


ড. সায়ন্তন মজুমদার: রবীন্দ্র সংগীতে সিন্ধুপারে থাকা বিদেশিনির কথা শুনলেই আমরা বলে উঠি ‘আমি চিনি গো চিনি তোমারে’। নজরুলগীতিতে সুদূর দারুচিনি দ্বীপবাসিনীকে দেখলেও আমাদের মুখ থেকে বেরিয়ে যায় ‘চিনি তোমারে চিনি’। ভিনদেশি সেই নারীরা আমাদের অতি কাছের মানুষ। কিন্তু ছন্দের জাদুকর সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের জাদুকলমে নানা দেশের মহিলারা যে কাব্যছন্দে বন্দি হয়ে রয়েছেন, তাঁরা আমাদের খুব বেশি পরিচিতা নন। আজ আন্তর্জাতিক নারী দিবসে তাঁদের কথাই বলব।
কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের(১৮৮২-১৯২২) পঞ্চম কাব্যগ্রন্থ হল ‘তীর্থ-সলিল’। এটি বিবিধ অনুবাদ কবিতার সংকলন, যার প্রথম সংস্করণ প্রকাশিত হয় ১৯০৮ সালে। গ্রন্থটি কবি উৎসর্গ করেছিলেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরকে।
বহু পুরুষ কবির পাশাপাশি ‘ভারতীয় বুলবুল’ সরোজিনী নাইডুর একটি সৃষ্টির অনূদিত কবিতার পরেই তিনি আলোচ্য বিষয়ের কবিতাগুলি লিপিবদ্ধ করেছিলেন। প্রতিটি কবিতারই নাম ছিল ‘নারী-বন্দনা’। শিরোনামের নিচে নানা দেশের বা মহাদেশের বা জাতির কিংবা অঞ্চলের নামগুলি পরিচায়িকারূপে লেখা ছিল। এ হেন কবিতাগুলি সংখ্যায় ছিল দশটি। ভারতবর্ষীয় নারীবন্দনাটির স্থান ছিল পঞ্চমে।
প্রথমে আসি মালয় উপদ্বীপের নারীবন্দনায়। সত্যেন্দ্রনাথ লিখেছেন ‘মলয়’। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় অবস্থিত এই মালয় এশিয়া মহাদেশের সর্ব দক্ষিণপ্রান্ত, যা থাইল্যান্ড থেকে সিঙ্গাপুর পর্যন্ত জুড়ে রয়েছে। সেই স্থানের রমণীদের কপাল যেন শুক্লপক্ষে তৃতীয়ার চাঁদ, নাক আধফুটন্ত জুঁইফুল। আমের মতো তার গাল, লেবুগন্ধী ঘাসের মতো কচি আঙুল। চুল সুপারি ফুলের গুচ্ছ, আকাশের পাখির মতো ভুরুযুগল, চোখে শুকতারার শোভা। নিচের ঠোঁটে লেগে রয়েছে পেকে ফেটে যাওয়া ডালিমের রং।
এরপর রয়েছে মিশরীয় নারীবন্দনা। মালয় নারীর বন্দনা দেহসর্বস্ব। কিন্তু মিশরিয়াকে তিনি ‘রমণীর মণি, মমতার খনি’ বলেছেন অর্থাৎ ইজিপশিয়ার মানসিক সৌন্দর্যের আভাস আমরা এখানে পেয়ে যাই। পাশাপাশি ‘রাজার দুলালী ধনি’-র মধ্যে তার সামাজিক অবস্থানও সুনিশ্চিত হয়েছে। কিন্তু আবার প্রাধান্য পেয়ে যায় তার তনুশ্রী। অমাবস্যার অন্ধকারকে হার মানানো তার চুল আঁধারকরা জামবনের মতো দেহে ছড়িয়ে থাকে। চোখে কাটিং করা হীরার দ্যুতিবিজয়ী দৃষ্টি। শেষ দুই ছত্র এই বাসন্তী আবহাওয়ায় আমাদের হৃদয়ে আজও দখিনা বাতাস বয়ে আনে—‘তোমারে ঘিরিয়া যেন বসন্ত নব-পল্লব খোলে!’
