


ড. সায়ন্তন মজুমদার: আজ জেলের জলহাওয়া দিয়ে আসন্ন দোলের আগমনির গল্প শুরু করব। ঠিক একশো বছর আগেকার কথা। তখন ব্রিটিশশাসিত দেশরূপে ভারতীয় উপনিবেশেরই অংশ ছিল বার্মা। অর্থাৎ বর্তমানে আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র মায়ানমার। সেখানে জেলে বন্দি ছিলেন এমন একজন বাঙালি যিনি পরবর্তীতে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতিরূপে পরিচিত হন। রবীন্দ্রনাথ তাঁকে দেশনায়ক উপাধি দেন। কয়েক বছর পরে ভারতের জন্য প্রবাসে গঠিত সরকারের সর্বেসর্বাও হয়েছিলেন। সেই প্রণম্য নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু বন্দি ছিলেন ব্রহ্মদেশের মান্দালয় জেলে।
২ ফেব্রুয়ারি ১৯২৬ সালে বার্মা সরকারের মুখ্যসচিবকে তাঁর লেখা একটি চিঠির বিষয় ছিল ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদির জন্য বরাদ্দ ভাতা। ইতিমধ্যে ১৬ জানুয়ারি জেল ইন্সপেক্টর জেনারেলকে চিঠিতে তিনি জানিয়েছিলেন, ‘তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় অনুষ্ঠান (যেমন—সরস্বতী পূজা, হোলি ও দোলপূর্ণিমা উৎসব এবং দুর্গাপূজা) আমরা এখানে পালন করতে চাই।’ সেই উৎসবের খরচ আদায়ের দাবিও জানিয়েছিলেন। উদাহরণরূপে কলকাতার আলিপুর জেলে খ্রিস্ট উৎসব পালনের জন্য কয়েদিদের ভাতা দানের কথাও মনে করিয়ে দিতে ভোলেননি। ভারতীয় জেল কমিটির রিপোর্টের প্রাসঙ্গিক পৃষ্ঠাও দেখে নিতে বলেছেন। চিঠিতে তাঁর সহস্বাক্ষরকারীরূপে ছিলেন সত্যেন্দ্রচন্দ্র মিত্র, বিপিনবিহারী গাঙ্গুলি, মদনমোহন ভৌমিক, জীবনলাল চ্যাটার্জি সহ আরো অনেকে।
সেই ঐতিহাসিক চিঠি হতে জানা যায় যে শতবর্ষ পূর্বে দোল উৎসব পড়েছিল ফেব্রুয়ারি মাসে। নেতাজির লিখন অনুসারে ‘আগামী ২৬ ফেব্রুয়ারি এবং পরবর্তী দু-দিন হোলি উৎসব সম্পন্ন হবে, এই উৎসব বাবদ খরচ সরস্বতী পূজার চাইতে সামান্য কিছু বেশি, কিন্তু ওই অর্থের পরিমাণ কোনোমতেই ১০০ টাকার বেশি হবে না।’ বিষয়টি জেনে খুশি হয়ে ৮ ফেব্রুয়ারি কলকাতার এলগিন রোড থেকে ভাইকে চিঠি দিয়েছিলেন দাদা শরৎচন্দ্র বসু।
আসলে নেতাজির কাছে উৎসবগুলি আজকের মতো নিছক প্রায় হুজুগের নামান্তর ছিল না। তিনি এইসবের মধ্যে ভারতীয় সংস্কৃতি, মূল্যবোধকে হাতিয়ার করে দেশবাসীকে নব প্রাণে এক ঐক্যসূত্রে বাঁধতে চাইতেন। তাই দোলের দশ দিন আগে ১৬ ফেব্রুয়ারি আবার বার্মার মুখ্যসচিবকে অসহযোগিতার কথা সখেদে জানিয়ে লিখেছিলেন, ‘আমাদের কাছে ধর্ম নিছক সামাজিক সম্মিলন, বুদ্ধিবিলাস বা ছুটির দিনের উৎসব নয়। এটি সপ্রাণ।’ কিন্তু বসন্ত পঞ্চমী বা সরস্বতী পুজোর সূত্রে সূচিত ও দোল উৎসবে সমাপিত নেতাজির জীবনের এই ঘটনা ভারতের বহু প্রাচীন আরও একটি স্মরণীয় ঘটনাকে যেন সমাপতিত করেছিল। ‘ভারতের তোতাপাখি’ আমির খসরু নিজে গুরু নিজামউদ্দিন আউলিয়ার শোক দূর করতে বসন্ত পঞ্চমীর দিন বাসন্তী রঙের ফুলকাপড়ে সজ্জিত হয়ে গুরুসমীপে উপস্থিত হয়েছিলেন। রঙের পার্বণকে হাতিয়ার করে ভারতের বহুত্ববাদী সংস্কৃতিই যেন পুনরুজ্জীবিত হয়েছিল নেতাজির কর্মকাণ্ডে।
