানো হত না। কিন্তু অবস্থা ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হল। এখন রামকৃষ্ণ মিশনের সাধুরা উপস্থিত না হলে সমাবেশ অপূর্ণ থাকে। বাস্তবিকই স্বাধীনতা পরবর্তী সাধু সমাজের মধ্যে আমরা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে স্বামী বিবেকানন্দ প্রবর্তিত সেবাভাবকে সংযুক্ত হতে দেখি। অবশ্য নাগা সম্প্রদায় বাদে। এদিক দিয়ে ভারতের সন্ন্যাস আশ্রমের বিবর্তনের ইতিহাসে স্বামী বিবেকানন্দের এক উল্লেখযোগ্য অবদান। প্রখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী জি এস ঘুরে তাঁর অসাধারণ গ্রন্থ ‘Indian Sadhus’-এ বিষয়টি উল্লেখ করেছেন।
আদি শংকরাচার্যের শুভ জন্মতিথিতে আমরা ভারতের মূল সন্ন্যাস সম্প্রদায়কে চিহ্নিত করতে চাইলাম। কিন্তু শেষ করব মূল প্রশ্ন দিয়ে, সাধু কে? এখানেও আমাদের শ্রীরামকৃষ্ণের কথা অনুসরণ করতে হবে, তিনি বলছেন, যাঁর মন প্রাণ সব ঈশ্বরে সমর্পিত হয়েছে তিনিই সাধু। আরও সোজা করে উল্লেখ করছেন, যাঁকে দেখলে ঈশ্বরের কথা মনে পড়ে তিনিই সাধু। যেমন, স্যাঁকরাকে দেখলে সোনার গহনার স্মৃতি মনে ভেসে ওঠে। এই উপমার পর আর কোনো প্রশ্ন থাকে না। প্রয়োজন হয় শুধু ডুব দেওয়ার। কোনো জিনিসের জন্য নয়। যা আমার প্রয়োজন তা সৃষ্টিকর্তা দেবেন নিশ্চয়ই। তিনিই যে সৃষ্টি করেছেন আমাদের! তাই ঈশ্বরের কাছে আমরা মূল প্রশ্নটি করব, তুমি কে? তোমার সঙ্গে আমার সম্পর্ক কি? এটিই ধর্ম, এ-ই হল সন্ন্যাসের ভিত্তি।