


ইন্দ্রজিৎ সেন, কলকাতা: আন্দোলন। প্রথমে বাংলাদেশ। পরে নেপাল। অবশেষে ভারতেও। আর নেপথ্যে কারা? 'জেন জি'। গত দুই বছরে দক্ষিণ এশিয়া থেকে আফ্রিকা, ইউরোপ থেকে উত্তর আমেরিকা অসংখ্য দেশে তরুণদের বিক্ষোভ রাজনীতির গতিপথই বদলে দিয়েছে। কোথাও দুর্নীতি, কোথাও বৈষম্য, কোথাও গণতান্ত্রিক অধিকার খর্বের অভিযোগ। প্রতিটি ইস্যুর কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে যুবসমাজের ক্ষোভ। নেপাল-বাংলাদেশের আন্দোলন তো দেশের সরকারই বদলে দিয়েছে। সাম্প্রতি ভারত দেখল জেন-জি'দের আন্দোলন। নিট প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগকে ফ্রন্টলাইনে রেখে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফা চেয়ে দিল্লির যন্তরমন্তরে বড়সড় আন্দোলনে নেমেছিল এই জেন জিদের একাংশ। দিন দিন বাড়তে থাকে আন্দোলনকারীদের সংখ্যা। দাবি ছিল একাটাই ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফা। আন্দোলনের রেশ এতটাই বেড়ে ওঠে যে সেই আঁচ দেশের বিভিন্ন রাজ্যেই ছড়িয়ে পড়ে। টানা আন্দোলনের ফলে তাঁদের দাবিকেই মান্যতা দিয়ে শনিবার ইস্তফা দিলেন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী। ছড়িয়ে পড়ল দেশজুড়ে তরুণ তরুণীদের উচ্ছাস। ককরোচ পার্টি যাঁরা নিজেদের জেন-জি গঠিত ছাত্র যুব সংগঠন বলে দাবি করেছেন তাঁরা এবং ককরোচ প্রধান অভিজিত্ দিপকে মঞ্চে তিরঙ্গা উড়িয়ে উচ্ছাস আনন্দে ভাসলেন শনিবার। অর্থাৎ আবার একটা আন্দোলনে জেন-জি দের জয়। এবার আসা যাক আসল কথায়। এই প্রেক্ষাপটে উঠে আসছে শুধুমাত্র 'জেন-জি'দের নাম। এবার বড় প্রশ্ন কারা এই 'জেনারেশন জি' । এই 'জি' কি 'জি' ফর জিনিয়াস এর 'জি'? এই 'জি' খায় না মাথায় দেয়? তার আগে জানতে হবে এই জেনারেশনের ধারনা এল কীভাবে?
সমাজ বিজ্ঞানীদের মতে, সোশ্যাল জেনারেশন বা সামাজিক প্রজন্মের ধারনাটির সূচনা হয় ঊনবিংশ শতাব্দীতে। একই সময়ে জন্ম নেওয়া এবং একই ধরনের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশে বেড়ে ওঠা মানুষদের একটি নির্দিষ্ট প্রজন্ম হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। এর আগে প্রজন্ম বলতে শধুমাত্র একটি পরিবারের বাবা-মা, সন্তান বা পূর্বপুরুষদের সম্পর্ককেই বোঝানো হত। কিন্তু পরে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে আসে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। দেখা যায়, একই সময়ে জন্ম নেওয়া মানুষের চিন্তাভাবনা, আচরণ ও জীবনদর্শনের মধ্যে কাকতালীয়ভাবে একটি অদ্ভুত মিল রয়েছে। আর সেখান থেকেই এই জেনারেশন বা প্রজন্মের ধারনা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
এবার প্রশ্ন প্রজন্মের নামগুলি কীভাবে এল? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর, বিশেষ করে ১৯৪৫ সালের পর অর্থনীতিবিদ, সরকারি সংস্থা ও বিজ্ঞাপন সংস্থাগুলি জনসংখ্যা বিশ্লেষণের সুবিধার জন্য বিভিন্ন প্রজন্মের নাম ব্যবহার শুরু করে। কালক্রমে আসতে থাকে একের পর এক প্রজন্ম। যেই প্রজন্মগুলির নামও ছিল ভিন্ন। তবে শুধু মাত্র ১৯৪৫ এর পরের সময় থেকেই তাঁরা এই বিভাজনকে তুলে ধরেননি বরং ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে প্রজন্মের বিভাজনগুলি বিশেষজ্ঞরা বর্ণনা করেছেন।
গ্রেটেস্ট জেনারেশন: বর্তমান সময়ে সবচেয়ে পুরোনো প্রজন্ম হল এই গ্রেটেস্ট জেনারেশন। যাঁদের জন্ম ১৯০১ থেকে ১৯২৭ সালের মধ্যে। এই প্রজন্মের মানুষরা ইতিহাসে উল্লিখিত মহামন্দার ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে বড় হয়েছেন এবং পরবর্তীতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। জীবনের শুরু থেকেই কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ায় কঠোর পরিশ্রম, আত্মত্যাগ, দায়িত্ববোধ তাদের জীবনের প্রধান বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছিল।
সাইলেন্ট জেনারেশন: এই জনেরেশনের মানুষদের জন্ম ১৯২৮ থেকে ১৯৪৫ সালের মধ্যে। এসময়ে কমিউনিজম নিয়ে প্রবল রাজনৈতিক আতঙ্কের সময় তাঁরা বড় হয়েছেন। সেই সময় প্রকাশ্যে মত প্রকাশের ক্ষেত্রে মানুষের মধ্যে এক ধরনের ভয় কাজ করত। এই নীরব সামাজিক বাস্তবতার কারণেই তাদের 'সাইলেন্ট জেনারেশন' বলা হয়। কঠোর পরিশ্রম, শৃঙ্খলা, আত্মনির্ভরশীলতা এবং নিয়ম মেনে চলাকে তারা জীবনের অন্যতম মূল্যবোধ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।