জাপানি ললনার ছোটো ছোটো চোখের মধ্যে কবি গুটিয়ে থাকা ফুলকুঁড়ির পাপড়ি লক্ষ করেছেন। চোখের মতো ক্ষুদ্রাকৃতি ঠোঁটের হাসিটিও কবির মতে ‘আধ-বিকশিত’। ডিম্বাকার মুখে বসানো সেই দুটি চোখ ছুরির মতো শাণিত আবার পাখির মতো শান্ত। ঠোঁট-চোখ ক্ষুদ্র হলেও জাপানি মহিলারা কিন্তু দীর্ঘগ্রীবা। পাণ্ডুবরণ, কৃশকায় তার দেহশ্রী।
নারীবন্দনের মানচিত্র এবার অগ্রসর হয়েছে ইয়োরোপের গ্রিসে। গ্রিসিয়ান রমণীর গাল হতে গোলাপের মতো দুধে-আলতা রং ও নিঃশ্বাসে যেন মধু ঝরে পড়ে। তার মনোতোষ হাসিভরা মুখে ভাস্বর, মাঝারি মাপের চোখের উপর থাকা জোড়া ভ্রূ যুক্ত নয়। মাঝে থাকা নাক গরুড়ের মতো এক্কেবারেই নয়। ভূষণভরার পাশাপাশি বসনহারাতেও তার গ্রিক সৌন্দর্য যেন ‘তনু কমনীয়, সুখ নমনীয়, নিখিল পরাণ লোভা।’
ইহুদি নারীর মুখগন্ধ নাসপাতি হতে মিঠে। সুরা, সুধা সরবত সবই যেন তার অধর হতে ছিটকে বের হয়। তার নীল চুল, দেহে তরুণ তরুর ছন্দ, মনে আঙুরগুচ্ছের রস। অমৃতভরা স্ফটিক দেহে কোন রসের অভাব আছে তা কবি ঠাওর করতে পারেননি।
এবার কবি মধ্যযুগীয় ইয়োরোপিয়ান মহিলার দ্বারস্থ হয়েছেন। সোনাকে হারানো সোনালি চুল ও ননী বা হিমানীর শুভ্রতা বিজয়ী দেহপটের অধিকারিণী সে। করুণ নয়নের নিচে অরুণ অধরে তরুণ হাসি খেলে বেড়াচ্ছে তার। সকলেই তার সোহাগভিখারি।
এতক্ষণ গৌরাঙ্গীদের কথাই আলোচিত হয়েছে। এবার কবি দেখেছেন আফ্রিকান কাফ্রি কৃষ্ণকলিকে। তার অমৃতকূপ কিংবা সুষমার খনির মতো কালোরূপ দেখে কবি বলতে বাধ্য হয়েছেন ‘কালো আমি বাসি ভালো।’ কোমলে কঠোর সেই কৃষ্ণাঙ্গীর শ্যামল বদনে চঞ্চল দুটি আঁখিপাখি স্নিগ্ধ।
যুদ্ধের আবহে বর্তমানে পরস্পর প্রতিপক্ষ হলেও এ কাব্যে ইজরায়েলি ইহুদি নারীর সঙ্গে বিরাজিতা ইরানিয়ান পারস্যসুন্দরী। ধনুর মতো ভুরুতে, কাজলকালো নয়নকটাক্ষের তীর যোজনা করে চলেন তিনি। থুতনিতে নীল সুষমালেখা, কালো তিল তার রূপকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ক্লিওপেট্রার কাছে এন্টনির মতোই তার ‘অমল চরণে লুণ্ঠিত কত মুকুট-শীর্ষ ভূপ!’
