


ফ্লোরিডা: দীর্ঘ ন’মাসের প্রতীক্ষার অবসান! ২৮৬ দিন পর, পৃথিবীর চারদিকে ৪,৫৭৭বার পাক খেয়ে, সাড়ে ১৯ কোটি কিলোমিটার উড়ান শেষে নিরাপদেই মহাকাশ থেকে ফিরে এলেন সুনীতা উইলিয়ামস। ৫৯ বছর বয়সি সুনীতার সঙ্গে ছিলেন নাসার আরও এক নভশ্চর, ৬২ বছরের বুচ উইলমোর। এই যাত্রায় ফিরেছেন আরও দুই মহাকাশচারী, নাসার নিক হেগ এবং রাশিয়ার রসকসমসের আলেকজান্দর গরবুনভ। ভারতের ঘড়িতে তখন বুধবার ভোররাত। আমেরিকায় বিকেল। তালাহাসি উপকূলে, মেক্সিকো উপসাগরে আগে থেকেই অপেক্ষা করছিলেন উদ্ধারকারীরা। নাসার সরাসরি সম্প্রচারে শোনা যাচ্ছে নেপথ্য ভাষণ, ‘শান্ত, কাচের মতো সমুদ্র’। ফ্লোরিডার পরিষ্কার নীল আকাশে তখন বিন্দুর মতো উঁকি মেরেছে এলন মাস্কের সংস্থা স্পেসএক্সের মহাকাশযানটি। ধীরে ধীরে গতি কমিয়ে সেটি নেমে আসছে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে কয়েক ফুট উঁচুতে... একে একে খুলে গেল ছ’টি সাদা-লাল প্যারাসুট। ভাসতে ভাসতে উপসাগরের বুকে আলতো করে নেমে এল এলন মাস্কের সংস্থা স্পেসএক্সের মহাকাশযান ড্রাগন ক্যাপসুল। মিশন কন্ট্রোল থেকে ভেসে এল খুশি বার্তা... ‘ক্রু ৯ ফিরল পৃথিবীতে। নিক, আলেকজান্দর, বুচ এবং সুনি, ওয়েলকাম হোম!’ জবাব দিলেন নিক, ‘কী অসাধারণ যাত্রা! আমি তো গোটা ক্যাপসুল ভর্তি একেবারে কান ছুঁয়ে ফেলা হাসি দেখছি।’ ভাসমান মহাকাশযানের চারপাশে তখন ঢেউ তুলেছে কয়েকটি ডলফিন। মার্কিন মুলুকের ঘড়ির কাঁটায় বুধবার বিকেল ৫টা ৫৭। ভারতে রাত সাড়ে তিনটে।
মঙ্গলবার ভারতীয় সময় সকাল ১০টা ৩৫ মিনিটে সুনীতাদের নিয়ে আন্তর্জাতিক স্পেস স্টেশন থেকে ‘আনডক’ করেছিল মহাকাশযান ড্রাগন। সেই হিসেবে মাত্র ১৭ ঘণ্টা সময় লেগেছে পৃথিবীতে তাঁদের অবতরণে। যদিও সেই যাত্রা মোটেই সহজ হয়নি। বিশেষ করে একেবারে শেষ পর্যায়, পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশপর্বটি। ড্রাগন ক্যাপসুলের গতি পৌঁছে যায় ঘণ্টায় ২৮,৮০০ কিলোমিটারে। বাতাসের সঙ্গে ঘর্ষণে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে মহাকাশযানের গা। প্রায় ১,৬০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ড্রাগনের সাদা গা বাদামি হয়ে ওঠে।। যদিও ক্যাপসুলের তাপরোধক উপাদান ফেনোলিক-ইমপ্রেগনেটেড কার্বন অ্যাবলাটোর (পিআইসিএ) সুনীতাদের কোনও ক্ষতি হতে দেয়নি। নাসা এই প্রথম এই হাল্কা উপাদান ব্যবহার করেছে। একেবারে শেষ পর্যায়ে এসে প্যারাসুট খুলে মহাকাশযানটির গতি নামিয়ে আনা হয় ঘণ্টায় ২৫ কিলোমিটারে। তারপর অবতরণ।