যাই হোক, সুদীর্ঘ চিঠিতে মুখ্যসচিবকে মাধ্যম করে ব্রিটিশ রাজমুকুটকে তিনি রাজকর্তব্য বিষয়ে যেন এক উচিত শিক্ষার পাঠ দিয়েছিলেন। পত্রান্তে সবিনয়ে জানিয়েও দিয়েছিলেন, শুধুমাত্র প্রতিকারের জন্য প্রার্থনা নিবেদনই নয়, অন্যায়ের প্রতিরোধে প্রতিবাদী ভূমিকা গ্রহণের কথা—‘আগামী ১৮ ফেব্রুয়ারি ১৯২৬ বৃহস্পতিবার থেকে অনশন ধর্মঘট শুরু করছি’। অন্যান্য স্বাক্ষরকারীরা ছিলেন ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী, সতীশচন্দ্র চক্রবর্তী, সুরেন্দ্রমোহন ঘোষ প্রমুখ। প্রথম চিঠিতে নেতাজি সই করেছিলেন সকলের আগে, এই চিঠিতে সকলের শেষে। নেতাজি সেখানেই থেমে থাকেননি। বার্মার রাজ্যপাল, বাংলার ছোটোলাট, ভারতের বড়োলাটকেও বারবার টেলিগ্রাম প্রেরণে উদ্যোগী হয়েছিলেন।
এবার আসি সেই বছরের দোলের দিনের কথায়। অর্থাৎ ফেব্রুয়ারির ২৬। সেদিন অনশন ধর্মঘটের নবম দিবস। জেল তত্ত্বাবধায়ককে চারটি ও মুখ্যসচিবকে একটি চিঠি লিখতে ব্যস্ত থাকতে দেখি নেতাজিকে। স্বাভাবিকভাবে খিদেপেটে উৎসবের বিন্দুমাত্র ছোঁয়া সেভাবে ছিল না। জোর করে খাইয়ে অনশন ভঙ্গ করানোর জুলুম বন্ধ করা, নিজের পিতামাতাকে উদ্বিগ্ন না হওয়ার তারবার্তা পাঠানো, উচ্চপদস্থজনদের সঙ্গে সাক্ষাৎপ্রার্থী হওয়া, আত্মীয়দের সঙ্গে যোগাযোগ— এই সবই সেগুলিতে লেখা ছিল। হোলি শেষে শরৎচন্দ্রের চিঠি থেকে জানা যায় বসন্ত পূর্ণিমা কালে সুভাষচন্দ্র বেশ অসুস্থ ছিলেন।
গুরু কথা ছেড়ে এবার আসি হালকা চালের লঘু কথায়। উনিশ শতকে ‘দেবগণের মর্ত্যে আগমন’ খ্যাত দুর্গাচরণ রায়(১৮৪৭-৯৭) নকশা জাতীয় রচনার জন্য প্রসিদ্ধ ছিলেন। ১৮৮১ সালে দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণের ‘কল্পদ্রুম’ পত্রিকায় তিনি লিখেছিলেন ‘শখের দোলযাত্রা’।
সেখানে ফাগুনদিনে বৈকুণ্ঠে বসে নারায়ণের পুরানো দিনের দোলযাত্রার কথা মনে পড়ে যায়। কিন্তু লোকের শ্রদ্ধাভক্তি কমে গিয়েছে বলে কিছুটা ক্ষুণ্ণ হলেও আবার মর্তে আসতে ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন তিনি। তা শুনে লক্ষ্মী বেশ ব্যঙ্গই করেছেন স্বামীকে। কারণ তাঁর মতে দোল মানেই বেশ কিছু লোকের লক্ষ্মীনারায়ণকে কাঁধে তুলে খড়বাঁধা মেড়াগাছ পোড়ানো ও মেয়েদের বিনোদনের জন্য বাঈ-খেমটার আয়োজন করা। অতঃপর দেবদেবীর কাঁচা ঘুম ভাঙিয়ে আবির, ফুটকড়াই মুড়কি, চিনির ছাঁচ, শশাকলার শীতলভোগ নিবেদনের মাধ্যমে দেবদোল পালন। কমলা’তো কমলাপতির মুখের ওপর সপাটে বলেই দেন যে দোল পর্বটা ‘সকল পর্বের ওঁচা’। দেবদম্পতির কথায় তৎকালীন বঙ্গসমাজের ধর্মচেতনা চিত্রও ফুটে উঠেছে। ব্রাহ্মদের অপৌত্তলিকতা সত্ত্বেও কেশবচন্দ্র সেনের হরিভক্তির কথা জেনে নারায়ণ প্রীত হয়েছেন। এবার নারায়ণ দোলযাত্রায় ধরায় যাবেন কি না সেই বিষয়ে একরকম বিনম্র মিনতি জানান লক্ষ্মীকে। ঠিক সেই সময় লক্ষ্মী স্বামীকে একটা গল্প বলেন।