মরুসুন্দরী আরব্য নায়িকার কথা রয়েছে শেষে। যার কথা ছোটো থেকেই আমরা আরব্য রজনীর গল্পে শুনে এসেছি। জাপানি মহিলার মতোই তার হাত-পা। মেহেন্দি করা আঙুলগুলি বিশেষ সজ্জাসংস্কৃতির পরিচায়ক। মাড়িসহ দাঁত ‘প্রবালে মুকুতা পাঁতি’ হলেও সবচেয়ে আকর্ষণীয় হল— ‘কান্ত কোমল ক্লান্ত সে দিঠি সকল দিঠির সেরা’।
সর্বান্তে আসি ভারতীর কথায়। জাপানিদের মতো শুধুমাত্র নজর বা হাসি নয়, ভারতীয়ার সার্বিক দেহশ্রীতে যেন অর্ধ বিকশিত স্বর্ণকমলের মহিমা স্বতোৎসারিত। পৌর্ণমাসীর চন্দ্রমার মতো তার মুখশ্রী। মৃগনয়নী, কোকিলকণ্ঠী সেই স্বদেশিনীর স্পর্শে আসে শিরীষসুষমা। কিন্তু একটি বিশেষ বস্তুর কথা একমাত্র ভারতবর্ষীয়ার বর্ণনার ক্ষেত্রেই কবি ব্যবহার করেছিলেন। সেটি যুগ যুগ ধরে নারীর ভূষণরূপে পরিগণিত। সেটি ভারতীয়ার হাসিতে সদা জড়িয়ে থাকে,তা হল লজ্জা।
নারীবন্দনা বিষয়ী কবিতাগুলিতে নারীর প্রিয়া সত্তার জয়জয়কার হলেও প্রিয়া হতে পরিণীতা জননীর জয়ধ্বনিও রয়েছে। স্বামী বিবেকানন্দের ‘Kali, The Mother’ কবিতার বঙ্গানুবাদী ‘মৃত্যুরূপী মাতা’ কবিতায় মরণবেশী মা-কে পরম আন্তরিকতায় ডেকেছেন দত্তকবি। ‘হাবশী নারীর গান’-এ উতল বাদলধারায় বিপর্যস্ত মা-বধূর সঙ্গছাড়া এক পথিককে রক্ষা করার পরম ইচ্ছাই প্রকট হয়েছে। জননীর সেই ইচ্ছাপরশে, প্রতিকূল প্রশাসন বা পরিবেশের চোখে চোখ রেখে কথা বলা পুরুষটির দৃপ্ত নয়নও নেমে যায়। মাতৃস্নেহে মুহূর্তের মধ্যে সে যেন স্বীয় ছোটোবেলা ফিরে পায়। কবি হায়েনের লেখা ‘মাতার প্রতি’-র অনূদিত কবিতায় সত্যেন্দ্রকবি ‘চির-আরাধ্য’ বিশেষণ প্রয়োগ করেছেন।
আরাধনা-অর্চনার কথাতেই নারী দেবীত্বে উত্তীর্ণা হন। একজন কবির কাছে সেই নারী হলেন Muse বা কাব্যাধিষ্ঠাত্রী। আলতাফ হুসেন আনসারির একটি কবিতানুবাদে কাব্যদেবীর প্রতি কবি সত্যেন্দ্রনাথের অঞ্জলি প্রদত্ত হয়েছে। সত্যরত্ন কাব্যলক্ষ্মীকে হঠাৎ-কবিদের ত্যাগ করে, খ্যাতি-অখ্যাতির মোহ হতে মুক্ত হতে বলেছেন কবি। তাঁকে জনবিমোহিনী না হয়ে গুণগ্রাহী রসজ্ঞের নয়নবাসিনী হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। নিজেকে তাঁর দাসরূপে কল্পনা করে কাব্যদেবীর প্রতি সশ্রদ্ধ চিত্তে কবি বলেছেন, ‘সম্রাট সে তুমি।’
স্বভূমের কবির বিদেশবিভূমের রমণীয়লোকে এই অবলোকন সত্যিই আশ্চর্যের। অত্যাশ্চর্য হতেই হয় যখন আমরা জানতে পারি যে তিনি একবারের জন্যও বিদেশে পা রাখেননি। মায়ের কথা ভেবে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে বিলাত ভ্রমণের প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছিলেন। এই জন্যই হয়তো কবিদের তৃতীয় নয়ন বা ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের অতি সক্রিয়তার প্রবাদ প্রচলিত রয়েছে। যার ফলে দূর নিকট হয়, অনির্বচনীয়তা বচনে প্রকাশ পায়, অতীন্দ্রিয় বস্তু ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য হয়।
এই কাব্যের ভূমিকায় তিনি একদা লিখেছিলেন, ‘বিশ্বমানবের নানা বেশ, নানা মূর্তি ও নানা ভাবের সহিত পরিচয় সাধনই এই গ্রন্থ প্রচারের প্রধান উদ্দেশ্য।’ কিন্তু শুধুমাত্র এই কবিতাগুলির মাধ্যমে বিশ্বমানব নয়, বিশ্বমানবীর এক অপ্রতিম কাব্যিক প্রতিমা তিনি নির্মাণ করেছিলেন।