


রাজদীপ গোস্বামী, মেদিনীপুর: এল নিনোর জেরে প্রকৃতির খামখেয়ালিপনা আর মানুষের দাপাদাপির কারণে কি জঙ্গলমহলের বিস্তীর্ণ অরণ্যভূমির বাস্তুতন্ত্র সঙ্কটে? প্রশ্নটা উস্কে দিল সাম্প্রতিক এক গবেষণা। জঙ্গলমহলের বনসম্পদ আদিবাসীদের জীবন-জীবিকার একমাত্র সম্বল। শালবীজ, মহুল ফুল, কেন্দুপাতা, শালপাতা, কালোজাম, তেঁতুল কিংবা বর্ষায় বহুল চাহিদাসম্পন্ন কুড়কুড়ে ছাতু সংগ্রহ করেই সংসারের হাল ধরে বহু আদিবাসী পরিবার। কিন্তু, এবছর সেই পরিচিত ছবি উধাও। অনিয়মিত বর্ষা, দীর্ঘকালীন তাপপ্রবাহ এবং ঋতুচক্রের অস্বাভাবিক পরিবর্তনের জেরে জঙ্গল যেন তার প্রাচুর্য হারাতে বসেছে। কমছে বনজ সম্পদের উৎপাদন। আর তার সরাসরি প্রভাব পড়ছে পশ্চিম মেদিনীপুর ও ঝাড়গ্রামের হাজার হাজার বননির্ভর মানুষের রুজিরুটিতে। গবেষণায় উঠে আসছে এমনিই চাঞ্চল্যকর তথ্য। গবেষকদের মতে, অরণ্যভূমির এই কৃপণতার নেপথ্যে অন্যতম কারণ এল নিনো-জনিত জলবায়ুগত অস্বাভাবিকতা।পশ্চিম মেদিনীপুর সদর ব্লকের বাসিন্দা লক্ষ্মী মাহাত। প্রতি বছর তিনি শালবীজ বিক্রি করে দেড় থেকে দুই হাজার টাকা উপার্জন করতেন। এ বছর সেই আয় নেমে এসেছে মাত্র ৮০০ টাকায়। আক্ষেপের সুরে তিনি বলছিলেন, ‘আগের মতো ফলনই হচ্ছে না। জঙ্গলে গিয়ে অনেক সময় খালি হতে ফিরতে হচ্ছে।’ একই ছবি ঝাড়গ্রামের জামবনিতেও। আদিবাসী বধূ রেবতী সরেনের কথায়, ‘এ বছর জঙ্গলে কুড়কুড়ে ছাতুর দেখাই নেই। কয়েক দিন টানা বৃষ্টি, তারপর রোদ, আবার হালকা বৃষ্টি—এই স্বাভাবিক আবহাওয়া না থাকলে ছাতু জন্মায় না।’
নরেন্দ্রলাল খান মহিলা মহাবিদ্যালয় (স্বশাসিত)-এর ভূগোল বিভাগ সম্প্রতি জলবায়ুর পরিবর্তন ও বনভূমিতে তার প্রভাব নিয়ে রিসার্চ পেপার তৈরি করে। তাতে সামনে আসে এল নিনো কিংবা সুপার এল নিনোর আগমন বার্তা শুধু কৃষিক্ষেত্রেই নয়, বনাঞ্চলকেও সঙ্কটের কবলে ফেলছে। ভুগোল বিভাগের অধ্যাপক প্রভাত কুমার শীট বলছিলেন, ‘প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের জলের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে এল নিনো পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এর ফলে বিশ্বব্যাপী বায়ুমণ্ডলীয় সঞ্চালনের পরিবর্তন ঘটে। বর্ষার স্বাভাবিক ছন্দ ব্যাহত হয়। দক্ষিণ এশিয়ার বহু অঞ্চলের মতো জঙ্গলমহলেও এর প্রভাব পড়ছে। কোথাও অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, কোথাও দীর্ঘ তাপপ্রবাহ এবং কখনও অতিবৃষ্টি সরাসরি আঘাত হানছে বনজ সম্পদের উৎপাদন ও বননির্ভর মানুষের জীবিকার উপরে। আমাদের গবেষণায় এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে আসছে।’জঙ্গল লাগোয়া গ্রামের বাসিন্দারা জানিয়েছেন, ‘গত বছর বহু পরিবার কালোজাম, কুড়কুড়ে ছাতু ও অন্যান্য বনজ সম্পদ বিক্রি করে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করেছিলেন। কিন্তু এ বছর আষাঢ় শেষ হতে চললেও কুড়কুড়ে ছাতুর দেখা মেলেনি। মেদিনীপুরের বাসিন্দা সুভাষ মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘জঙ্গলে আগুন লাগিয়ে দেওয়া, গাছ কাটার খেসারত দিতে হচ্ছে। জঙ্গলমহলের মানুষ কুড়কুড়ে ছাতু এক থেকে দেড় হাজার টাকা কেজি দরে বিক্রি করেন। এই ছাতুর উৎপাদন কমছে মানে গ্রামীণ অর্থনীতিতে সরাসরি প্রভাব পড়বে।’