গতবছরে গোকুলনগরে রামধন মুখোপাধ্যায়ের বিধবা কন্যা পদ্মিনীর শখের দোলযাত্রা করার গল্প। গ্রামেরই এক ছেলে দামোদর তাঁর প্রণয়ীরূপে জুটে গিয়েছিল। নায়কনায়িকার নামও লক্ষ্মীনারায়ণের সমার্থক। দামোদরমিলনের সুযোগ গ্রহণ করতে পদ্মিনী, বাবাকে দিয়ে বাড়িতে দোল উৎসবের আয়োজন করায়। সন্ধ্যায় চাঁচর বা ন্যাড়াপোড়া হবে। পদ্মিনী দামোদরকে বাড়ির ঢেস্কেল অথবা ঢেঁকিশালের বিচালির গাদায় লুকিয়ে থাকতে বলে। দামোদরও তাই করে। পদ্মিনী তখন কয়েকটি সন্দেশ, লাড্ডু ক্ষীর বিড়ালকে খেতে দিয়ে দামোদরকেও দেয়। বিড়াল সন্দেশ খাচ্ছে দেখে রামধন ইট ছোঁড়েন। তাতে বিচালির গাদায় লুকোনো দামোদরের মাথা কিছুটা ফেটে যায়। তখন তার ‘চোরা প্রেমের মুখে ছাই’ বলে মনে হলেও মুখে কিন্তু রা কাটতে পারেনি।
সন্ধ্যায় চাঁচরে মেড়াগাছ পোড়ানোর জন্য গাদা হতে বিচালি সংগ্রহ করতে বলেন রামধন। পদ্মিনীর বারণ সত্ত্বেও তাড়াহুড়োতে লোকেরা বিচালি টানতেই দামোদরের গায়ে হাত পড়ে যায়। তারা তখন গাদায় বাঁশ দিয়ে পিটাতে থাকে। দামোদর মুখে কাপড় দিয়ে পালিয়ে, বনজঙ্গলে লুকিয়ে রক্ষা পায়। সবাই ভাবে চোর এসেছিল। কিছু সময় পরে দামোদর এসে পদ্মিনীকে বলে ‘আমি পীরিতে ইস্তফা দিলাম’।
কিন্তু তাঁকে নিরস্ত করে পদ্মিনী আবার যোজনা বানায়। ভাঁড়ার ঘরে একটা বড়ো জালার মধ্যে দামোদরকে সে লুকিয়ে রাখে। এদিকে কেষ্ণা বেনে লোকজন নিয়ে ফরমাসমতো সেই জালায় বহুল আবির ঢেলে দেয়। তাতে দামোদরের চোখ-কান-মুখে আবির ঢুকে পড়ে। পদ্মিনী তাকে আবিরমাখা সিঁদুরে আমটির মতো দেখতে লাগছে বলে খুশি করে। তবু দামোদর উনিশ শতকীয় স্ত্রী স্বাধীনতাকেই দায়ী করে। কারণ পদ্মিনীকে বাড়ি থেকে বেশ স্বাধীনতা দেওয়া হত বলেই তাদের দুজনের এই অসম্ভব বন্ধুত্ব জন্ম নিতে পেরেছিল।
এবার তাকে ছেঁড়া সপ বা মাদুরের মধ্যে লুকিয়ে রাখে পদ্মিনী। একটি বাচ্চা ছেলে ছুঁচো আতশবাজি ধরিয়ে দিলে তা ছুটে গিয়ে দামোদরের গায়ে জড়ানো মাদুরে গিয়ে আগুন লাগিয়ে দেয়। শেষে জল ঢেলে আগুন নেভানো হয়।
বাড়িতে একদল লোকজন হাজির হলে বসার জন্য মাদুর ধরে টানতেই দুশ্চরিত্র দামোদরকে সকলে দেখে ফেলে। আবিরে অভিষিক্ত দামোদরকে সকলে মাঠে নিয়ে গিয়ে ছাতিমগাছের সঙ্গে ঝুলিয়ে রেখে দোলে উঠিয়ে দেয়। পদ্মিনীই তাকে বাঁচায়। স্কুলেপড়া পদ্মিনী তখন চরম অসন্তোষে সমাজকে প্রশ্ন করে— দেশের লোক প্রাণদণ্ড দিতে পারে কিন্তু বিধবার চোখের জল কি মুছাতে পারে?
লক্ষ্মীর বলা গল্পের সব ভাষাই কিন্তু চলিতে রচনা করেছিলেন লেখক। গল্প বলার পর লক্ষ্মী বৈকুণ্ঠেই দোল পালনের সিদ্ধান্ত নেন। তার ওপর সেই বছর দোল একুশে ফাল্গুন, বারবেলা শনিবারে পড়েছিল। আবার পরদিন রবিবারে মাতালের বিপদ। সেই সমস্যা এই একবিংশ শতকেও রয়েছে বরং বেড়েছে। তাই পৃথিবীতে এসে দোলে ওঠা নারায়ণের নিষিদ্ধ হল।
কিন্তু সেই বার বৈকুণ্ঠে ভালোভাবেই দোলযাত্রা সম্পন্ন হয়েছিল। নারায়ণ ‘দেবগণকে লইয়া তেল লুণ মেখে লঙ্কা দিয়ে ফুটকড়াই মুড়কী ও ছাঁচ গালে দিয়ে জল পান করিলেন। ঐ দিন বৈকুণ্ঠের রাস্তা ঘাট লালে লাল হইয়া গেল!’
লেখক গবেষক ও প্রাবন্ধিক