


সৌম্যব্রত দাশগুপ্ত: মাটির গায়ে আলতো করে ধরা দশটা আঙুল... পরতে পরতে গড়ে তোলে মৃন্ময়ীকে। নারী মূর্তির মধ্যে ধরা দেন দেবী। আকাশজুড়ে আষাঢ়-শ্রাবণ পেরিয়ে আসা মেঘ... একটু পরপরই নেমে আসে অবিরামধারা। জল থইথই লেন-বাইলেনে মাটির উপাখ্যান লেখে কুমোরটুলি। মাটির সোঁদা গন্ধ আর স্যাঁতসেঁতে অন্ধকার ছোট ছোট ঘরে লালচে ডুমের আলোয় একটু একটু করে দেবীর সৃষ্টি হয়। বিভঙ্গে ফুটে ওঠে এথেনার স্পর্ধা, ভেনাসের লাস্য... কখনও ঘরের মেয়ের মায়াবী চাহনি! পাশে প্রবাহমান গঙ্গা দেখেছে পোটো-পাড়ার উত্থানপতন।
কলকাতা তখনও সাবালক হয়নি। বিদেশি বণিকদের আসা যাওয়া নিত্যদিন। ভাগ্যান্বেষীদের বসতি গড়ে উঠেছে সবে। তাঁদের প্রয়োজন মেটাতে এসেছিল কয়েকঘর কুমোর। হোগলা গাছের বন কেটে মাথা গোঁজার আস্তানা। ঘড়ঘড় শব্দে চাক ঘুরতো, খড়পোড়া ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠত আকাশে। সেই আগুনে পুড়ে লাল হতো মাটির হাড়ি-পাতিল।
পলাশীর যুদ্ধের পর কলকাতায় জন্ম নেয় নতুন ‘বাবু-কালচার’। বাঙালি বাবুরা বিত্তসাধনায় মজলেন। সেই রবার্ট ক্লাইভের আনুকুল্যেই। ১৭৫৭ সালে শোভাবাজার রাজবাড়ির রাজা নবকৃষ্ণদেব শুরু করলেন দুর্গাপুজো। তারপর একে একে কলকাতায় বাবুরা প্রায় প্রত্যেকেই সে পথে হাঁটলেন। দুর্গাপুজো হয়ে দাঁড়াল সামাজিক মর্যাদার প্রতীক। ‘হুতোমপ্যাঁচার নক্সা’য় বাবুদের বাড়ির দুর্গার একটা অসাধারণ বর্ণনা দিয়েছিলেন কালীপ্রসন্ন সিংহ। ‘প্রতিমাখানি প্রায় বিশ হাত উঁচু— ঘোড়ায় চড়া হাই ল্যান্ডের গোরা বিবি পরি ও নানাবিধ চিড়িয়া সোলার ফুল ও পদ্ম দিয়ে সাজানো— মধ্যে মা ভগবতী জগদ্ধাত্রী মূর্তি সিংগির গা রুপুলি ও হাতি সবুজ মকমল দিয়ে মোড়া। ঠাকুরুণের বিবিয়ানা মুখ— রং ও গড়ন আসল ইহুদি ও আরমানি কেতা, ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর ও ইন্দ্র দাঁড়িয়ে জোড় হাত করে স্তব কচ্চেন। প্রতিমের উপর ছোট ছোট বিলাতি পরিরা ভেঁপু বাজাচ্চে।’
হুতোমের বর্ণনায় স্পষ্ট, বাবুদের বাড়ির দুর্গা প্রতিমায় থাকত সাহেবি কেতা। সাদা চামড়ার কর্তাদের খুশি করতে, নিজেদের মোচ্ছবে রং জমাতে দরকার পড়েছিল দক্ষ মৃৎশিল্পীর। আর তাই তো কৃষ্ণনগরের ঘূর্ণি থেকে কলকাতা... নতুন ঠিকানা পেল প্রতিমা শিল্পীরা। কোম্পানি আমলে এশহরে বিভিন্ন পেশার মানুষের কাজকর্ম ও বসবাসের জন্য জায়গা ছিল নির্দিষ্ট। যেমন, সুরা বিক্রেতাদের জন্য শুঁড়িপাড়া, কাঠের মিস্ত্রিদের জন্য ছুতোরপাড়া, তেলের কারবারিদের জন্য কলুটোলা... তেমনই মৃৎশিল্পী বা কুমোরদের জন্য কুমোরটুলি।
শোনা যায়, রাজা নবকৃষ্ণদেব নিজের বাড়ির প্রতিমা তৈরির জন্য কৃষ্ণনগর থেকে একজন মৃৎশিল্পীকে নিয়ে এসেছিলেন কলকাতায়। অনুসরণ করলেন অন্যান্য সম্ভ্রান্ত পরিবারও। কৃষ্ণনগর থেকে আরও অনেকে পাড়ি জমালেন এশহরে। নতুন কাজের আশায়। সকলে মিলে একটু একটু করে গড়ে তুললেন কলকাতার পোটো-পাড়া।
