


পরামর্শে এন আর এস মেডিক্যাল কলেজের ডার্মাটোলজি বিভাগের প্রধান ডাঃ অরুণ আচার।
কী করবেন, কী করবেন না
১. বয়স হলে এমনিতেই ত্বকে একটু শুষ্কভাব আসে। এই সমস্যাকে সেনাইল জেরোসিস বলে। আবার শীতকালে শুষ্ক আবহাওয়ার কারণেও ত্বক থেকে বাড়তি জল বেরিয়ে যায়। এই কারণে শীতকালে বয়স্করা ত্বকের সমস্যায় ভুগতে থাকেন। তাই বয়স্কদের ত্বকের আর্দ্রতা বজায় রাখার চেষ্টা করতে হবে। অর্থাত্ ত্বক শুষ্ক হয়ে গেলে ময়েশ্চারাইজার বা তেল জাতীয় উপাদান লাগাতে হবে। আবার অনেকের ডায়াবেটিস থাকে। ব্লাড সুগার থেকেও অনেকের ত্বকে শুকনোভাব আসতে পারে। এই শুষ্কভাব প্রতিরোধ করতে হলে ত্বকে ময়েশ্চারাইজার লাগাতে হবে।
এই তৈলাক্ত উপাদান নারকেল তেল হতে পারে, আবার হতে পারে লিক্যুইড প্যারাফিন, গ্লিসারিন, সেরামাইড কনটেইনিং ক্রিম।
২. শীতকালে বয়স্ক মানুষের ত্বকে একধরনের চুলকানি হয়। অর্থাত্ ত্বক চুলকায়। কুটকুট করে। এই ধরনের সমস্যার জন্যও ত্বকে ময়েশ্চারাইজার লাগাতে হবে। এছাড়া ত্বকে সরাসরি উলের জিনিস না পরাই ভালো।
অনেকে খুব বেশি গরম জলে স্নান করেন। সেক্ষেত্রে অতি উষ্ণ জলে স্নান না করে বরং ঈষদুষ্ণ জলে স্নান করাই উচিত। বেশি গরম হলে ত্বকের শুষ্কভাব বেড়ে যেতে পারে।
৩. বয়সকালে কারও কারও পা একটু ফেটে ফেটে যায়। সুগার থাকলে অনেকক্ষেত্রে হাত-পায়ের স্নায়ু বা পেরিফেরাল নার্ভগুলির ক্ষতি হতে থাকে। একসময় নার্ভগুলি সঠিকভাবে কাজ করতে পারে না। সঠিকভাবে সংবেদন পৌঁছয় না মস্তিষ্কে। তাই পায়ে কোনও ঘা বা সংক্রমণ হলে ব্যথা অনুভব করেন না ডায়াবেটিসের রোগী। সেই সুযোগে ওই ক্ষতের মাধ্যমে অন্যান্য ব্যাকটেরিয়া শরীরে প্রবেশ করে। দেখা গিয়েছে, এই ঘা কোনও কোনও ক্ষেত্রে এতখানিই ভয়ঙ্কর হয় যে গ্যাংগ্রিন হওয়ার আশঙ্কা থাকে। কখনও অ্যাম্পুটেশনের প্রয়োজনও হয়।
প্রধান কাজ হল, লোশন ক্রিম, নারকেল তেল ইত্যাদি ব্যবহার করা। তাতে ত্বক ফাটবে না, ঘা হওয়ার আশঙ্কাও কমবে। ঘা হওয়া এবং সম্ভাব্য অঙ্গহানিও প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে।
শীতকালে সাবান ব্যবহার
সাবান ব্যবহার করতে হলে অবশ্যই গ্লিসারিন সাবানকে অগ্রাধিকার দিন। এমন সাবান ব্যবহার করা দরকার যাতে শরীর তেলতেলে থাকে। মাথা অনেকসময় চুলকায়। মাথায় খুশকি অনেকসময়েই বেশি হয়। এসবের সঙ্গে লড়তে জল বেশি করে পান করুন। তাতে ত্বকের শুষ্কভাব কমবে। ফল, সবুজ শাকসব্জি বেশি করে খেতে হবে। ফল এবং সবুজ শাকসব্জিতে থাকে প্রচুর জল ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। ফলে শরীরে জলের অভাব হয় না। অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ত্বককে ঝুলে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করে।
মেডিকেটেড সাবান নিয়ে প্রশ্ন
কোনওভাবেই মেডিকেটেড সাবান ব্যবহার করা উচিত নয়। বেশ কিছু সাবান আছে, যেগুলি ব্যবহার করলে সমস্যা বাড়তে পারে। মনে রাখতে হবে, কিছু নির্দিষ্ট অসুখ থাকে যেক্ষেত্রে মেডিকেটেড সাবান ব্যবহার করতে দেওয়া হতে পারে রোগীকে। এগুলি ছাড়া এই ধরনের সাবান ব্যবহারে বিপদ বাড়বে বই কমবে না।
অনেকে আবার কিটোকোনাজেল নির্ভর সাবানও ব্যবহার করেন। তবে চিকিত্সকের পরামর্শ ছাড়া মেডিকেটেড সাবান ব্যবহার করলে সমস্যা বাড়ার আশঙ্কাই থেকে যায়। এছাড়া ত্বকের শুষ্কভাবও অনেকগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে মেডিকেটেড সাবান।
শীতকালে-চটিজুতো