বেবি বুমার: ১৯৪৬ থেকে ১৯৬৪ এই সময়টি বেবি বুমার জেনারেশন নামে পরিচিত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অদ্ভুতভাবে জনসংখ্যাগত পরিবর্তন দেখা যায়। সে সময় যুদ্ধের দীর্ঘ অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার অবসানের পর মানুষ আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে শুরু করে। তাঁদের মধ্যে বংশ বিস্তারের এক বিশাল প্রবনতা লক্ষ্য করা যায়। এর ফলেই হঠাৎ করে জন্মহার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। ইতিহাসে এই ঘটনাই 'বেবি বুম' নামে পরিচিত। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে এই পরিবর্তনের প্রভাব ছিল সবচেয়ে বেশি। ১৯৪৬ থেকে ১৯৬৪ এই সময়কালের মধ্যে শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্রেই প্রায় ৭ কোটি ৬০ লাখ শিশু জন্মগ্রহণ করে। এত বড় সংখ্যায় নবজাতকের জন্মের কারণেই এই সময়ে জন্ম নেওয়া মানুষদের 'বেবি বুমার' নামে অভিহিত করা হয়।
জেনারেশন এক্স: এদের জন্ম ১৯৬৫ থেকে ১৯৮০ সালের মধ্যে। এই প্রজন্ম এমন এক সময়ে বড় হয়েছে, যখন বিশ্ব এইডস মহামারি, বিভিন্ন টেলিভিশন সংস্কৃতির উত্থান এবং সমকামীতার অধিকারের আন্দোলনের মতো বিষয়ের সাক্ষী ছিল। প্রযুক্তির দ্রুত উত্থানও দেখেছে এই প্রজন্ম। স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া, বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি এবং পরিবর্তনের সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা এই প্রজন্মের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
মিলেনিয়াল: ১৯৮১ থেকে ১৯৯৬ সালের মধ্যে জন্ম নেওয়া মানুষদের এই প্রজন্মের মানুষ হিসাবে ধরা হয়। বা জেন ওয়াই নামেও এরা পরিচিত। যখন পৃথিবী ধীরে ধীরে ডিজিটাল যুগে প্রবেশ করছে তার সাক্ষী বহন করছে এই প্রজন্ম। এদের শৈশবের একটি অংশ ইন্টারনেট ছাড়া কাটিয়েছে, আবার পরবর্তী জীবন ইন্টারনেট, স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে ভাবে জড়িয়ে। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী হামলা থেকে শুরু করে ই-কমার্সের উত্থান সবই তাঁদের অভিজ্ঞতার অংশ। সন্তান লালন-পালনের ক্ষেত্রেও তারা নতুন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এসেছে। সন্তানদের নিজস্ব পরিচয়, ব্যক্তিত্ব এবং স্বাধীন মত প্রকাশকে উৎসাহিত করার প্রবণতা এই প্রজন্মের মধ্যে বেশি দেখা যায়।
জেনারেশন জি বা জেন-জি: ১৯৯৭ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে এই জেন-জির উত্থান। এই প্রজন্মের বিশেষত্ব হল, তারা এমন এক পৃথিবীতে জন্মেছে যেখানে ইন্টারনেট, স্মার্টফোন, সোশ্যাল মিডিয়া, ডিজিটাল যোগাযোগ সবসময়ই ছিল। প্রযুক্তি তাদের কাছে নতুন কিছু নয়, বরং দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক অংশ। অল্প বয়স থেকেই বিশ্বজুড়ে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর সঙ্গে সংযুক্ত থাকার সুযোগ পাওয়ায় তাদের দৃষ্টিভঙ্গিও তুলনামূলকভাবে ভিন্ন।
জেনারেশন আলফা: ২০১০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে জন্ম নেওয়া শিশুদের বলা হয় জেন আলফা। এরা এমন একটি সময়ে বড় হচ্ছে, যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অনলাইন শিক্ষা এবং স্মার্ট ডিভাইস জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আগের যেকোনো প্রজন্মের তুলনায় তারা প্রযুক্তি ব্যবহারে বেশি দক্ষ। তবে প্রযুক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার কারণে মনোযোগের ঘাটতি এবং সামনাসামনি সামাজিক যোগাযোগ কমে যাওয়ার মতো উদ্বেগও রয়েছে। এই প্রজন্মের একটি অংশ কোভিড-১৯ মহামারির সময় জন্মেছে। ফলে তাদের শৈশবের অভিজ্ঞতা আগের সব প্রজন্মের তুলনায় অনেকটাই ভিন্ন। গবেষকদের মতে, ভবিষ্যতে শিক্ষা, প্রযুক্তি এবং কর্মক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আনতে পারে এই প্রজন্মই।
এখানেই শেষ নয় এই জেনারেশনের ধারাবাহিকতা বজায় আছে আর থাকবে ভবিষ্যতেও। বর্তমান সময় যাদের জন্ম ২০২৫ থেকে ২০৩৯ সালের মধ্যে হবে তাঁরা পরিচিতি পাবে জেনারেশন বিটা নামে। যেহেতু এই প্রজন্মের যাত্রা সবে মাত্র শুরু হয়েছে তাই তাঁদের সূদূর প্রসারী ভবিষ্যতের ধারনা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে বিশেষজ্ঞদের ধারণা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তাঁদের জীবনের স্বাভাবিক অংশ হয়ে উঠবে।