প্রথমদিকের কলকাতার দুর্গাপুজো মূলত বাবু কালচারের প্রতিযোগিতাই। প্রতিমার সাজসজ্জা নিয়ে চলত রেষারেষি। শিবকৃষ্ণ দাঁর বাড়ির প্রতিমার সাজসজ্জার বিশেষ খ্যাতি ছিল। তৎকালীন কলকাতায় কান পাতলেই শোনা যেত... ‘মা এসে গয়না পরেন জোড়াসাঁকোয় শিবকৃষ্ণ দাঁর বাড়ি, ভোজন করেন কুমারটুলির অভয়চরণ মিত্রের বাড়ি আর রাত্রি জেগে নাচ দেখেন শোভাবাজারের রাজবাড়িতে।’ শিবকৃষ্ণ দাঁর বাড়িতে দেবীর চালচিত্রে দেখা যেত ইউনিকর্ন, পরী, ব্রিটিশ সিংহ। সবই সাহেবদের মন পাওয়ার বাসনায়। উপকরণ সামান্য খড়, বাঁশ, দড়ি আর দু’রকমের মাটি। এঁটেল বা চিট আর বেলে মাটি। বেলে মাটি আদতে গঙ্গার মাটিই। যে কোনও ঘাটেই পাওয়া যায়, দামেও সস্তা। শিল্পীদের পছন্দ ছিল উলুবেড়িয়ার মাটি। নৌকা বোঝাই করে তা আসত।
মাটি যাঁদের হাতে রূপ নেয় শিল্পের, তাঁদেরকেই বারবার হতে হয়েছে ঠাঁইনাড়া। মৃৎশিল্পীদের আদি নিবাস ছিল পূর্ববঙ্গের ঢাকায়। মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র সেখান থেকে তাঁদের নিয়ে আসেন কৃষ্ণনগরের জলঙ্গি নদীর পাড়ে, ঘূর্ণিতে। আবার রাজার নির্দেশেই ঘূর্ণি ছেড়ে কলকাতা। বারবার মাটি হারানোর গল্প মিশে যায় শিল্পীর হাতের মাটিতে। বাবুদের বাড়িতে আড়ম্বরের দেবীকে গড়ে তুলেছিল যে হাত, সেই হাতই পরবর্তীতে দুর্গাকে করে তোলে নাগরিক। বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের প্রবল উত্তাপ পুড়িয়ে দিয়েছিল শারদোৎসবের বহিরঙ্গকে। মৃন্ময়ী রূপ বদলে দুর্গা তখন চিন্ময়ী দেশমাতা।
কলকাতায় ১৯৩০ সাল পর্যন্ত ছিল একচালার রাজত্ব। সবুজ রঙের অসুর আর ঘন ক্যাটকেটে হলুদ রঙের প্রতিমা, আলতা পরা পা সাদা সিংহের গায়ে। অলঙ্কারের রং শোলার... সাদা বা রুপোলি ডাকের। সাবেকি সেই প্রথা ভাঙার দুঃসাহস দেখালেন কুমোরটুলিরই এক প্রবাদপ্রতিম শিল্পী.. গোপেশ্বর পাল। এক চালচিত্র ভেঙে দুর্গা ও তাঁর সন্তানরা হলেন আলাদা। দেবীর গায়ে হলুদ মুছে চাপল দুধে আলতার প্রতীকী রং, গোলাপি! ব্যস, ঘরের দেবী হয়ে উঠলেন মণ্ডপের ঐশ্বর্যময়ী। সেই শুরু। প্রতিমার রঙে পরীক্ষানিরীক্ষা আজও থামেনি।
কুমোরটুলি সেই ১৭৭০ থেকে রঙের বিন্যাসে যে শিল্প চেতনার পরিচয় দিয়েছেন, ফরাসি মডার্ন আর্টের শিল্পীদের তা করে দেখাতে লেগেছে আরও বহু বছর। পুরনো যুগে সিংহে দেখা যেত ঘোড়ার মতো মুখ। অনেকের মতে, সিংহ বাংলার পশু নয়। বাংলার শিল্পীরা স্বচক্ষে পশুরাজকে দেখেনওনি। সেই কারণেই ঘোড়ার আবির্ভাব। ফোটোগ্রাফির উদ্ভবের সঙ্গে সঙ্গেই দেবীর বাহন ফিরে আসে স্বচেহারায়।