আধঘণ্টা অপেক্ষা করে মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজ। তার মধ্যে স্পিডবোট নামিয়ে উদ্ধারকারীরা পৌঁছে যান ক্যাপসুলের কাছে। সেটিকে বেঁধে টেনে আনা হয় জাহাজের দিকে। তোলা হয় হাইড্রলিক পদ্ধতিতে। গ্যাস লিক হচ্ছে কি না পরীক্ষা করার পর খোলা হয় ড্রাগন ক্যাপসুলের ‘হ্যাচ’ বা দরজা। ভারতীয় সময় বুধবার ভোর ৪টে ২২ মিনিট নাগাদ প্রথমে ক্যাপসুলের ভিতর থেকে বেরিয়ে আসেন নিক হগ। তারপর একে একে আলেকজ়ান্দর, সুনীতা এবং বুচ। সুনীতাদের মুখে ছিল প্রশান্তির হাসি। স্ট্রেচারে চাপিয়ে তাঁদের নিয়ে যাওয়া হয়। খানিকবাদে জাহাজ এসে থামে বন্দরে। সেখানে সুনীতাদের জন্য অপেক্ষা করছিল বিশেষ গাড়ি। তাতে চেপেই হিউস্টন, নাসার জনসন স্পেস সেন্টারে। কারণ, এখনই বাড়ি ফেরা হচ্ছে না সুনীতাদের। পরিবার বা অন্য কারও সঙ্গে দেখা করতেও পারবেন না। অন্তত ৪৫ দিন থাকতে হবে চিকিৎসকদের কড়া পর্যবেক্ষণে। সেখানে ব্যায়াম, বিশ্রাম, এবং নিয়মিত স্বাস্থ্যপরীক্ষার মাধ্যমে তাঁদের সুস্থ করে তোলা হবে।
গত বছর ৫ জুন আটদিনের জন্য স্পেস স্টেশনে পাড়ি দিয়েছিলেন সুনীতা-বুচ। তারপর মহাকাশযানে ত্রুটি, প্রযুক্তিগত সমস্যা এবং রাজনৈতিক দড়ি টানাটানি। ন’মাস...। সেই অপেক্ষা শেষ হল এতদিনে।
শঙ্কা
জিনের গঠন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে
দৃষ্টি ক্ষীণ, ছানির ঝুঁকি
ত্বকের ঘনত্ব কমে যায়। কেটে গেলে ক্ষত সহজে শুকোয় না। পায়ের তলার পুরু চামড়া পাতলা হয়ে যাওয়ায় হাঁটতে সমস্যা
মাসল অ্যাট্রফি বা পেশি সঙ্কোচন
শরীরের ২০ শতাংশ তরল বেরিয়ে যায়। ওজন কমে
রেডিয়েশনের প্রভাবে ব্রেন ড্যামেজ। আলঝাইমার্সের আশঙ্কা
রক্ত সঞ্চালন শ্লথ হয়, লোহিত রক্তকণিকার উৎপাদন কমে আসে
প্রতি মাসে ১ শতাংশ করে হাড়ের ক্ষয়। মেরুদণ্ড প্রসারিত হয়ে উচ্চতা বৃদ্ধি। সুনীতার উচ্চতাও প্রায় ২ ইঞ্চি বেড়ে গিয়েছে বলে জল্পনা
রিহ্যাব
প্রথম ২৪ ঘণ্টা: প্রাথমিক স্বাস্থ্যপরীক্ষার পর স্ট্রেচারে শুইয়েই নিয়ে যাওয়া হয়েছে হিউস্টনে নাসার জনসন স্পেস সেন্টারে। রাখা হয়েছে আইসোলেশনে
পরের ৪৮ ঘণ্টা: মেরুদণ্ড স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে শুরু করবে। রক্তচাপ স্বাভাবিক হবে
এক সপ্তাহ: প্রতিদিন দু’ঘণ্টা করে বিভিন্ন শারীরিক কসরতের ফলে মোশন সিকনেস, দৈহিক ভারসাম্য হারানোর সমস্যা কমবে।
দু’সপ্তাহ: কিছু বিশেষ ব্যায়াম। এই সময়ে শরীরে তরলের ভারসাম্য ফিরবে। লোহিত রক্তকণিকা তৈরি স্বাভাবিক হবে। ফিরে আসতে থাকবে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও
এক মাস: পেশির গঠন মহাকাশে যাওয়ার আগের জায়গায় ফিরবে
৪৫ দিন: রিহ্যাব শেষ। মিলবে বাড়ি ফেরার অনুমতি।
সুনীতার কীর্তি
এবার মহাকাশে
২৮৬ দিন
এবারের মিশনে দু’টি স্পেসওয়াক মোট ১১ ঘণ্টা ২৬ মিনিট
২৮৬ দিনে পরিভ্রমণ ১৯ কোটি ৫২ লক্ষ ৮৯ হাজার ৮৫৭ কিলোমিটার
পৃথিবীর চারপাশে চক্কর ৪ হাজার ৫৭৬ বার
১৫০ টিরও বেশি মৌলিক বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা
ও প্রযুক্তিগত প্রদর্শন।
তিনটি অভিযানে সবমিলিয়ে ৬০৮ দিন মহাকাশে