


নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: বাঙালির দুর্গাপুজো কীভাবে হবে? কেমন হওয়া উচিত প্যান্ডেলের থিম কিংবা প্রতিমার ঘরানা? সবটাই এবার বাতলে দেবে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি)! তথাকথিত হিন্দুত্বের ধ্বজাধারীদের তরফে বিভিন্ন পুজো কমিটিকে পাঠানো একটি চিঠি ঘিরে এমন জল্পনা তুঙ্গে। আজ, বুধবার সল্টলেকের ইজেডসিসিতে দুর্গাপুজোর ‘অনুশাসন’ নিয়ে একটি আলোচনা সভার আয়োজন করেছে তারা। সেখানেই ডাকা হয়েছে কলকাতার পুজো সংগঠক থেকে শুরু করে বিভিন্ন পুজো কমিটিকে। সাধুসন্ত, পুরোহিতরাও উপস্থিত থাকবেন। সেখানেই ‘দুর্গাপুজোর সাত্ত্বিকতা ও ধর্মীয় ঐতিহ্য অক্ষুণ্ণ’ রাখার বার্তা দেবে ভিএইচপি!
গত এক দশকের বেশি সময় ধরে কলকাতা তথা বাংলার দুর্গাপুজো হয়ে উঠেছে বিশ্বজনীন। থিমের শিল্পশৈলীতে প্রতি বছর চমক দিয়েছে বাংলার পুজো কমিটিগুলি। করোনাকালে পরিযায়ী শ্রমিকের কষ্ট তুলে ধরেছিল বেহালার বড়িশা ক্লাব। শিশু কোলে ‘সাধারণ’ মায়ের রূপে দুর্গামূর্তি নজর কেড়েছিল। অর্জুনপুরের ‘ফিউচারেস্টিক’ দুর্গা-থিম কিংবা জগৎ মুখার্জি পার্কের এআই দুর্গা তো রীতিমতো ট্রেন্ডিং হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। এই ধরনের শিল্পশৈলী, আয়োজনের নিরিখে ইউনেস্কোর ‘ইনট্যাঞ্জিবল কালচারাল হেরিটেজ’ স্বীকৃতি পেয়েছে বাংলার দুর্গাপুজো। সেই কারণেই এবার, রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতায় আসার মাত্র তিনমাসের মধ্যে বাঙালিকে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের দুর্গাপুজোর ‘ধরন-ধারণ’ শেখানোর এই প্রচেষ্টা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিভিন্ন পুজো কমিটিকে দেওয়া সেই চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘দুর্গাপূজা শুধু উৎসব নয়-এ আমাদের ধর্মীয় ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সমাজজীবনের এক পবিত্র প্রকাশ। ঐতিহ্যবাহী দুর্গোৎসবের ধর্মীয় ও সাত্ত্বিক ভাবধারা, পবিত্রতা ও সাংস্কৃতিক মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখার উদ্দেশ্যে এক গুরুত্বপূর্ণ কার্যকরী বৈঠক করা হবে।’
এই প্রসঙ্গে ভিএইচপির দক্ষিণবঙ্গ প্রান্তের প্রচার-প্রসার প্রমুখ রক্তিম দাশ বলেন, ‘গত বেশ কয়েক বছর ধরেই দুর্গাপুজোয় উৎসবের চেহারা দিতে গিয়ে থিমের নামে যা খুশি তাই করা হয়েছে। অনেক সময় নানা অভিযোগ উঠেছে। শিল্পশৈলীর নামে প্রতিমাকে বিকৃত করে দেওয়া হচ্ছে। এমন থিম তৈরি হচ্ছে, যা হিন্দু শাস্ত্রের পরিপন্থী। উৎসবকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে ভক্তি-ধর্ম-আবেগ হারিয়ে যাচ্ছিল। তাই দুর্গাপুজোর ঐতিহ্য, ধর্মীয় মর্যাদা রক্ষা, পুজোর পরিবেশকে আরও পবিত্র করতে এই বৈঠক। আমরা থিমের বিরোধী নই। কিন্তু, পুজোকে পুজোর মতোই করতে হবে।’ বিষয়টি নিয়ে সাবধানী মন্তব্য করেছেন হাতিবাগান সর্বজনীনের পুজো উদ্যোক্তা শাশ্বত বসু। তিনি বলেন, ‘আমাদের ডাকা হয়েছে। দেখা যাক, বৈঠকের আলোচনায় কী উঠে আসে।’ ফোরাম ফর দুর্গোৎসবের সাধারণ সম্পাদক অঞ্জন উকিলের সাফ কথা, ‘পুজোর প্যান্ডেল কিংবা প্রতিমার সাবেকিয়ানাও যেমন প্রয়োজন, তেমনি থিমের শিল্পশৈলীও জরুরি। কারণ, এটা মানতে হবে, গত দুই দশকে এই শিল্পকর্মের উপর ভর করেই দুর্গাপুজো পৃথিবীর সেরা পাবলিক আর্ট ইনস্টলেশনের মঞ্চ হয়ে উঠেছে। আর্ট করতে গিয়ে পুজোর ভক্তি ভুললেও হবে না। আবার শুধুমাত্র সনাতনী কায়দায় পুজো হলেও তা সারা বিশ্বের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে না। তাই দুটোর মেলবন্ধনই প্রয়োজন।’