দেশভাগ গভীর ছাপ ফেলেছিল কলকাতার পোটো-পাড়ায়। ঢাকা, বিক্রমপুর, কুমিল্লা, ময়মনসিংহের মৃৎশিল্পীরা ঠাঁইনাড়া হয়ে দলে দলে ভিড় করতে থাকেন এপারে। একদিকে দেশ হারানোর যন্ত্রণা, অন্যদিকে বেঁচে থাকার লড়াই... কঠিন আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছিল শিল্পীজীবন। মাটি হারানোর সেই যন্ত্রণা মাটি দিয়েই ভুলেছিলেন পূর্ববঙ্গের শিল্পীরা। এপার বাংলা-ওপার বাংলার শিল্প ঘরানার সংঘাত ছিল অনিবার্য। পুরনো টানা টানা চোখের বাংলা প্রতিমা গড়লেন না পূর্ববঙ্গের শিল্পীরা। তাঁদের হাতের স্পর্শে দেবী হয়ে উঠলেন ঘরের মেয়ে। এক্কেবারে রিয়ালিস্টিক। পুরনো আমলের একচালা কিংবা আধুনিক ওরিয়েন্টাল শৈলীতেও প্রতিমার চোখ হতো টানা টানা। আর পূর্ববঙ্গীয় ঘরানায় তা হল নিখুঁত পটলচেরা। মুখ পান পাতার মতো। সাবেকি একচালা প্রতিমায় দেবী দাঁড়িয়ে থাকেন সোজা হয়ে সমভঙ্গ মুদ্রায়। আর পূর্ববঙ্গীয় নতুন রীতির প্রতিমায় দেখা গেল দুর্গা দাঁড়িয়েছেন কোমর বাঁকিয়ে, অসুরের দিকে একটু ঝুঁকে। আশ্চর্য এক গতিময়তা সেই দেহভঙ্গিমায়—যেন শত্রুদলনে উদ্যত দশভুজা! তখন কুমোরটুলিতে যাকে বলা হতো ‘বাঙাল দুর্গা’। প্রতিমা শিল্পীদের মধ্যে পূর্ববঙ্গ-পশ্চিমবঙ্গ একটা বিভাজন স্পষ্ট হয়ে ওঠে সেই সময় থেকেই। কুমোরটুলিতে এই বিভাজন দু’টি আলাদা আলাদা মৃৎশিল্পী সমিতির জন্ম দিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গীয় শিল্পীদের ‘কুমোরটুলি মৃৎশিল্প সাংস্কৃতিক সমিতি’ আর পূর্ববঙ্গীয় শিল্পীদের ‘কুমোরটুলি মৃৎশিল্প সমিতি’। বনমালি সরকার স্ট্রিটের বাসিন্দারা সকলেই প্রায় পূর্ববঙ্গ থেকে আসা। ঘূর্ণি থেকে আসা শিল্পীরা আছেন গোপেশ্বর পাল লেন ও নিতাই পাল লেনে। ঠাট্টা করে এই দুই পল্লিকে ‘হিন্দুস্তান-পাকিস্তান’ বলেও চিহ্নিত করে থাকেন এলাকার মানুষ। যদিও শিল্পধারার এই বিভেদ ক্রমে ঘুচে গিয়েছে। ‘মাটি’ই মিলিয়ে দিয়েছে শিল্পীদের। সৃষ্টি হয়েছে এক নতুন শিল্প ধারার, যেখানে দুই বঙ্গের অবদান সমান।
কুমোরটুলিকে লড়াই করতে হয়েছে শিল্পীর অধিকারের জন্যও। গোপেশ্বর পাল যখন একচালা ভেঙে পাঁচটি আলাদা কাঠামোয় ছড়িয়ে দিচ্ছেন দুর্গা প্রতিমাকে, মেনে নেয়নি রক্ষণশীল সমাজ। ক্ষোভে গর্জে উঠেছে তারা। শোভাবাজার রাজবাড়ির ঠাকুর দালানে বসেছে পণ্ডিতদের সভা। ডেকে পাঠানো হয়েছে শিল্পী গোপেশ্বরকে। সেদিন তাঁর মুখে ছিল একটাই যুক্তি— ‘মা কোনও সময়ই সন্তানদের নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে যাবেন না! তাই আমার তৈরি পাঁচ কাঠামোর ঠাকুরই শাস্ত্র সম্মত।’ শিল্পী-স্বাধীনতার সামনে সেদিন মাথা নোয়াতে হয়েছিল সব ধর্মীয় সংস্কারকে। কুমোরটুলি যেন এক প্রতিবাদের গল্প। প্রতিকূলতার সামনে দাঁড়িয়ে লড়াই করবার গল্প। কুমোরটুলির কাহিনি স্থান পায়নি কলকাতার মূল ধারার ইতিহাসে। কিন্তু তাঁরা না থাকলে বাংলার মাতৃ আরাধনাই যে পূর্ণতা পেত না!