অনেক বয়স্ক এবং ডায়াবেটিসের রোগী পায়ে সঠিক জুতো পরেন না। শক্ত চটি বা প্লাস্টিকের চটি পরলে পা ফাটতে পারে বেশি। অনেকের এমন রাবারের চটিতে অ্যালার্জি থাকতে পারে। এই বিষয়ে সাবধান হওয়া প্রয়োজন। সবসময় উচিত পা ঢাকা জুতো পরা। খুব ভালো হয় স্পোর্টস শ্যু ব্যবহার করলে। এছাড়া সকালে অনেকেই মর্নিং ওয়াক করতে যান। এই প্রসঙ্গে বলে রাখি, মর্নিং ওয়াক করার আগেও সম্ভব হলে ত্বকে ময়েশ্চারাইজার লাগিয়ে রাখুন। ময়েশ্চারাইজার ব্যবহারের সেরা সময়
স্নান করার পর ময়েশ্চারাইজার লাগাতে পারলে খুব ভালো হয়। রাতে শুতে যাওয়ার আগেও ত্বকে লাগাতে পারেন, ময়েশ্চারাইজার। পায়ের ত্বক খুব বেশি ফেটে গেলেও ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করলে ভালো হয়। খুব ভালো হয় সিরামাইড নির্ভর ক্রিম ব্যবহার করতে পারলে। কারণ আমাদের ত্বকে প্রাকৃতিকভাবেই এই ফ্যাটি অ্যাসিড থাকে। এটি ত্বকের আর্দ্রভাব ধরে রাখতে সাহায্য করে। রোগ প্রতিরোধেও সাহায্য করে।
গায়ে তেল
ত্বকে তেল দেওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন করেন। এই প্রসঙ্গে বলা যায়, গায়ে অবশ্যই তেল দেওয়া যাবে। খুব ভালো হয় গায়ে নারকেল তেল লাগাতে পারলে। খুব অল্প খরচে ত্বকের পরিচর্যা করা যায় নারকেল তেল দিয়ে। লাগানো যায় পেট্রোলিয়াম জেলি। বিশেষ করে যাঁদের হাত ও পায়ের ত্বক ফেটে যায়, তাদের জন্য পেট্রোলিয়াম জেলি খুব উপযোগী।
সেনাইল প্লুরাইটিস বলে একটা অসুখ আছে। এই রোগে ত্বকের ইলাস্টিসিটি বা টানটান ভাব কমে যায়। ত্বক কুঁচকে যায়, চুলকায়।
এক্ষেত্রে বারবার ক্রিম লাগাতে হবে। দরকারে খেতে হবে অ্যান্টিঅ্যালার্জিক। তবে অতিরিক্ত সমস্যা হলে চিকিত্সকের শরণাপন্ন হওয়াই বাঞ্ছনীয়। সেক্ষেত্রে দরকারে দিতে হবে ক্রিম। না হলে ঘা হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়।
ডায়েট
ডায়েটে অবশ্যই মাছ রাখুন। মাছে থাকে ফ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড। খুব ভালো হয় সামুদ্রিক মাছ খেলে। ত্বক খুব ভালো থাকে। ত্বকের জলশূন্যতা কমে।
এক নজরে শীতে ডায়াবেটিকদের ত্বকের যত্ন—
• নিয়মিত ত্বক পরীক্ষা— রোজ রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে পা এবং ত্বকের অন্যান্য অংশে কোনও ক্ষত, ফোসকা বা রঙের পরিবর্তন হচ্ছে কি না, পরীক্ষা করে দেখুন।
• ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার— দিনে দু’বার ত্বকে অবশ্যই ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করুন। শীতে দু’বারের বেশি ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করলে আরও ভালো।
• গরম জল নয়, ঈষদুষ্ণ জল— গরম জল ত্বককে আরও শুষ্ক করে তোলে। গরম জলের পরিবর্তে ইষদুষ্ণ জল ব্যবহার করতে পারেন। তাতে ত্বক ফাটার সমস্যা কমবে।
• গ্লিসারিন সাবান ব্যবহার— সাবান ত্বক থেকে প্রাকৃতিক তেল শুষে নেয়। তাই মাইল্ড ক্লিনজার বা গ্লিসারিন সাবান ব্যবহার করতে পারলে বেশি ভালো হয়।
• নরম কাপড় ব্যবহার করুন— ত্বকে যাতে ঘষা বা আঘাত না লাগে সেজন্য ব্যবহার করুন নরম কাপড়।
• ঠান্ডা আবহাওয়ায় যথাযথ পোশাক পরুন— শরীর গরম রাখতে গরম জামা পরুন। উলের পোশাক পরলে চেষ্টা করুন যাতে তা সরাসরি ত্বকের সংস্পর্শে না আসে।
• জুতো পরার সময় সতর্কতা— সঠিক মাপের জুতো পরুন। পা ঢাকা স্পোর্টস শ্যু ব্যবহার করলে বেশি ভালো।
• সুগার নিয়ন্ত্রণে রাখুন: ডায়াবেটিস ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখলে ত্বকের সমস্যা কম হয়। প্রতি ৩ মাস অন্তর চিকিত্সকের পরামর্শ নিন।
• বড় সমস্যায় অবহেলা নয়: ত্বকে কোনও বড় জটিলতা তৈরি হলে রোগ ফেলে রাখবেন না। দ্রুত চিকিত্সকের পরামর্শ নিন।
লিখেছেন সুপ্রিয় নায়েক