


নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: আলোর উত্সবে মেতে উঠল শহর। কালো মেয়ের পায়ের তলায় বসেই তাঁর আরাধনায় সোমবার রাত কাটল কলকাতায়। সকাল থেকে উত্তর থেকে দক্ষিণে কালী ঠাকুর দর্শনে পথে নেমে পড়েছিল বাঙালি। আর কালী পুজো মানেই তো আতশবাজি পোড়ানো! কিন্তু, এবারও শব্দদানব রুখতে ব্যর্থ পুলিশি নজরদারি। রেহাই পেল না শিশুদের হাসপাতাল চত্বরও। রাত তখন প্রায় ১১টা। ল্যান্সডাউনের শিশুমঙ্গল হাসপাতালের বাইরে একের পর এক চকোলেট বোমার শব্দে অতিষ্ট রোগী ও চিকিৎসকরা। অভিযোগের ভিত্তিতে সেখানে যায় ভবানীপুর থানার পুলিশ। পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের দাবি, রাতে সেখানে শব্দসূচক ১ ডেসিবেলও হওয়ার কথা নয়। কিন্তু, মিটার বলছে, ৯৬।
রাত বাড়তেই পরিবেশ দূষণের ভ্রূকুটিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে আকাশ-বাতাস ঢাকল বাজির ধোঁয়ায়। প্রশাসনের নিয়মাবলি ভুলে বেড়েই চলল শব্দবাজির দাপট। শহরতলি এলাকায় রাত ৮টা-৯টাতেই এমন পরিস্থিতি ছিল, খোদ পুজো কমিটির তরফে মাইকে শব্দবাজি পোড়ানো বন্ধ রাখার অনুরোধ করতে হয়। ১০টার পর থেকেই পুলিশ ও দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের কন্ট্রোল রুমে মুহুর্মুহু অভিযোগ আসতে শুরু করে। দূষণের ঠেলায় শহরে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত নিউটাউন। রাতে সেখানকার বায়ুদূষণ সূচক ২২১ ছাড়ায়। দমদমে ১৫০ পেরয়।
এদিন সকাল থেকেই ঠনঠনিয়া, ফিরিঙ্গি কালীবাড়ি, দক্ষিণের করুণাময়ী, কালীঘাট, লেক কালীবাড়ি, দক্ষিণেশ্বর সহ বিভিন্ন মন্দিরে দর্শনার্থীর লম্বা লাইন পড়ে। মন্দির, আবাসন, রাস্তাঘাট রঙিন আলোয় আলোকিত। তার সঙ্গে মন্ত্রোচ্চারণ আর যজ্ঞের ধোঁয়ায় শহরের রাত যেন মায়াবী রূপ ধারণ করেছিল। যদিও সব কিছুকে হারিয়ে দিয়েছে শব্দদানবের তাণ্ডব। এদিন বিকেল থেকেই দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের কার্যালয়ে কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছিল। আধিকারিকরা নজর রাখছিলেন, কোন এলাকার শব্দ দূষণের মাত্রা বাড়ছে। বালিগঞ্জ, যাদবপুর, বেহালা, বেলেঘাটা তপসিয়া, রুবি সহ বিভিন্ন এলাকায় রাতে কান পাতা দায় হয়ে ওঠে। পর্ষদের আধিকারিকরা বিভিন্ন হাসপাতাল চত্বরে সরেজমিনে পরীক্ষা করেন। অভিযোগ, বিসি রায় শিশু হাসপাতাল ও আর জি কর চত্বরে শব্দবাজির দাপট ছিল যথেষ্ট। বিষয়টি পুলিশে জানানো হয়। নিয়ম অনুযায়ী, কালীপুজোর রাত ৮টা থেকে ১০টা পর্যন্ত শুধুমাত্র সবুজ বাজি ফাটানোর কথা। কিন্তু, সময়ের আগে ও পরেও শব্দদানবের দাপট অব্যাহত ছিল।
পর্ষদের চেয়ারম্যান কল্যাণ রুদ্র বলেন, ‘কেন্দ্রীয় দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের তথ্য বলছে, রবিবার কলকাতার একিউআই (এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স) ছিল ৮৩। যেখানে দিল্লি পৌঁছে গিয়েছে ৪০০-এ। মুম্বই সমুদ্রর ধারে হলেও সেখানে ১৮৮। অর্থাত্, কলকাতা শহর অনেকটাই সুরক্ষিত।’ তাহলে কি শহরের মানুষের মধ্যে সচেতনতা ফিরেছে? কল্যাণবাবুর কথায়, ‘কালী পুজোর রাত কাটলে তা বলা যাবে। কিন্তু পড়ুয়া ও তরুণ প্রজন্মের মধ্যে একটা সচেতনতা এসেছে।’ রাত ১২টা পর্যন্ত পর্ষদে গোটা রাজ্য থেকে ৪১টি অভিযোগ এসেছে। শব্দবাজির অভিযোগই বেশি। কিছু ডিজে বক্স বাজানোর অভিযোগও রয়েছে। শহরের বিভিন্ন আবাসন থেকে রাত বাড়তেই শব্দবাজির প্রকোপ বেড়েছে। আবাসনগুলিতে কড়া নজরের ফরমান জারি করেছিলেন সিপি। অভিযোগ, সেই বহুতলেই দাপট ছিল সবচেয়ে বেশি। শব্দবাজি ফাটানো সহ বিভিন্ন অভিযোগে পুলিশ রাত ১২টা পর্যন্ত ৪৫ জনকে গ্রেফতার করেছে উদ্ধার হয়েছে ৫২২ কেজি নিষিদ্ধ বাজি।